সর্বশেষ

২৫ সেপ, ২০২৬

সন্দেহজনক, অপ্রমাণিত বা আইনগতভাবে দুর্বল দলিল দিয়ে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা যায় না: হাইকোর্টের রায়

সন্দেহজনক, অপ্রমাণিত বা আইনগতভাবে দুর্বল দলিল দিয়ে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা যায় না: হাইকোর্টের রায়

ছবি: সংগৃহীত 
কোনো দলিল সন্দেহজনক, অপ্রমাণিত বা আইনগতভাবে দুর্বল হলে সেটিকে জমির মালিকানার বৈধ ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, রেকর্ড অব রাইটসে কোনো বিরূপ বা প্রতিকূল এন্ট্রি ভুল হলেও, তার ভিত্তিতে নিজে থেকেই কোনো ব্যক্তির মালিকানা বা দখলের অধিকার সৃষ্টি হয় না। মালিকানার দাবিদারকে প্রথমে নিজের স্বত্বের আইনগত ভিত্তি নির্ভরযোগ্য প্রমাণে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আবদুর রহমান এই সিদ্ধান্ত দেন। আফসার উদ্দিন বেগ ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য (সিভিল রিভিশন নং- ৪৩১৯/১৯৯৭) মামলায় ৪ আগস্ট ২০২৬ দেওয়া রায়ে আদালত নিম্ন আদালতের আপিলের রায় বাতিল করে ট্রায়াল কোর্টের মামলাটি খারিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল করেন। যার পূর্নাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার প্রেক্ষাপট:

মামলার বাদীরা সংশ্লিষ্ট জমিতে নিজেদের স্বত্ব ঘোষণার জন্য ১৯৯১ সালে দেওয়ানি মামলা করেন। তাদের দাবি ছিল, পূর্ববর্তী মালিকদের কাছ থেকে তারা কথিত পট্টার মাধ্যমে জমি পেয়েছেন এবং পরে সেখানে পুকুর, ঘাট ও স্থাপনা নির্মাণসহ দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে জমিটি সরকারের নামে খাস খতিয়ানে রেকর্ড হওয়ায় তারা আদালতের শরণাপন্ন হন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জমিটি মূলত জমিদারির সম্পত্তি ছিল এবং State Acquisition and Tenancy Act, 1950-এর অধীনে জমিদারি বিলুপ্তির পর জমিটি যথাযথভাবে সরকারের খাস জমি হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। বাদীদের জমিতে কোনো বৈধ স্বত্ব নেই বলেও দাবি করা হয়।

ট্রায়াল কোর্ট বাদীদের মামলা খারিজ করলেও আপিল আদালত সেই রায় উল্টে দিয়ে বাদীদের পক্ষে ডিক্রি দেন। এরপর সরকার হাইকোর্টে রিভিশন মামলা করে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট দেখতে পান, বাদীরা তাদের কথিত পট্টা ও দাখিলার মাধ্যমে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেও এসব দলিলের সত্যতা ও প্রস্তুত প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি রয়েছে। বিশেষ করে দাখিলাগুলোর প্রস্তুত ও সম্পাদনের সময় সম্পর্কে সাক্ষীর বক্তব্যের সঙ্গে দলিলের তথ্যের মিল ছিল না।

আদালত আরও বলেন, পরবর্তী এস. এ. রেকর্ডও বাদীদের কথিত পট্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বাদীদের একজন জমির পরিমাণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি এবং ভাড়াও নিয়মিত পরিশোধের প্রমাণ দিতে পারেননি। এসব বিষয় তাদের স্বত্ব ও দখলের দাবিকে দুর্বল করেছে।

হাইকোর্টের মতে, কোনো পক্ষ শুধু পুরোনো দলিল আদালতে উপস্থাপন করলেই তা মালিকানার প্রমাণ হয়ে যায় না। মালিকানার মূল উৎস, পূর্ববর্তী মালিকের স্বত্ব, জমির পরিচয়, পরবর্তী লেনদেন, দখলের ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট খতিয়ান—সবকিছু মিলিয়ে স্বত্বের ধারাবাহিকতা যাচাই করতে হবে।

আদালত স্পষ্ট করে বলেন, খতিয়ান নিজে মালিকানার উৎস নয়। রেকর্ড অব রাইটসের সঙ্গে দলিল, উত্তরাধিকার, দখল, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং স্বত্বের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করতে হবে। পূর্বসূরির বৈধ স্বত্ব প্রমাণিত না হলে পরবর্তী খতিয়ানের এন্ট্রিও সেই ত্রুটি দূর করতে পারে না।

‘Adverse entry’ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য:

আদালত বলেন, কোনো ব্যক্তির স্বত্বের প্রাথমিক ভিত্তিই যদি প্রমাণিত না হয়, তাহলে রেকর্ড অব রাইটসে তার পক্ষে বা বিপক্ষে থাকা কোনো এন্ট্রির ওপর নির্ভর করে স্বত্ব সৃষ্টি করা যাবে না।

রায়ে বলা হয়েছে, “a doubtful, unproved or legally infirm document cannot constitute the juridical foundation of title”—অর্থাৎ সন্দেহজনক, অপ্রমাণিত বা আইনগতভাবে দুর্বল দলিল মালিকানার বিচারিক ভিত্তি হতে পারে না। একইভাবে, মালিকানার প্রাথমিক ভিত্তি না থাকলে রেকর্ড অব রাইটসে বিরূপ এন্ট্রি ভুল হলেও তা নিজে থেকেই বাদীর ঘোষণামূলক বা দখলগত অধিকার সৃষ্টি করে না।

আদালত একই সঙ্গে “Qui sentit commodum, sentire debet et onus” নীতির উল্লেখ করে বলেন, কোনো ব্যক্তি সুবিধা ভোগ করলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়ও বহন করতে হয়—তবে কোনো সম্পত্তির অধিকার সৃষ্টির আইনগত উৎসই যেখানে প্রমাণিত হয়নি, সেখানে এই নীতি প্রয়োগ করে মালিকানা সৃষ্টি করা যায় না।

আপিল আদালতের সিদ্ধান্ত কেন বাতিল:

হাইকোর্ট মনে করেন, আপিল আদালত পট্টা ও দাখিলাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং দলিলগুলোর অসঙ্গতি, জমির পরিচয়, স্বত্বের মূল উৎস, আর.এস. খতিয়ান ও কমিশনারের প্রতিবেদন যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি। একই সঙ্গে ট্রায়াল কোর্টের বিস্তারিত প্রমাণমূল্যায়ন কেন ভুল ছিল, সে বিষয়ে আপিল আদালত যথেষ্ট ও যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে পারেনি।

হাইকোর্ট আরও বলেন, বাদীকে নিজের মামলার ভিত্তি নিজেকেই প্রমাণ করতে হবে; বিবাদীর মামলার দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে বাদী স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে বাদীরা নির্ভরযোগ্য ও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণে তাদের স্বত্বের ধারাবাহিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

রায়

হাইকোর্ট আফসার উদ্দিন বেগ ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য (সিভিল রিভিশন নং- ৪৩১৯/১৯৯৭) -এর রুল এবসোলুট করেন। একই সঙ্গে আপিল আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল করে ট্রায়াল কোর্টের বাদীদের মামলা খারিজের রায় পুনর্বহাল ও বহাল করেন। খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি।

আইনি শিক্ষা:

এই রায়ের মূল শিক্ষা হলো—জমির মালিকানা প্রমাণে শুধু খতিয়ান, পুরোনো দাখিলা বা কোনো একক দলিল যথেষ্ট নয়। দাবিদারকে বৈধ উৎস থেকে স্বত্বের ধারাবাহিকতা, জমির সুনির্দিষ্ট পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দখলের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। সন্দেহজনক বা অপ্রমাণিত দলিল এবং তার ওপর নির্ভরশীল রেকর্ডের এন্ট্রি একা মালিকানার আইনগত ভিত্তি তৈরি করতে পারে না।


বিডিএলপিবি/মাসুম

একাধিক মামলার সাজা একসঙ্গে চলার সুযোগ নেই: হাইকোর্টের রায়

একাধিক মামলার সাজা একসঙ্গে চলার সুযোগ নেই: হাইকোর্টের রায়

একই মামলার হাজতবাস ছাড়া ৩৫এ ধারার সুবিধা নয়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রায় দিয়েছেন যে, একাধিক মামলায় পৃথকভাবে দেওয়া কারাদণ্ডের সাজা আদালত স্পষ্ট নির্দেশ না দিলে ধারাবাহিকভাবে (consecutive) কার্যকর হবে; অর্থাৎ একটি সাজা শেষ হওয়ার পর অন্য সাজা শুরু হবে। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা কেবল সংশ্লিষ্ট মামলায় বিচারাধীন অবস্থায় কাটানো হাজতবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে; এক মামলার সাজাভোগের সময় অন্য মামলার সাজা থেকে কর্তন করা যাবে না।

মামলার প্রেক্ষাপট:

মামলাটি দায়ের করেন মো. নাসির উদ্দিন, যিনি নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার অধীনে দায়ের হওয়া ছয়টি পৃথক মামলায় দণ্ডিত হন। তিনি দাবি করেন যে, বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ও কারাভোগের সময়কাল বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে মুক্তি দেওয়া উচিত ছিল এবং কারা কর্তৃপক্ষ আইনানুগভাবে ৩৫এ ধারার সুবিধা প্রদান করেনি। এ অভিযোগে তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করেন।

আবেদনকারীর পক্ষে বলা হয়, তিনি ইতোমধ্যে বিভিন্ন মামলায় প্রদত্ত সাজা ভোগ করেছেন এবং সেই সময়কাল হিসাব করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ ব্যাংকগুলোর আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী আদালত বিশেষ নির্দেশ না দিলে পৃথক মামলার সাজা একটির পর একটি কার্যকর হবে এবং এক মামলার সাজাভোগ অন্য মামলার সাজা থেকে সমন্বয় করা যাবে না।

আদালতের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা কেবল সেই মামলায় বিচারপূর্ব হাজতবাসের সময়কে সাজা থেকে কর্তনের সুযোগ দেয়। অন্য কোনো মামলায় কাটানো কারাবাসের সময় এ ধারার অধীনে সমন্বয়যোগ্য নয়।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুসারে কোনো ব্যক্তি একাধিক মামলায় দণ্ডিত হলে পরবর্তী সাজা পূর্ববর্তী সাজা শেষ হওয়ার পর কার্যকর হবে, যদি না বিচারিক আদালত স্পষ্টভাবে সমসাময়িক (concurrent) সাজা ভোগের নির্দেশ দেন।

রায়ে আদালত Nazrul Islam vs. Government of Bangladesh (75 DLR 427) মামলার সিদ্ধান্ত উদ্ধৃত করে বলেন, একাধিক সাজা সাধারণত ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয় এবং সমসাময়িকভাবে কার্যকরের জন্য আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা আবশ্যক।

এছাড়া আদালত পুনর্ব্যক্ত করেন যে, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের রিট এখতিয়ারের মাধ্যমে সাধারণভাবে ফৌজদারি কার্যধারায় হস্তক্ষেপ করা যায় না, যদি না আইনের বৈধতা (vires) চ্যালেঞ্জ করা হয় অথবা এখতিয়ারগত ত্রুটি প্রমাণিত হয়।

রায়:

সব দিক বিবেচনায় হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন এবং আবেদনকারীকে দুই মাসের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আইনজীবীকে প্রতিটি মামলায় বিচারকালীন হাজতবাসের পৃথক হিসাব তৈরি করে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করার সুযোগ দেওয়া হয়, যাতে ৩৫এ ধারার সুবিধা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যায়।

আইনি শিক্ষা:

এই রায় থেকে প্রতীয়মান হয় যে, একাধিক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একসঙ্গে চলবে না। বিচারিক আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া সাজা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে, ৩৫এ ধারার সুবিধা কেবল সংশ্লিষ্ট মামলার বিচারকালীন হাজতবাসের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে।

মামলার তথ্য:
মামলার নাম: মো. নাসির উদ্দিন বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য
মামলা: রিট পিটিশন নং ২৩২৭/২০২২
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ
বিচারপতি: বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী
এখতিয়ার: সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিশেষ মূল এখতিয়ার
শুনানি: ২৫ জুন, ৪ আগস্ট, ২০ আগস্ট ও ২১ আগস্ট ২০২৫
রায়: ২৭ আগস্ট ২০২৫
রায় প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিডিএলপিবি/মাসুম

২৪ সেপ, ২০২৬

হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন দেবাশীষ রায় চৌধুরী

হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন দেবাশীষ রায় চৌধুরী

 

সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী তাকে শপথ পড়ান

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ১১টায় সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে তাকে শপথবাক্য পাঠ করান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। শপথ অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতির নিয়োগ

এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীকে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। আইন ও বিচার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীকে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে এ নিয়োগ কার্যকর হবে।

অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ

বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন অতিরিক্ত বিচারপতিকে পরবর্তী সময়ে স্থায়ী করা হলেও তাকে তখন স্থায়ী বিচারপতি করা হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় তার বয়স ৪৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় স্থায়ীকরণ হয়নি। বয়সসংক্রান্ত শর্ত পূরণের পর তাকে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

আইন পেশায় অভিজ্ঞতা

বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী যুক্তরাজ্যে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন থেকে এলএলবি (অনার্স), কলেজ অব ল থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা এবং হলবর্ন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করেন। তিনি ২০০৫ সালে জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে, ২০০৭ সালে হাইকোর্ট বিভাগে এবং ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

হাইকোর্টে স্থায়ী বিচারকের সংখ্যা ১০০

বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বিচারকের সংখ্যা ১০০ জনে দাঁড়িয়েছে।

পারিবারিক পরিচয়

বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নিতাই রায় চৌধুরীর ছেলে।

দীর্ঘদিন আইন পেশায় থাকার পর ২০২৪ সালে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে বিচারিক দায়িত্বে যুক্ত হন তিনি। স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে তার দায়িত্বের পরবর্তী ধাপ শুরু হলো।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS)

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যা: মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ দিলেন হাইকোর্ট

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যা: মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ দিলেন হাইকোর্ট

ছবিঃ সংগৃহীত 
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত মো. সুরজ আলীর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, নিহতের মরদেহ স্বামীর বাড়িতে পাওয়া যাওয়া, চিকিৎসা-প্রমাণে শ্বাসরোধজনিত হত্যার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং যৌতুক দাবির পক্ষে সাক্ষ্য আসামির অপরাধ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘ কারাবাস ও অন্যান্য প্রশমনকারী পরিস্থিতি বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করা হয়েছে।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে. এম. রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন।

মামলার প্রেক্ষাপটঃ

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, নিহত চম্পা খাতুনের সঙ্গে আসামি মো. সুরজ আলীর প্রায় ১৫ বছর আগে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করা হলে নিহতের পরিবার ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করে। পরবর্তীতে বাকি ২০ হাজার টাকা আদায়ের জন্য চম্পাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

একপর্যায়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে সালিশ অনুষ্ঠিত হয় এবং বাকি ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এরপরও আসামিপক্ষ পুনরায় ২০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করে। ওই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চম্পাকে হত্যা করা হয় এবং তাঁর মরদেহ স্বামীর বাড়ির আঙিনায় কাঁঠালগাছের নিচে ফেলে রাখা হয়।

ঘটনার খবর পেয়ে নিহতের স্বজনেরা সেখানে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান। পরে নিহতের ভাই মো. ইদ্রিস আলী ২১ মার্চ ২০০৪ তারিখে হরিণাকুণ্ডু থানায় মামলা করেন।

মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিচার শেষে ঝিনাইদহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মো. সুরজ আলীকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(ক) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন। অন্য তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে আসামি ফৌজদারি আপিল ও জেল আপিল করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণঃ

চিকিৎসা-প্রমাণে আত্মহত্যার দাবি সমর্থিত নয়-

হাইকোর্ট বলেন, নিহতের মরদেহ আসামির বাড়িতে পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি আসামিপক্ষ অস্বীকার করেনি। ময়নাতদন্তে নিহতের নাক ও গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরবর্তী ভিসেরা পরীক্ষায় বিষের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসক চূড়ান্ত মতামতে জানান, নাক ও মুখ বন্ধ করে শ্বাসরোধের ফলে শ্বাসকষ্টে নিহতের মৃত্যু হয়েছে এবং তা হত্যাজনিত। আদালত চিকিৎসকের বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে বলেন, আত্মহত্যার বিষয়ে আসামিপক্ষের বক্তব্য চিকিৎসা-প্রমাণে সমর্থিত হয়নি।

স্ত্রীর মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যার দায়-

আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিহতের মরদেহ স্বামীর বাড়িতে পাওয়া যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করার দায় আসামির ওপর বিশেষভাবে বর্তায়। এ মামলায় আসামি কখনো বিষপানে, আবার কখনো ফাঁসিতে আত্মহত্যার কথা বললেও সেই দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দিতে পারেননি।

আলিবাইয়ের দাবি প্রমাণিত হয়নি-

আসামিপক্ষের দাবি ছিল, ঘটনার রাতে সুরজ আলী বাড়িতে ছিলেন না। তবে এ বিষয়ে প্রতিরক্ষা সাক্ষী এমন কোনো প্রত্যক্ষ তথ্য দিতে পারেননি, যা থেকে প্রমাণ হয় যে আসামি ঘটনার সময় অন্য কোথাও অবস্থান করছিলেন।

হাইকোর্ট বলেন, আলিবাইয়ের দাবি সুনির্দিষ্ট ও আইনানুগ প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এ মামলায় আসামির উপস্থাপিত সাক্ষ্য তাঁর অনুপস্থিতির দাবি প্রমাণে সহায়ক হয়নি।

পুনরায় যৌতুক দাবির অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত-

আদালত বলেন, নিহতের ভাই, বাবা ও দুই চাচাতো ভাইয়ের সাক্ষ্যে বিয়ের সময় যৌতুক প্রদান, পরবর্তী সালিশ এবং পুনরায় ২০ হাজার টাকা দাবির বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিশেষ করে নিহতের বাবা সাক্ষ্যে জানান, আসামি সরাসরি তাঁর কাছে আরও ২০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করেছিলেন। আদালতের মতে, জেরায় এ বক্তব্য নড়বড়ে হয়নি।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, বিয়ের সময় দাবিকৃত ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলেও পরবর্তী ২০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ পৃথকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দীর্ঘ কারাবাস ও আইন সংশোধন বিবেচনায় সাজা পরিবর্তনঃ

হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, আসামি দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন এবং সাত বছরের বেশি সময় কনডেম সেলে কাটিয়েছেন। আদালত তাঁর দীর্ঘ কারাবাস, অপরাধের প্রকৃতি এবং অন্যান্য প্রশমনকারী পরিস্থিতি বিবেচনা করেন।

এ ক্ষেত্রে Nalu vs. The State, 17 BLC (AD) 204 মামলার নজির উল্লেখ করা হয়। আদালত আরও বলেন, ২৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(ক) ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে। ডেথ রেফারেন্স ও আপিল বিচারাধীন থাকায় সংশোধিত বিধান এ মামলায় প্রযোজ্য হবে।

এসব বিষয় বিবেচনায় আদালত মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তঃ

হাইকোর্ট বিভাগ ডেথ রেফারেন্স খারিজ এবং ফৌজদারি আপিল খারিজ করেন। তবে আসামির মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত অর্থদণ্ড বহাল রাখেন।

একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা অনুযায়ী কারাবাসের সময় গণনার নির্দেশ দেন এবং আসামিকে কনডেম সেল থেকে সাধারণ বন্দিদের জন্য নির্ধারিত সেলে স্থানান্তরের আদেশ দেন। জেল আপিলও নিষ্পত্তি করা হয়।

আইনি শিক্ষাঃ

এ রায়ে আদালত দেখিয়েছেন, হত্যার অভিযোগে চিকিৎসা-প্রমাণ, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য এবং আসামির ব্যাখ্যা মূল্যায়ন করে অপরাধ নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে অপরাধ প্রমাণিত হলেও সাজা নির্ধারণের সময় আইন সংশোধন, কারাবাসের সময়কাল ও প্রশমনকারী পরিস্থিতি বিবেচনায় আসতে পারে।

সূত্র: Death Reference No. 43 of 2019; Criminal Appeal No. 5809 of 2019; Jail Appeal No. 133 of 2022। রায়: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। লিখিত রায় প্রকাশ: ২৩.০৯.২০২৬।


বিডিএলপিবি/মাসুম

পরিচয় শনাক্তকরণে ব্যর্থতা ও ত্রুটিপূর্ণ স্বীকারোক্তি: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাইকোর্টে খালাস: পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

পরিচয় শনাক্তকরণে ব্যর্থতা ও ত্রুটিপূর্ণ স্বীকারোক্তি: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাইকোর্টে খালাস: পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

ছবিঃ সংগৃহীত 
মামলায় প্রকৃত অপরাধীর পরিচয় প্রমাণ করতে না পারা, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্যে অসংগতি থাকায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগ। আদালত বলেছেন, আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো আইনসম্মত সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় তিনি খালাস পাওয়ার অধিকারী।

২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ এ রায় দেন। আদালত মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো ডেথ রেফারেন্স নাকচ করেন, আসামির ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর করেন এবং কারা আপিল নিষ্পত্তি করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল করে আসামিকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। অন্য কোনো মামলায় আটক থাকার প্রয়োজন না থাকলে তাঁকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলাটি চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার একটি ১০ বছর বয়সী শিশু জুলী আক্তারের মৃত্যু ঘিরে। ২০০৮ সালের ১৬ মে শিশুটি তার আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থানকালে নিখোঁজ হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বাড়িতে কৃষিকাজের জন্য নিয়োগ করা এক ব্যক্তি নিজেকে মো. জামাল পরিচয় দিয়ে শিশুটিকে অন্য দুই শিশুর কাছ থেকে আলাদা করে নিয়ে যান।

পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে খুঁজতে থাকেন। পরদিনও তার সন্ধান না পাওয়ায় থানায় অভিযোগ করা হয়। ১৮ মে ২০০৮ তারিখে হাটহাজারীর একটি খাল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মামলার তদন্তে পুলিশ আমীর হোসেন ওরফে জামালকে গ্রেপ্তার করে। তদন্ত শেষে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তবে এজাহারে উল্লেখিত মো. জামালকে অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়নি।

বিচার শেষে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২, চট্টগ্রাম আসামিকে ৯(২) ধারায় মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং ৭ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দেন। পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। আসামিও দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও জেল আপিল করেন।

আসামিপক্ষের বক্তব্য

আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, এজাহারে যে জামালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আমীর হোসেন সেই ব্যক্তি নন। তাঁর নাম, পিতৃপরিচয় ও ঠিকানা আলাদা। প্রকৃত জামালকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে তদন্তেও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

আসামিপক্ষ আরও দাবি করে, পুলিশি নির্যাতনের মাধ্যমে আসামির কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। ফলে ওই জবানবন্দি সত্য ও স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ছিল, সাক্ষীদের জবানবন্দি, আসামির স্বীকারোক্তি ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাই মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন এবং আপিল খারিজের আবেদন জানানো হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

১. প্রকৃত আসামির পরিচয় প্রমাণিত হয়নিঃ

হাইকোর্টের কাছে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, এজাহারে উল্লিখিত মো. জামাল এবং দণ্ডপ্রাপ্ত আমীর হোসেন একই ব্যক্তি কি না।

আদালত লক্ষ্য করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা এজাহারে উল্লেখিত জামালের ঠিকানা যাচাই করে তাঁকে সেখানে পাওয়ার কথা জানালেও তিনি বিদেশে চলে গেছেন বলে দাবি করেন। কিন্তু এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে ইমিগ্রেশন বিভাগের সহায়তা নেওয়া হয়নি। তাঁর দেশত্যাগ-সংক্রান্ত নথিও সংগ্রহ করা হয়নি।

অন্যদিকে আমীর হোসেনের পরিচয়, পিতৃপরিচয় ও ঠিকানা নিয়ে আসামিপক্ষ সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলেছিল। আদালতের মতে, আমীর হোসেনই সেই জামাল—যিনি শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন—এমন পরিচয় নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

২. স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণযোগ্য নয়ঃ

আদালত বলেন, আসামি শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন যে পুলিশি নির্যাতন ও চাপের মুখে তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি আদালতে আবেদনও করেছিলেন এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি উপস্থাপনের অনুরোধ করেছিলেন।

কিন্তু ট্রাইব্যুনাল ম্যাজিস্ট্রেট স্বীকারোক্তিকে সত্য ও স্বেচ্ছায় দেওয়া বলে গ্রহণ করেছিলেন—এই যুক্তিতে চিকিৎসার নথি উপস্থাপনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

হাইকোর্ট আরও দেখতে পান, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪(৩) ধারায় স্বীকারোক্তির সত্যতা ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া সম্পর্কে ম্যাজিস্ট্রেটের প্রয়োজনীয় স্মারকলিপি যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে আদালত Babul Vs. State, 63 DLR (AD) 10 মামলার নজির উল্লেখ করেন।

আদালতের সিদ্ধান্ত, স্বীকারোক্তির সত্যতা ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া নিশ্চিত করার আইনগত শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেটিকে আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

৩. চিকিৎসা প্রতিবেদনের সঙ্গে স্বীকারোক্তির অসংগতিঃ

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শিশুটির মৃত্যু মাথায় আঘাত এবং পানিতে ডুবে শ্বাসরোধের সম্মিলিত প্রভাবে হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মৃত্যুকে জীবদ্দশায় সংঘটিত ও হত্যাজনিত বলে মত দেন চিকিৎসক।

প্রতিবেদনে যৌন সংসর্গের ইতিবাচক লক্ষণের কথাও ছিল। তবে আদালত উল্লেখ করেন, প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ধর্ষণ বা জোরপূর্বক যৌন সংসর্গের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে স্বীকারোক্তিতে আসামি শিশুটিকে ধর্ষণ করে শ্বাসরোধে হত্যার কথা বলেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। আদালতের মতে, স্বীকারোক্তির বর্ণনার সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যের অসংগতি রয়েছে। ফলে স্বীকারোক্তিটি আসামির বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

৪. শিশু সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও আসামি শনাক্তকরণে সমস্যাঃ

ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উল্লেখ করা দুই শিশু সাক্ষীর সাক্ষ্যও আদালত পর্যালোচনা করেন।

আদালত লক্ষ্য করেন, ঘটনার সময় সাক্ষী আরাফাতের বয়স ছিল প্রায় তিন বছর। জেরায় সে জানায়, আদালতে আসার আগে সংবাদদাতা তাকে আসামিকে শনাক্ত করে দেখিয়েছিলেন। তার দেওয়া উত্তরে আসামিকে নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করার মতো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

অন্য শিশু সাক্ষী শাখী আক্তারের সাক্ষ্যেও অসংগতি ছিল। আদালত বলেন, এসব সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত আমীর হোসেনই শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

আদালত সাক্ষ্য আইনের ১১৮ ধারার আলোকে আরাফাতের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য বলে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেননি।

৫. তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে ঘাটতিঃ

আদালত আরও উল্লেখ করেন, এজাহারে নাম থাকা জামালকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাঁর বিদেশযাত্রার দাবি যাচাই করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষী হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়নি।

আসামিপক্ষের বক্তব্য ছিল, প্রকৃত অভিযুক্তকে আড়াল করে আমীর হোসেনকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে, আমীর হোসেনকে এজাহারের জামাল হিসেবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের বক্তব্য ছিল দুর্বল ও অবিশ্বাসযোগ্য।

আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তঃ

সব সাক্ষ্যপ্রমাণ, চিকিৎসা প্রতিবেদন, স্বীকারোক্তি এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, আমীর হোসেনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারার অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।

আদালত বলেন, আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ দেওয়ার মতো আইনসম্মত সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। তিনি ১৮ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে ছিলেন, যার মধ্যে সাত বছর কনডেম সেলে কাটিয়েছেন। আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অনুগ্রহ হিসেবে নয়, বরং অধিকার হিসেবেই খালাস পাওয়ার যোগ্য।

ফলে ডেথ রেফারেন্স নাকচ, ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর এবং জেল আপিল নিষ্পত্তি করা হয়। ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশ বাতিল করে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।

আইনি শিক্ষাঃ

এই রায়ে আদালত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন—

- ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তের পরিচয় নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।
- ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪(৩) ধারার শর্ত মেনে স্বীকারোক্তি রেকর্ড করতে হবে; জবানবন্দির স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে তা দণ্ডাদেশের ভিত্তি হতে পারে না।
- চিকিৎসা প্রতিবেদন ও স্বীকারোক্তির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি থাকলে আদালতকে তা সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
- শিশু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে তার বয়স, উপলব্ধি, স্মৃতিশক্তি ও জেরায় দেওয়া উত্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা বিবেচনা করা জরুরি।
- গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও আইনসম্মত ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া কাউকে দণ্ডিত করা যায় না।

মামলা: Death Reference / Criminal Appeal / Jail Appeal
আসামি: আমীর হোসেন ওরফে জামাল
অভিযোগ: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারা
রায় প্রদান: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রায় প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেঞ্চ: বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা
আদালত: হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
প্রাসঙ্গিক নজির: Babul Vs. State, 63 DLR (AD) 10
প্রাসঙ্গিক আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৬৪(৩) ধারা; সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১১৮ ধারা; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারা।

বিডিএলপিবি/মাসুম

২৫ বছর পূর্ণের আগে পদত্যাগ করলে পেনশন নয়: আপিল বিভাগের রায়

২৫ বছর পূর্ণের আগে পদত্যাগ করলে পেনশন নয়: আপিল বিভাগের রায়

চাকরি থেকে পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার বিধান অসাংবিধানিক নয়।

সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে শুধু চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন দাবি করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস, পার্ট-১-এর ৩০০(ক) বিধিতে পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার বিধানকে সংবিধানবিরোধী নয় বলে ঘোষণা করেছেন আদালত।

১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ও অন্যান্য বনাম মো. মাহবুব মুর্শেদ ও অন্যান্য (সিভিল আপিল নং ৭৭/২০২২) মামলায় এ রায় দেন আপিল বিভাগের তিন সদস্যের বেঞ্চ। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। সম্প্রতি লিখিত রায় প্রকাছিত হয়। মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগের ১৮ মার্চ ২০২১ তারিখের রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছিল।

মামলার পটভূমি

মো. মাহবুব মুর্শেদ ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে সহকারী জজ হিসেবে যোগ দেন। অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ৩১ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে প্রায় ১৯ বছর চাকরির পর তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তিনি পেনশনের আবেদন করেন। আইন ও বিচার বিভাগ তাঁর পেনশন প্রস্তাব অনুমোদন করলেও ২৫ মার্চ ২০১৫ তারিখে হিসাব ও নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ তা ফেরত দেয়।

এরপর তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে রিট করেন। তাঁর দাবি ছিল, ১৯ বছর চাকরির পর পদত্যাগ করলেও তিনি পেনশনের অধিকারী এবং বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ৩০০(ক) বিধিতে পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার বিধান সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট রিটটি আংশিকভাবে মঞ্জুর করে ৩০০(ক) বিধির যে অংশে পদত্যাগের ক্ষেত্রে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার কথা বলা হয়েছে, তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। এরপর চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ

আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এ সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। আদালত বলেন, পদত্যাগ কোনো শাস্তি নয়; এটি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বরখাস্ত বা অপসারণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যার সঙ্গে অভিযোগ ও তদন্তের বিষয় যুক্ত থাকতে পারে।

তাই পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত হওয়া শাস্তি নয়; এটি পেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি আইনগত অযোগ্যতা।

আদালত আরও বলেন, পদত্যাগ, বরখাস্ত ও অপসারণ একই বিধানে উল্লেখ থাকলেও এগুলোর আইনগত প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ফলে ৩০০(ক) বিধানের এ ব্যবস্থা বৈষম্যমূলক নয় এবং সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থীও নয়।

পেনশনের ক্ষেত্রে ২৫ বছরের চাকরিকাল

আপিল বিভাগ বলেন, প্রযোজ্য আইনি কাঠামোতে অবসর ও স্বেচ্ছা অবসরের ক্ষেত্রে ২৫ বছরের যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল গুরুত্বপূর্ণ। তবে পদত্যাগকে পেনশন পাওয়ার স্বতন্ত্র ভিত্তি হিসেবে সংশ্লিষ্ট আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট পেনশন ব্যবস্থায় ২৫ বছর বা তার বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল সম্পন্ন করার পর পদত্যাগ গ্রহণ করা হলে অবসরকালীন পেনশনের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তবে ১৯ বছর চাকরির পর পদত্যাগ করা বর্তমান মামলার ক্ষেত্রে সেই যোগ্যতা পূরণ হয়নি।

৩০০(ক) বিধান নিয়ে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত

আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে বলেন, পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ৩০০(ক) বিধান সংবিধানবহির্ভূত নয়। আইন যেখানে পদত্যাগের কারণে পেনশনের অধিকার সৃষ্টি করেনি, সেখানে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের পূর্বের অনুমোদন থেকেও এমন কোনো আইনগত অধিকার সৃষ্টি হতে পারে না।

চূড়ান্ত রায়

আপিল বিভাগ সরকারের করা আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্ট বিভাগের ১৮ মার্চ ২০২১ তারিখের রায় ও আদেশ বাতিল করেছেন। একই সঙ্গে মামলায় খরচের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আইনি শিক্ষাঃ

পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করা কোনো শাস্তি নয়; এটি পদত্যাগের আইনগত পরিণতি। নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল পূর্ণ না করে পদত্যাগ করলে শুধু চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন দাবি করা যাবে না।

 

বিডিএলপিবি/মাসুম 

 

 

বন্ধকী পণ্য (Pledged Goods) নষ্ট হলেই দায় ব্যাংকের নয়: দুই মামলায় হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

বন্ধকী পণ্য (Pledged Goods) নষ্ট হলেই দায় ব্যাংকের নয়: দুই মামলায় হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

ছবি: সংগৃহীত 
বন্ধক রাখা পণ্য নষ্ট বা মূল্য কমে গেলেই তার দায় ব্যাংকের ওপর বর্তায় না—এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে দুটি অর্থঋণ-সংক্রান্ত মামলায় নিম্ন আদালতের ক্ষতিপূরণের রায় বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, বন্ধকী পণ্যের আইনগত দখল ব্যাংকের কাছে ছিল—এটি প্রমাণিত না হলে কেবল ব্যাংকের পাহারাদার বা তদারকি থাকার কারণে ব্যাংককে পণ্যের জিম্মাদার (bailee) হিসেবে দায়ী করা যাবে না।

মামলা সম্পর্কে তথ্য:

হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রথম আপিল নং ৩৮/২০২০ ও ৭৩/২০২০-এর রায় দেন। দুটি মামলাই অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমানে PLC)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং একই ধরনের আইনগত প্রশ্ন থাকায় একসঙ্গে শুনানি করে আদালত। মামলাগুলোতে নিম্ন আদালত ব্যাংকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের ডিক্রি দিয়েছিল। রায়টি প্রকাশিত হয় ২২/০৯/২০২৬ তারিখে।

মামলার প্রেক্ষাপট:

প্রথম মামলায় মেসার্স ইয়ানবার এগ্রো প্রোডাক্টস ইন্ডাস্ট্রিজ জাপান থেকে ব্যাংকের অর্থায়নে এমএস প্লেট আমদানি করে। এসব পণ্যের একটি অংশ দিয়ে এমএস হাউজিং পাইপ তৈরি করা হলেও প্রায় ৬৪ হাজার ৯১২ রানিং ফুট এমএস প্লেট ব্যাংকের ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে অবশিষ্ট ছিল। বাদীপক্ষের দাবি, ব্যাংক দীর্ঘদিন এসব পণ্য বিক্রি বা সমন্বয় না করায় পণ্য নষ্ট হয়ে যায় এবং তাদের আর্থিক ক্ষতি হয়।

দ্বিতীয় মামলায় মেসার্স এ. হাসেম দেওয়ান অ্যান্ড কোং লিমিটেড জাহাজ ভাঙা ব্যবসার জন্য ব্যাংকের অর্থায়ন নেয়। জাহাজ ভাঙার পর উৎপাদিত ৮ হাজার ১৮৩ মেট্রিক টন স্ক্র্যাপের মধ্যে ৪ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ছাড় করা হলেও অবশিষ্ট ৩ হাজার ৯৮৩ মেট্রিক টন পণ্য ব্যাংকের ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে থেকে যায়। বাদীপক্ষের অভিযোগ ছিল, ব্যাংক অবশিষ্ট পণ্য বিক্রি বা ঋণের সঙ্গে সমন্বয় না করায় পণ্যের মূল্য কমে যায়।

নিম্ন আদালতের রায়:

দুটি মামলাতেই নিম্ন আদালত ব্যাংকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের ডিক্রি দেন। প্রথম মামলায় ১৪ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় মামলায় ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৩ হাজার ৫৪৩ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে ব্যাংক হাইকোর্টে আপিল করে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট বলেন, বন্ধক বা pledge-এর ক্ষেত্রে পণ্যের দখল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত বা গঠনমূলক দখল ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে—এমন প্রমাণ না থাকলে শুধু ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী বা তদারকির ব্যবস্থা থাকলেই ব্যাংককে bailee বা জিম্মাদার বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে পণ্যগুলো বাদীপক্ষের নিজস্ব স্থাপনাতেই ছিল এবং সেগুলোর বাস্তব নিয়ন্ত্রণও বাদীপক্ষের কাছেই ছিল।

আদালত আরও বলেন, Contract Act-এর ১৭৬ ধারায় বন্ধকী পণ্য বিক্রি করাই ঋণ আদায়ের মামলা করার পূর্বশর্ত নয়। পাওনাদার চাইলে ঋণের জন্য মামলা করতে পারে এবং নিরাপত্তা ধরে রাখতে পারে; আবার যুক্তিসংগত নোটিশ দিয়ে বন্ধকী পণ্য বিক্রিও করতে পারে। ফলে পণ্য বিক্রি না করার বিষয়টিকে একাই ব্যাংকের চুক্তিভঙ্গ বা দায় হিসেবে দেখানো যাবে না।

ক্ষতিপূরণের দাবিতে আদালতের ব্যাখ্যা:

হাইকোর্ট বলেন, শুধু পণ্য নষ্ট হয়েছে বা মূল্য কমেছে—এমন দাবি করলেই ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। ব্যাংকের নির্দিষ্ট কোনো আইনগত বা চুক্তিগত দায়িত্ব ছিল কি না, সেই দায়িত্ব ভঙ্গ হয়েছে কি না এবং ওই ভঙ্গের কারণেই সরাসরি ক্ষতি হয়েছে কি না—এসব বিষয় প্রমাণ করতে হবে। মামলাগুলোতে বাদীপক্ষ ব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট কাজ বা অবহেলার কারণে পণ্য নষ্ট হয়েছে এবং দাবিকৃত ক্ষতির পরিমাণ কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, তা সন্তোষজনকভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।

চূড়ান্ত রায়:

আদালত বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পণ্যের ক্ষতি, নষ্ট বা অবনতির ঝুঁকি বাদীপক্ষের ওপর থাকলেও কোনো চুক্তি আইনের বাধ্যতামূলক দায়িত্বকে অকার্যকর করতে পারে না। তবে এখানে ব্যাংকের বিরুদ্ধে এমন কোনো প্রমাণিত দায়িত্বভঙ্গ বা সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়।

ফলে হাইকোর্ট ব্যাংকের আপিল দুটি মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯-এর রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন এবং উভয় মানি স্যুট খারিজ করে দেন। মামলায় কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।

আইনি শিক্ষা:

বন্ধকী বা pledge-এর ক্ষেত্রে শুধু ব্যাংকের কাছে পণ্যের নিরাপত্তাজনিত স্বার্থ থাকলেই ব্যাংককে পণ্যের আইনগত দখলদার বা জিম্মাদার বলা যায় না। ব্যাংকের ওপর পণ্যের ক্ষতি বা অবনতির দায় আরোপ করতে হলে দখল, নির্দিষ্ট আইনগত বা চুক্তিগত দায়িত্ব, দায়িত্বভঙ্গ এবং সেই দায়িত্বভঙ্গের সঙ্গে ক্ষতির সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণ করতে হবে।

একইভাবে, Contract Act, 1872-এর ১৭৬ ধারা অনুযায়ী বন্ধকী পণ্য বিক্রি না করাই ব্যাংকের বিরুদ্ধে দায় সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয়। ক্ষতিপূরণের দাবিতে শুধু পণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনা নয়, ব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট কাজ বা অবহেলার কারণে সেই ক্ষতি হয়েছে এবং দাবিকৃত ক্ষতির পরিমাণ প্রমাণিত হয়েছে—এ বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।


বিডিএলপিবি/মাসুম