![]() |
প্রাসঙ্গিক আইন ও নীতি: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ; লোকাস স্ট্যান্ডি (Locus Standi); জনস্বার্থ মামলা (Public Interest Litigation); Approbate and Reprobate নীতি। |
রাজধানীর বনানীতে একটি আবাসিক প্লট বিকল্প বরাদ্দের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদন খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, কেবল আইনজীবী হওয়া কিংবা আইন ও জনস্বার্থ রক্ষার সাধারণ দায়িত্ব পালনের দাবি করলেই কোনো ব্যক্তি সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার অধিকার অর্জন করেন না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যক্তিগত, সম্পত্তিগত অথবা আইনস্বীকৃত স্বার্থ থাকতে হবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রিট পিটিশন নং ১১৮২৮/২০১৬, আবদুল বাসেত মজুমদার (মৃত) ও অন্যান্য বনাম রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও অন্যান্য মামলার রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার ঘটনা
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রাজধানীর বনানী আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কের ডি ব্লকের ২৪ নম্বর প্লটটি রাজউক ২০০৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর মো. জিয়াউল হক মিয়ানের অনুকূলে বিকল্প প্লট হিসেবে বরাদ্দ দেয়। এর আগে ১৯৯৫ সালে তাঁকে গুলশান আবাসিক এলাকায় একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লেকের লে-আউট পরিকল্পনা চূড়ান্ত না হওয়ায় রাজউক ওই প্লটের দখল বুঝিয়ে দিতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বনানীর প্লটটি বিকল্প হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বরাদ্দের পর রাজউকের সঙ্গে ২০০৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর একটি নিবন্ধিত লিজ দলিল সম্পাদিত হয়। পরবর্তী সময়ে প্লটটি একাধিকবার হস্তান্তরিত হয় এবং সর্বশেষ এলিগ্যান্ট ওয়াশিং প্ল্যান্ট লিমিটেডের নামে মালিকানা ও নামজারি সম্পন্ন হয়। ওই জমিতে ১০ তলা ভবন নির্মাণের নকশাও অনুমোদন করে রাজউক।
অন্যদিকে, মূল রিটকারী আবদুল বাসেত মজুমদারের বক্তব্য ছিল, তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন জমির পাশের এই প্লটটি দীর্ঘদিন খালি জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। সেখানে ওয়াসার পাম্প ও অন্যান্য স্থাপনা ছিল। তাঁর অভিযোগ, কোনো বিধিমালা বা নীতিমালায় বিকল্প প্লট বরাদ্দের বিধান না থাকা সত্ত্বেও রাজউক বেআইনিভাবে প্লটটি বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া জমিটি আবাসিক প্লট হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার আগে যথাযথ প্রক্রিয়ায় রূপান্তর এবং প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি ও দরপত্র আহ্বান করা প্রয়োজন ছিল।
এসব অভিযোগে তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে মূল রিটকারীর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা মামলাটি পরিচালনা করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট বলেন, রিটকারী নিজে বিতর্কিত জমির মালিকানা, চুক্তিগত অধিকার, আর্থিক দায়বদ্ধতা কিংবা অন্য কোনো আইনস্বীকৃত স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তাঁর স্ত্রীর পাশের জমির মালিকানা ও সেখানে বসবাসের বিষয়টি স্বীকার করলেও তা বিতর্কিত প্লটের ওপর রিটকারীর কোনো স্বত্ব বা বলবৎযোগ্য অধিকার সৃষ্টি করে না।
আদালত আরও বলেন, কোনো জমির প্রতিবেশী বা সংলগ্ন জমির মালিক হওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরকারি জমির বরাদ্দের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর কিংবা বরাদ্দ প্রক্রিয়া বন্ধ করার আইনগত অধিকার অর্জন করেন না। এ ধরনের অধিকার দাবি করতে হলে সংশ্লিষ্ট জমিতে সরাসরি আইনগত স্বার্থ অথবা অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি দেখাতে হবে।
আইনজীবী হিসেবে রিটকারীর অবস্থান নিয়েও আদালত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত বলেন, আইনজীবী হওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তি সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতিটি প্রশাসনিক কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার সীমাহীন অধিকার পান না। আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পেশাগত দায়িত্ব থাকলেও তা একাই রিট দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় লোকাস স্ট্যান্ডি বা মামলা করার আইনগত অধিকার সৃষ্টি করে না।
জনস্বার্থে মামলা করার ক্ষেত্রেও আদালত বলেন, কেবল জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করলেই কোনো আবেদন জনস্বার্থমূলক মামলা হয়ে যায় না। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত জনস্বার্থ সংশ্লিষ্টতা এবং জনস্বার্থে মামলা করার গ্রহণযোগ্য ভিত্তি থাকতে হবে।
পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন
আদালত রিটকারীর বক্তব্যে পরস্পরবিরোধিতা দেখতে পান। একদিকে তিনি সংলগ্ন জমির মালিক হিসেবে বিতর্কিত প্লটটি পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের স্বার্থের কথা বলেছেন। অন্যদিকে একই জমিকে উন্মুক্ত স্থান বা জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গা দাবি করে ব্যক্তিগত বরাদ্দের বিরোধিতা করেছেন।
আদালত বলেন, একই মামলায় কোনো পক্ষকে পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণের সুযোগ দেওয়া যায় না। আইন অনুযায়ী একজন litigant একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী দাবি বা অবস্থান গ্রহণ করে নিজের সুবিধামতো প্রতিকার চাইতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে Approbate and Reprobate নীতির কথাও উল্লেখ করেন আদালত।
আদালতের মতে, রিটকারীর এ ধরনের পরিবর্তনশীল ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য তাঁর দাবির আইনগত ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। তিনি বিতর্কিত জমির বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ ও বলবৎযোগ্য আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
রিট আবেদন খারিজ
সবশেষে হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দেন, রিটকারীর বিতর্কিত জমির ওপর কোনো প্রত্যক্ষ ও আইনস্বীকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তাঁর রিট আবেদন দায়েরের আইনগত যোগ্যতা বা লোকাস স্ট্যান্ডি নেই। ফলে মামলার মূল বিরোধের গুণাগুণ বা বিকল্প প্লট বরাদ্দের বৈধতা নিয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
এ কারণে আদালত রুল খারিজ করেন এবং রুল জারির সময় দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করেন। তবে কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম