সর্বশেষ

২১ অক্টো, ২০২৬

স্বত্বের গ্রহণযোগ্য ভিত্তি (prima facie case) ছাড়া জমির মালিকানা দাবির মামলায় 'অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা' নয়: হাইকোর্ট

স্বত্বের গ্রহণযোগ্য ভিত্তি (prima facie case) ছাড়া জমির মালিকানা দাবির মামলায় 'অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা' নয়: হাইকোর্ট

"প্রাসঙ্গিক আইন: দেওয়ানি কার্যবিধির অর্ডার ৩৯, রুল ১ ও ২; অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১-এর ৭ ও ১৩ ধারা | মামলার নাম: মো. ইসহাক আলী (মৃত), তাঁর আইনগত উত্তরাধিকারী মো. মইনুল হক ও অন্যান্য বনাম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য | মামলা নম্বর: সিভিল রিভিশন নং ৩৭৭৪/২০১৩ | রায় প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬"
জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পেতে হলে বাদীকে তাঁর স্বত্বের দাবির পক্ষে প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কেবল জমির দখল, দলিল বা নামজারির দাবি করলেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার অধিকার সৃষ্টি হয় না। স্বত্বের দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রাথমিক প্রমাণ উপস্থাপনে ব্যর্থ হলে আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিতে বাধ্য নন বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সম্প্রতি বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের একক বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া রায়ে আদালত বাদীপক্ষের দায়ের করা রিভিশনের রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানান।

মামলার পটভূমি

মামলাটির সূত্রপাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ এলাকার একটি জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থেকে। বাদীপক্ষের দাবি, ১৯৪৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি একটি দলিলের মাধ্যমে তাঁরা জমিটি ক্রয় করেন এবং পরবর্তী সময়ে জমির দখল ভোগ করতে থাকেন। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে ভুলভাবে অন্যদের নাম রেকর্ড করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালে দায়ের করা একটি স্বত্ব মামলায় ডিক্রি পাওয়ার ভিত্তিতেও তাঁরা জমির ওপর নিজেদের অধিকার দাবি করেন।

বাদীপক্ষ আরও দাবি করে, তাঁদের নামজারি বাতিল করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ জমিটি তৃতীয় পক্ষের কাছে ইজারা দেয়। এ পরিস্থিতিতে তাঁরা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা দায়েরের পাশাপাশি দেওয়ানি কার্যবিধির অর্ডার ৩৯, রুল ১ ও ২ অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন।

অন্যদিকে, সরকারি বিবাদীপক্ষের দাবি, জমিটি অর্পিত ও অনাবাসী সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠায় বাদীপক্ষের উপস্থাপিত দলিল ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলে।

নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত

বিচারিক আদালত প্রথমে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিলেও উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে তা প্রত্যাহার করেন। পরে বাদীপক্ষের আপিল আংশিক মঞ্জুর করে ১৪ আগস্ট ২০১৩ তারিখে অতিরিক্ত জেলা জজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ মামলাটি ফেরত পাঠান। জমিটি অর্পিত সম্পত্তিসংক্রান্ত আইনের আওতায় পড়লে মূল মামলাটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, তা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, বাদীপক্ষের স্বত্বের দাবির অন্যতম ভিত্তি ছিল ১৯৪৪ সালের একটি অনিবন্ধিত দলিল। এ ছাড়া ১৯৭৭ সালের স্বত্ব মামলার রায় ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও গুরুতর সন্দেহ ছিল। সংশ্লিষ্ট মামলার রেজিস্টারের সঙ্গে উপস্থাপিত রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপির সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বাদীপক্ষ জমির নামজারি সংশোধন এবং সংশোধিত এসএ খতিয়ানের কথা বললেও সংশ্লিষ্ট সংশোধিত খতিয়ান বা নামজারি খতিয়ান আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি। ফলে জমির ওপর তাঁদের স্বত্বের প্রাথমিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

হাইকোর্টের মতে, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মতো অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকার দেওয়ার আগে বাদীর প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য মামলা (prima facie case) রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মূল মামলাটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, সেই প্রশ্নও নিষেধাজ্ঞার আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

আদালত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১-এর ৭ ও ১৩ ধারার বিধানও আলোচনা করেন। তবে মূল মামলাটি আইনত গ্রহণযোগ্য কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় আরজি হাইকোর্টে সংযুক্ত না থাকায় আদালত নিজে বিষয়টি পরীক্ষা করতে পারেননি।

রিভিশন খারিজ

হাইকোর্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, বাদীপক্ষ নিম্ন আদালতে তাঁদের দাবির পক্ষে প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিম্ন আদালতগুলোর সিদ্ধান্তে আইনগত কোনো ত্রুটি দেখাতে না পারায় সেসব সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

ফলে আদালত সিভিল রিভিশন নং ৩৭৭৪/২০১৩-এর রুল খারিজ করেন এবং পূর্বে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতকে অপ্রয়োজনীয় মুলতবি এড়িয়ে যত দ্রুত সম্ভব মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন, যদি এরই মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি না হয়ে থাকে।

মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক

এ রায়ের তাৎপর্য হলো, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রতিকার নয়। আবেদনকারীকে তাঁর দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রাথমিক ভিত্তি দেখাতে হবে। দলিল, পূর্ববর্তী ডিক্রি, খতিয়ান ও নামজারির মতো নথির সত্যতা বা সামঞ্জস্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থাকলে তা নিষেধাজ্ঞার আবেদন বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: হাইকোর্ট বিভাগের রায়, সিভিল রিভিশন নং ৩৭৭৪/২০১৩।


মামলার "পরবর্তী তারিখ": যে অন্যায়কে আমরা নিয়তি ভেবে নিয়েছি

মামলার "পরবর্তী তারিখ": যে অন্যায়কে আমরা নিয়তি ভেবে নিয়েছি

আদালত চত্বরের একটা পরিচিত দৃশ্য আছে। ভোর থেকে গ্রামের মানুষ বাস ধরে জেলা শহরে আসেন। হাতে ভাঁজ করা কাগজের বান্ডিল, চোখে অনিশ্চয়তা। সারা দিন গাছতলায় বা বারান্দায় অপেক্ষা করেন। বিকেলে কেউ এসে বলেন, "আজও হয়নি, পরের তারিখ পড়েছে।" মানুষটি কিছু না বলে ফিরে যান। সামনের মাসে আবার আসবেন।

এই দৃশ্য এত পরিচিত যে আমরা এটাকে অন্যায় বলে ভাবি না। বলি, "মামলার তো এমনই হয়।" আমাদের প্রবাদও তা-ই বলে: মামলা মানে তারিখ আর তারিখ মানে হয়রানি। কিন্তু একটা অন্যায় দীর্ঘদিন চললে সেটা নিয়ম হয়ে যায় না। শুধু প্রশ্ন করার অভ্যাসটা মরে যায়।

সংবিধান কী বলে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিচার ঝুলে থাকলে সেটা দয়া বা সুবিধার বিষয় থাকে না, সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আইনের জগতে একটা বহুল প্রচলিত কথা আছে: বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার অস্বীকার করা। আমরা কথাটা মুখস্থ জানি, কিন্তু নিজের দেশের বাস্তবতায় তার অর্থ ভেবে দেখি না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন আদালতে ৪০ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। প্রতিটি মামলার পেছনে অন্তত দুটি পক্ষ, একাধিক পরিবার, কিছু সাক্ষী আর অনেক অপেক্ষার গল্প। সংখ্যাটা কাগজে একটা পরিসংখ্যান, কিন্তু বাস্তবে এটা লাখ লাখ মানুষের জীবন।

তারিখের ভেতরের হিসাব

একটা উদাহরণ ধরা যাক। এক কৃষক তাঁর বাবার রেখে যাওয়া জমি নিয়ে ভাইদের সঙ্গে দেওয়ানি মামলায় জড়ালেন। মামলার সময় তাঁর বয়স চল্লিশ। প্রতি তারিখে যাতায়াত, খাওয়া, উকিলের মুহুরির খরচ আছে, আর সেদিনের কাজ বাদ পড়ে। কখনো বিচারক ছুটিতে, কখনো প্রতিপক্ষের উকিল সময় চেয়েছেন, কখনো সমন ঠিকমতো পৌঁছায়নি, কখনো সাক্ষী আসেননি। প্রতিবারই "পরবর্তী তারিখ"। এভাবে বছর যায়, দশক যায়। শেষ পর্যন্ত রায় আসে ঠিকই, কিন্তু তত দিনে হয়তো মামলার কারণ হওয়া জমির মূল্য মামলার খরচের চেয়ে কম, অথবা মামলাকারী আর বেঁচে নেই। তখন সেই রায় আর ন্যায়বিচার থাকে না, একটা কাগজ হয়ে থাকে।

ফৌজদারি মামলায় ব্যাপারটা আরও নির্মম। অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ হলেও বছরের পর বছর মামলার বোঝা টানেন। চাকরি হারান, সমাজে মুখ দেখাতে পারেন না, পরিবার আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে বাদী বা ভুক্তভোগী, বিশেষ করে নারী বা দরিদ্র মানুষ, ধীরে ধীরে হাল ছেড়ে দেন। অনেক সময় প্রভাবশালী পক্ষের চাপে বা ক্লান্তিতে আপস করেন। দীর্ঘসূত্রতার এই ফাঁকটা তাই সবসময় ক্ষমতাবানদের পক্ষে কাজ করে। যাঁর টাকা আছে, তিনি অপেক্ষা করতে পারেন। যাঁর নেই, তিনি হেরে যান, রায়ের আগেই।

 কেন এমন হয়

কারণগুলো নতুন কিছু নয়, কিন্তু আলোচনা কম।

প্রথমত, বিচারকের সংখ্যা মামলার তুলনায় কম। একজন বিচারককে প্রতিদিন যতগুলো মামলা শুনতে হয়, তাতে প্রতিটির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত, সময় চেয়ে আবেদন করার সংস্কৃতি। দেওয়ানি কার্যবিধির নিয়মে একটি পক্ষ সাধারণত সীমিত সংখ্যকবারই মুলতবি চাইতে পারেন। বাস্তবে "অসুস্থতা", "কাগজ প্রস্তুত নয়" বা "সাক্ষী অনুপস্থিত"-এর মতো কারণ দেখিয়ে মুলতবি চাওয়া এতটাই সাধারণ যে সেটাকে প্রায় অধিকার মনে করা হয়। আদালতও অনেক সময় নমনীয় থাকে।

তৃতীয়ত, সমন জারি ও সাক্ষী হাজির করার দুর্বল ব্যবস্থা। একটা সমন ঠিকানায় পৌঁছাতে কত মাস লাগে, সেটা যাঁরা মামলা করেছেন তাঁরাই জানেন।

চতুর্থত, ফৌজদারি মামলায় তদন্ত ও প্রতিবেদন জমা দিতে বিলম্ব।

পঞ্চমত, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার সীমিত ব্যবহার। আইনে মধ্যস্থতার সুযোগ আছে, গ্রাম আদালতের মতো স্থানীয় ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু অনেকে জানেনই না যে এসব পথ খোলা আছে। অনেক ক্ষেত্রে জানলেও আদালতেই যেতে চান, কারণ "কোর্টের রায়"-এর প্রতি একটা সামাজিক মর্যাদা কাজ করে।

আমরা প্রশ্ন করি না কেন?

এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাটা এত পুরোনো ও এত ব্যাপক যে মানুষ একে প্রাকৃতিক নিয়মের মতো মেনে নিয়েছে। বৃষ্টি হলে ভিজতে হয়, মামলা করলে ঘুরতে হয়।

এর আরেকটা কারণ ভয়। আদালতের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাধারণ মানুষ ভয় পান, কারণ তাঁর মামলাটাই তো ওই আদালতে ঝুলছে। উকিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে পরের তারিখে কী হয়, সে চিন্তাও আছে। ফলে যিনি সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, তিনিই সবচেয়ে বেশি চুপ থাকেন।

তৃতীয় কারণ আইনি সচেতনতার অভাব। অধিকাংশ মানুষ জানেন না, দ্রুত বিচার তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। তিনি জানেন না, অকারণ মুলতবির বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো যায়। তিনি জানেন না, উকিলের কাছে মামলার অগ্রগতির হিসাব চাওয়া তাঁর ন্যায্য দাবি। আইনকে আমরা দেখি "উকিল-মোক্তারের বিষয়" হিসেবে, নিজের জীবনের বিষয় হিসেবে নয়।

কী করা যায়?

সমাধান একটা জাদুকরী সংস্কারে নেই, কিন্তু কিছু পথ স্পষ্ট।

বিচারক নিয়োগ বাড়ানো এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। মামলার ধরন অনুযায়ী সময়সীমা নির্ধারণ এবং অকারণ মুলতবি নিরুৎসাহিত করার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। যেখানে নিয়ম আছে, সেখানে নিয়ম মানাটাই আগে আসে।

প্রযুক্তির ব্যবহারও কাজে আসবে। ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, অনলাইনে মামলার অবস্থা জানার সুযোগ এবং ইলেকট্রনিক সমন জারি অনেক অপচয় কমাতে পারে। এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সারা দেশে ও সব স্তরে কতটা কার্যকর, তা নিয়মিত নজরদারির দাবি রাখে।

মধ্যস্থতা ও সালিশের মতো বিকল্প ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে হবে। পারিবারিক বিরোধ, ছোটখাটো জমি বা লেনদেনের বিষয়ে আদালতের বাইরে দ্রুত সমাধান পেলে মামলার চাপ যেমন কমে, মানুষও অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি থেকে বাঁচেন। তবে এসব ব্যবস্থা যেন প্রভাবশালীদের হাতে অপব্যবহৃত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, নাগরিকের সচেতনতা। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে, গণমাধ্যমে, স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমে নাগরিক অধিকার ও আদালতের প্রাথমিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। মানুষ যখন জানবেন যে দ্রুত বিচার তাঁর অধিকার, তখন প্রশ্নও উঠবে।

 শেষ কথা

"পরবর্তী তারিখ" শব্দ দুটো আমাদের সমাজে এতটাই মিশে গেছে যে এটা নিয়ে ভাবাই বাহুল্য মনে হয়। অথচ এই দুটো শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া সময়, অর্থ ও আস্থা। যে রাষ্ট্র নাগরিককে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রথম শর্ত সময়মতো বিচার।

আমরা যদি এখনো প্রশ্ন না করি, তাহলে আগামী প্রজন্মও গাছতলায় বসে অপেক্ষা করবে, আর শুনবে সেই একই কথা। প্রশ্ন করা অশ্রদ্ধা নয়, নাগরিক দায়িত্ব। আদালতকে আমরা সম্মান করি বলেই তাকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে চাই। ন্যায়বিচার যেন কারও বেঁচে থাকার চেয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার নাম না হয়, এটুকু চাওয়া অন্তত আমরা করতেই পারি।

কলমে,
সুস্মিতা কর্মকার 
শিক্ষার্থী
ইউআইটিএস, আইন বিভাগ 

৬৭৮ কোটি টাকার অবৈধ স্বর্ণ ও হীরা চোরাচালান: ১ দিনের রিমান্ডে দিলীপ আগরওয়ালা

৬৭৮ কোটি টাকার অবৈধ স্বর্ণ ও হীরা চোরাচালান: ১ দিনের রিমান্ডে দিলীপ আগরওয়ালা

ছবি: সংগৃহীত 
প্রায় ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার অবৈধ স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচা এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে করা মামলায় ‘ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে এক দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলামের আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির উপপরিদর্শক মো. আশরাফুল হাসান আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য তিন দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। দুপুর ২টা ১০ মিনিটের দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দিলীপ আগরওয়ালাকে আদালতে হাজির করা হয়।

রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ৬৭৮ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগের সত্যতা যাচাই, ব্যাংক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার জন্য আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন জানায়। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক মাজহারুল ইসলাম।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গুলশান অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের কার্যালয়ে বৈধ এলসির বাইরে স্থানীয় বাজার থেকে প্রায় ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচা করা হয়েছে। এসব লেনদেনের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটি বৈধ নথিপত্র দেখাতে পারেনি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এর আগে গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে দিলীপ আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গত বছরের নভেম্বর মাসে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শেখ বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলাটি করেন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন হত্যা মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগ শেষে গত বছরের ১ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পান দিলীপ আগরওয়ালা।

সূত্র: বিডিনিউজ ২৪
বিডি ল’ পোস্ট/মাসুম

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠন স্থগিতের বিজ্ঞপ্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠন স্থগিতের বিজ্ঞপ্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট

ছবি: সংগৃহীত 
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠন কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির জারি করা বিজ্ঞপ্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ইউনুছ আলী আকন্দ হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি দায়ের করেন। রিটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে।

এর আগে গত ১৫ অক্টোবর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠন কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।

কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠনসংক্রান্ত প্রবিধানমালা, ২০২৬ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্রবিধানমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কমিটি গঠন কার্যক্রম পরিচালনা না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক, দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বেসরকারি নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমমানের প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়।

রিটে ওই বিজ্ঞপ্তি জারির আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং বিজ্ঞপ্তিটি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—সে বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


সুরতহাল প্রতিবেদন (Inquest Report): ধারণা, আইনি ভিত্তি ও গুরুত্ব

সুরতহাল প্রতিবেদন (Inquest Report): ধারণা, আইনি ভিত্তি ও গুরুত্ব

সুরতহাল প্রতিবেদন হলো অস্বাভাবিক, সন্দেহজনক বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর পর মৃতদেহের বাহ্যিক অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে পুলিশ কর্তৃক প্রস্তুত করা একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন। এতে মৃতদেহে দৃশ্যমান আঘাত, ক্ষতচিহ্ন, পরিহিত পোশাক এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়।

১. আভিধানিক অর্থ

‘সুরত’ অর্থ চেহারা বা আকৃতি এবং ‘হাল’ অর্থ অবস্থা। অর্থাৎ, সুরতহাল বলতে মৃতদেহের বাহ্যিক অবস্থার বিবরণকে বোঝায়।

২. আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৭৪ ও ১৭৫ ধারা এবং প্রযোজ্য পুলিশ রেগুলেশনস, বেঙ্গল (PRB)-এর সংশ্লিষ্ট বিধান সুরতহাল-সংক্রান্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

৩. সুরতহাল প্রতিবেদনে যা থাকে

সুরতহাল প্রতিবেদনে সাধারণত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়—

  • ঘটনার স্থান, তারিখ ও সময়;
  • মৃত ব্যক্তির পরিচয়;
  • মৃতদেহের দৃশ্যমান আঘাত, ক্ষত ও জখমের বিবরণ;
  • মৃত ব্যক্তির পরিহিত পোশাক ও পারিপার্শ্বিক আলামতের তথ্য;
  • সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের পরিচয় ও প্রাসঙ্গিক তথ্য;
  • মৃতদেহের বাহ্যিক অবস্থা সম্পর্কে পুলিশের পর্যবেক্ষণ।

৪. সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পার্থক্য

সুরতহাল প্রতিবেদন: পুলিশ মৃতদেহের বাহ্যিক অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করে।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন: চিকিৎসক মৃতদেহ পরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক মতামত প্রদান করেন।

অর্থাৎ, সুরতহাল মূলত মৃতদেহের বাহ্যিক অবস্থা ও দৃশ্যমান আলামত নথিবদ্ধ করে, আর ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়।

৫. আইনগত গুরুত্ব

অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক মৃত্যুর তদন্তে সুরতহাল প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক তথ্য ও দৃশ্যমান আলামত সংরক্ষণে সহায়তা করে। তবে এটি এককভাবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বা কোনো অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত ভিত্তি নয়।

মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সার্বিক আইনগত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক তথ্য এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও বিবেচনা করা হয়।


বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম

মাদরাসার সিলেবাসে প্রোগ্রামিং, ব্যবসায় শিক্ষা ও স্পোকেন ভাষা যুক্ত করার দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ

মাদরাসার সিলেবাসে প্রোগ্রামিং, ব্যবসায় শিক্ষা ও স্পোকেন ভাষা যুক্ত করার দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ

ছবি: সংগৃহীত 
দেশের মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে পাঠ্যক্রমে নতুন কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ইসলামিক বিজনেস ও অ্যাকাউন্টিং’, ‘কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ও প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ’ এবং ব্যবহারিক আরবি ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষা।

নোটিশে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এসব বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করার কথা জানানো হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন সোমবার (১৯ অক্টোবর ২০২৬) জনস্বার্থে এ লিগ্যাল নোটিশ পাঠান।

নোটিশের প্রাপক হিসেবে রয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগের সচিব, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান।

ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ের প্রস্তাব

নোটিশে বলা হয়েছে, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাদরাসায় পড়াশোনা করেন। তাদের বিদ্যমান ধর্মীয় শিক্ষা ও পাঠ্যক্রম অপরিবর্তিত রেখে এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা দরকার।

প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর একটি ‘ইসলামিক বিজনেস ও অ্যাকাউন্টিং’। এ বিষয়ে পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা, বিপণন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও হিসাবরক্ষণ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন।

পাশাপাশি ইসলামের নৈতিক ও বাণিজ্যিক মূল্যবোধ অনুসরণ করে ব্যবসা পরিচালনা, সঠিক ওজনে পণ্য বিক্রি, ভেজাল পরিহার এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার বিষয়েও শিক্ষা পাবেন।

নোটিশদাতার মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক ব্যবসায়িক শিক্ষার সমন্বয় ঘটলে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৎ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায়ও তা সহায়ক হতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি ও ভাষা দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ

নোটিশে বলা হয়েছে, বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনায় মাদরাসার শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ও প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ শেখানো প্রয়োজন। এ ধরনের শিক্ষা তাদের সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া আরবি ও ইংরেজি ভাষায় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আরবি ভাষায় শুধু পাঠ গ্রহণ নয়, কথোপকথন ও পেশাগত যোগাযোগে দক্ষতা অর্জন করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক ও করপোরেট খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, ইংরেজিতে যোগাযোগের দক্ষতা আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াবে।

নোটিশদাতার অভিমত, এসব বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।

শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় অনলাইন শিক্ষার প্রস্তাব

মাদরাসাগুলোতে বিশেষায়িত শিক্ষকের অভাব বিবেচনায় প্রস্তাবিত বিষয়গুলো পড়ানোর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনলাইন ক্লাস চালুর কথা বলা হয়েছে নোটিশে।

এ জন্য আইসিটি বিভাগ, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মাধ্যমে মানসম্মত ভিডিও ক্লাস তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব পাঠ সরকারি ওয়েব পোর্টাল অথবা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে।

এ ব্যবস্থায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও অনলাইনে পাঠ গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে মূল্যায়ন ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে।

সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার যুক্তি

মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য যুগোপযোগী ও সর্বজনীন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে নোটিশে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সুযোগের সমতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির প্রসঙ্গে সংবিধানের ১৯, ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের উল্লেখ রয়েছে।

নোটিশদাতার দাবি, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো হলে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে তাদের সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে।

এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে প্রস্তাবিত বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা এবং অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। অন্যথায়, শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।


সূত্র: জাগো নিউজ ২৪

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

২০ অক্টো, ২০২৬

প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে গুরুতর অসংগতি ও সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতার কারণে আসামির দণ্ড বাতিল: হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে গুরুতর অসংগতি ও সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতার কারণে আসামির দণ্ড বাতিল: হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

এজাহার দায়েরে প্রায় ৯ ঘণ্টার বিলম্বের ব্যাখ্যা দিতে না পারায় মাদক মামলায় আসামির দণ্ড বাতিল করল হাইকোর্ট
মাদক মামলায় এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে গুরুতর অসংগতি এবং এজাহার দায়েরে প্রায় নয় ঘণ্টার বিলম্বের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় আসামির দণ্ডাদেশ বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সম্প্রতি বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চ ক্রিমিনাল আপিল নম্বর ৫৭৯৫/২০২৩ — মো. মিজানুর রহমান সুমান বনাম রাষ্ট্র- এর রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট রায়টি ঘোষণা করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়।

মামলার ঘটনা:

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটের দিকে ঢাকার পল্টন থানাধীন ৫৯ নয়াপল্টনের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে আসামি মো. মিজানুর রহমান সুমনের কাছ থেকে ১০০টি এবং অপর এক আসামির কাছ থেকে ৫০টি ইয়াবা উদ্ধারের কথা বলা হয়। পরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক্স-রে কক্ষ থেকে আরও ৪৬০টি ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করা হয়। সব মিলিয়ে ৬১০টি ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে মামলা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে মামলার বিচার শেষে ঢাকার বিশেষ জজ, ৯ম আদালত ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ মো. মিজানুর রহমান সুমনকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণির ৯(ক) অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামি হাইকোর্টে আপিল করেন।

আপিলকারীর যুক্তি

আপিলকারীর আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, জব্দতালিকার সাক্ষীরা তাঁদের স্বাক্ষর সাদা বা ফাঁকা কাগজে নেওয়া হয়েছিল বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ আসামির দেহ তল্লাশি বা ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেননি। ফলে জব্দতালিকা ও উদ্ধারের বিষয়ে প্রসিকিউশনের বক্তব্য নির্ভরযোগ্য নয়।

এ ছাড়া মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের বক্তব্যে ইয়াবা উদ্ধারের স্থান, ট্যাবলেটের রং এবং এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে অসংগতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, মামলার বাদী ও র্যাব সদস্য মো. মাসুম করিম খান বিভিন্ন পর্যায়ে এজাহার দায়েরের ভিন্ন ভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন। জবানবন্দিতে একবার ঘটনাস্থলে সকাল ৫টা ৫০ মিনিটে এজাহার দায়েরের কথা বলা হয়। পরে একই রাতে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে পল্টন থানায় এজাহার দায়েরের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু জেরার সময় তিনি জানান, প্রকৃতপক্ষে এজাহার দায়ের করা হয়েছিল রাত ২টা ২৫ মিনিটে।

অভিযোগের ঘটনাটি বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে ঘটেছে বলে উল্লেখ থাকায়, এজাহার দায়েরের সময়সংক্রান্ত এই অসংগতি মামলার প্রমাণকে গুরুতরভাবে সন্দেহজনক করে তোলে। আদালত আরও উল্লেখ করেন, এজাহার দায়েরে বিলম্বের কোনো ব্যাখ্যাও প্রসিকিউশন দিতে পারেনি।

আদালতের মতে, সাক্ষীদের বক্তব্যে এ ধরনের গুরুতর অসংগতি থাকা সত্ত্বেও বিচারিক আদালত মামলার যথাযথ মূল্যায়ন না করেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। ফলে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

সার্বিক তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট আপিলের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। আদালত Criminal Appeal No. 5795 of 2023 মঞ্জুর করে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ ঢাকার বিশেষ জজ, ৯ম আদালত কর্তৃক দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করেন।

মামলার মূল শিক্ষা

ফৌজদারি মামলায় শুধু অভিযোগ আনাই যথেষ্ট নয়; সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে গুরুতর অসংগতি এবং বিলম্বের ব্যাখ্যার অভাব প্রসিকিউশনের মামলাকে সন্দেহের মুখে ফেলতে পারে।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম