সম্প্রতি বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের একক বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া রায়ে আদালত বাদীপক্ষের দায়ের করা রিভিশনের রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানান।
মামলার পটভূমি
মামলাটির সূত্রপাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ এলাকার একটি জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থেকে। বাদীপক্ষের দাবি, ১৯৪৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি একটি দলিলের মাধ্যমে তাঁরা জমিটি ক্রয় করেন এবং পরবর্তী সময়ে জমির দখল ভোগ করতে থাকেন। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে ভুলভাবে অন্যদের নাম রেকর্ড করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালে দায়ের করা একটি স্বত্ব মামলায় ডিক্রি পাওয়ার ভিত্তিতেও তাঁরা জমির ওপর নিজেদের অধিকার দাবি করেন।
বাদীপক্ষ আরও দাবি করে, তাঁদের নামজারি বাতিল করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ জমিটি তৃতীয় পক্ষের কাছে ইজারা দেয়। এ পরিস্থিতিতে তাঁরা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা দায়েরের পাশাপাশি দেওয়ানি কার্যবিধির অর্ডার ৩৯, রুল ১ ও ২ অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন।
অন্যদিকে, সরকারি বিবাদীপক্ষের দাবি, জমিটি অর্পিত ও অনাবাসী সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠায় বাদীপক্ষের উপস্থাপিত দলিল ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলে।
নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত
বিচারিক আদালত প্রথমে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিলেও উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে তা প্রত্যাহার করেন। পরে বাদীপক্ষের আপিল আংশিক মঞ্জুর করে ১৪ আগস্ট ২০১৩ তারিখে অতিরিক্ত জেলা জজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ মামলাটি ফেরত পাঠান। জমিটি অর্পিত সম্পত্তিসংক্রান্ত আইনের আওতায় পড়লে মূল মামলাটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, তা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, বাদীপক্ষের স্বত্বের দাবির অন্যতম ভিত্তি ছিল ১৯৪৪ সালের একটি অনিবন্ধিত দলিল। এ ছাড়া ১৯৭৭ সালের স্বত্ব মামলার রায় ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও গুরুতর সন্দেহ ছিল। সংশ্লিষ্ট মামলার রেজিস্টারের সঙ্গে উপস্থাপিত রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপির সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, বাদীপক্ষ জমির নামজারি সংশোধন এবং সংশোধিত এসএ খতিয়ানের কথা বললেও সংশ্লিষ্ট সংশোধিত খতিয়ান বা নামজারি খতিয়ান আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি। ফলে জমির ওপর তাঁদের স্বত্বের প্রাথমিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
হাইকোর্টের মতে, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মতো অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকার দেওয়ার আগে বাদীর প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য মামলা (prima facie case) রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মূল মামলাটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, সেই প্রশ্নও নিষেধাজ্ঞার আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
আদালত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১-এর ৭ ও ১৩ ধারার বিধানও আলোচনা করেন। তবে মূল মামলাটি আইনত গ্রহণযোগ্য কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় আরজি হাইকোর্টে সংযুক্ত না থাকায় আদালত নিজে বিষয়টি পরীক্ষা করতে পারেননি।
রিভিশন খারিজ
হাইকোর্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, বাদীপক্ষ নিম্ন আদালতে তাঁদের দাবির পক্ষে প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিম্ন আদালতগুলোর সিদ্ধান্তে আইনগত কোনো ত্রুটি দেখাতে না পারায় সেসব সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
ফলে আদালত সিভিল রিভিশন নং ৩৭৭৪/২০১৩-এর রুল খারিজ করেন এবং পূর্বে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতকে অপ্রয়োজনীয় মুলতবি এড়িয়ে যত দ্রুত সম্ভব মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন, যদি এরই মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি না হয়ে থাকে।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক
এ রায়ের তাৎপর্য হলো, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রতিকার নয়। আবেদনকারীকে তাঁর দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রাথমিক ভিত্তি দেখাতে হবে। দলিল, পূর্ববর্তী ডিক্রি, খতিয়ান ও নামজারির মতো নথির সত্যতা বা সামঞ্জস্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থাকলে তা নিষেধাজ্ঞার আবেদন বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: হাইকোর্ট বিভাগের রায়, সিভিল রিভিশন নং ৩৭৭৪/২০১৩।