সর্বশেষ

২৯ সেপ, ২০২৬

ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে নিয়ে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের রুল

ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে নিয়ে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের রুল

ছবি: সংগৃহীত 
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে অনুষ্ঠিত কথিত ‘ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে’কে কেন্দ্র করে জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি, ভুয়া পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।

রিটটি গত ৩০ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। এতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এবং চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছে।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন এডভোকেট মোহাম্মদ আহসান। তাকে সহযোগিতা করেন এডভোকেট ইশরাত হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল।

রুলে গত ১০ জুলাই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে অনুষ্ঠিত কথিত সমলিঙ্গ তথা ট্রান্সজেন্ডার বিয়েকে ঘিরে জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক ব্যবহার, মিথ্যা পরিচয় দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।

রিটে উল্লেখ করা হয়, গত ১০ জুলাই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে তাসনুভা আনান শিশিরকে ‘কনে’ হিসেবে উপস্থাপন করে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘটনাটি বাংলাদেশের প্রথম ‘ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে’ হিসেবে প্রচারিত হয়।

রিট আবেদনকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে দুই জন্মগত পুরুষের মধ্যে বিবাহ কিংবা স্বঘোষিত ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের ভিত্তিতে একজন জন্মগত পুরুষকে বিবাহের ক্ষেত্রে নারী হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো বিধান নেই।

আবেদনে আরও দাবি করা হয়, বিয়ের সময় ‘শিশির বিশ্বাস’ নামে যে জাতীয় পরিচয়পত্র মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে ৬৪৬৫০১৮১৮৯ নম্বর ব্যবহার করা হয়। রিটে বলা হয়েছে, ওই নম্বরের প্রকৃত জাতীয় পরিচয়পত্রের মালিক মো. জাহিদুল ইসলাম।

রিটের সঙ্গে সংযুক্ত নথিতে বলা হয়েছে, তাসনুভা আনানের নিজস্ব জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ৬৪০৬৬৭৭৬১৪। আবেদনকারীর দাবি, জাহিদুল ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে নাম, ছবি, বাবা-মায়ের নাম ও জন্মতারিখ পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘শিশির বিশ্বাস’ নামে একটি ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছে।

রিটে ২০২৩ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে লিঙ্গ পরিবর্তনের বৈধতা দেওয়ার মতো কোনো আইন বা বিধান নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে রিট আবেদনে দাবি করা হয়েছে।

রিট আবেদনকারীর আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, মামলাটি কেবল কথিত ট্রান্সজেন্ডার বিয়েকে কেন্দ্র করে নয়; এর সঙ্গে অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরির অভিযোগও জড়িত। এসব অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

রিটে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০২৩-এর ২৩ ও ২৭ ধারা, দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৯৬ ধারা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ৩৭৭ ধারার উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪, ১৫৬ ও ১৫৭ ধারা এবং পুলিশ আইন, ১৮৬১-এর ২৩ ধারার আলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

এর আগে গত ২৪ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ‘ডিমান্ড অব জাস্টিস’ নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ইশরাত হাসান ওই নোটিশ পাঠিয়ে তিন দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি দাবি করে পরবর্তীতে হাইকোর্টে রিটটি দায়ের করা হয়।


বিডিএলপিবি/এমএম

সূত্র: ইত্তেফাক ডিজিটাল রিপোর্ট (২৯/০৯/২০২৬)

বিচারাঙ্গনে অনিয়ম-দুর্নীতি দেখলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ করার আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের

বিচারাঙ্গনে অনিয়ম-দুর্নীতি দেখলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ করার আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের

ছবি: সংগৃহীত 
সুপ্রিম কোর্ট, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় কিংবা বিচারাঙ্গনের অন্য কোথাও অনিয়ম, অনাচার বা দুর্নীতি নজরে এলে তা অনুসন্ধান করে বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের (এসআরএফ) দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। পেশাগত জীবনের একটি দীর্ঘ সময় সাংবাদিকতায় কাটিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি অবগত।

আদালতকেন্দ্রিক বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রকাশিত প্রতিবেদনের ইতিবাচক প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি। রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর আদালতসংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে এবং এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, একই বিষয়ে হাইকোর্টের একাধিক বেঞ্চে পৃথক পিটিশন করে আদেশ নেওয়ার বিষয়টি তার নজরে এসেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশ দেবেন বলেও জানান তিনি।

বিচারাঙ্গন আইনজীবীদের জীবিকা ও পেশাগত কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কয়েকজনের অনিয়ম বা অসদাচরণের কারণে যেন পুরো আইনজীবী সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে বিচারাঙ্গনের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড ও অর্জনও জনসমক্ষে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সম্প্রতি আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের ইতিবাচক কার্যক্রম সম্পর্কেও জনগণকে অবহিত করা প্রয়োজন। আদালত সম্পর্কে মানুষের কাছে যেন বিভ্রান্তিকর বা ভুল বার্তা না যায়, সেদিকেও সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করে মূল ভবনের ফোয়ারার সামনে গিয়ে শেষ হয়। এতে এসআরএফের নেতৃবৃন্দ এবং সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত সাংবাদিকরা অংশ নেন।

পরে দুপুর ১টায় সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কেটে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। এসআরএফ সভাপতি মো. দিদারুল আলমের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ডালিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

অনুষ্ঠানে হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার মো. নুরুল আমিন বিপ্লব, আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার, হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার (বিচার), ডুলা সভাপতি শেখ আলী আহমেদ খোকন, বাংলাদেশ আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান খান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, প্রসিকিউটর মঈনুল করিম ও প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহসহ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, পেশাগত দায়িত্ব পালনে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, সাংবাদিকদের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষা এবং আদালতসংক্রান্ত সংবাদ দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের যাত্রা শুরু হয়।


বিডিএলপিবি/এমএম

সূত্র: বাসস (২৯/০৯/২০২৬)


বিকল্প আইনি প্রতিকার থাকলে অর্থঋণ মামলায় সরাসরি রিট নয়: হাইকোর্ট

বিকল্প আইনি প্রতিকার থাকলে অর্থঋণ মামলায় সরাসরি রিট নয়: হাইকোর্ট

আগের তিন রিটের তথ্য গোপন করে মামলা করায় আইনজীবীকে ১০ হাজার টাকা খরচ প্রদানের আদেশ 
অর্থঋণ আদালতের রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে বিকল্প কার্যকর আইনি প্রতিকার থাকা সত্ত্বেও সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করা যাবে না বলে রুল খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আগের তিনটি রিট মামলা এবং সংশ্লিষ্ট আপিলের তথ্য গোপন করে বর্তমান রিট দায়েরের বিষয়টি আদালতের কাছে প্রমাণিত হওয়ায় আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবীকে ১০ হাজার টাকা খরচ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি মো. মোজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ রায় দেন। আদালতে মামলাটি শুনানি হয় ২০ আগস্ট ও ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সম্প্রতি রায়ের লিখিত অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। মামলাটি হলো রিট পিটিশন নং- ৫২৩৮/২০২৫, মেসার্স মৌসুমি ট্রেডার্স বনাম অর্থঋণ আদালত-১, ঢাকার বিচারক ও অন্যান্য।

মামলার পটভূমি:

একটি ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে ২৫ কোটি ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ৬৭১ টাকা ৭০ পয়সা পাওনা দাবি করে মামলা করে। পরে মামলাটি একতরফাভাবে ডিক্রি হয়। ডিক্রির ভিত্তিতে ব্যাংক ২৭ কোটি ১৬ লাখ ১৩ হাজার ৫২৩ টাকা ১৬ পয়সা আদায়ের দাবিতে অর্থজারি মামলা দায়ের করে।

রিট আবেদনকারীরা ছিলেন অর্থঋণ মামলা নং ৮২/২০২০-এর বিবাদী এবং অর্থ জারি মামলা নং ১২৫/২০২১-এর ডিক্রিদার। তারা অর্থঋণ আদালতের একতরফা রায় ও ডিক্রি এবং পরবর্তী জারি কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন।

রিটকারীদের অভিযোগ ছিল, অর্থঋণ মামলায় তাদের যথাযথভাবে সমন জারি করা হয়নি। এ ছাড়া বন্ধক রাখা সম্পত্তি ডিক্রি ও পরবর্তী জারি কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও তারা আপত্তি জানান।

ব্যাংকের বক্তব্য:

ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, রিটকারীদের জন্য অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯ ও ৪১ ধারায় কার্যকর বিকল্প প্রতিকার রয়েছে। ফলে ওই প্রতিকার গ্রহণ না করে সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

ব্যাংক আরও জানায়, রিটকারীরা এর আগে একই বিরোধকে কেন্দ্র করে আরও তিনটি রিট মামলা করেছিলেন। এর মধ্যে একটি রিট খারিজ হয়েছিল, একটি মামলা অনুপস্থিতির কারণে খারিজ হয় এবং আরেকটি রিটও অনুপস্থিতির কারণে খারিজ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তারা আপিল বিভাগেও সিপি ফর লিভ টু আপিল দায়ের করেছিলেন।

আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগ:

আদালত দেখতে পান, আগের রিট ও আপিলের বিষয়গুলো বর্তমান রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি আগের রিটগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীই আদালতে উপস্থিত ছিলেন—এ বিষয়টিও আদালতের নজরে আসে।

হাইকোর্ট বলেন, আগের মামলাগুলো থেকে রিটকারীদের অর্থঋণ আদালতের রায় ও ডিক্রি সম্পর্কে জ্ঞান ছিল। সে ক্ষেত্রে তাদের অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯ ধারার প্রতিকার গ্রহণ করা উচিত ছিল।

সমন জারির বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ:

রিটকারীদের দাবি ছিল, অর্থঋণ মামলায় যথাযথভাবে সমন জারি হয়নি। তবে হাইকোর্ট মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখতে পান, প্রথমে সাধারণ পদ্ধতিতে ও রেজিস্টার্ড ডাকযোগে সমন পাঠানো হয়েছিল। তা জারি না হওয়ায় পরে আদালতের নির্দেশে দৈনিক সংবাদপত্রে সমন প্রকাশ করা হয়।

আদালত আরও দেখতে পান, সমন জারির পর পর্যাপ্ত সময় পার হয়েছিল এবং অর্থঋণ আদালতের বিচারকও আইন অনুযায়ী সমন যথাযথভাবে জারি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে একতরফা রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের কোনো বেআইনি কার্যক্রম পাওয়া যায়নি।

বন্ধকী সম্পত্তি জারি মামলায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত:

রিটকারীরা দাবি করেছিলেন, ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা সম্পত্তি অর্থঋণ মামলার ডিক্রি ও পরবর্তী জারি কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা বেআইনি।

হাইকোর্ট অর্থঋণ আদালত আইনের ৮(২)(খ) ধারা পর্যালোচনা করে বলেন, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে মামলা দায়েরের সময় বন্ধক রাখা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির বিস্তারিত বিবরণ দিতে হয়। ফলে ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য ওই বন্ধকী সম্পত্তি জারি মামলার তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা নেই।

বিকল্প প্রতিকার থাকলে রিটের সীমা:

হাইকোর্টের রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অর্থঋণ আদালতের রায় বা ডিক্রির বিরুদ্ধে আইনেই যখন কার্যকর বিকল্প প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে, তখন সরাসরি রিটের মাধ্যমে সেই প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ নেই।

আদালত অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৫(২), ৫(৩), ৫(৮) ও ৫(১১) ধারার বিধান পর্যালোচনা করেন। আদালত বলেন, অর্থঋণ আদালত একটি বিশেষ আইন দ্বারা পরিচালিত আদালত এবং ওই আইনের সঙ্গে অসঙ্গতি না থাকলে দেওয়ানি কার্যবিধির বিধান প্রযোজ্য হবে।

আগের তথ্য গোপন করাকে গুরুতর হিসেবে দেখলেন আদালত:

হাইকোর্ট আরও বলেন, বর্তমান রিট দায়েরের আগে একই পক্ষ তিনটি রিট করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগেও গিয়েছিলেন। এসব তথ্য বর্তমান রিটে গোপন করা হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, আগের রিটগুলোর সবগুলোতেই একই আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। ফলে আগের মামলার তথ্য গোপনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। আদালতের মতে, এর মাধ্যমে অর্থ জারি কার্যক্রম থামিয়ে ডিক্রির টাকা আদায়ের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

রুল খারিজ, ১০ হাজার টাকা খরচ:

সবশেষে হাইকোর্ট রুল খারিজ করেন। একই সঙ্গে আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবীকে ১০ হাজার টাকা টোকেন খরচ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই অর্থ ১৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিতে বলা হয়েছে।

রুল জারির সময় অর্থ জারি মামলার কার্যক্রমের ওপর যে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল, সেটিও প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়েছে। রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট আদালতে দ্রুত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

আইনি শিক্ষা

১. বিকল্প কার্যকর প্রতিকার থাকলে সরাসরি রিট নয়:
কোনো বিশেষ আইনে কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকলে সাধারণভাবে সেই প্রতিকার গ্রহণ করতে হয়।

২. অর্থঋণ আদালত আইন একটি বিশেষ আইন:
অর্থঋণ সংক্রান্ত বিরোধে বিশেষ আইনের বিধান প্রাধান্য পাবে; দেওয়ানি কার্যবিধি প্রযোজ্য হলেও তা ওই বিশেষ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করতে হবে।

৩. বন্ধকী সম্পত্তি জারি মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে:
আইনের নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী বন্ধক রাখা সম্পত্তি ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য জারি মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা আইনসম্মত হতে পারে।

৪. আগের মামলা গোপন করা গুরুতর বিষয়:
একই বিরোধ নিয়ে আগে করা মামলা ও আপিলের তথ্য গোপন করে নতুন রিট করলে আদালত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারেন।

৫. রিট আপিলের বিকল্প নয়:
আইনে নির্ধারিত কার্যকর প্রতিকারকে পাশ কাটিয়ে রিটের মাধ্যমে একই বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনা চাওয়া সব ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।

রায়ের মূল বক্তব্য:

অর্থঋণ আদালতের রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এ কার্যকর বিকল্প প্রতিকার থাকলে সেই প্রতিকার গ্রহণ না করে সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট করা যাবে না। একই সঙ্গে আগের মামলা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে রিট করলে তা আদালতের প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রতিবন্ধক হতে পারে।


বিডিএলপিবি/মাসুম

সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের ২য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য র‍্যালি

সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের ২য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য র‍্যালি

ছবি: সংগৃহীত 
সুপ্রিম কোর্ট বিটে কর্মরত নিয়মিত সাংবাদিকদের সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের (এসআরএফ) দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে থেকে র‍্যালিটি শুরু হয়। পরে র‍্যালিটি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করে মূল ভবনের ফোয়ারার সামনে গিয়ে শেষ হয়।

সংগঠনের তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে এসআরএফ। এরই অংশ হিসেবে এ বর্ণাঢ্য র‍্যালির আয়োজন করা হয়।

র‍্যালিতে সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মো. দিদারুল আলম, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ডালিম, সাবেক সভাপতি মাসউদুর রহমান রানা, জ্যেষ্ঠ কার্যনির্বাহী সদস্য মাজহারুল হক মান্না, কোষাধ্যক্ষ ইমন মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলাম ফকির, দফতর সম্পাদক রাব্বি হোসেন, প্রকাশনা সম্পাদক ইমরান নাফিজ, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম রুবেল, কার্যনির্বাহী সদস্য সৈয়দা সাবরিনা মজুমদারসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত সাংবাদিকরা অংশ নেন।

পেশাগত দায়িত্ব পালনে পারস্পরিক সহযোগিতা, সাংবাদিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা এবং আদালতসংক্রান্ত সংবাদ দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠভাবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের যাত্রা শুরু হয়।

দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম আরও গতিশীল করা, সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা ও মানোন্নয়ন এবং সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।


বিডিএলপিবি/এমএম
সূত্র: ঢাকা পোস্ট (২৯/০৯/২০২৬)

আপিলের সুযোগ থাকলে সন্তান নিয়ে হেবিয়াস করপাস রিট নয়: হাইকোর্টের রায়

আপিলের সুযোগ থাকলে সন্তান নিয়ে হেবিয়াস করপাস রিট নয়: হাইকোর্টের রায়

সন্তানের হেফাজত নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্রচলিত আইনি প্রতিকার অনুসরণের ওপর গুরুত্ব
সন্তানের হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে কোনো বিরোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনে আপিলের কার্যকর সুযোগ থাকলে সরাসরি হেবিয়াস করপাস রিটের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়া যাবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেছেন, হেবিয়াস করপাস রিটের উদ্দেশ্য মূলত কোনো ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে আটক বা হেফাজতে রাখার অভিযোগের প্রতিকার দেওয়া। কিন্তু সন্তানের জিম্মা, অভিভাবকত্ব বা হেফাজত নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে যদি আইন নির্ধারিত আদালত ও আপিলের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই সংশ্লিষ্ট পক্ষের জন্য প্রযোজ্য আইনি পথ।

শিশুর হেফাজত নিয়ে গর্ভধারিণী মায়ের হেবিয়াস করপাস রিটে জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এ রায় দেন। রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র মামলায় হাইকোর্ট এমন রায় দিয়েছেন। আদালতের ২১ পৃষ্ঠার ওই রায়ের মূল অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এ মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি কাজী জিনাত হক।

মামলার প্রেক্ষাপট:

সন্তানের হেফাজত নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট করা হয়। রিটের মাধ্যমে সন্তানকে আদালতে হাজির করে তার হেফাজতসংক্রান্ত প্রতিকার চাওয়া হয়। তবে আদালতের সামনে প্রশ্ন ওঠে—সন্তানের হেফাজত নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যখন প্রচলিত আইনে আদালতে যাওয়ার এবং সংশ্লিষ্ট আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে, তখন একই বিষয়ে সরাসরি হেবিয়াস করপাস রিট গ্রহণ করা যায় কি না। হাইকোর্ট বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রচলিত আইনি প্রতিকার ও হেবিয়াস করপাস রিটের প্রকৃতি বিবেচনা করেন।

হেবিয়াস করপাসের পরিধি:

হেবিয়াস করপাস মূলত বেআইনি আটক বা হেফাজতের বিরুদ্ধে একটি সাংবিধানিক প্রতিকার। এর মাধ্যমে আদালত কোনো ব্যক্তিকে তার হেফাজতে রাখার আইনগত ভিত্তি পরীক্ষা করতে পারেন।

তবে সন্তানের হেফাজতসংক্রান্ত বিরোধে শুধু একজন অভিভাবকের কাছে সন্তান থাকা মানেই তা বেআইনি আটক—এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। সন্তানের কল্যাণ, অভিভাবকত্ব এবং জিম্মার অধিকার নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আইন ও আদালতের এখতিয়ার বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আপিলের সুযোগ থাকলে বিকল্প প্রতিকার অনুসরণ:

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় হলো—কোনো পক্ষ যদি আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আদালতে তার দাবি উপস্থাপন করতে পারেন এবং সেই আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকে, তাহলে সেই প্রতিকার এড়িয়ে সরাসরি হেবিয়াস করপাস রিট করা সমীচীন নয়।

আদালত এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ, সন্তানের হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আদালতে বিষয়টি নিষ্পত্তির সুযোগ দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আপিলের পথ অনুসরণ করতে হবে।

রায়ের মূল বক্তব্য:

সন্তানের হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যখন আইন অনুযায়ী আদালতে যাওয়ার এবং আপিলের সুযোগ রয়েছে, তখন সেই কার্যকর আইনি প্রতিকার এড়িয়ে সরাসরি হেবিয়াস করপাস রিট গ্রহণ করা উচিত নয়।

হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তে সন্তানের হেফাজতসংক্রান্ত বিরোধে হেবিয়াস করপাস রিটের সীমা এবং প্রচলিত আইনি প্রতিকারের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।


বিডিএলপিবি/এমএম

খালাসের পরও ৮ বছর কারাবাস: ইব্রাহিমকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রুল

খালাসের পরও ৮ বছর কারাবাস: ইব্রাহিমকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রুল

ছবি: সংগৃহীত 
হাইকোর্টের খালাসের আদেশের পরও প্রায় আট বছর কারাগারে থাকার ঘটনায় খুলনার বটিয়াঘাটার ইব্রাহিম শেখকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না কেন—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালতের খালাসের আদেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তদন্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।

হত্যামামলায় গ্রেপ্তার, পরে মৃত্যুদণ্ড:

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বাসিন্দা ইব্রাহিম শেখ পেশায় নৈশপ্রহরী ছিলেন। ২০০৩ সালে রাতে দায়িত্ব পালন শেষে সকালে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ তাকে একটি হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। আর্থিক সংকটের কারণে সে সময় নিজের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্যও ছিল না তার।

পরে একটি মামলায় দায়রা আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য একটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এসব রায়ের বিরুদ্ধে ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিলের শুনানিতে হাইকোর্ট মামলার সাক্ষ্য ও প্রমাণে বিভিন্ন অসঙ্গতি দেখতে পান।

পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় ২০১৭ সালের ২০ জুলাই হাইকোর্ট একটি মামলায় ইব্রাহিম শেখকে খালাস দেন। অপর মামলায় দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

খালাসের পরও আট বছর কারাগারে:

রিটে বলা হয়েছে, হাইকোর্টের খালাসের আদেশ বা রিলিজ অর্ডারের কপি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে প্রায় আট বছর সময় লাগে। ফলে আদালতের আদেশে খালাস পাওয়ার পরও ইব্রাহিম শেখকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হয়।

রিটকারীর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে হাইকোর্টের খালাসের আদেশ যথাসময়ে কার্যকর হয়নি। এর ফলে একজন খালাসপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত কারাভোগ করতে হয়েছে।

দীর্ঘ কারাবাসে বদলে গেছে জীবন:

রিটে ইব্রাহিম শেখের দীর্ঘ কারাবাসের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় ২২ বছর কারাগারে থাকার সময়ে তিনি তার মাকে হারিয়েছেন। তার স্ত্রীও অন্যত্র চলে গেছেন। দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার কারণে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতেও তিনি সমস্যায় রয়েছেন বলে রিটে দাবি করা হয়েছে।

৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবি:

সম্প্রতি ইব্রাহিম শেখের ঘটনা নিয়ে জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট তার জন্য ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ, পূর্ণ পুনর্বাসন, বাসস্থান ও চিকিৎসাসেবার দাবি জানায়।

এরপর অতিরিক্ত কারাবাসের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের পক্ষে রিটটি দায়ের ও শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ হাসান শহীদ কারুজ্জামান।

হাইকোর্টের জারি করা রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, সরকারি কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও অবহেলার কারণে খালাস পাওয়ার পরও ইব্রাহিম শেখকে প্রায় আট বছর অতিরিক্ত কারাবন্দি রাখার ঘটনায় তাকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না।

একই সঙ্গে অতিরিক্ত কারাবাসের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।


বিডিএলপিবি/এমএম
সূত্র: যুগান্তর (২৮.০৯.২০২৬)

২৮ সেপ, ২০২৬

চুক্তির শর্ত অনুযায়ীই অর্থ পাওয়ার অধিকার নির্ধারণ করবে আদালত: হাইকোর্ট

চুক্তির শর্ত অনুযায়ীই অর্থ পাওয়ার অধিকার নির্ধারণ করবে আদালত: হাইকোর্ট

চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস করলেই বাকি ২০% ভাড়া পাওয়ার অধিকার তৈরি হয় না; চুক্তিতে নির্ধারিত গন্তব্যে পণ্য পৌঁছানো ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল না হলে বকেয়া ভাড়া দাবি করা যাবে না
চুক্তিতে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী পণ্য চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল না হলে শুধু চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস সম্পন্ন করার ভিত্তিতে বাকি ২০ শতাংশ পরিবহন ভাড়া দাবি করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

একটি সার পরিবহন সংক্রান্ত বাণিজ্যিক বিরোধে ড্রাই বাল্ক শিপিং (প্রা.) লিমিটেডের করা মামলা খারিজ করে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ রায় দেন। মামলাটি ছিল অ্যাডমিরালটি স্যুট নং ২/২০২৩, যেখানে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)সহ অন্যরা বিবাদী ছিলেন।

মামলার পটভূমি:

বিসিআইসি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে বাংলাদেশে ইউরিয়া সার পরিবহনের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এর আওতায় সমুদ্রপথে পণ্য চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরে আনা এবং পরে দেশের বিভিন্ন নির্ধারিত গুদাম বা কারখানায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।

ড্রাই বাল্ক শিপিংয়ের সঙ্গে ১২ এপ্রিল ২০২২ তারিখে একটি চুক্তি হয়। পরে মেসার্স পোটন ট্রেডার্সের সঙ্গে স্থানীয় পরিবহনের জন্য পৃথক চুক্তি করা হয়। এমভি জিউ ফেইং লিং জাহাজে করে ২৯,৮২৮.৭৬৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া চট্টগ্রামে আনা হয় এবং ১৫ মে ২০২২ পণ্য খালাস শেষ হয়। বিসিআইসি চুক্তির ৮০ শতাংশ ভাড়া পরিশোধ করলেও বাকি ২০ শতাংশ, যার পরিমাণ ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৬৬১.৮০ মার্কিন ডলার, পরিশোধ করেনি।

বাদীপক্ষ বকেয়া ভাড়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ, ব্যাংক সুদ ও অন্যান্য খরচসহ মোট প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা দাবি করে মামলা করে।

বিবাদীপক্ষের বক্তব্য:

বিসিআইসির পক্ষ থেকে বলা হয়, চুক্তির ৫৫(বি) ধারায় বাকি ২০ শতাংশ ভাড়া পরিশোধের আগে নির্ধারিত গুদামে পণ্য পৌঁছানোর প্রমাণ, পণ্য গ্রহণের সনদ, এমআরআরসহ বেশ কিছু নির্দিষ্ট কাগজপত্র দাখিলের শর্ত ছিল।

কিন্তু এসব শর্ত পূরণ হয়নি। এমনকি জাহাজে আসা পণ্যের মধ্যে ১২,২২৩.৫০ মেট্রিক টন সংশ্লিষ্ট গুদামে পৌঁছায়নি বলেও বিবাদীপক্ষ দাবি করে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

আদালত বলেন, দরপত্র ও চুক্তির সামগ্রিক কাঠামো থেকে দেখা যায়, সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের পরই পরিবহনকারীর দায়িত্ব শেষ হয়নি। নির্ধারিত গুদাম বা কারখানায় পুরো পণ্য পৌঁছে দেওয়াও চুক্তির অংশ ছিল। বিশেষ করে চুক্তির ৫৫(বি) ধারায় বাকি ২০ শতাংশ ভাড়া পরিশোধের সঙ্গে নির্ধারিত গন্তব্যে পুরো পণ্য পৌঁছানো এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি দাখিলের শর্ত স্পষ্টভাবে যুক্ত ছিল।

আদালত আরও বলেন, বাদী সমুদ্রপথের পরিবহন সম্পন্ন করায় ৮০ শতাংশ ভাড়া পাওয়ার অধিকার অর্জন করেছিল এবং সেই অর্থ বিসিআইসি পরিশোধও করেছে। কিন্তু বাকি ২০ শতাংশের জন্য আলাদা একটি চুক্তিগত শর্ত ছিল—নির্ধারিত গন্তব্যে পুরো পণ্য পৌঁছানো এবং তার প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করা। সেই শর্ত পূরণের প্রমাণ বাদী দিতে পারেনি।

রায়ের মূল বক্তব্য:

চুক্তিতে কোনো অর্থ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত নির্ধারিত থাকলে আদালত সেই চুক্তির শর্ত অনুসারেই অর্থ পাওয়ার অধিকার নির্ধারণ করবে।

এই মামলায় চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস সম্পন্ন হলেও নির্ধারিত গুদাম বা কারখানায় পুরো পণ্য পৌঁছানোর প্রমাণ এবং চুক্তিতে নির্ধারিত প্রয়োজনীয় নথি দাখিল করা হয়নি। ফলে বাকি ২০ শতাংশ ভাড়া পাওয়ার অধিকার বাদীর সৃষ্টি হয়নি।

মামলার চূড়ান্ত ফল:

হাইকোর্ট বাদীর দাবি করা ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি বলে সিদ্ধান্ত দেন। একই সঙ্গে বাকি ২০ শতাংশ ভাড়া পাওয়ার অধিকার সৃষ্টি হয়নি এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দাবি করা অতিরিক্ত অর্থও পাওয়ার ভিত্তি নেই বলে জানান। এ ছাড়া চুক্তির ৫১(II) ধারায় চট্টগ্রাম বন্দরে ক্ষতিপূরণমূলক অতিরিক্ত ভাড়া বা বিলম্বভাড়া প্রযোজ্য না থাকায় ওই দাবিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে আদালত উল্লেখ করেন। ফলে মামলার ২ থেকে ৫ নম্বর বিষয়গুলো বাদীর বিরুদ্ধে নিষ্পত্তি করে অ্যাডমিরালটি স্যুটটি খারিজ করা হয়। তবে আদালত খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি।


বিডিএলপিবি/মাসুম
সূত্র: রায়টি প্রকাশিত হয় ২৮/০৯/২০২৬ তারিখে