কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা কিংবা আত্মহত্যার কাজে সহায়তা করা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধের বিচার ও শাস্তি নির্ধারণে দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এবং বিশেষ ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, অভিযোগ প্রমাণে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর বিধানও প্রাসঙ্গিক।
আত্মহত্যায় প্ররোচনা কী?
আত্মহত্যায় প্ররোচনা বলতে কাউকে আত্মহত্যার দিকে উসকে দেওয়া, প্ররোচিত করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা করাকে বোঝায়। তবে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলেই অন্য কাউকে দায়ী করা যায় না। অভিযুক্তের ভূমিকা, মানসিক উপাদান এবং ঘটনার সঙ্গে তাঁর কর্মকাণ্ডের আইনগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা: শাস্তি ও অপরাধের উপাদান
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে এবং অন্য কেউ তাঁকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিলে, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার শর্তে প্ররোচনাকারীর সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ১০৭ ধারায় বর্ণিত প্ররোচনা, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সহায়তা কিংবা ইচ্ছাকৃত সহায়তার উপাদান থাকতে হয়। পাশাপাশি, অভিযুক্তের প্রয়োজনীয় মানসিক উপাদান এবং আত্মহত্যার সঙ্গে তাঁর আচরণের প্রাসঙ্গিক যোগসূত্রও বিবেচ্য। শুধু বিরোধ, মনোমালিন্য, অপমান কিংবা সাধারণ ঝগড়ার ঘটনা দিয়ে ৩০৬ ধারার অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ক ধারা:
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ক ধারায় নারীর সম্মতি ছাড়া বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত কোনো কাজের প্রত্যক্ষ কারণে সম্ভ্রমহানির ফলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ অপরাধে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। তবে এ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত শর্ত ও ঘটনার প্রমাণ বিবেচনা করতে হয়।
আত্মহত্যার চেষ্টা: দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা:
দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টা একটি পৃথক দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।আত্মহত্যার চেষ্টা এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনা এক নয়। প্রথমটি নিজের জীবন শেষ করার প্রচেষ্টা, আর দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে অন্য ব্যক্তির প্ররোচনা বা সহায়তার ভূমিকা বিবেচ্য।
অভিযোগ প্রমাণে কী বিবেচনা করে আদালত?
আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে অভিযুক্তের ফৌজদারি দায় নির্ধারণে আদালত সাধারণত বিবেচনা করেন—
* অভিযুক্তের কথাবার্তা, আচরণ ও সহায়তার প্রকৃতি;
* আত্মহত্যার সঙ্গে অভিযুক্তের কর্মকাণ্ডের আইনগত সম্পর্ক;
* প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ;
* অপরাধের উপাদান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না।
অপমান, হুমকি বা মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; তবে সেগুলো একাই সব ক্ষেত্রে ৩০৬ ধারার অপরাধ প্রতিষ্ঠা করে না।
প্রাসঙ্গিক বিচারিক সিদ্ধান্ত:
১. Ramesh Kumar v. State of Chhattisgarh (2001)
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ মামলায় ‘instigation’ বা প্ররোচনার অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কাউকে কোনো কাজের দিকে উসকে দেওয়া বা উৎসাহিত করার বিষয়টি বিবেচনা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো বক্তব্য বা আচরণকে প্ররোচনা হিসেবে গণ্য করতে হলে তার প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ জরুরি।
২. M. Mohan v. State (2011) : ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এ সিদ্ধান্তে ৩০৬ ধারার অপরাধ প্রতিষ্ঠায় প্ররোচনা বা সহায়তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। সাধারণ বিবাদ বা কথাকাটাকাটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মহত্যায় প্ররোচনা নয়।
৩. Pramod Shriram Telgote v. State of Maharashtra (2018): বোম্বে হাইকোর্টের এ মামলায় ৩০৬ ধারার অভিযোগে অপরাধমূলক অভিপ্রায় বা mens rea এবং অভিযুক্তের আচরণের ভূমিকা বিবেচনার বিষয়টি উঠে আসে।
উল্লেখ্য, এসব ভারতীয় বিচারিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আদালতের জন্য সরাসরি বাধ্যতামূলক নজির নয়; তবে প্ররোচনার ধারণা বিশ্লেষণে তুলনামূলকভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
৪. এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ: ওয়াহিদা সিফাত মামলা (২০১৭)
ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। মামলায় মানসিক ও শারীরিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ গুরুত্ব পায়।
তবে ৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ হাইকোর্ট বিভাগ ওই রায় বাতিল করে পুনর্বিচারের নির্দেশ দেন। এ মামলায় পারিবারিক কলহ, ঝগড়া বা প্রতিকূল পরিবেশের পাশাপাশি দণ্ডবিধির ১০৭ ধারার অধীনে প্ররোচনা কিংবা ইচ্ছাকৃত সহায়তার উপাদান প্রমাণের গুরুত্ব সামনে আসে।
সুতরাং, বাংলাদেশে ৩০৬ ধারাসংক্রান্ত বিস্তৃত আপিল-নজির তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও অপরাধের উপাদান ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
সুইসাইড নোটের সাক্ষ্যগত গুরুত্ব:
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২(১) ধারা অনুযায়ী, মৃত্যুর কারণ বা মৃত্যুর দিকে পরিচালিত পরিস্থিতি সম্পর্কে মৃত ব্যক্তির বক্তব্য নির্দিষ্ট শর্তে প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হতে পারে।
এ কারণে সুইসাইড নোট আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে নোটে কারও নাম উল্লেখ থাকলেই তাঁর অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। নোটের সত্যতা, বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণের সঙ্গে তার সামঞ্জস্যও বিবেচ্য।
পরিশেষে, বাংলাদেশে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে শুধু আত্মহত্যার ঘটনা প্রমাণ করাই যথেষ্ট নয়; দণ্ডবিধির ১০৭ ও ৩০৬ ধারার প্রাসঙ্গিক উপাদান প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। বিশেষ ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ক ধারা এবং সাক্ষ্য আইনের ৩২(১) ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। অভিযুক্তের ভূমিকা, অপরাধমূলক অভিপ্রায়, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনের শর্ত বিবেচনা করেই আদালতকে দায় নির্ধারণ করতে হয়।
সূত্র:
১. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ — ১০৭, ৩০৬ ও ৩০৯ ধারা
২. বাংলাদেশের আইনভান্ডার — নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ক ধারা এবং সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২(১) ধারা
৩. The Daily Star — ওয়াহিদা সিফাত মামলায় পুনর্বিচারের নির্দেশ
৪. Ramesh Kumar v. State of Chhattisgarh (2001); M. Mohan v. State (2011); Pramod Shriram Telgote v. State of Maharashtra (2018)—ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও বোম্বে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত।
বিডিএলপিবি/মাসুম












