প্রমাণের দায়
(Burden of Proof) সম্পর্কিত বিধানগুলো সাক্ষ্য আইন,
১৮৭২
এর
১০১,
১০২,
১০৩
ও
১০৫
ধারায়
আলচনা
করা হয়েছে।
১. ধারা
১০১- প্রমাণের দায়ের
মূলনীতিঃ ১০১
ধারা অনুযায়ী,
কোনো ব্যক্তি আদালতের কাছে কোনো আইনগত অধিকার বা দায় সম্পর্কে
রায় দিতে বললে এবং সেই অধিকার বা দায় নির্ভর
করে এমন কিছু তথ্যের অস্তিত্বের ওপর, তাকে সেই তথ্যের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে। অর্থাৎ, যে দাবি করবে, দাবিটির ভিত্তি প্রমাণ করার দায়ও সাধারণত তার ওপর থাকবে।
উদাহরণঃ ‘ক’ দাবি করলেন
যে ‘খ’-এর কাছে
তার ৫ লাখ টাকা
পাওনা রয়েছে। ‘ক’ যদি আদালতের
কাছে টাকা আদায়ের ডিক্রি চান, তাহলে ‘ক’-কেই প্রথমে
প্রমাণ করতে হবে যে ‘খ’-এর কাছে
তার ৫ লাখ টাকা
পাওনা রয়েছে।
২. ধারা
১০২
— কার
ওপর
প্রমাণের
দায়?
১০২ ধারা অনুযায়ী, কোনো মামলায় উভয় পক্ষ কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করলে যে
পক্ষ মামলায় হেরে যাবে, সেই পক্ষের ওপর প্রমাণের দায় থাকবে। অর্থাৎ, আদালত যদি কোনো পক্ষের বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণই না পায়, তাহলে
যে পক্ষ তার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হবে, তার ওপর প্রাথমিক প্রমাণের
দায়
(burden of proof) থাকবে।
সুতরং, যদি কোনো পক্ষই কোনো প্রমাণ না দেয়, যে
পক্ষ পরাজিত হবে—প্রমাণের দায় তার ওপর।”
৩. ধারা
১০৩
— নির্দিষ্ট
তথ্যের
প্রমাণের
দায়ঃ ১০৩ ধারা অনুযায়ী,
কোনো নির্দিষ্ট তথ্যের অস্তিত্ব আদালতকে বিশ্বাস করাতে চাইলে সেই তথ্যের অস্তিত্ব প্রমাণ করার দায় সেই ব্যক্তির ওপর থাকে, যিনি আদালতকে তা বিশ্বাস করাতে
চান।
উদাহরণঃ ‘ক’ দাবি করলেন
যে ‘খ’ একটি নির্দিষ্ট
দিনে একটি নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত ছিলেন। ‘ক’ যদি তার
মামলার কোনো বক্তব্য প্রতিষ্ঠার জন্য এই বিশেষ তথ্যের
ওপর নির্ভর করেন, তাহলে সেই তথ্য প্রমাণের দায়িত্ব ‘ক’-এর ওপর
থাকবে।
৪. ধারা
১০৫
— ফৌজদারি
মামলায়
ব্যতিক্রমের
প্রমাণঃ
কোনো
আসামি যদি দাবি করেন যে তার বিরুদ্ধে
আনা অভিযোগের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির (Penal Code) সাধারণ ব্যতিক্রম (General
Exception) অথবা বিশেষ ব্যতিক্রম (Special
Exception) প্রযোজ্য,
তাহলে সেই ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হওয়ার পরিস্থিতির অস্তিত্ব প্রমাণের দায় আসামির ওপর থাকে।
অর্থাৎ, কোনো
আসামি যদি দাবি করেন যে অপরাধ সংঘটনের
সময় তিনি এমন মানসিক অবস্থায় ছিলেন যার কারণে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ব্যতিক্রম তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তাহলে সেই ব্যতিক্রমের ভিত্তি হিসেবে যে পরিস্থিতি তিনি
দাবি করছেন, তা প্রমাণের প্রশ্ন
আসতে পারে। তবে এর অর্থ এই
নয় যে প্রসিকিউশনকে তার
নিজের মামলার প্রয়োজনীয় উপাদান প্রমাণ করতে হবে না। অপরাধের মৌলিক উপাদান প্রমাণের দায়িত্ব সাধারণভাবে প্রসিকিউশনের ওপরই থাকে।
দেওয়ানি মামলায়
প্রমাণের
দায়
ও মানদণ্ডঃ দেওয়ানি
মামলায় প্রমাণের দায়ের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো— “যে দাবি করে,
তাকেই প্রমাণ করতে হয়।“ বাদী
(Plaintiff) কোনো অধিকার, মালিকানা, পাওনা, চুক্তি, দখল বা অন্য কোনো
আইনগত দাবি করলে সেই দাবির প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো তাকে প্রমাণ করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ নীতিঃ
বাদী তার নিজের মামলার শক্তির ওপর সফল হবেন; কেবল বিবাদীর মামলার দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে নয়। অর্থাৎ,
বিবাদী যথেষ্ট প্রমাণ দিতে পারেননি—এটি একাই বাদীর দাবি প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রমাণের মানদণ্ডঃ দেওয়ানি
মামলায় সাধারণত প্রমাণের মানদণ্ড হলো সম্ভাবনার ভার (Preponderance of
Probabilities) আদালত
বিবেচনা করে কোন পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ তুলনামূলকভাবে
বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও সম্ভাব্য।
ফৌজদারি মামলায়
প্রমাণের
দায়
ও মানদণ্ডঃ ফৌজদারি
মামলায় সাধারণ নীতি হলো— অপরাধ প্রমাণের দায় প্রসিকিউশনের ওপর। অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ করেছেন—এটি প্রসিকিউশনকে আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের
মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আসামিকে
সাধারণভাবে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে হয় না। ফৌজদারি
বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতি হলো— অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত
আসামিকে নির্দোষ বলে গণ্য করা হবে।
প্রমাণের মানদণ্ডঃ
ফৌজদারি
মামলায় প্রসিকিউশনকে সাধারণত অপরাধ যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ঊর্ধ্বে (Beyond Reasonable
Doubt) প্রমাণ করতে হয়। যদি প্রসিকিউশনের প্রমাণে এমন যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থেকে যায় যা অপরাধের বিষয়ে
বাস্তব অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, তাহলে তার সুবিধা আসামি পাবেন।
Burden of Proof এবং
Onus of Proof-এর পার্থক্যঃ দুটি
ধারণা পরস্পর সম্পর্কিত হলেও সম্পূর্ণ এক নয়। Burden of Proof হলো মামলায়
কোনো দাবি বা বিষয় প্রমাণ
করার আইনগত মূল দায়। Onus of Proof মামলার কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ে প্রমাণ উপস্থাপনের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব। প্রাথমিকভাবে এক পক্ষের ওপর
থাকা যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপনের পর অন্য পক্ষের
দিকে স্থানান্তরিত হতে পারে। যেমন, বাদী প্রথমে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক প্রমাণ দিয়ে তার দাবি প্রতিষ্ঠা করলে পরবর্তী পর্যায়ে বিবাদীর ওপর সেই দাবি খণ্ডনের জন্য প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব আসতে পারে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম
কোর্টের
গুরুত্বপূর্ণ
রায়ঃ
১.
Ajufannessa
v. Safar Miah, 30 DLR (SC) 41 (1978)-
এ মামলায় আপিল
বিভাগ বলেন, সাক্ষ্য আইনের ১০১ ধারায় বিধান রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো আইনি অধিকার বা দায়বদ্ধতার বিষয়ে
আদালতের রায় পেতে চান—যা কোনো ঘটনার
অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল এবং যা তিনি দাবি
করছেন—তবে তাঁকেই প্রমাণ করতে হবে যে সেই ঘটনাগুলোর
অস্তিত্ব রয়েছে। এছাড়া উক্ত আইনের ১০৩ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার অস্তিত্ব সম্পর্কে আদালতকে বিশ্বাস করাতে ইচ্ছুক ব্যক্তির ওপরই সেই ঘটনা প্রমাণের ভার বর্তায়; তবে যদি কোনো
আইনে
এমন
বিধান
থাকে
যে
ওই
ঘটনা
প্রমাণের
দায়িত্ব
নির্দিষ্ট
কোনো
ব্যক্তির
ওপর
ন্যস্ত
থাকবে,
সেক্ষেত্রে
সেই
আইনই
প্রযোজ্য
হবে।
২. Abul
Kashem v. State,
42 DLR 37-
মামলায় বলা হয়, ফৌজদারি মামলায়
প্রসিকিউশনের দায়িত্ব, অভিযোগের প্রয়োজনীয় উপাদান প্রমাণ করা। শুধু অভিযোগ উত্থাপন করলেই তা প্রমাণিত হয়ে
যায় না; প্রসিকিউশনকে তার মামলা আইনসম্মত প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩.
Shah
Sufi Taj Islam v. Begum Rokeya Chowdhury, 9 BLT (AD) 62- এই মামলাটি মূলত
১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১০১ ধারা (Onus of Proof বা প্রমাণের দায়) এবং একই সাথে প্রশাসনিক আইনের অধস্তন বা অর্পিত বিধানের
(Delegated Legislation) বৈধতা
সংক্রান্ত বিষয়ের সাথে জড়িত। আপিল বিভাগ এ মামলার রায়ে বলেন
যে, কোনো ব্যক্তি যদি অন্য ব্যক্তির ওপর এমন অবস্থানে থাকেন যেখানে সক্রিয় আস্থা বা প্রভাবের সম্পর্ক
বিদ্যমান, তাহলে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের সৎ বিশ্বাস (good faith) এবং অযাচিত
প্রভাবের অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রমাণের প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে, কোনো মামলায় বিবাদী পক্ষ যদি বাদীর কোনো দাবি বা প্রাপ্তি স্বীকার
করে নেয়, তাহলে তা প্রমাণ করার
বাড়তি কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বাদীর ওপর থাকে না। অধিকন্তু, মূল আইনের সীমার বাইরে গিয়ে কোনো প্রশাসনিক বিধি বা নিয়ম তৈরি
করা আইনত অবৈধ।
সূত্র:
The Evidence
Act, 1872
https://lawcastlebd.wordpress.com/
https://www.lawyersnjurists.com/article/onus-of-proof/
https://www.researchgate.net/
বিডিএলপিবি/মাসুম