![]() |
| চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস করলেই বাকি ২০% ভাড়া পাওয়ার অধিকার তৈরি হয় না; চুক্তিতে নির্ধারিত গন্তব্যে পণ্য পৌঁছানো ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল না হলে বকেয়া ভাড়া দাবি করা যাবে না |
একটি সার পরিবহন সংক্রান্ত বাণিজ্যিক বিরোধে ড্রাই বাল্ক শিপিং (প্রা.) লিমিটেডের করা মামলা খারিজ করে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ রায় দেন। মামলাটি ছিল অ্যাডমিরালটি স্যুট নং ২/২০২৩, যেখানে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)সহ অন্যরা বিবাদী ছিলেন।
মামলার পটভূমি:
বিসিআইসি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে বাংলাদেশে ইউরিয়া সার পরিবহনের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এর আওতায় সমুদ্রপথে পণ্য চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরে আনা এবং পরে দেশের বিভিন্ন নির্ধারিত গুদাম বা কারখানায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
ড্রাই বাল্ক শিপিংয়ের সঙ্গে ১২ এপ্রিল ২০২২ তারিখে একটি চুক্তি হয়। পরে মেসার্স পোটন ট্রেডার্সের সঙ্গে স্থানীয় পরিবহনের জন্য পৃথক চুক্তি করা হয়। এমভি জিউ ফেইং লিং জাহাজে করে ২৯,৮২৮.৭৬৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া চট্টগ্রামে আনা হয় এবং ১৫ মে ২০২২ পণ্য খালাস শেষ হয়। বিসিআইসি চুক্তির ৮০ শতাংশ ভাড়া পরিশোধ করলেও বাকি ২০ শতাংশ, যার পরিমাণ ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৬৬১.৮০ মার্কিন ডলার, পরিশোধ করেনি।
বাদীপক্ষ বকেয়া ভাড়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ, ব্যাংক সুদ ও অন্যান্য খরচসহ মোট প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা দাবি করে মামলা করে।
বিবাদীপক্ষের বক্তব্য:
বিসিআইসির পক্ষ থেকে বলা হয়, চুক্তির ৫৫(বি) ধারায় বাকি ২০ শতাংশ ভাড়া পরিশোধের আগে নির্ধারিত গুদামে পণ্য পৌঁছানোর প্রমাণ, পণ্য গ্রহণের সনদ, এমআরআরসহ বেশ কিছু নির্দিষ্ট কাগজপত্র দাখিলের শর্ত ছিল।
কিন্তু এসব শর্ত পূরণ হয়নি। এমনকি জাহাজে আসা পণ্যের মধ্যে ১২,২২৩.৫০ মেট্রিক টন সংশ্লিষ্ট গুদামে পৌঁছায়নি বলেও বিবাদীপক্ষ দাবি করে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:
আদালত বলেন, দরপত্র ও চুক্তির সামগ্রিক কাঠামো থেকে দেখা যায়, সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের পরই পরিবহনকারীর দায়িত্ব শেষ হয়নি। নির্ধারিত গুদাম বা কারখানায় পুরো পণ্য পৌঁছে দেওয়াও চুক্তির অংশ ছিল। বিশেষ করে চুক্তির ৫৫(বি) ধারায় বাকি ২০ শতাংশ ভাড়া পরিশোধের সঙ্গে নির্ধারিত গন্তব্যে পুরো পণ্য পৌঁছানো এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি দাখিলের শর্ত স্পষ্টভাবে যুক্ত ছিল।
আদালত আরও বলেন, বাদী সমুদ্রপথের পরিবহন সম্পন্ন করায় ৮০ শতাংশ ভাড়া পাওয়ার অধিকার অর্জন করেছিল এবং সেই অর্থ বিসিআইসি পরিশোধও করেছে। কিন্তু বাকি ২০ শতাংশের জন্য আলাদা একটি চুক্তিগত শর্ত ছিল—নির্ধারিত গন্তব্যে পুরো পণ্য পৌঁছানো এবং তার প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করা। সেই শর্ত পূরণের প্রমাণ বাদী দিতে পারেনি।
রায়ের মূল বক্তব্য:
চুক্তিতে কোনো অর্থ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত নির্ধারিত থাকলে আদালত সেই চুক্তির শর্ত অনুসারেই অর্থ পাওয়ার অধিকার নির্ধারণ করবে।
এই মামলায় চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস সম্পন্ন হলেও নির্ধারিত গুদাম বা কারখানায় পুরো পণ্য পৌঁছানোর প্রমাণ এবং চুক্তিতে নির্ধারিত প্রয়োজনীয় নথি দাখিল করা হয়নি। ফলে বাকি ২০ শতাংশ ভাড়া পাওয়ার অধিকার বাদীর সৃষ্টি হয়নি।
মামলার চূড়ান্ত ফল:
হাইকোর্ট বাদীর দাবি করা ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি বলে সিদ্ধান্ত দেন। একই সঙ্গে বাকি ২০ শতাংশ ভাড়া পাওয়ার অধিকার সৃষ্টি হয়নি এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দাবি করা অতিরিক্ত অর্থও পাওয়ার ভিত্তি নেই বলে জানান। এ ছাড়া চুক্তির ৫১(II) ধারায় চট্টগ্রাম বন্দরে ক্ষতিপূরণমূলক অতিরিক্ত ভাড়া বা বিলম্বভাড়া প্রযোজ্য না থাকায় ওই দাবিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে আদালত উল্লেখ করেন। ফলে মামলার ২ থেকে ৫ নম্বর বিষয়গুলো বাদীর বিরুদ্ধে নিষ্পত্তি করে অ্যাডমিরালটি স্যুটটি খারিজ করা হয়। তবে আদালত খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি।
বিডিএলপিবি/মাসুম
সূত্র: রায়টি প্রকাশিত হয় ২৮/০৯/২০২৬ তারিখে