![]() |
| কলকাতা হাইকোর্ট | ছবি: সংগৃহীত |
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তুহিন গঙ্গোপাধ্যায় বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মামলায় বিচারপতি উদয় কুমারের একক বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত বলেন, চেকের স্বাক্ষর স্বীকার করার পর আইনগত অনুমান খণ্ডনের দায় অভিযুক্তের ওপর বর্তায়। তবে এই দায় প্রমাণের মানদণ্ড হলো সম্ভাবনার ভারসাম্য—অর্থাৎ অভিযুক্তকে এমন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে, যাতে তাঁর প্রতিরক্ষা যুক্তিসংগত ও সম্ভাব্য বলে প্রতীয়মান হয়।
মামলার ঘটনা
মামলাটি নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় চেক প্রত্যাখ্যানের অভিযোগে দায়ের করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তুহিন গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর কাপড়ের ব্যবসা ‘মধুকরী টেক্সটাইল’-এর প্রয়োজনে অভিযোগকারীর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণ পরিশোধের জন্য দেওয়া চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপনের পর প্রত্যাখ্যাত হয়।
আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধের দাবিতে নোটিশ পাঠানো হলেও অভিযুক্ত অর্থ পরিশোধ করেননি। তাঁর দাবি ছিল, তিনি অভিযোগকারীর কাছ থেকে কোনো ঋণ নেননি এবং তাঁকে কোনো চেকও দেননি। বরং তাঁর টাকার ব্যাগ হারিয়ে গিয়েছিল, যাতে একটি স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক ছিল। এ ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন এবং ব্যাংককে চেকের অর্থ পরিশোধ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
বিচারিক আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন। পরবর্তী সময়ে আপিল আদালতও দণ্ডাদেশ বহাল রাখেন, তবে কারাদণ্ড কমিয়ে সাত দিন নির্ধারণ করেন এবং ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেন। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন তুহিন গঙ্গোপাধ্যায়।
সাধারণ ডায়েরির এন্ট্রি এককভাবে যথেষ্ট নয়
আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, সাধারণ ডায়েরির এন্ট্রি মূলত তথ্যদাতার নিজের বক্তব্যের নথিভুক্তি। কেবল সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে—এ তথ্য থেকেই প্রমাণিত হয় না যে চেকটি বাস্তবে হারিয়ে গিয়েছিল কিংবা অন্য কেউ সেটির অপব্যবহার করেছে।
এ ক্ষেত্রে চেক হারানোর দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় অভিযুক্ত আইনগত অনুমান খণ্ডন করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে আদালত মনে করেন। ফলে নিম্ন আদালতগুলোর সিদ্ধান্তে কোনো বেআইনি পদক্ষেপ বা গুরুতর অসংগতি খুঁজে পায়নি হাইকোর্ট।
লিখিত চুক্তি বা আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ না থাকলেই ঋণ অবৈধ নয়
৩০ হাজার টাকার মতো তুলনামূলক স্বল্প অঙ্কের ব্যক্তিগত ঋণের ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি না থাকা কিংবা আয়কর বিবরণীতে ঋণের বিষয়টি উল্লেখ না থাকাকে এককভাবে ঋণটি আইনত অকার্যকর প্রমাণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না বলেও আদালত পর্যবেক্ষণ করেন।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, অভিযোগকারীর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে অভিযুক্ত এমন কোনো গ্রহণযোগ্য আপত্তি উত্থাপন করেননি, যা ঋণ দেওয়ার দাবিকে সন্দেহের মুখে ফেলতে পারে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম আলাদাভাবে অভিযুক্ত করা বাধ্যতামূলক নয়
মামলায় ‘মধুকরী টেক্সটাইল’ নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পৃথকভাবে অভিযুক্ত না করার বিষয়েও আপত্তি তোলা হয়েছিল। আদালত এ আপত্তি নাকচ করে বলেন, একক মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্বতন্ত্র আইনগত সত্তা নয়; এটি মূলত মালিকের ব্যবসায়িক নাম। তাই শুধু ব্যবসার নামকে আলাদাভাবে মামলার আসামি না করায় ফৌজদারি কার্যক্রম ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায় না।
এ ছাড়া আবেদনকারীকে একদিকে বেকার এবং অন্যদিকে ছোট কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে বর্ণনা করার অসংগতিকে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি, যার কারণে প্রাথমিক পর্যায়েই পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করা প্রয়োজন।
দণ্ডাদেশ বহাল, তবে কারাদণ্ড ভোগে অব্যাহতি
সব দিক বিবেচনায় কলকাতা হাইকোর্ট নিম্ন আদালতগুলোর দণ্ডাদেশে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনো কারণ খুঁজে পাননি। ফলে ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ এবং তা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রযোজ্য অতিরিক্ত দণ্ডের নির্দেশ বহাল থাকে। তবে অভিযুক্তকে সাত দিনের মূল কারাদণ্ড ভোগ করা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
মামলার তথ্য
মামলা: তুহিন গঙ্গোপাধ্যায় বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য
আদালত: কলকাতা হাইকোর্ট
বিচারপতি: উদয় কুমার
রায়ের তারিখ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রাসঙ্গিক আইন: নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮, ১১৮(ক) ও ১৩৯ ধারা।
সূত্র: দ্য বার বুলেটিন
বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম