সর্বশেষ

১৯ অক্টো, ২০২৬

জাল ও সন্দেহজনক দলিলের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি গ্রহণযোগ্য নয়

জাল ও সন্দেহজনক দলিলের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি গ্রহণযোগ্য নয়

আগের নিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের নির্দেশ হাইকোর্টের
জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধে আগের নিবন্ধিত দলিল, মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য এবং জমির সুনির্দিষ্ট সীমানার প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন, সন্দেহজনক ও জালিয়াতিপূর্ণ বায়নাপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তী দলিলের মাধ্যমে জমির ওপর অগ্রাধিকার দাবি করা যায় না। মামলার সামগ্রিক সাক্ষ্য-প্রমাণে বাদীর স্বত্ব, পূর্ববর্তী দখল ও পরবর্তী সময়ে বেদখল হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে তিনি স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি পেতে পারেন।

বিচারপতি মো. আলী রেজা ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫ এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮ একসঙ্গে নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট এ রায় দেন।

মামলার পটভূমি

মামলার বাদী ১৯৭৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এলাকার দুই শতক জমি ক্রয় করেন বলে দাবি করেন। জমি কেনার পর সেখানে টিনশেড ঘর নির্মাণ করে ওষুধের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বাদীর অভিযোগ, ১৯৭৭ সালের ৭ জানুয়ারি বিবাদীরা তাঁর ঘর ভেঙে তাঁকে জমি থেকে উচ্ছেদ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি জমির দখল ফিরে পেলেও ১৯৭৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আবারও বেদখল হন।

অন্যদিকে, বিবাদীদের দাবি ছিল, তাঁরা ১৯৭৪ সালে জমির মালিকের সঙ্গে বায়নাপত্র সম্পাদন করেন এবং পরবর্তী সময়ে জমির দলিল নিবন্ধন করে দখল নেন। তাঁরা বাদীর দলিলকে জাল ও প্রতারণামূলক দাবি করেন।

এ বিরোধে বাদী ১৯৮৫ সালে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারিক ও আপিল আদালত ঘুরে হাইকোর্ট বিভাগে আসে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, বাদীর সাক্ষীরা জমিতে তাঁর পূর্ববর্তী দখল এবং পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদের বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। জেরায় তাঁদের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য কোনো অসংগতি বের করতে পারেননি বিবাদীরা। বাদীর মূল নিবন্ধিত দলিল, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং জমির সীমানাসংক্রান্ত নথিপত্র তাঁর দাবিকে সমর্থন করেছে।

অন্যদিকে, বিবাদীদের দাখিল করা বায়নাপত্রে একাধিক সন্দেহজনক বিষয় পাওয়া যায়। দলিলের লেখার কালি ও সাক্ষীদের স্বাক্ষরের কালির মধ্যে পার্থক্য ছিল। বায়নাপত্রে ১৯৭১ সালের আদালতের সিল পাওয়া গেলেও সেটি সম্পাদনের তারিখ ছিল ১৯৭৪ সাল। এসব অসংগতি এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত বায়নাপত্রটিকে পরবর্তী সময়ে তৈরি ও জালিয়াতিপূর্ণ বলে মনে করেন।

বিবাদীদের পরবর্তী নিবন্ধিত দলিলেও সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। দলিলে কথিত বায়নাপত্রের উল্লেখ ছিল না এবং স্ট্যাম্প ক্রয় ও নিবন্ধনসংক্রান্ত কিছু অসংগতির সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। আদালতের মতে, এসব দলিল বিবাদীদের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

জমির সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণের গুরুত্ব

বিবাদীরা দাবি করেছিলেন, মামলার জমির সীমানা সুনির্দিষ্ট নয়। তবে হাইকোর্ট বলেন, আরজির তফসিল, বাদীর দলিল, সাক্ষীদের জবানবন্দি, কমিশনারের প্রতিবেদন এবং মামলার নকশা থেকে জমির পরিচয় ও সীমানা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে ইস্যু করা চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত বিএস খতিয়ানেও জমিটি বাদীর নামে রেকর্ড করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে সমর্থিত হলে এ ধরনের চূড়ান্ত রেকর্ডের প্রমাণমূল্য রয়েছে।

আগের নিবন্ধিত দলিলের অগ্রাধিকার

হাইকোর্ট বলেন, কেবল আগের একটি অনিবন্ধিত বায়নাপত্রের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বাদীর আগের নিবন্ধিত দলিলের চেয়ে অগ্রাধিকার দাবি করা যায় না। এ মামলায় বাদীর দলিল আগে নিবন্ধিত হয়েছে এবং তাঁর স্বত্ব, পূর্ববর্তী দখল ও পরবর্তী সময়ে বেদখল হওয়ার বিষয়টি যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বাদীর স্বত্বের দাবিই গ্রহণযোগ্য।

হাইকোর্টের রায়

হাইকোর্ট নিম্ন আদালতগুলোর সংশ্লিষ্ট রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫-এর রুল যথাযথ ঘোষণা করা হয় এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮-এর রুল খারিজ করা হয়।

একই সঙ্গে আদালত বাদীর পক্ষে জমির স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি দেন। বিবাদী ১ ও ২-কে রায় ও আদেশের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে জমির সব বাধা অপসারণ করে বাদীকে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় বাদী আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমির দখল পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।

মামলার বিবরণ

মামলার নাম: ড. আশরাফ হোসেন (মৃত), তাঁর আইনগত উত্তরাধিকারীগণ বনাম হাজী আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ও অন্যান্য

মামলার নম্বর: সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫ এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮

বিচারপতি: বিচারপতি মো. আলী রেজা

রায়ের তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রায় প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬


বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি থাকলেই অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণিত হয় না: হাইকোর্ট

সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি থাকলেই অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণিত হয় না: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
শুধু সরকারি অর্থের ঘাটতি বা ক্ষতি প্রমাণিত হলেই অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; অর্থের ওপর অভিযুক্তের ন্যস্ত দায়িত্ব ও অসৎভাবে আত্মসাতের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে।

সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি পাওয়া গেলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অর্থ আত্মসাতের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, সরকারি অর্থের ঘাটতি বা ক্ষতির প্রমাণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট অর্থ অভিযুক্তের জিম্মায় বা নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে তা আত্মসাৎ করেছেন—এ বিষয়গুলোও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর একক বেঞ্চ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। রায়ে আদালত লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতির ঘটনায় দণ্ডিত ডাক বিভাগের কর্মচারী মো. ওমর ফারুকের আপিল মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে তাঁকে অভিযোগ থেকে খালাস দেন।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরের নিয়মিত পোস্টমাস্টার ছুটিতে থাকাকালে ওমর ফারুক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিয়মিত পোস্টমাস্টার দায়িত্বে ফিরে এলে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি তাঁর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা থাকলেও ওমর ফারুক পরে দায়িত্ব দেবেন বলে জানান এবং একপর্যায়ে অফিস থেকে চলে যান। পরবর্তী সময়ে ডাকঘরে নগদ অর্থ ও অন্যান্য হিসাবের তালিকা প্রস্তুত করে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতি পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫ ধারায় মামলা হয়। ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিশেষ জজ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।

আপিলের শুনানিতে হাইকোর্ট দেখতে পান, ডাকঘরে অর্থের ঘাটতি থাকার বিষয়টি সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে এলেও ওই অর্থ অভিযুক্তের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং তিনি তা অসৎ উদ্দেশ্যে আত্মসাৎ করেছেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি। মামলায় ৯ লাখ টাকা লালমনিরহাট প্রধান ডাকঘর থেকে গ্রহণের কথা বলা হলেও তা আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাবের এন্ট্রি বা প্রেরণের নথি পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তাও স্বীকার করেন, ওই অর্থ প্রকৃতপক্ষে আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, একজন গ্রাহকের তিন লাখ টাকা জমা দেওয়ার লেনদেনের প্রমাণ থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিগতভাবে ওই অর্থ গ্রহণ বা আত্মসাৎ করেছিলেন, তা প্রমাণিত হয়নি। দায়িত্ব হস্তান্তর না করে অফিস ত্যাগ করা কিংবা অর্থের ঘাটতির সময় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা সন্দেহের কারণ হতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট অর্থের সঙ্গে অভিযুক্তের অসৎ আত্মসাতের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা না হলে তা দণ্ডাদেশের জন্য যথেষ্ট নয়। আদালতের মতে, অর্থের ঘাটতি প্রমাণ করা এবং সেই অর্থ অসৎভাবে আত্মসাৎ করা প্রমাণ করা দুটি পৃথক বিষয়।

এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দেন, মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারার অপরাধের অপরিহার্য উপাদান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে আপিল মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল এবং অভিযুক্তকে খালাস দেওয়া হয়।

মামলার বিবরণ: মো. ওমর ফারুক বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য, ফৌজদারি আপিল নং ৭৭১২/২০১৪; রায়ের তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

আইনি তাৎপর্য: এ রায় ফৌজদারি বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে—সরকারি অর্থের ঘাটতি বা হিসাবের অসংগতি থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মসাতের অপরাধে পরিণত হয় না। অভিযুক্তের কাছে অর্থের ন্যস্ততা বা নিয়ন্ত্রণ এবং তাঁর অসৎ আত্মসাতের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।


বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম

সরকারি সংস্থার দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার ফলে আপিল দায়েরে বিলম্ব হলে সন্তোষজনক কারণ (Sufficient Cause) বিবেচনায় মওকুফ করা যায়: হাইকোর্ট

সরকারি সংস্থার দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার ফলে আপিল দায়েরে বিলম্ব হলে সন্তোষজনক কারণ (Sufficient Cause) বিবেচনায় মওকুফ করা যায়: হাইকোর্ট

তামাদি আইনের ৫ দ্বারায় বিলম্ব মওকুফ সংক্রান্ত  

সরকারি সংস্থার প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার কারণে আপিল দায়েরে বিলম্ব হলে, যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করা সাপেক্ষে তা মওকুফ করা যেতে পারে বলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি মামলায় আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মওকুফ করে আদালত বলেছেন, মামলার গুণাগুণ বিবেচনার সুযোগ দিতে যথাযথ ক্ষেত্রে কারিগরি ত্রুটির চেয়ে ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সিভিল রিভিশন নাম্বার ৪৬৮৬/২০০৪, বাংলাদেশ রেলওয়ে বনাম শফিকুল ইসলাম, মামলায় এ রায় দেন। আদালত লালমনিরহাটের জেলা জজ আদালতের বিলম্ব মওকুফের আবেদন খারিজের আদেশ বাতিল করে বাংলাদেশ রেলওয়ের আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মওকুফ করেন।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, শফিকুল ইসলাম ২০০২ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও অন্যান্য বিবাদীর বিরুদ্ধে লালমনিরহাটের সহকারী জজ আদালতে আদার স্যুট নাম্বার ৬৮/২০০২ দায়ের করেন। তাঁর আবেদনের মূল বক্তব্য ছিল, আদার স্যুট নাম্বার ১১৭/১৯৯৪ মামলায় ১৯৯৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া রায় ও ডিক্রি (ডিক্রি স্বাক্ষরিত হয় ৫ অক্টোবর ১৯৯৭) তাঁর বিরুদ্ধে যোগসাজশমূলক এবং তাঁর ওপর বাধ্যকর নয়।

বিচার শেষে ২০০৩ সালের ২৪ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট আদালত শফিকুল ইসলামের পক্ষে রায় ও ডিক্রি দেন। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ে লালমনিরহাটের জেলা জজ আদালতে আপিল নাম্বার ২৮/২০০৪ দায়ের করে। তবে আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব হওয়ায় তামাদি আইন, ১৯০৮-এর ৫ ধারায় বিলম্ব মওকুফের আবেদন করা হয়।

জেলা জজ ২০০৪ সালের ১ আগস্ট আবেদনটি খারিজ করেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট আবেদনপত্র, নিম্ন আদালতের নথি এবং বিলম্ব মওকুফের আবেদন পর্যালোচনা করে দেখতে পান, জেলা জজ বিলম্বের কারণ যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই আবেদনটি খারিজ করেছিলেন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে আদালতকে জানায়, রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আইন উপদেষ্টার মতামত নেওয়া, প্রয়োজনীয় ব্যয় বরাদ্দ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং আইনজীবীর মাধ্যমে আপিলের স্মারকলিপি ও বিলম্ব মওকুফের আবেদন প্রস্তুত করতে সময় লেগেছিল। এসব দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার কারণেই ১৬৮ দিনের বিলম্ব ঘটে।

আদালতের মতে, একটি সরকারি সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিলম্বের ব্যাখ্যা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। হাইকোর্টের কাছে বাংলাদেশ রেলওয়ের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক মনে হয়েছে এবং তা তামাদি আইনের ৫ ধারায় বর্ণিত ‘যথেষ্ট কারণ’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে।

পূর্ববর্তী নজিরের আলোকে সিদ্ধান্ত

আদালত বাংলাদেশ বনাম জাহেরউদ্দিন, ১৯৮৬ বিএলডি (এডি) ১৮০ মামলায় আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেন। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, সরকার কোনো বিশেষ সুবিধা ভোগ করে না; তবে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন ধাপের কারণে যথাযথ পরিস্থিতিতে বিলম্ব বিবেচনার সুযোগ থাকতে পারে। সরকার ও সাধারণ মামলাকারীর ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড একই থাকবে।

এ ছাড়া সরকার বনাম আলাউদ্দিন, ৬ বিএলসি (এডি) ১০১ মামলার নীতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের কালেক্টর, ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন, আনান্টনাগ বনাম মিসেস কাটিজি, এআইআর ১৯৮৭ এসসি ১৩৫৩ মামলায় গৃহীত উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের ৫৯ ডিএলআর (এডি) ১ মামলায় অনুমোদিত নীতিগুলোর প্রতিও আদালত গুরুত্ব দেন।

এসব নজিরের আলোকে আদালত বলেন, বিলম্ব মওকুফের ক্ষেত্রে যান্ত্রিক বা অতিরিক্ত কারিগরি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত নয়। বিলম্বের পেছনে যথেষ্ট কারণ থাকলে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন হলে মামলাটি মেরিটস বা প্রকৃত গুণাগুণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া উচিত।

আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট মনে করেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিলম্বের ব্যাখ্যা যথেষ্ট ছিল এবং জেলা জজ আইন ও মামলার পরিস্থিতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই হাইকোর্ট রুল মঞ্জুর করে জেলা জজের ২০০৪ সালের ১ আগস্টের আদেশ বাতিল করেন এবং আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মওকুফ করেন।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আপিল আদালতকে সব পক্ষকে অবহিত করে দ্রুত আইন অনুযায়ী আপিলটি নিষ্পত্তির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, আপিলটি ২০০৪ সালে দায়ের করা হয়েছিল। মামলায় খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি এবং পূর্বে দেওয়া অন্তর্বর্তী আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

আইনি শিক্ষা

এই রায় থেকে প্রতীয়মান হয়, তামাদি আইনের ৫ ধারায় বিলম্ব মওকুফের আবেদন বিবেচনার সময় বিলম্বের কারণ ও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। সরকারি সংস্থার দাপ্তরিক প্রক্রিয়া বিলম্বের ব্যাখ্যার অংশ হতে পারে, তবে কেবল সরকারি সংস্থা হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলম্ব মওকুফের অধিকার সৃষ্টি হয় না।

বিলম্বের যথেষ্ট কারণ প্রতিষ্ঠিত হলে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন হলে আপিলের গুণাগুণ বিবেচনার সুযোগ দেওয়াই আদালতের দায়িত্ব। তবে প্রতিটি মামলায় বিলম্বের ব্যাখ্যা নিজস্ব তথ্য ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।

বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম


৩০ বছরের বেশি পুরোনো দলিলের সত্যতা প্রমাণে সাক্ষী ছাড়াই আইনগত অনুমান প্রযোজ্য: হাইকোর্ট

৩০ বছরের বেশি পুরোনো দলিলের সত্যতা প্রমাণে সাক্ষী ছাড়াই আইনগত অনুমান প্রযোজ্য: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
৩০ বছরের বেশি পুরোনো কোনো দলিল যথাযথ হেফাজত থেকে আদালতে উপস্থাপন করা হলে সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারার অধীনে তার সম্পাদন ও সত্যতা সম্পর্কে আইনগত অনুমান করা যায়। এমন ক্ষেত্রে দলিলের সাক্ষীদের আলাদাভাবে হাজির করে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পাদন প্রমাণের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, ১০০ টাকার কম মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয়মূল্য হলে তৎকালীন আইনের অধীনে নিবন্ধন ছাড়াও দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে বিক্রয় সম্পন্ন হতে পারে।

-এর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ আবদুল আওয়াল ও বিচারপতি এ কে এম রাবিউল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ফার্স্ট আপিল নং- ৭২১/২০১৮ মামলার রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। রায়টি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঘোষণা করা হয়। মামলাটি ছিল আবদুল রেজ্জাক ভূঁইয়া এবং অন্যান্য বনাম আবদুল হোসাইন খান অ্যান্ড আদার্স। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয় ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার ঘটনা

মামলার বিরোধীয় জমি মুন্সিগঞ্জের একটি মৌজায় সি.এস. খতিয়ান নম্বর ৭৭-এর সি.এস. দাগ নম্বর ১২৪৬-এর ২১ শতাংশ জমি। বাদীদের দাবি ছিল, জমিটির মূল মালিক ছিলেন ইসব খাঁ। তাঁর মৃত্যুর পর দুই ছেলে ও এক মেয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে জমিটি পান এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের উত্তরসূরিরা মালিকানা অর্জন করেন। কিন্তু বিভিন্ন জরিপে তাঁদের কয়েকজনের নাম বাদ পড়ে যাওয়ায় তাঁরা স্বত্ব ঘোষণার জন্য মামলা করেন।

অন্যদিকে বিবাদীদের দাবি, ইসব খাঁ ১৯১৮ সালে ৮৫ টাকা মূল্যে ২১ শতাংশ জমি আমির ভূঁইয়া ওরফে ফেলু ভূঁইয়ার কাছে বিক্রি করেন এবং তাঁকে দখলও বুঝিয়ে দেন। পরবর্তীতে ওই জমি নিয়ে ১৯২০ সালের বন্ধকী দলিল এবং ১৯২৬ সালের কবুলিয়ত দলিল সম্পাদিত হয়। বিবাদীদের পূর্বসূরিদের নামে এসএ ও আরএস খতিয়ানও প্রকাশিত হয়।

বাদীরা ১৯১৮ সালের বিক্রয় দলিলটিকে জাল ও বানোয়াট দাবি করেন। কিন্তু বিবাদীরা দীর্ঘদিনের দখল, পুরোনো দলিল এবং সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে নিজেদের মালিকানা দাবি করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট দেখতে পান, বিবাদীরা ১৯২৪ সালের একটি নিবন্ধিত হেবা-বিল-এওয়াজ দলিলসহ ১৯১৮, ১৯২০ ও ১৯২৬ সালের একাধিক পুরোনো দলিল আদালতে উপস্থাপন করেছেন। ১৯২৪ সালের দলিল থেকে দেখা যায়, ইসব খাঁর ছেলে আবদুল আজিজ তাঁর পিতার জীবদ্দশাতেই মারা যান। ফলে তৎকালীন প্রযোজ্য মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের অধীনে আবদুল আজিজের ছেলে জুলমত খাঁ সরাসরি দাদার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে অংশ পাওয়ার অধিকারী ছিলেন না।

আদালত আরও বলেন, ১৯১৮ সালের দলিলে জমির মূল্য ৮৫ টাকা দেখানো হয়েছে, যা তৎকালীন ১০০ টাকার নিবন্ধনসীমার নিচে ছিল। দলিলের মাধ্যমে দখল হস্তান্তরও হয়েছিল। তাই তৎকালীন সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ৫৪ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধন ছাড়াও দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে বিক্রয়টি আইনগতভাবে সম্পন্ন হতে পারে।

সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারার প্রয়োগ

রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৯০ ধারা নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যা। হাইকোর্ট বলেন, ৩০ বছরের বেশি পুরোনো কোনো দলিল যথাযথ হেফাজত থেকে আদালতে উপস্থাপন করা হলে দলিলটির সম্পাদন ও সত্যতা সম্পর্কে আদালত আইনগত অনুমান করতে পারেন। ফলে এ ধরনের পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে সম্পাদন প্রমাণের জন্য দলিলের সাক্ষীদের আনুষ্ঠানিকভাবে হাজির করা আবশ্যক নয়।

আদালত অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার (রেভিনিউ) বনাম মো. রিয়াজউদ্দিন পিকে অ্যান্ড আদার্স, ৫ বিএলসি (এডি) ৭৬ মামলার নীতিও উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, যথাযথ হেফাজত থেকে ৩০ বছরের বেশি পুরোনো দলিল উপস্থাপন করা হলে সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারায় তার সত্যতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়।

এ মামলায় ১৯২০ ও ১৯২৬ সালের দলিলগুলো সরকারি রেজিস্ট্রেশন ভলিউম বা বালাম বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। আদালত বলেন, শতবর্ষের কাছাকাছি পুরোনো দলিলে তারিখ বা বাংলা-ইংরেজি তারিখের সামান্য অসঙ্গতি থাকলেই সেটিকে জাল বলা যায় না। এমন সামান্য ত্রুটি সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারার আইনগত অনুমানকে খণ্ডন করে না।

শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা গ্রহণযোগ্য নয়

হাইকোর্ট আরও বলেন, বাদীরা যদি জমির দখলে না থাকেন এবং দখল পুনরুদ্ধারের মতো পরবর্তী প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা করা যায় না। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন , ১৮৭৭-এর ৪২ ধারার প্রোভাইসো অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরবর্তী প্রতিকার না চাওয়া হলে এমন মামলা আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।

আদালতের মতে, বাদীরা দীর্ঘ সময় ধরে জমির দখলের বাইরে ছিলেন এবং প্রায় ৯০ বছর পর ২০০৯ সালে ১৯১৮ ও ১৯২০ সালের লেনদেনকে চ্যালেঞ্জ করেন। অথচ দখল পুনরুদ্ধারের কোনো প্রতিকার চাননি। এ কারণে মামলাটি শুধু এ কারণেও আইনগতভাবে টেকসই ছিল না।

রায়

সবশেষে হাইকোর্ট বলেন, বিচারিক আদালত মামলার তথ্য, পরিস্থিতি ও প্রমাণ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং আইনগতভাবে টেকসই নয় এমন ডিক্রি দিয়েছেন। ফলে ফার্স্ট আপিল নং- ৭২১/২০১৮ মঞ্জুর করা হয়।

এর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ, প্রথম আদালতের টাইটেল স্যুট নং- ১৮৭/২০০৯ মামলায় ৮ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করা হয়েছে। আপিলটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিত্তিতে ১–১৪ নম্বর বিবাদীর বিরুদ্ধে এবং অন্যদের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে মঞ্জুর করা হয়।

বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম

অর্থঋণ মামলায় একতরফা ডিক্রি বাতিলের জন্য ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন ও ১৫ দিনের মধ্যে ১০ শতাংশ জমা বাধ্যতামূলক: হাইকোর্ট

অর্থঋণ মামলায় একতরফা ডিক্রি বাতিলের জন্য ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন ও ১৫ দিনের মধ্যে ১০ শতাংশ জমা বাধ্যতামূলক: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
অর্থঋণ আদালতের একতরফা ডিক্রি বাতিলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করা এবং আবেদনের পর ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেছেন, অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারার শর্ত পরস্পর সম্পূরক। ফলে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন এবং পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা—দুই শর্তের যেকোনো একটি পূরণ না হলে আদালতের ওই আবেদন গ্রহণ করে একতরফা ডিক্রি বাতিল করার এখতিয়ার নেই।

মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ও বিচারপতি উর্মী রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ সিভিল রিভিশন নং- ৪১৬১/২০১৬ মামলায় ৩০ আগস্ট ২০২৬ এ রায় দেন। মামলাটি ছিল মো. মনির চৌধুরী বনাম প্রতিপক্ষ ছিল উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড ২০১৫ সালে ঢাকার চতুর্থ অর্থ ঋণ আদালতে অর্থ ঋণ মামলা দায়ের করে। ব্যাংকের দাবি ছিল, বিবাদী ব্যাংক থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে জমি বন্ধক রেখেছিলেন। ঋণ পরিশোধ না করায় সুদসহ ২৩ মার্চ ২০১৫ পর্যন্ত মোট ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ০.১৯ টাকা পাওনা হয়।

মামলায় বিবাদী পক্ষ লিখিত জবাব দাখিল করলেও পরবর্তী সময়ে অনুপস্থিত থাকায় অর্থ ঋণ আদালত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ একতরফা ডিক্রি দেন। এর বিরুদ্ধে বিবাদী ৩০ মে ২০১৬ অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(২) ধারায় একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন করেন এবং ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১০ শতাংশ অর্থ জমা না দেওয়ায় আদালত আবেদনটি খারিজ করেন। পরে জেলা জজ, ঢাকা-র কাছে করা মিস আপিলও খারিজ হয়। জেলা জজ উল্লেখ করেন, আবেদনকারী মিস মামলায় কিংবা আপিলেও ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দেননি।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে বলেন, একতরফা ডিক্রি হলে বিবাদী ডিক্রির তারিখ অথবা ডিক্রি সম্পর্কে অবগত হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তা বাতিলের আবেদন করতে পারবেন। এরপর আবেদন করার তারিখের পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ নির্ধারিত পদ্ধতিতে জমা দিতে হবে।

আদালত দেখতে পান, এ মামলায় ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ একতরফা ডিক্রি হলেও আবেদনকারী ৩০ মে ২০১৬ আবেদন করেন। অর্থাৎ আইন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই আবেদন করা হয়নি। উপরন্তু, আবেদনকারী ১০ শতাংশ ডিক্রিকৃত অর্থও নির্ধারিত সময়ে জমা দেননি।

আদালত আরও বলেন, অর্থ ঋণ আদালত আইন একটি বিশেষ আইন। এই আইনে একতরফা ডিক্রি বাতিলের জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তাই নির্ধারিত সময় অতিক্রম করার পর আদালতের নির্দেশে ১০ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে একতরফা ডিক্রি বাতিলের সুযোগ নেই।

হাইকোর্ট এর আগে দেওয়া পুবালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম বাংলাদেশ এবং অন্যান্য মামলার সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বলেন, ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারার বিধান একসঙ্গে পড়তে হবে এবং উভয় শর্তই পূরণ করতে হবে। একইভাবে ওসমান গাজী চৌধুরী বনাম অর্থ ঋণ আদালত এবং প্রাইম গ্লোবাল লিমিটেড এবং অন্যান্য বনাম সোনালী ব্যাংক লিমিটেড এবং অন্যান্য মামলার সিদ্ধান্তেও নির্ধারিত সময় ও ১০ শতাংশ অর্থ জমার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

রায়ের আদেশ

হাইকোর্ট আবেদনকারীর দাখিল করা রুল খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করা হয়। আদালত অর্থ ঋণ আদালতকে ২০১৬ সালে দায়ের করা এক্সিকিউশন মামলা আর কোনো বিলম্ব ছাড়াই এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেন।

আইনি শিক্ষা

অর্থ ঋণ আদালতে একতরফা ডিক্রি বাতিল করতে হলে শুধু আবেদন করাই যথেষ্ট নয়। ডিক্রির তারিখ বা ডিক্রি সম্পর্কে জানার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন এবং আবেদনের পর ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা—উভয় শর্তই পালন করতে হবে। বিশেষ আইনে নির্ধারিত এই শর্ত অতিক্রম করে আদালত সাধারণ ক্ষমতাবলে একতরফা ডিক্রি বাতিল করতে পারে না।

বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম

সংসদের সামনে ছিনতাইয়ের ঘটনায় শিক্ষিকার মৃত্যু: মোটরসাইকেল মালিক রাকিবের জামিন

সংসদের সামনে ছিনতাইয়ের ঘটনায় শিক্ষিকার মৃত্যু: মোটরসাইকেল মালিক রাকিবের জামিন

ছবি: সংগৃহীত 
রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে বগুড়ার প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় মো. রাকিব হোসেন (২৪) নামে এক আসামির জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত।
গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা কর ‘দ্রুত আদায়ের’ নির্দেশ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ

গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা কর ‘দ্রুত আদায়ের’ নির্দেশ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ

কোলাজ ছবি 

ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে পাঁচ করবর্ষের বকেয়া ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি কর দ্রুত আদায়ের বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশের ওই অংশ স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

রোববার (১৮ অক্টোবর) আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের আদালত এ আদেশ দেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি কর পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে গ্রামীণ কল্যাণ। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের ‘দ্রুত আদায়ের’ নির্দেশনা স্থগিত করেন আপিল বিভাগ।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

এর আগে গত ১২ অক্টোবর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে পাঁচ করবর্ষের বকেয়া ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি কর আদায়ে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। করদাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটির করা পৃথক দুটি রিট খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।

ওই দিন সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায় দুটি প্রকাশ করা হয়। এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করে রায় দেন।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

সূত্র: ইত্তেফাক ডিজিটাল রিপোর্ট