সর্বশেষ

৬ অক্টো, ২০২৬

মিরপুর স্মৃতিসৌধে গার্মেন্টসকর্মী হত্যায় তিন ছিনতাইকারীর মৃত্যুদণ্ড

মিরপুর স্মৃতিসৌধে গার্মেন্টসকর্মী হত্যায় তিন ছিনতাইকারীর মৃত্যুদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত 
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গার্মেন্টসকর্মী সায়মনকে ছিনতাইয়ের পর হত্যার মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় চোরাই মোবাইল ফোন কেনার দায়ে সুজন নামে এক ব্যক্তিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ঢাকার ১৩তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জাহিদুল ইসলামের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন—মো. ইউসুফ, ইকবাল খাঁ ও মেহেদী হাসান। তাদের প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আদালতের বেঞ্চ সহকারী সোহেল মিয়া রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ জানান, রায় ঘোষণার আগে কারাগারে থাকা ইউসুফ, ইকবাল ও মেহেদী হাসানকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার পর তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করে কারাগারে পাঠানো হয়। অপর আসামি সুজন পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড

মামলার নথি অনুযায়ী, নিহত সায়মনের বয়স ছিল ১৭ বছর। তিনি মিরপুর-১ নম্বরে সনি সিনেমা হলের পেছনে লিবার্টি গার্মেন্টসে মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতেন।

২০২২ সালের ১১ অক্টোবর অফিস থেকে বেতন নেওয়ার পর সহকর্মী রিফাত হোসেন রাব্বি ও হৃদয় হাসানকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুর-১ এলাকায় কেনাকাটা করতে যান সায়মন। কেনাকাটা শেষে রাত ৯টার দিকে তারা বাসায় ফিরছিলেন।

এ সময় আড়ং শপিং সেন্টারের সামনে তিন ছিনতাইকারীর একজন সায়মনকে উদ্দেশ করে দাবি করেন, তিনি নাকি তার ছোট ভাইকে মারধর করেছেন। পরে ‘কথা আছে’ বলে ভয়ভীতি দেখিয়ে সায়মন ও রিফাতকে রূপায়ণ টাওয়ারের সামনে থেকে রিকশায় তুলে নেওয়া হয়।

রিকশাটি দারুস সালাম থানার কোনাবাড়ি হয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাঁচাবাজারের সামনে পৌঁছালে রিফাতকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর সায়মনকে স্মৃতিসৌধের ভেতরে নিয়ে যায় ওই তিন ব্যক্তি।

সেখানে চাকু দেখিয়ে সায়মনের কাছে থাকা টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী তাদের হাতে তুলে দিতে বলা হয়। সায়মন এতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে তার কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় তারা।

সায়মনের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তদন্ত ও অভিযোগপত্র

ঘটনার পর সায়মনের বাবা শাজাহান শেখ দারুস সালাম থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ ইউসুফকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে ইউসুফ ঘটনার সঙ্গে ইকবাল খাঁ ও মেহেদী হাসানের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তের সময় ইউসুফের বাসা থেকে সায়মনের মোবাইল ফোন বিক্রির টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া সায়মনের মোবাইল ফোনটি সুজনের কাছে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে আসে।

তদন্ত শেষে দারুস সালাম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহান আহমেদ ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ইউসুফ, ইকবাল ও মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের পর হত্যার অভিযোগে এবং সুজনের বিরুদ্ধে চোরাই মাল রাখার অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

১৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ

২০২৩ সালের ২ আগস্ট আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। বিচার চলাকালে আদালত মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। পরে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মঙ্গলবার আদালত রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে ইউসুফ, ইকবাল খাঁ ও মেহেদী হাসানকে মৃত্যুদণ্ড এবং সুজনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।


বিডিএলপিবি/এমএম

সূত্র: যুগান্তর (০৬.১০.২০২৬)

আদালত থেকে আবারও পালালেন সেই শরিফ

আদালত থেকে আবারও পালালেন সেই শরিফ

ছবি: সংগৃহীত 
ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে শরিফুল ইসলাম নামে এক আসামি আবারও পালিয়ে গেছেন। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলমের আদালতে হাজিরা শেষে তাকে হাজতখানায় নেওয়ার পথে এ ঘটনা ঘটে।

এর আগে ২০২৫ সালের জুনেও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাস থেকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় পুলিশ সদস্যকে মারধর করে হাতকড়া খুলে পালিয়েছিলেন তিনি।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৯ জুন ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাস থেকে হাজতখানায় নেওয়ার পথে পুলিশ সদস্যকে আঘাত করে হাতকড়া খুলে পালিয়ে যান শরিফুল ইসলাম। ওই ঘটনায় সেদিনই হাজতখানার ইনচার্জ রিপন মোল্লা বাদী হয়ে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন।

ওই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য থাকায় মঙ্গলবার শরিফুলকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলমের আদালতে তোলা হয়। তবে কোনো সাক্ষী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় সেদিন সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

পরে ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগে কর্মরত কনস্টেবল আব্দুল আলিম শরিফুলকে আদালত থেকে হাজতখানায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় কৌশলে হাতকড়া খুলে তিনি আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে যান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, কোতোয়ালি থানার মামলার হাজতি আসামি শরিফুল ইসলাম কৌশলে হাতকড়া খুলে পালিয়ে গেছেন। মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য থাকায় তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল।


সূত্র: সমকাল (০৬.১০.২০২৬)

দেনমোহর স্ত্রীর স্বতন্ত্র অধিকার, আর্থিক অক্ষমতার অজুহাতে দায় এড়ানো যাবে না: হাইকোর্ট

দেনমোহর স্ত্রীর স্বতন্ত্র অধিকার, আর্থিক অক্ষমতার অজুহাতে দায় এড়ানো যাবে না: হাইকোর্ট

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
দেনমোহর স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র ও আইনগত অধিকার এবং স্বামী আর্থিক অক্ষমতার অজুহাত দেখিয়ে এ দায় থেকে অব্যাহতি নিতে পারেন না—এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, স্ত্রী স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে দেনমোহরের পুরো বা কোনো অংশ মওকুফ না করলে আদালতেরও দেনমোহরের অর্থ কমিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার নেই।

বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ সিভিল রিভিশন নং ৫২১৯/২০২৪ মামলায় এ রায় দেন। ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রায়টি ঘোষণা করা হয়। মামলাটিতে ইকুব আলী ছিলেন আবেদনকারী এবং শানজিদা নাসরিন ছিলেন প্রতিপক্ষ। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি:

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাদী ও বিবাদীর মধ্যে বিয়ে হয়। বিয়েতে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল ২২ লাখ টাকা। তাদের দাম্পত্য জীবনে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়।

পরবর্তীতে দাম্পত্য বিরোধের একপর্যায়ে স্ত্রীকে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং পরে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। স্ত্রী নিজের দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ভরণপোষণ আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করেন।

পারিবারিক আদালত একতরফা ডিক্রি দিয়ে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ ৩০ হাজার টাকা এবং মেয়ের অতীতের ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা, অর্থাৎ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি মেয়ের জন্য প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা ভরণপোষণ এবং বিয়ের আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ওই ডিক্রি কার্যকরের জন্য এক্সিকিউশন মামলা করা হয়। বিবাদী ডিক্রি বাতিলের আবেদন করলেও তা নিষ্পত্তির আগেই তিনি উচ্চতর আদালতে আপিল করেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজের আদালত ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট আপিলটি খারিজ করে পারিবারিক আদালতের ডিক্রি বহাল রাখেন। এরপর তিনি হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।

হাইকোর্টে আবেদনকারীর বক্তব্য:

আবেদনকারীর আইনজীবী যুক্তি দেন, তিনি মামলার সমন যথাযথভাবে পাননি এবং তার অনুপস্থিতিতে একতরফা ডিক্রি দেওয়া হয়েছে। তার দাবি ছিল, তিনি দেনমোহরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছেন এবং আর্থিক সংকটের কারণে বাকি অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

হাইকোর্টে আবেদনকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার ডিক্রির বিপরীতে তিনি ইতোমধ্যে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। বাকি অর্থ মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করা হয়।

অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেন, নিম্ন আদালত দুটি সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনের যথাযথ মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। রিভিশন মামলার মাধ্যমে পুনরায় সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়নের সুযোগ নেই এবং আবেদনকারী কোনো আইনগত ত্রুটি বা এখতিয়ারগত ভুল দেখাতে পারেননি।

দেনমোহর নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

রায়ে হাইকোর্ট পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে দেনমোহরের আইনগত ও ধর্মীয় ভিত্তি বিশ্লেষণ করেন। আদালত উল্লেখ করেন, দেনমোহর কেবল প্রচলিত কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র আর্থিক অধিকার এবং বিবাহের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি বাধ্যবাধকতা।

আদালত আরও বলেন, কোরআনের বিধান অনুযায়ী দেনমোহর স্ত্রীকে প্রদান করতে হবে এবং স্ত্রী নিজের ইচ্ছায় কোনো অংশ ছেড়ে না দিলে স্বামী তা ফেরত নেওয়ার অধিকার রাখেন না।

রায়ে আরও বলা হয়, প্রচলিত মুসলিম আইন ও নিকাহনামার কাঠামো অনুযায়ী তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্বামীর ওপর স্ত্রীর পাওনা ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়। স্ত্রীকে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে—এমন কোনো সাধারণ বিধান নেই।

দেনমোহর মওকুফের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:

হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেন, আদালতের নিজের এখতিয়ার থেকে দেনমোহরের কোনো অংশ মওকুফ করার সুযোগ নেই। তবে স্ত্রী স্বামীর পক্ষে স্বেচ্ছায় দেনমোহরের সম্পূর্ণ বা কোনো অংশ মওকুফ করতে পারেন।

এ ধরনের মওকুফ বৈধ হতে হলে তা হতে হবে সচেতন, দ্ব্যর্থহীন ও স্বাধীন সম্মতির ভিত্তিতে। জবরদস্তি, প্রভাব, প্রতারণা বা স্বাধীন সম্মতির ঘাটতির মাধ্যমে কোনো মওকুফ আদায় করা হলে সেটিকে বৈধ বলে গ্রহণ করা যাবে না।

মেয়ের ভরণপোষণও বহাল:

হাইকোর্ট দেখতে পান, নিম্ন আদালতগুলো ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ভরণপোষণের বিষয়ে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। আদালত বলেন, স্কুলগামী অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের প্রয়োজন, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ও উৎসবসহ সামগ্রিক ব্যয় বিবেচনায় ভরণপোষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, আবেদনকারী মোট ডিক্রিকৃত ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও মেয়ের চলমান ভরণপোষণের আইনগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি।

রিভিশন খারিজ, ডিক্রি বহাল:

সবশেষে হাইকোর্ট আবেদনকারীর রিভিশনে কোনো বেআইনি সিদ্ধান্ত, ত্রুটি বা এখতিয়ারগত ভুল খুঁজে পাননি। ফলে রুলটি খারিজ করে দেন এবং নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন।

তবে আদালত আবেদনকারীকে প্রতিপক্ষ স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের প্রাপ্য বকেয়া দেনমোহর ও ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে প্রকৃত আর্থিক সংকট প্রমাণিত হলে এক্সিকিউটিং আদালত ন্যায়সংগত শর্তে কিস্তিতে ডিক্রির অর্থ পরিশোধের সুযোগ দিতে পারবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়। তবে এমন কিস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ডিক্রিধারীর অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।

বিডিএলপিবি/মাসুম

বিচারকদের ‘জুডিশিয়াল লিডারশিপ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ প্রশিক্ষণে মনোনয়ন

বিচারকদের ‘জুডিশিয়াল লিডারশিপ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ প্রশিক্ষণে মনোনয়ন

ছবি: সংগৃহীত 
নারীদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার আরও কার্যকর করা, কমিউনিটি পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মামলা ব্যবস্থাপনা উন্নত করার লক্ষ্যে বিচারকদের জন্য দুই দিনব্যাপী ‘জুডিশিয়াল লিডারশিপ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের উদ্যোগে এবং জিআইজেডের কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ‘অ্যাক্সেস টু জাস্টিস ফর উইমেন: স্ট্রেংদেনিং কমিউনিটি ডিসপিউট রেজোলিউশন অ্যান্ড ইমপ্রুভিং কেস ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।

৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের আইন ও বিচার বিভাগের এক চিঠিতে জানানো হয়, আগামী ৭ ও ৮ অক্টোবর ২০২৬ রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন, মহাখালী, ঢাকা-তে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে।

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ২২ জন বিচারককে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

মনোনীতদের মধ্যে ঢাকা, খুলনা, নরসিংদী, রংপুর, কুমিল্লা, মৌলভীবাজার ও বরিশাল জেলার জেলা ও দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ, মহানগর দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার/চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার রয়েছেন।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট বিচারকদের এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

প্রশিক্ষণে জুডিশিয়াল লিডারশিপ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, কমিউনিটি পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মামলা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের যাবতীয় ব্যয় আয়োজক প্রতিষ্ঠান জিআইজেড বহন করবে। ফলে এ প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ নেই।

প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় যোগাযোগের জন্য অ্যাক্সেস টু জাস্টিস ফর উইমেন প্রকল্পের অ্যাডভাইজার মো. আরিফুল ইসলাম-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে মনোনীত কর্মকর্তাদের যথাসময়ে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


সূত্র: আইন ও বিচার বিভাগ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের পত্র।
বিডিএলপিবি/এমএম

আবরার ফাহাদ হত্যা: দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের প্রত্যাশা অ্যাটর্নি জেনারেলের

আবরার ফাহাদ হত্যা: দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের প্রত্যাশা অ্যাটর্নি জেনারেলের

কোলাজ ছবি 
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে ‘ফ্যাসিবাদ আমলের চরম উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

আগামী ৭ অক্টোবর আবরার ফাহাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক অগ্রগতি তুলে ধরে সাংবাদিকদেরকে তিনি বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা একসময় মনে করতেন, অপরাধ করেও তারা পার পেয়ে যাবেন। তবে আবরার হত্যা মামলার বিচার ও রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে—অপরাধ করলে শেষ পর্যন্ত বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায় হাইকোর্ট বহাল রাখায় রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি। রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান হলো, মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বিলম্ব করা হবে না।

তিনি বলেন, নাগরিকের দ্রুত বিচার পাওয়ার যে সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে, রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করতে চায়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কোনো ধরনের বিলম্ব করা হবে না। এমনকি শুনানি মুলতবির জন্যও রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করবে না।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়া উচিত। মানুষ এই মামলার রায় কার্যকর হতে দেখতে চায়।”

যেভাবে হত্যাকাণ্ড

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা তৎকালীন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিলেন।

বিচারিক আদালতে ২৫ জনের সাজা

আলোচিত এ হত্যা মামলায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২০ আসামি হলেন—মেহেদী হাসান (রাসেল), মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান (রবিন), ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল (জেমি), মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলেন—মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ।

আপিল বিভাগে বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষা

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কয়েকজন আপিল ও লিভ টু আপিল করেছেন। ফলে মামলাটি এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের বিলম্বের চেষ্টা করবে না। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে রায় কার্যকরের পথ সুগম করাই রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা।

বিডিএলপিবি/এমএম
সূত্র: বাসস (০৫.০৯.২০২৬)

প্যানেল চেয়ারম্যান না হয়েও ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক-প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান অবৈধ: হাইকোর্ট

প্যানেল চেয়ারম্যান না হয়েও ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক-প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান অবৈধ: হাইকোর্ট

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দী উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনরত থাকা অবস্থায় আইন ও সরকারি পরিপত্রের বিধান অনুসরণ না করে অন্য একজনকে প্যানেল চেয়ারম্যান দেখিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ.এফ.এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ এ রায় দেন। রিট পিটিশন নং ২৮০৭/২০২৫-এর রায় ২১ জুন ২০২৬ তারিখে ঘোষণা করা হয়। মামলার বাদী আহাম্মদ আলী, ১ নম্বর ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে।

মামলার প্রেক্ষাপট:

আহাম্মদ আলী ২০২১ সালের নির্বাচনে ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১২ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে গেজেট প্রকাশের পর শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পূর্বের প্যানেল চেয়ারম্যান কাজী শহীদুল ইসলামের মৃত্যুর কারণে ১০ নভেম্বর ২০২৪ অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদের সভায় নতুন প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। ওই সভায় মো. কবির হোসেনকে ১ নম্বর এবং মো. নুরু শেখকে ২ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।

তবে ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জারি করা এক স্মারকের মাধ্যমে মোহন রায়হানকে ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে দেখিয়ে তাকে ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচিত চেয়ারম্যান হাইকোর্টে রিট করেন।

আদালতে মূল প্রশ্ন:

রিটে বলা হয়, ১৯ আগস্ট ২০২৪-এর স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী অনুপস্থিত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যানকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। প্যানেল চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকলে বা জটিলতা দেখা দিলে বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের অধীনস্থ কর্মকর্তাকে ওই ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু মোহন রায়হানকে কখনো প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়নি।

অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির কারণে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম সচল রাখার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯-এর ৩৩, ১০১ ও ১০২ ধারার অধীনে সংশ্লিষ্ট আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট দেখতে পান, ১০ নভেম্বর ২০২৪-এর ইউনিয়ন পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুজন সদস্যকে প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়েছিল। কিন্তু মোহন রায়হানকে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচনের কোনো নথি আদালতের সামনে পাওয়া যায়নি।

আদালত বলেন, ১৯ আগস্ট ২০২৪-এর পরিপত্র অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কেবল প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা বিভাগীয় কমিশনার/জেলা প্রশাসকের অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তাকে দেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী গঠিত প্যানেল চেয়ারম্যানদের মধ্য থেকেই একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল।

এ ছাড়া রিটের সঙ্গে দাখিল করা জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, উত্তরাধিকার সনদ ও মাস্টাররোল রেজিস্টার পর্যালোচনা করে আদালত দেখতে পান যে, আবেদনকারী আহাম্মদ আলী ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

আদালতের সিদ্ধান্ত:

হাইকোর্টের অভিমত, ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখের বিতর্কিত আদেশটি ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯-এর ৩৩, ১০১ ও ১০২ ধারার পাশাপাশি ১৯ আগস্ট ২০২৪-এর সরকারি পরিপত্রের বিধান অনুযায়ী জারি করা হয়নি। ফলে আদালত রুল যথাযথ ঘোষণা করে বিতর্কিত স্মারকটি বাতিল করেন।

আদালত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ১৫ জানুয়ারি ২০২৫-এর সংশ্লিষ্ট স্মারকটি ‘without lawful authority and is of no legal effect’—অর্থাৎ আইনগত কর্তৃত্ববিহীন এবং আইনগত কার্যকারিতাহীন। মামলায় খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি এবং রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


বিডিএলপিবি/মাসুম

৫ অক্টো, ২০২৬

মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্টের রায়

মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্টের রায়

ছবি: সংগৃহীত 
রিটের সংক্ষিপ্ত কার্যক্রমে জটিল স্বত্ব-মালিকানা নির্ধারণ করা যাবে না; দেওয়ানি আদালতের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ

অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে কোনো সম্পত্তি অবমুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা ও স্বত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলে তা উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে নিষ্পত্তি করতে হবে বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেছেন, রিটের সংক্ষিপ্ত কার্যক্রমে জটিল স্বত্ব, মালিকানা ও অধিকার নির্ধারণ করা যায় না। এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।

একই সঙ্গে মালিকানা নিয়ে চলমান আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত সম্পত্তি কোনো পক্ষের অনুকূলে অবমুক্ত না করার এবং সম্পত্তির দখল বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

রিটের নিষ্পত্তি, তবে মালিকানা নির্ধারণ দেওয়ানি আদালতে:

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এ. এফ. এম. সাইফুল করিম ও বিচারপতি ফাতেমা নজীব সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ১৯ মে ২০২৬ এই রায় দেন।

রিট আবেদন দুটি হলো—রিট পিটিশন নং ৩৮২০/২০২১ এবং ৩৮২১/২০২১। একই সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করার বিষয়কে কেন্দ্র করে পৃথক কার্যক্রম থেকে দুটি রিটের উদ্ভব হওয়ায় আদালত উভয় রিট একসঙ্গে শুনানি ও নিষ্পত্তি করেন।

কী নিয়ে বিরোধ?

মামলার নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষ পৃথক দলিল ও আদালতের ডিক্রির ভিত্তিতে নিজেদের স্বত্ব দাবি করেন।

রিটকারী শাহাবুদ্দিন আহমেদের দাবি, তিনি ৮ জুলাই ১৯৯৬ তারিখের নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে আলোক কুমার দত্তের কাছ থেকে সম্পত্তিটি ক্রয় করেন। এরপর তিনি সম্পত্তির দখলে থেকে নামজারি করেন এবং ভূমি উন্নয়ন করসহ সরকারি পাওনা পরিশোধ করেন।

অন্যদিকে প্রতিপক্ষের দাবি, আলোক কুমার দত্তের সঙ্গে ২৩ মে ১৯৯৬ তারিখের একটি বায়নাপত্রের ভিত্তিতে তিনি চুক্তির নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলা করেন। ওই মামলায় ডিক্রি পাওয়ার পর ২৬ জানুয়ারি ২০০৩ তারিখে আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধিত বিক্রয় দলিল সম্পাদিত হয়।

ফলে একই সম্পত্তি নিয়ে দুই পক্ষের স্বত্বের দাবি পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে।

নিম্ন আদালতে কী হয়েছিল?

সংশ্লিষ্ট অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালে উভয় পক্ষ পৃথক মামলা করেন। বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল এক মামলায় সম্পত্তি অবমুক্তির পক্ষে এবং অন্য মামলায় তা খারিজ করে রায় ও ডিক্রি দেন।

এর বিরুদ্ধে আপিল হলে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আপিল ট্রাইব্যুনাল ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে উভয় আপিল মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনালের আগের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। এরপর সংশ্লিষ্ট পক্ষ হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট দেখতে পান, উভয় পক্ষই তাদের স্বত্বের দাবি একই মূল মালিকের কাছ থেকে প্রাপ্ত অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠা করছেন। এক পক্ষ ১৯৯৬ সালের বিক্রয় দলিলের ভিত্তিতে এবং অপর পক্ষ ২০০১ সালের চুক্তির নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলার ডিক্রির ভিত্তিতে পরবর্তী দলিলের মাধ্যমে স্বত্ব দাবি করছেন।

আদালত আরও দেখতে পান, ২০০১ সালের মামলার ডিক্রির বৈধতা নিয়ে পরবর্তী দেওয়ানি কার্যক্রম এখনও বিচারাধীন। একই সঙ্গে ১৯৯৬ সালের বিক্রয় দলিলের সত্যতা নিয়েও বিরোধ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন, রিট এখতিয়ারের সংক্ষিপ্ত কার্যক্রমে দলিলের সত্যতা, জটিল স্বত্ব এবং প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এসব প্রশ্ন উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত নির্দেশনা:

আদালত উভয় রিটের রুল নিষ্পত্তি করে নির্দেশ দেন—

প্রথমত, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির স্বত্ব ও মালিকানা উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে নির্ধারিত হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মালিকানা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তি কোনো পক্ষের অনুকূলে অবমুক্ত করা যাবে না।

তৃতীয়ত, চলমান আইনি বিরোধে যে পক্ষের পক্ষে সম্পত্তির স্বত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে, সেই পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তি অবমুক্ত করতে হবে।

চতুর্থত, ততদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পত্তির দখল বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।

রায়ের তাৎপর্য:

এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট মূলত পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, রিট আদালত জটিল মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প দেওয়ানি আদালত নয়। কোনো সম্পত্তির প্রকৃত স্বত্ব নিয়ে গুরুতর বিরোধ থাকলে এবং দলিল ও পূর্ববর্তী ডিক্রির বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে, সংক্ষিপ্ত রিট কার্যক্রমে তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা সমীচীন নয়।

অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তির ক্ষেত্রেও প্রথমে প্রকৃত স্বত্ব নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মালিকানা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষকে সম্পত্তি অবমুক্ত করে দিলে পরবর্তী বিরোধ আরও জটিল হতে পারে—এ কারণেই আদালত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।


বিডিএলপিবি/মাসুম