 |
| ৩০ বছরের বেশি পুরোনো নিবন্ধিত দলিলের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারায় আইনগত অনুমান প্রযোজ্য; উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া শুধু মৌখিক সাক্ষ্যে দলিল অস্বীকার করা যাবে না |
পুরোনো নিবন্ধিত দলিলের ক্ষেত্রে আইনগত অনুমান প্রযোজ্য হওয়ায় শুধু মৌখিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ওই দলিলকে অস্বীকার করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ৩০ বছরের বেশি পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৯০ ধারার অধীনে দলিলটি যথাযথভাবে সম্পাদিত হয়েছে—এমন একটি অনুমান তৈরি হয়। তবে উপযুক্ত প্রমাণের মাধ্যমে এই অনুমান খণ্ডন করা সম্ভব।
মামলাটি নুরুল হক ওরফে নূর মোহাম্মদ হাওলাদার বনাম মুন্সী মো. ইসহাক আলী হাওলাদার ও অন্যান্য। সিভিল রিভিশন নং ১৭৭৯/২০০১-এর এ মামলায় বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী রায় দেন। মামলার শুনানি হয় ২১, ২২ ও ২৩ জুন ২০২৬ এবং রায় ঘোষণা করা হয় ১৯ জুলাই ২০২৬। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে।
মামলার বিরোধের সূত্রপাত
পটুয়াখালীর সদর উপজেলার লোহালিয়া মৌজার ৭১১ ও ৭১২ নম্বর এসএ খতিয়ানের জমি নিয়ে এ বিরোধের সৃষ্টি হয়। বাদীপক্ষের দাবি ছিল, তারা বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে মোট ৯৬ শতাংশ জমির স্বত্ব ও দখল অর্জন করেন। এর মধ্যে ১৯৯৩ সালের একটি দলিলের মাধ্যমে এসএ রেকর্ডভুক্ত ব্যক্তি সোবহানের কাছ থেকে ৪৬ শতাংশ এবং ১৯৭৫ সালের দলিলের মাধ্যমে লালবরু বিবির কাছ থেকে আরও ৫০ শতাংশ জমি কেনার দাবি করা হয়। পরে তাদের নামে নামজারিও করা হয়।
অন্যদিকে, বিবাদীপক্ষের দাবি ছিল, তারা ১৯৫৮ সালের ১৩ মে সোবহান ও হাকিম আলীর কাছ থেকে দুটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে যথাক্রমে ৩৪ শতাংশ ও ১৩ শতাংশ জমি কিনেছেন এবং ক্রয়ের পর থেকে জমির দখলে থেকে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে আসছেন।
বাদীপক্ষ ১৯৫৮ সালের ৪৫৫৪ ও ৪৫৫৫ নম্বর দলিলকে জাল, অবৈধ ও তাদের ওপর অপ্রযোজ্য দাবি করে এবং সংশ্লিষ্ট খতিয়ান বাতিলেরও আবেদন করে মামলা দায়ের করেন। তবে বিচারিক আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। আদালতের মতে, বাদী স্বত্ব ঘোষণার যথাযথ প্রার্থনা করেননি এবং বিতর্কিত দলিল দুটি বাতিলের জন্যও প্রয়োজনীয় প্রতিকার চাননি।
১৯৫৮ সালের দলিল নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট দেখতে পান, বাদীপক্ষ ১৯৫৮ সালের দলিল দুটির সম্পাদন ও নিবন্ধন সরাসরি অস্বীকার করে কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আরজিতে দেয়নি এবং দলিল দুটি বাতিলের জন্যও কোনো প্রতিকার প্রার্থনা করেনি। এ কারণে আদালত দলিল দুটি সোবহান ও হাকিম আলীর মাধ্যমে বিবাদীদের পক্ষে সম্পাদিত ও নিবন্ধিত হয়েছিল বলে ধরে নেন।
আদালত বলেন, নিবন্ধন আইনের ৬০ ধারার অধীনে নিবন্ধনের সনদ দেওয়া হলে দলিলটি আইনের বিধান অনুযায়ী যথাযথভাবে নিবন্ধিত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হয়। অবশ্য এই অনুমান খণ্ডনযোগ্য। কোনো পক্ষ দলিলের সম্পাদন বা নিবন্ধন নিয়ে আপত্তি করলে উপযুক্ত প্রমাণের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে।
এ মামলায় ১৯৫৮ সালের দলিল দুটি ৩০ বছরের বেশি পুরোনো হওয়ায় সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৯০ ধারার সুবিধা পাবে বলেও হাইকোর্ট উল্লেখ করেন। আদালতের মতে, উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে বিপরীত কিছু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ধরে নেওয়া হবে যে দলিল দুটি সোবহান ও হাকিম আলী যথাযথভাবে সম্পাদন করেছিলেন।
হাইকোর্ট আরও বলেন, বাদীপক্ষ দলিলের টিপসই নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট টিপসই রেজিস্টারের সঙ্গে তুলনা করে বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে শুধু মৌখিক বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরোনো নিবন্ধিত দলিলের বৈধতা নাকচ করার সুযোগ নেই।
মৌখিক সাক্ষ্যের চেয়ে দলিলগত প্রমাণের গুরুত্ব
আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, দলিলগত প্রমাণ সাধারণত মৌখিক সাক্ষ্যের ওপর প্রাধান্য পায়। এ মামলায় সোবহান হাওলাদার আদালতে ১৯৫৮ সালের দলিল দুটি সম্পাদনের কথা অস্বীকার করলেও, সেই অস্বীকারের পক্ষে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে তার মৌখিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নিবন্ধিত দলিল দুটিকে অকার্যকর ঘোষণা করা যায় না।
পরবর্তী দলিলে স্বত্ব সৃষ্টি হয়নি
হাইকোর্টের মতে, ১৯৫৮ সালের দলিলের মাধ্যমে বিবাদীদের পক্ষে জমির স্বত্ব হস্তান্তরিত হয়ে যাওয়ার পর একই জমি নিয়ে ১৯৯৩ সালে সোবহানের করা পরবর্তী দলিলের মাধ্যমে বাদীপক্ষের অনুকূলে নতুন করে কোনো স্বত্ব সৃষ্টি হয়নি। কারণ, আগেই জমি হস্তান্তর হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে একই বিক্রেতার করা দলিলের মাধ্যমে পুনরায় স্বত্ব হস্তান্তর সম্ভব নয়।
আদালত আরও বলেন, বাদীপক্ষের নামে প্রস্তুত রেকর্ড পরবর্তীতে বাতিল হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে তাদের প্রথমে নিজের স্বত্ব ঘোষণার জন্য আদালতের কাছে প্রতিকার চাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা তা না করে শুধু ১৯৫৮ সালের দলিল দুটি তাদের ওপর অপ্রযোজ্য ঘোষণার আবেদন করেছে। ফলে মামলাটি তার বর্তমান কাঠামোয় আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
সবশেষে হাইকোর্ট বলেন, ১৯৫৮ সালের দলিল দুটির মাধ্যমে বিবাদীদের অনুকূলে জমির স্বত্ব হস্তান্তরিত হয়েছিল এবং পরবর্তী ১৯৯৩ সালের দলিলের মাধ্যমে বাদীপক্ষের কোনো স্বত্ব অর্জিত হয়নি। নিম্ন আদালতগুলো সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত দিয়েছে এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রমাণ ভুলভাবে পড়া বা বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
এ কারণে হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া স্ট্যাটাস কো-এর অন্তর্বর্তী আদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং মামলায় কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।
বিডিলপোস্ট/মাসুম