![]() |
১.৩১ একর জমির পুরোটা বণ্টনের নির্দেশ; খতিয়ান স্বত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয় |
একটি ১.৩১ একর জমি নিয়ে বিরোধের মামলায় এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, এস.এ. বা আর.এস. খতিয়ানে কারও নাম থাকলেই তার স্বত্ব চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বৈধ ও নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত স্বত্বের বিপরীতে শুধু খতিয়ানের রেকর্ডকে প্রাধান্য দেওয়া যায় না।
বিচারপতি শেখ আবদুল আওয়াল ও বিচারপতি এ. কে. এম. রাবিউল হাসান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ Azahar Uddin Bhuiyan, being dead, his legal heirs vs. Chandraban Bibi and others (First Appeal No. 312 of 2018) মামলায় ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। যার রায় প্রকাশিত হয় ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার পটভূমি
বরিশালের যুগ্ম জেলা জজ, প্রথম আদালতে Title Suit No. 51 of 2007 মামলাটি ১.৩১ একর জমি বণ্টনের দাবিতে দায়ের করা হয়। বাদীদের দাবি ছিল, বিতর্কিত জমির ওপর তাঁদের স্বত্বের ধারাবাহিকতা পূর্ববর্তী মালিকদের মাধ্যমে তাঁদের কাছে এসেছে। তাঁদের স্বত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল ১৩ জুন ১৯৩৯ তারিখের নিবন্ধিত কবুলিয়ত দলিল নং ১৯৯৯। তবে পরবর্তী এস.এ. খতিয়ানে ১.৩১ একর জমির মধ্যে ১.০৫ একর বাদীদের পক্ষে এবং অবশিষ্ট ০.২৬ একর বিবাদীদের নামে রেকর্ড হয়। বাদীদের বক্তব্য ছিল, ০.২৬ একর জমি ভুলভাবে বিবাদীদের নামে রেকর্ড করা হলেও তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে পুরো ১.৩১ একর জমি যৌথভাবে ভোগদখল করে আসছেন।
অন্যদিকে বিবাদীদের দাবি ছিল, ০.২৬ একর জমির মালিকানা নিয়ে জটিল প্রশ্ন রয়েছে। তাই পৃথকভাবে স্বত্ব ঘোষণার প্রার্থনা ছাড়া শুধু বণ্টনের মামলা করে ওই অংশের দাবি করা যায় না। তাঁরা ১৯৩৯ সালের কবুলিয়ত দলিলের কার্যকারিতা ও জমির পরিমাণ নিয়েও আপত্তি তোলেন।
নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত
মামলার শুনানি শেষে যুগ্ম জেলা জজ, প্রথম আদালত, বরিশাল ১৩ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে মামলাটি আংশিকভাবে মঞ্জুর করেন। আদালত ১.০৫ একর জমির বিষয়ে বাদীদের পক্ষে বণ্টনের ডিক্রি দিলেও ০.২৬ একর জমির ক্ষেত্রে তাঁদের দাবি গ্রহণ করেননি। এর মূল কারণ ছিল—ওই অংশের স্বত্ব নিয়ে বিরোধ থাকায় পৃথক স্বত্ব ঘোষণার প্রার্থনা ছাড়া বণ্টনের দাবি করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাদীরা হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করেন।
হাইকোর্টে মূল প্রশ্ন
আপিলের শুনানিতে হাইকোর্ট মূলত তিনটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন—
প্রথমত, পৃথক স্বত্ব ঘোষণার প্রার্থনা না থাকলেও বণ্টন মামলার মধ্যেই ০.২৬ একর জমির স্বত্বের প্রশ্ন নির্ধারণ করা যায় কি না;
দ্বিতীয়ত, দেওয়ানি কার্যবিধির Order VII Rule 3 অনুসারে জমির বিবরণ যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে পুরো জমির বণ্টন বাধাগ্রস্ত হবে কি না;
তৃতীয়ত, বাদীরা পুরো ১.৩১ একর জমিতে তাঁদের স্বত্ব ও বণ্টনের অধিকার প্রমাণ করতে পেরেছেন কি না।
হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
খতিয়ান স্বত্ব সৃষ্টি বা বিলুপ্ত করে না
হাইকোর্ট প্রথমেই স্পষ্ট করেন, খতিয়ান মূলত জমির রেকর্ড; এটি নিজে থেকে কারও স্বত্ব সৃষ্টি বা বিলুপ্ত করে না। আদালত দেখতে পান, বাদীদের স্বত্বের ধারাবাহিকতা ১৯৩৯ সালের নিবন্ধিত কবুলিয়ত দলিল দ্বারা সমর্থিত। অপরদিকে এস.এ. খতিয়ানে ০.২৬ একর বিবাদীদের নামে রেকর্ড হওয়ার বিষয়টি বাদীদের স্বত্বকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে না। বিশেষ করে বিবাদীদের নামে থাকা খতিয়ানের ভিত্তিতে বাদীদের স্বত্ব অস্বীকার করার আগে তাঁদের স্বত্বের পক্ষে থাকা নিবন্ধিত দলিল ও অন্যান্য প্রমাণ যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল বলে আদালত মনে করেন।
বণ্টন মামলাতেই স্বত্বের প্রশ্ন নির্ধারণ করা যায়
হাইকোর্ট বলেন, বণ্টনের মামলায় জমির অংশীদারদের স্বত্ব নির্ধারণের প্রয়োজন হলে সেই প্রশ্ন একই মামলার মধ্যেই নিষ্পত্তি করা যায়। অর্থাৎ, কোনো যৌথ সম্পত্তিতে কার কতটুকু অংশ রয়েছে—এটি নির্ধারণ করতে গিয়ে স্বত্বের আনুষঙ্গিক প্রশ্ন দেখা দিলে তার জন্য সব সময় আলাদা স্বত্ব ঘোষণার মামলা দায়ের করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এ বিষয়ে আদালত Cinmoy Chowdhury vs. Mridul Chowdhury, 55 DLR (AD) 115 মামলার নীতি অনুসরণ করেন। ফলে ০.২৬ একর জমির জন্য আলাদা স্বত্ব ঘোষণার মামলা না করায় বাদীদের বণ্টনের মামলা অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়নি।
জমি শনাক্ত করা সম্ভব হলে Order VII Rule 3 বাধা নয়
দেওয়ানি কার্যবিধির Order VII Rule 3 অনুযায়ী মামলার স্থাবর সম্পত্তির বিবরণ এমন হতে হবে, যাতে সম্পত্তিটি স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায় এবং ভবিষ্যতে ডিক্রি কার্যকর করার সময় কোনো অসুবিধা না হয়। হাইকোর্ট দেখতে পান, মামলার তফসিলে পুরো ১.৩১ একর জমি সি.এস. দাগ নম্বর ও সীমানাসহ উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে জমিটি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য ছিল। আদালত বলেন, যৌথ সম্পত্তির বণ্টন মামলায় প্রাথমিক ডিক্রি দেওয়ার সময় প্রতিটি অংশের আলাদা ভৌত সীমানা নির্ধারণ করা আবশ্যক নয়। চূড়ান্তভাবে জমি ভাগ করার সময় অ্যাডভোকেট কমিশনারের মাধ্যমে মাপজোক ও অংশ নির্ধারণ করা যেতে পারে।
১৯৩৯ সালের নিবন্ধিত কবুলিয়ত দলিলকে অগ্রাহ্য করার কারণ নেই
মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ছিল ১৩ জুন ১৯৩৯ তারিখের নিবন্ধিত কবুলিয়ত দলিল নং ১৯৯৯। হাইকোর্ট লক্ষ্য করেন, ট্রায়াল কোর্টও দলিলটিকে প্রকৃত ও বৈধ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বিবাদীরা ওই দলিল বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণার জন্য কোনো মামলা করেনি। আদালত আরও লক্ষ্য করেন, বিবাদীপক্ষের সাক্ষীর বক্তব্য থেকেও দলিলটির বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে প্রতীয়মান হয়। এ ক্ষেত্রে Specific Relief Act, 1877-এর Section 31 এবং Evidence Act, 1872-এর Section 90-এর বিধান প্রাসঙ্গিক বলে আদালত উল্লেখ করেন। বিশেষ করে ৩০ বছরের বেশি পুরোনো এবং যথাযথ হেফাজত থেকে উপস্থাপিত দলিলের ক্ষেত্রে তার সত্যতা সম্পর্কে আইনে অনুমানের সুযোগ রয়েছে।
শুধু মৌখিক আপত্তিতে নিবন্ধিত দলিল অকার্যকর হয় না
বিবাদীপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কবুলিয়ত দলিলটি এককভাবে বাদীদের পুরো জমির স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। হাইকোর্ট এই যুক্তি গ্রহণ করেননি। আদালতের মতে, দীর্ঘদিনের পুরোনো নিবন্ধিত দলিল আদালতে প্রমাণিত এবং অচ্যালেঞ্জড অবস্থায় থাকলে শুধু মৌখিক বক্তব্যের ভিত্তিতে সেটিকে অকার্যকর বলা যায় না। বিবাদীরা দলিলটি বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণার জন্য যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেয়নি—এ বিষয়টিও আদালতের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
একজন সহ-শরিকের দখল সাধারণত সবার দখল
হাইকোর্ট আরও বলেন, যৌথ সম্পত্তিতে একজন সহ-শরিক দখলে থাকলে সাধারণভাবে সেই দখল সব সহ-শরিকের পক্ষের দখল হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্য সহ-শরিককে সম্পূর্ণভাবে বেদখল করা হয়েছে বা তাঁর অধিকার অস্বীকার করে দীর্ঘদিন ধরে পৃথকভাবে দখল করা হয়েছে—এমন বেদখল বা ouster প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত একজনের দখলের কারণে অন্য সহ-শরিকের অধিকার নষ্ট হয় না। এই মামলায় বিবাদীপক্ষ বাদীদের সম্পূর্ণ বেদখলের বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেনি। বরং বিবাদীপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্যে বাদীদের জমিতে দখলের বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে।
সাক্ষীদের স্বীকারোক্তিও আদালতের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ
মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, বিবাদীপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দিতে বাদীদের দখলের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি রয়েছে। আদালত বলেন, কোনো পক্ষের নিজের বক্তব্য বা সাক্ষ্যের মাধ্যমে কোনো বিষয় স্বীকার করা হলে সেটি সেই পক্ষের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ছাড়া বিবাদীদের বক্তব্য ও নথিপত্রের মধ্যেও এমন কিছু বিষয় ছিল, যা বাদীদের দাবি ও ১৯৩৯ সালের দলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ট্রায়াল কোর্টের সিদ্ধান্তে হাইকোর্টের আপত্তি
সবকিছু বিবেচনা করে হাইকোর্ট মনে করেন, ট্রায়াল কোর্ট ০.২৬ একর জমির বিষয়ে আইনের ভুল প্রয়োগ করেছে। বিশেষ করে এস.এ. খতিয়ানে বিবাদীদের নাম থাকার বিষয়টিকে ১৯৩৯ সালের নিবন্ধিত কবুলিয়ত দলিলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া সঠিক হয়নি। আদালতের মতে, বাদীদের স্বত্বের ধারাবাহিকতা, নিবন্ধিত দলিল, দখল এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ একসঙ্গে বিবেচনা করলে পুরো ১.৩১ একর জমির ওপর তাঁদের বণ্টনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়
হাইকোর্ট বিভাগ First Appeal No. 312 of 2018 মঞ্জুর করেন। ট্রায়াল কোর্টের ১৩ অক্টোবর ২০১৫ তারিখের রায় ও ডিক্রি সংশোধন করে হাইকোর্ট পুরো ১.৩১ একর জমির বিষয়ে বাদীদের পক্ষে প্রাথমিক বণ্টন ডিক্রি দেওয়ার নির্দেশ দেন।
রায়ে বলা হয়—
বাদীরা পুরো ১.৩১ একর জমিতে তাঁদের আইনগত অংশ অনুযায়ী পৃথক সাহাম পাওয়ার অধিকারী;
পক্ষগুলোকে ৪৫ দিনের মধ্যে নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নিতে হবে;
৪৫ দিনের মধ্যে পারস্পরিকভাবে বণ্টন সম্ভব না হলে যে কোনো পক্ষ ট্রায়াল কোর্টে অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের আবেদন করতে পারবেন;
কমিশনার সরেজমিনে জমি পরিমাপ করে প্রত্যেক পক্ষের প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ করবেন এবং তার ভিত্তিতে চূড়ান্ত ডিক্রি প্রস্তুত করা হবে।
আপিলটি বিবাদী ১-৭ নম্বরের বিরুদ্ধে শুনানি করে এবং অন্যদের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে মঞ্জুর করা হয়। আদালত কোনো খরচ আরোপ করেননি।
রায়ের মূল বক্তব্য
যৌথ সম্পত্তির বণ্টন মামলায় কোনো অংশের স্বত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলেও, সেই স্বত্বের প্রশ্ন নির্ধারণের জন্য সব ক্ষেত্রে পৃথক স্বত্ব ঘোষণার মামলা করা বাধ্যতামূলক নয়। একই বণ্টন মামলায় প্রয়োজনীয় স্বত্বের প্রশ্ন নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। বৈধ নিবন্ধিত দলিলের বিপরীতে শুধু খতিয়ানের রেকর্ডকে চূড়ান্ত স্বত্বের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
আইনি শিক্ষা
এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছেন—
প্রথমত, খতিয়ান স্বত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
দ্বিতীয়ত, বণ্টন মামলার প্রয়োজনেই যদি স্বত্বের কোনো আনুষঙ্গিক প্রশ্ন ওঠে, আদালত একই মামলায় সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে পারেন।
তৃতীয়ত, সম্পত্তি তফসিল, দাগ ও সীমানার মাধ্যমে যথেষ্টভাবে শনাক্ত করা গেলে Order VII Rule 3-এর কারণে বণ্টন মামলা ব্যর্থ হবে না।
চতুর্থত, দীর্ঘদিনের পুরোনো ও অচ্যালেঞ্জড নিবন্ধিত দলিলের গুরুত্ব রয়েছে এবং শুধু মৌখিক বক্তব্য দিয়ে এমন দলিলকে অকার্যকর করা যায় না।
পঞ্চমত, যৌথ সম্পত্তিতে একজন সহ-শরিকের দখল সাধারণত অন্য সহ-শরিকদের অধিকার নষ্ট করে না; সম্পূর্ণ বেদখল বা ouster প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য নজির
Cinmoy Chowdhury vs. Mridul Chowdhury, 55 DLR (AD) 115
Sanjib Kumar Bose vs. Syed Shamsuddin Ahmed, 33 DLR (AD) 34
Abdul Mannan Bhuiyan vs. Md. Nasir Hossain, 18 BLD (AD) 44
Hachina Begum vs. Abdul Mannan, 30 BLD 628
Guru Charan Mondol vs. Sree Bhaba Sindhu Sarkar, 13 MLR (AD)