![]() |
| প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত কোনো রায় বা আদেশ আইনের চোখে টিকে থাকতে পারে না—জাল ও অস্তিত্বহীন নথির ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগের রায় বাতিল করে পর্যবেক্ষণ আপিল বিভাগের। |
আপিল বিভাগ বলেন, প্রতারণার মাধ্যমে আদালতের কাছ থেকে কোনো প্রতিকার আদায় করা হলে সংশ্লিষ্ট রায়ও প্রতারণার দ্বারা কলুষিত হয়। এ ক্ষেত্রে আদালত “Fraud unravels everything” নীতির উল্লেখ করেন, যার অর্থ—প্রতারণা সবকিছুকেই ভেঙে দেয় বা আইনগত ভিত্তিহীন করে তোলে।
ডেপুটি কমিশনার, চট্টগ্রাম বনাম ইন্টারবাল্ক ওভারসিজ এসএ বাংলাদেশ লিমিটেড ও অন্যান্য, সিভিল আপিল: নং ১৭১–১৭৪/২০১৫ মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত গত ২১ মে ২০২৫ তারিখের রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১৪ আগস্ট, ২০২৫ তারিখে।
মামলার পটভূমি:
মামলাটি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় জমি অধিগ্রহণ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত হয়। ডেপুটি কমিশনার, চট্টগ্রাম বনাম ইন্টারবাল্ক ওভারসিজ এসএ বাংলাদেশ লিমিটেড ও অন্যান্য মামলাসহ চারটি দেওয়ানি আপিলে জমি অধিগ্রহণের একটি কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।
বিবাদীরা দাবি করেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ১৪ নভেম্বর ২০১০ তারিখে ভূমি মন্ত্রণালয়কে নতুন করে সারসংক্ষেপ দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশ অনুসরণ না করেই মন্ত্রণালয় ২৩ নভেম্বর ২০১০ তারিখে জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
এই দাবির ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ তারিখে চারটি রিট আবেদনে রুল যথাযথ ঘোষণা করেন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কার্যক্রমকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগত কার্যকারিতাহীন বলে ঘোষণা দেন।
আপিল বিভাগ যা বললেন:
আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ছিল, রিট আবেদনগুলোতে ব্যবহৃত প্রধানমন্ত্রীর কথিত নির্দেশসংবলিত নথিটির মূল সরকারি নথিতে কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে ওই নথির ওপর নির্ভর করে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে প্রতিকার আদায় করা হয়েছিল।
আপিল বিভাগ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, সংশ্লিষ্ট নোট বা চিঠিটি অস্তিত্বহীন ও কাল্পনিক। রিট আবেদনকারীরা তাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যেও কথিত নথিটির অস্তিত্ব সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের দাবির সন্তোষজনক প্রতিবাদ করতে পারেননি।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গোপনীয় সারসংক্ষেপ কীভাবে যথাযথ অনুমোদন ছাড়া আদালতের কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়েছিল, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগে সরকারি পক্ষের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবহেলার বিষয়টি আপিল বিভাগ নিন্দা করেন।
প্রতারণা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পর্যবেক্ষণ:
আপিল বিভাগ ইংরেজি মামলার Lazarus Estates Ltd. v. Beasley, (1956) 1 QB 702 মামলার পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত আদালতের কোনো রায় বা মন্ত্রীর কোনো আদেশ বহাল রাখা যায় না—“Fraud unravels everything.”
একই মামলায় লর্ড পার্কার এলজে-এর পর্যবেক্ষণও উদ্ধৃত করা হয়:
“Fraud vitiates all transactions known to the law of however high a degree of solemnity.”
এর মর্মার্থ হলো, আইনস্বীকৃত কোনো লেনদেন বা কার্যক্রম যত উচ্চমাত্রার আনুষ্ঠানিকতা ও মর্যাদার অধিকারীই হোক না কেন, প্রতারণা সেটিকে আইনগতভাবে কলুষিত করতে পারে।
আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপিল বিভাগ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, অস্তিত্বহীন ও কাল্পনিক নথির ওপর নির্ভর করে হাইকোর্ট বিভাগ যে রায় দিয়েছিলেন, তা প্রতারণার দ্বারা কলুষিত হয়েছে। তাই ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ তারিখের সংশ্লিষ্ট রায় ও আদেশ বাতিল করা হয়। ফলস্বরূপ, দেওয়ানি আপিল নং ১৭১–১৭৪/২০১৫ মঞ্জুর করা হয়।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম