আদালতের রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আদালতের রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২৪ অক্টো, ২০২৬

জাল নথির ভিত্তিতে পাওয়া আদালতের রায়ও প্রতারণার কারণে হতে পারে বাতিল: আপিল বিভাগ

জাল নথির ভিত্তিতে পাওয়া আদালতের রায়ও প্রতারণার কারণে হতে পারে বাতিল: আপিল বিভাগ

প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত কোনো রায় বা আদেশ আইনের চোখে টিকে থাকতে পারে না—জাল ও অস্তিত্বহীন নথির ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগের রায় বাতিল করে পর্যবেক্ষণ আপিল বিভাগের।
প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত কোনো বিচারিক রায়, সরকারি আদেশ কিংবা অন্য কোনো আইনগত কার্যক্রম বহাল থাকতে পারে না। এমনকি কোনো লেনদেন বা কার্যক্রম যত উচ্চমাত্রার আনুষ্ঠানিকতা ও আইনি মর্যাদাসম্পন্নই হোক না কেন, প্রতারণা প্রমাণিত হলে তা আইনগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এ নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে চারটি দেওয়ানি আপিলে হাইকোর্ট বিভাগের পূর্ববর্তী রায় বাতিল করেছেন।

আপিল বিভাগ বলেন, প্রতারণার মাধ্যমে আদালতের কাছ থেকে কোনো প্রতিকার আদায় করা হলে সংশ্লিষ্ট রায়ও প্রতারণার দ্বারা কলুষিত হয়। এ ক্ষেত্রে আদালত “Fraud unravels everything” নীতির উল্লেখ করেন, যার অর্থ—প্রতারণা সবকিছুকেই ভেঙে দেয় বা আইনগত ভিত্তিহীন করে তোলে।

ডেপুটি কমিশনার, চট্টগ্রাম বনাম ইন্টারবাল্ক ওভারসিজ এসএ বাংলাদেশ লিমিটেড ও অন্যান্য, সিভিল আপিল: নং ১৭১–১৭৪/২০১৫ মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত গত ২১ মে ২০২৫ তারিখের রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১৪ আগস্ট, ২০২৫ তারিখে।

মামলার পটভূমি:

মামলাটি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় জমি অধিগ্রহণ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত হয়। ডেপুটি কমিশনার, চট্টগ্রাম বনাম ইন্টারবাল্ক ওভারসিজ এসএ বাংলাদেশ লিমিটেড ও অন্যান্য মামলাসহ চারটি দেওয়ানি আপিলে জমি অধিগ্রহণের একটি কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।

বিবাদীরা দাবি করেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ১৪ নভেম্বর ২০১০ তারিখে ভূমি মন্ত্রণালয়কে নতুন করে সারসংক্ষেপ দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশ অনুসরণ না করেই মন্ত্রণালয় ২৩ নভেম্বর ২০১০ তারিখে জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

এই দাবির ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ তারিখে চারটি রিট আবেদনে রুল যথাযথ ঘোষণা করেন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কার্যক্রমকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগত কার্যকারিতাহীন বলে ঘোষণা দেন।

আপিল বিভাগ যা বললেন:

আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ছিল, রিট আবেদনগুলোতে ব্যবহৃত প্রধানমন্ত্রীর কথিত নির্দেশসংবলিত নথিটির মূল সরকারি নথিতে কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে ওই নথির ওপর নির্ভর করে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে প্রতিকার আদায় করা হয়েছিল।

আপিল বিভাগ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, সংশ্লিষ্ট নোট বা চিঠিটি অস্তিত্বহীন ও কাল্পনিক। রিট আবেদনকারীরা তাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যেও কথিত নথিটির অস্তিত্ব সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের দাবির সন্তোষজনক প্রতিবাদ করতে পারেননি।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গোপনীয় সারসংক্ষেপ কীভাবে যথাযথ অনুমোদন ছাড়া আদালতের কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়েছিল, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগে সরকারি পক্ষের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবহেলার বিষয়টি আপিল বিভাগ নিন্দা করেন।

প্রতারণা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পর্যবেক্ষণ:

আপিল বিভাগ ইংরেজি মামলার Lazarus Estates Ltd. v. Beasley, (1956) 1 QB 702 মামলার পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত আদালতের কোনো রায় বা মন্ত্রীর কোনো আদেশ বহাল রাখা যায় না—“Fraud unravels everything.”

একই মামলায় লর্ড পার্কার এলজে-এর পর্যবেক্ষণও উদ্ধৃত করা হয়:

“Fraud vitiates all transactions known to the law of however high a degree of solemnity.”

এর মর্মার্থ হলো, আইনস্বীকৃত কোনো লেনদেন বা কার্যক্রম যত উচ্চমাত্রার আনুষ্ঠানিকতা ও মর্যাদার অধিকারীই হোক না কেন, প্রতারণা সেটিকে আইনগতভাবে কলুষিত করতে পারে।

আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপিল বিভাগ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, অস্তিত্বহীন ও কাল্পনিক নথির ওপর নির্ভর করে হাইকোর্ট বিভাগ যে রায় দিয়েছিলেন, তা প্রতারণার দ্বারা কলুষিত হয়েছে। তাই ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ তারিখের সংশ্লিষ্ট রায় ও আদেশ বাতিল করা হয়। ফলস্বরূপ, দেওয়ানি আপিল নং ১৭১–১৭৪/২০১৫ মঞ্জুর করা হয়।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

২৩ অক্টো, ২০২৬

আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তি হলেই অব্যাহতভাবে আইন পেশা পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত হয় না: কর্ণাটক হাইকোর্ট

আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তি হলেই অব্যাহতভাবে আইন পেশা পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত হয় না: কর্ণাটক হাইকোর্ট

এআইবিই পরীক্ষার ফল যাচাই ও অননুমোদিত আইন পেশা শনাক্তে নিয়মিত তদারকির নির্দেশ বার কাউন্সিলকে
ভারতের কর্ণাটক হাইকোর্ট বলেছেন, আইনজীবী হিসেবে বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত হলেই অব্যাহতভাবে আইন পেশা পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত হয় না। আইন পেশা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত অল ইন্ডিয়া বার এক্সামিনেশন (এআইবিই) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত পূরণ করতে হবে। এ ছাড়া, এআইবিই পরীক্ষার ফল যাচাই এবং অননুমোদিতভাবে আইন পেশা পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করতে নিয়মিত তদারকির জন্য রাজ্য বার কাউন্সিলকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

প্রসন্ন কুমার বনাম কর্ণাটক রাজ্য মামলায় গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক আদেশে কর্ণাটক হাইকোর্টের বিচারপতি এইচ. পি. সন্দেশের একক বেঞ্চ এসব পর্যবেক্ষণ দেন।

মামলায় আদালত বলেন, কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়েরের আগে বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলামূলক প্রতিকার গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়। পেশাগত অসদাচরণের বিষয়টি বার কাউন্সিলের এখতিয়ারভুক্ত হলেও, সংশ্লিষ্ট আচরণে স্বতন্ত্রভাবে ফৌজদারি অপরাধের উপাদান থাকলে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার এখতিয়ারও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

মামলার পটভূমি

মামলাটিতে আবেদনকারীর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০, ১২০-বি ও ৫১১ ধারার পাশাপাশি অ্যাডভোকেটস অ্যাক্ট, ১৯৬১-এর ৪৫ ধারায় অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়, তিনি ২০১১ সালে কর্ণাটক স্টেট বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও এআইবিই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে প্রায় এক দশক আইন পেশা পরিচালনা করেছেন।

অভিযোগটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়েরের পর ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৬(৩) ধারায় পুলিশি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে আবেদনকারী হাইকোর্টে মামলা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, অভিযোগগুলো মূলত পেশাগত অসদাচরণসংক্রান্ত, যা বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলামূলক এখতিয়ারের আওতাভুক্ত। এ ছাড়া, তাঁর তালিকাভুক্তির সনদে তালিকাভুক্তিকে অস্থায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি এবং তিনি পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে এআইবিই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

এআইবিই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে আইন পেশার অধিকার স্থগিত হতে পারে

আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী তালিকাভুক্তির দুই বছরের মধ্যে এআইবিই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইন পেশা পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করা প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে আইন পেশা পরিচালনার অধিকার স্থগিত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার মাধ্যমে পুনরায় আইন পেশা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আদালত আরও বলেন, বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা এবং ফৌজদারি আদালতের এখতিয়ার এক নয়। কোনো আচরণে ফৌজদারি অপরাধের উপাদান রয়েছে কি না, তা তদন্ত ও আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

অননুমোদিত আইন পেশার ক্ষেত্রে ৪৫ ধারা প্রয়োগের প্রশ্ন

আদালত উল্লেখ করেন, আইন পেশা পরিচালনার বৈধ অধিকার না থাকা সত্ত্বেও কেউ পেশা পরিচালনা করলে অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের ৪৫ ধারার প্রয়োগের প্রশ্ন উঠতে পারে। একইভাবে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪২০ ধারাসহ অভিযোগে উল্লিখিত অন্যান্য অপরাধের উপাদান পূরণ হয়েছে কি না, তা তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তের বিষয়।

তবে আদালত আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দেননি। বরং অভিযোগের সত্যতা ও অপরাধের উপাদান রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ রেখেছেন।

বার কাউন্সিলকে ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়মিত যাচাইয়ের নির্দেশ

অননুমোদিতভাবে আইন পেশা পরিচালনা প্রতিরোধে আদালত রাজ্য বার কাউন্সিলকে তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ, নির্ধারিত সময়সীমার মেয়াদ পর্যবেক্ষণ, এআইবিই পরীক্ষার ফল যাচাই এবং নিয়মিতভাবে অননুমোদিত আইন পেশা শনাক্ত করার নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে, কোনো আইনজীবীর তথ্যের মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে বলেও আদালত উল্লেখ করেন।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮২ ধারায় দায়ের করা আবেদনটি খারিজ করে দেন এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশকে আইন অনুযায়ী তদন্ত চালিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিলের সুযোগ দেন। তবে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে একটি প্রক্রিয়াগত ত্রুটিও আদালত চিহ্নিত করেন। আদালতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৬(৩) ধারায় তদন্তের জন্য পাঠানো বিচারিক আমল গ্রহণের আগের ধাপ; আমল গ্রহণের পর ওই পদ্ধতি প্রয়োগের বিষয়টি একইভাবে বিবেচনা করা যায় না।

সূত্র: দ্য বার বুলেটিন, ২১ অক্টোবর ২০২৬।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম 


গুরুতর অভিযোগ থাকলেই বিচারের পূর্বে অনির্দিষ্টকাল কারাবাস নয়: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

গুরুতর অভিযোগ থাকলেই বিচারের পূর্বে অনির্দিষ্টকাল কারাবাস নয়: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, শুধু অভিযোগের গুরুত্বের ভিত্তিতে অনির্দিষ্টকাল বিচার-পূর্ব কারাবাসে রাখা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।
বিচার শেষ হওয়ার আগেই দীর্ঘদিন কারাগারে আটক থাকাকে শাস্তিতে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছেন, আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রেও বিচারাধীন ব্যক্তির ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে।

ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দ্রুত বিচারের অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আদালত এ পর্যবেক্ষণ দেন।

বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি শীল নাগুর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রাজস্থানে ‘জল জীবন মিশন’ প্রকল্পের দরপত্রে শত শত কোটি টাকার অনিয়মসংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত সাবেক কংগ্রেসমন্ত্রী মহেশ চন্দ্র যোশি ও মুকেশ পাঠককে নিয়মিত জামিন দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন।

অভিযোগ গুরুতর হলেও অনির্দিষ্টকাল কারাবাসের ভিত্তি হতে পারে না

আদালত বলেন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশের অভিযোগ গুরুতর এবং সেগুলোর যথাযথ তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জামিনের বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যুক্তিও থাকতে পারে।

তবে অভিযোগের গুরুত্ব যত বেশি হোক না কেন, শুধু সেই কারণে জামিনের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় উপেক্ষা করা যায় না। একইভাবে, বিচার শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাগারে আটক রাখার যৌক্তিকতাও তৈরি হয় না।

আদালত আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বিচার-পূর্ব আটককে বিচার ছাড়াই শাস্তিতে পরিণত হতে দেওয়া হলে তা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দ্রুত বিচারের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হবে।

তদন্ত শেষ, হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন নেই

আদালত উল্লেখ করেন, দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়েছে এবং অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। মামলার অভিযোগের পক্ষে প্রধানত নথিপত্র ও ডিজিটাল প্রমাণের ওপর নির্ভর করছে রাষ্ট্রপক্ষ।

এসব প্রমাণের মধ্যে রয়েছে দরপত্রসংক্রান্ত নথি, সরকারি চিঠিপত্র, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, জব্দ করা মুঠোফোনের ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং আড়ি পেতে ধারণ করা কথোপকথন। এসব আলামত ইতোমধ্যে তদন্তকারী সংস্থার হেফাজতে রয়েছে।

বেঞ্চের মতে, অভিযুক্তদের আর হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ বা নতুন করে কোনো আলামত উদ্ধারের প্রয়োজন নেই। নথিপত্র ও ডিজিটাল প্রমাণ নষ্ট বা পরিবর্তন করার আশঙ্কাও অনেকাংশে দূর হয়েছে।

দীর্ঘ কারাবাস ও বিচার শুরু না হওয়ার বিষয় বিবেচনায়

আদালত দুই অভিযুক্তের কারাবাসের সময়কালও বিবেচনায় নেন। প্রায় ৭২ বছর বয়সী মহেশ চন্দ্র যোশি ২০২৬ সালের ৭ মে থেকে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে ছিলেন। অন্যদিকে, মুকেশ পাঠক ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় আট মাস ধরে কারাগারে আটক ছিলেন।

মামলার বিচার শেষ হতে কত সময় লাগতে পারে, সেটিও জামিন বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে।

আদালত জানান, মামলায় মোট ২২ জন অভিযুক্ত, তিনটি অভিযোগপত্র, রাষ্ট্রপক্ষের ১২৪ জন সাক্ষী এবং প্রায় ২০ হাজার পৃষ্ঠায় বিস্তৃত ১৯২টি নথি রয়েছে। তখনও অভিযোগ গঠন হয়নি এবং বিচার শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া কয়েকজন সহ-অভিযুক্তের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্ত চলছিল এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা কয়েকজন অভিযুক্ত পলাতক ছিলেন। মামলার বিপুল পরিমাণ সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনায় বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আদালত মনে করেন।

সহ-অভিযুক্তদের জামিনও বিবেচনায়

আদালত আরও লক্ষ করেন, একই ঘটনার সূত্রে দায়ের করা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমে দুই অভিযুক্ত জামিন পেয়েছিলেন। বর্তমান মামলার কয়েকজন সহ-অভিযুক্তও জামিন বা অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা পেয়েছিলেন।

সব পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে বেঞ্চ বলেন, অভিযুক্তদের আরও দীর্ঘ সময় বিচার-পূর্ব কারাবাসে রাখার প্রয়োজনীয়তা নেই। রাষ্ট্রপক্ষের যৌক্তিক উদ্বেগগুলো উপযুক্ত জামিনের শর্ত আরোপের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব।

মামলার গুরুত্ব

এই পর্যবেক্ষণে আদালত মূলত স্পষ্ট করেছেন, গুরুতর অভিযোগ থাকলেই বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে অনির্দিষ্টকাল কারাগারে রাখা যায় না। জামিন বিবেচনার ক্ষেত্রে অভিযোগের গুরুত্বের পাশাপাশি তদন্তের অবস্থা, প্রমাণের ধরন, হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা, ইতোমধ্যে ভোগ করা কারাবাস এবং বিচার শেষ হতে সম্ভাব্য সময়ও বিবেচনা করতে হবে।

তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগকে খাটো করে দেখা নয়; বরং বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা।

সূত্র: লাইভ ল' (LiveLaw), ২২ অক্টোবর ২০২৬।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

২২ অক্টো, ২০২৬

জনবল কমানোর অজুহাতে অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ী হওয়ার অধিকার অস্বীকার করা যায় না: আপিল বিভাগ

জনবল কমানোর অজুহাতে অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ী হওয়ার অধিকার অস্বীকার করা যায় না: আপিল বিভাগ

ছবি: সংগৃহীত 
দীর্ঘদিন সন্তোষজনকভাবে চাকরি করা এবং স্থায়ী নিয়োগের জন্য যোগ্য বিবেচিত কর্মীদের আইনগত অধিকার কেবল জনবল কমানোর সিদ্ধান্তের অজুহাতে অস্বীকার করা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো হেলপার ও ট্রাফিক হেলপার পদে কর্মরত অস্থায়ী কর্মীদের চাকরি স্থায়ী করার নির্দেশ দিয়ে আদালত এ পর্যবেক্ষণ দেন।

২০২৫ সালের ৭ মে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড বনাম মোঃ এ. কে. আজাদ ও অন্যান্য (কার্গো হেলপার), দেওয়ানি আপিল নং ১৭৮/২০১৮ মামলায় দেওয়া রায়ে আপিল বিভাগ বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের স্থায়ী নিয়োগের জন্য তালিকাভুক্ত করা এবং তাঁদের দীর্ঘদিনের সন্তোষজনক চাকরির বিষয়টি আইনগত অধিকার সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনবল কমানোর সিদ্ধান্তের কারণে তাঁদের সেই অধিকার নাকচ করা যায় না। 

মামলার পটভূমি

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মীরা প্রায় ১০ থেকে ২৫ বছর ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে অস্থায়ী ভিত্তিতে কার্গো হেলপার ও ট্রাফিক হেলপার হিসেবে কাজ করছিলেন। ২০০০ সালে তাঁদের চাকরি স্থায়ী করার দাবি ওঠার পর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়।

২০০১ সালে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করা এবং সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ড থাকা কর্মীদের স্থায়ী নিয়োগের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয় এবং সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থাও করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।


২০০৭ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনবল ৬ হাজার ৮৮৩ থেকে কমিয়ে ৩ হাজার ৪০০ জনে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে কার্গো হেলপার ও ট্রাফিক হেলপার পদ দুটি অনুমোদিত জনবল কাঠামো থেকে বিলুপ্ত করা হয়।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মীরা চাকরি স্থায়ী করার নির্দেশনা চেয়ে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট করেন।

হাইকোর্টের রায় ও আপিল

২০১৬ সালের ২ জুন হাইকোর্ট বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরি স্থায়ী করার বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে বিমান কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। কার্গো হেলপার ও ট্রাফিক হেলপার পদে নিয়োগ সম্ভব না হলে স্থায়ী কাঠামোর অন্য কোনো উপযুক্ত পদে নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করতে বলা হয়।

হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আপিলকারী কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, কর্মীরা অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করতেন এবং সংশ্লিষ্ট পদ বিলুপ্ত হওয়ায় তাঁদের স্থায়ী পদে নিয়োগের সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, কর্মীদের পক্ষে বলা হয়, তাঁরা দীর্ঘদিন সন্তোষজনকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কর্তৃপক্ষ নিজেই তাঁদের স্থায়ী নিয়োগের জন্য তালিকাভুক্ত করেছিল।

আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ

আপিল বিভাগ রায়ে উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নাম স্থায়ী নিয়োগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিমান কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করেনি। তাঁদের দীর্ঘদিনের চাকরি এবং সন্তোষজনক কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে স্থায়ী নিয়োগের জন্য যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছিল।

আদালত ১৯৬৫ সালের Employment of Labour (Standing Orders) Act-এর ৪ ধারা এবং ২০০৬ সালের শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কর্মীদের আইনস্বীকৃত অধিকারকে কেবল জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত বা স্বেচ্ছা অবসর প্রকল্পের অজুহাতে অস্বীকার করা যায় না।

রায়ে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আইনগত অধিকার সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে পদ বিলুপ্তির যুক্তি দেখিয়ে তাঁদের স্থায়ী নিয়োগের অধিকার নাকচ করার অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়।

চাকরি স্থায়ী করার নির্দেশ

আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে কোনো আইনগত ত্রুটি খুঁজে পাননি। আদালত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে নির্দেশ দেন, এখনো অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত এবং সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ডধারী সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরি স্থায়ী করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

রায়ের অনুলিপি পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। একই সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগের ২ জুন ২০১৬ তারিখের রায় থেকে চাকরি স্থায়ী হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরির সুবিধাদির অর্ধেক দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অবসর গ্রহণের বয়স পূর্ণ হলে আইন অনুযায়ী তাঁদের পদ বিলুপ্ত করার স্বাধীনতা বিমান কর্তৃপক্ষের থাকবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।

আইনি তাৎপর্য

এ রায়ে আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন, দীর্ঘদিনের সন্তোষজনক চাকরি, স্থায়ী নিয়োগের জন্য যোগ্যতা এবং কর্তৃপক্ষের পূর্ববর্তী পদক্ষেপের ভিত্তিতে কোনো কর্মীর আইনগত অধিকার সৃষ্টি হলে কেবল প্রশাসনিক পুনর্গঠন বা পদ বিলুপ্তির যুক্তিতে তা অস্বীকার করা যায় না। তবে এ সিদ্ধান্ত মামলার নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রযোজ্য আইনের আলোকে বিবেচ্য; এটি সব অস্থায়ী কর্মীর চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী হওয়ার সাধারণ ঘোষণা নয়।

সূত্র: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ, সিভিল আপিল নং ১৭৮/২০১৮, রায়: ৭ মে ২০২৫। রায়টি সুপ্রিম  কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


চেকের মামলায় আসামির চেক হারনোর দাবি প্রমাণে শুধু জিডি এন্ট্রি যথেষ্ট নয়: কলকাতা হাইকোর্ট

চেকের মামলায় আসামির চেক হারনোর দাবি প্রমাণে শুধু জিডি এন্ট্রি যথেষ্ট নয়: কলকাতা হাইকোর্ট

কলকাতা হাইকোর্ট | ছবি: সংগৃহীত 
চেকের ওপর স্বাক্ষর স্বীকার করা হলে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১১৮(ক) ও ১৩৯ ধারার অধীনে আইনগত অনুমান কার্যকর হয়। এ অবস্থায় চেক হারিয়ে যাওয়ার দাবি কেবল পুলিশের জেনারেল ডায়েরি (জিডি) এন্ট্রির ওপর নির্ভর করে প্রমাণ করা যথেষ্ট নয়। স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে ওই দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তুহিন গঙ্গোপাধ্যায় বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মামলায় বিচারপতি উদয় কুমারের একক বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত বলেন, চেকের স্বাক্ষর স্বীকার করার পর আইনগত অনুমান খণ্ডনের দায় অভিযুক্তের ওপর বর্তায়। তবে এই দায় প্রমাণের মানদণ্ড হলো সম্ভাবনার ভারসাম্য—অর্থাৎ অভিযুক্তকে এমন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে, যাতে তাঁর প্রতিরক্ষা যুক্তিসংগত ও সম্ভাব্য বলে প্রতীয়মান হয়।

মামলার ঘটনা

মামলাটি নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় চেক প্রত্যাখ্যানের অভিযোগে দায়ের করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তুহিন গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর কাপড়ের ব্যবসা ‘মধুকরী টেক্সটাইল’-এর প্রয়োজনে অভিযোগকারীর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণ পরিশোধের জন্য দেওয়া চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপনের পর প্রত্যাখ্যাত হয়।

আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধের দাবিতে নোটিশ পাঠানো হলেও অভিযুক্ত অর্থ পরিশোধ করেননি। তাঁর দাবি ছিল, তিনি অভিযোগকারীর কাছ থেকে কোনো ঋণ নেননি এবং তাঁকে কোনো চেকও দেননি। বরং তাঁর টাকার ব্যাগ হারিয়ে গিয়েছিল, যাতে একটি স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক ছিল। এ ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন এবং ব্যাংককে চেকের অর্থ পরিশোধ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

বিচারিক আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন। পরবর্তী সময়ে আপিল আদালতও দণ্ডাদেশ বহাল রাখেন, তবে কারাদণ্ড কমিয়ে সাত দিন নির্ধারণ করেন এবং ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেন। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন তুহিন গঙ্গোপাধ্যায়।

সাধারণ ডায়েরির এন্ট্রি এককভাবে যথেষ্ট নয়

আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, সাধারণ ডায়েরির এন্ট্রি মূলত তথ্যদাতার নিজের বক্তব্যের নথিভুক্তি। কেবল সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে—এ তথ্য থেকেই প্রমাণিত হয় না যে চেকটি বাস্তবে হারিয়ে গিয়েছিল কিংবা অন্য কেউ সেটির অপব্যবহার করেছে।

এ ক্ষেত্রে চেক হারানোর দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় অভিযুক্ত আইনগত অনুমান খণ্ডন করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে আদালত মনে করেন। ফলে নিম্ন আদালতগুলোর সিদ্ধান্তে কোনো বেআইনি পদক্ষেপ বা গুরুতর অসংগতি খুঁজে পায়নি হাইকোর্ট।

লিখিত চুক্তি বা আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ না থাকলেই ঋণ অবৈধ নয়

৩০ হাজার টাকার মতো তুলনামূলক স্বল্প অঙ্কের ব্যক্তিগত ঋণের ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি না থাকা কিংবা আয়কর বিবরণীতে ঋণের বিষয়টি উল্লেখ না থাকাকে এককভাবে ঋণটি আইনত অকার্যকর প্রমাণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না বলেও আদালত পর্যবেক্ষণ করেন।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, অভিযোগকারীর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে অভিযুক্ত এমন কোনো গ্রহণযোগ্য আপত্তি উত্থাপন করেননি, যা ঋণ দেওয়ার দাবিকে সন্দেহের মুখে ফেলতে পারে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম আলাদাভাবে অভিযুক্ত করা বাধ্যতামূলক নয়

মামলায় ‘মধুকরী টেক্সটাইল’ নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পৃথকভাবে অভিযুক্ত না করার বিষয়েও আপত্তি তোলা হয়েছিল। আদালত এ আপত্তি নাকচ করে বলেন, একক মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্বতন্ত্র আইনগত সত্তা নয়; এটি মূলত মালিকের ব্যবসায়িক নাম। তাই শুধু ব্যবসার নামকে আলাদাভাবে মামলার আসামি না করায় ফৌজদারি কার্যক্রম ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায় না।

এ ছাড়া আবেদনকারীকে একদিকে বেকার এবং অন্যদিকে ছোট কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে বর্ণনা করার অসংগতিকে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি, যার কারণে প্রাথমিক পর্যায়েই পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করা প্রয়োজন।

দণ্ডাদেশ বহাল, তবে কারাদণ্ড ভোগে অব্যাহতি

সব দিক বিবেচনায় কলকাতা হাইকোর্ট নিম্ন আদালতগুলোর দণ্ডাদেশে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনো কারণ খুঁজে পাননি। ফলে ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ এবং তা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রযোজ্য অতিরিক্ত দণ্ডের নির্দেশ বহাল থাকে। তবে অভিযুক্তকে সাত দিনের মূল কারাদণ্ড ভোগ করা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

মামলার তথ্য

মামলা: তুহিন গঙ্গোপাধ্যায় বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য

আদালত: কলকাতা হাইকোর্ট

বিচারপতি: উদয় কুমার

রায়ের তারিখ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রাসঙ্গিক আইন: নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮, ১১৮(ক) ও ১৩৯ ধারা।

সূত্র: দ্য বার বুলেটিন

বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম


২০ অক্টো, ২০২৬

প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে গুরুতর অসংগতি ও সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতার কারণে আসামির দণ্ড বাতিল: হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে গুরুতর অসংগতি ও সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতার কারণে আসামির দণ্ড বাতিল: হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

এজাহার দায়েরে প্রায় ৯ ঘণ্টার বিলম্বের ব্যাখ্যা দিতে না পারায় মাদক মামলায় আসামির দণ্ড বাতিল করল হাইকোর্ট
মাদক মামলায় এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে গুরুতর অসংগতি এবং এজাহার দায়েরে প্রায় নয় ঘণ্টার বিলম্বের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় আসামির দণ্ডাদেশ বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সম্প্রতি বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চ ক্রিমিনাল আপিল নম্বর ৫৭৯৫/২০২৩ — মো. মিজানুর রহমান সুমান বনাম রাষ্ট্র- এর রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট রায়টি ঘোষণা করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়।

মামলার ঘটনা:

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটের দিকে ঢাকার পল্টন থানাধীন ৫৯ নয়াপল্টনের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে আসামি মো. মিজানুর রহমান সুমনের কাছ থেকে ১০০টি এবং অপর এক আসামির কাছ থেকে ৫০টি ইয়াবা উদ্ধারের কথা বলা হয়। পরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক্স-রে কক্ষ থেকে আরও ৪৬০টি ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করা হয়। সব মিলিয়ে ৬১০টি ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে মামলা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে মামলার বিচার শেষে ঢাকার বিশেষ জজ, ৯ম আদালত ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ মো. মিজানুর রহমান সুমনকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণির ৯(ক) অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামি হাইকোর্টে আপিল করেন।

আপিলকারীর যুক্তি

আপিলকারীর আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, জব্দতালিকার সাক্ষীরা তাঁদের স্বাক্ষর সাদা বা ফাঁকা কাগজে নেওয়া হয়েছিল বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ আসামির দেহ তল্লাশি বা ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেননি। ফলে জব্দতালিকা ও উদ্ধারের বিষয়ে প্রসিকিউশনের বক্তব্য নির্ভরযোগ্য নয়।

এ ছাড়া মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের বক্তব্যে ইয়াবা উদ্ধারের স্থান, ট্যাবলেটের রং এবং এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে অসংগতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, মামলার বাদী ও র্যাব সদস্য মো. মাসুম করিম খান বিভিন্ন পর্যায়ে এজাহার দায়েরের ভিন্ন ভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন। জবানবন্দিতে একবার ঘটনাস্থলে সকাল ৫টা ৫০ মিনিটে এজাহার দায়েরের কথা বলা হয়। পরে একই রাতে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে পল্টন থানায় এজাহার দায়েরের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু জেরার সময় তিনি জানান, প্রকৃতপক্ষে এজাহার দায়ের করা হয়েছিল রাত ২টা ২৫ মিনিটে।

অভিযোগের ঘটনাটি বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে ঘটেছে বলে উল্লেখ থাকায়, এজাহার দায়েরের সময়সংক্রান্ত এই অসংগতি মামলার প্রমাণকে গুরুতরভাবে সন্দেহজনক করে তোলে। আদালত আরও উল্লেখ করেন, এজাহার দায়েরে বিলম্বের কোনো ব্যাখ্যাও প্রসিকিউশন দিতে পারেনি।

আদালতের মতে, সাক্ষীদের বক্তব্যে এ ধরনের গুরুতর অসংগতি থাকা সত্ত্বেও বিচারিক আদালত মামলার যথাযথ মূল্যায়ন না করেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। ফলে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

সার্বিক তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট আপিলের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। আদালত Criminal Appeal No. 5795 of 2023 মঞ্জুর করে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ ঢাকার বিশেষ জজ, ৯ম আদালত কর্তৃক দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করেন।

মামলার মূল শিক্ষা

ফৌজদারি মামলায় শুধু অভিযোগ আনাই যথেষ্ট নয়; সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে গুরুতর অসংগতি এবং বিলম্বের ব্যাখ্যার অভাব প্রসিকিউশনের মামলাকে সন্দেহের মুখে ফেলতে পারে।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

বিভাগীয় তদন্তে দোষী হলেই ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হয় না, এক্ষেত্রে অভিযোগের অপরাধমূলক উপাদান যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

বিভাগীয় তদন্তে দোষী হলেই ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হয় না, এক্ষেত্রে অভিযোগের অপরাধমূলক উপাদান যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

স্নাতক (পাস) সনদ প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না হওয়ায়, ওই সনদকে কেন্দ্র করে জালিয়াতির অভিযোগে দেওয়া ফৌজদারি দণ্ড বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, সংশ্লিষ্ট চাকরিতে সনদটি বাধ্যতামূলক না হলে এবং মূল সনদ আদালতে উপস্থাপন না করে শুধু ফটোকপির ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া হলে তা যথাযথ প্রমাণের প্রশ্ন তোলে।

বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একক বেঞ্চ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। আদালত ক্রিমিনাল আপিল নং ৮০৫৮/২০২৪ মঞ্জুর করে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের ২৫ মার্চ ২০২৪ তারিখের দণ্ডাদেশ বাতিল করেন।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ গাজীপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিম্ন সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেন। অভিযোগ ছিল, তিনি অন্য এক ব্যক্তির নামে ইস্যু করা স্নাতক (পাস) পরীক্ষার সনদ নিজের বলে জমা দিয়ে চাকরি ও পরবর্তী পদোন্নতির সুবিধা গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি সনদটি যাচাই করে অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদন দেয়। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪২০ ধারায় মামলা হয়।

ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত ২৫ মার্চ ২০২৪ তারিখে তাঁকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন।

হাইকোর্টে আপিলকারীর যুক্তি

আপিলকারীর আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, যে স্নাতক (পাস) সনদটি জাল বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তার মূল কপি বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সনদের ফটোকপির ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি সাক্ষ্য আইনের ৬২, ৬৩ ও ৬৫ ধারার বিধান এবং হাজী ওয়াজিউল্লাহ বনাম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মামলার নজির উল্লেখ করেন।

আইনজীবী আরও বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধি অনুযায়ী নিম্ন সহকারী পদে নিয়োগের জন্য উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) সনদই যথেষ্ট ছিল। একইভাবে, উচ্চ সহকারী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও স্নাতক (পাস) সনদ বাধ্যতামূলক ছিল না। ফলে ওই সনদকে কেন্দ্র করে চাকরি ও পদোন্নতির সুবিধা অবৈধভাবে গ্রহণের অভিযোগের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট মামলার নথি, সাক্ষ্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিবিধি পর্যালোচনা করে দেখতে পান, সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতির জন্য বিতর্কিত স্নাতক (পাস) সনদ দাখিলের বাধ্যবাধকতা ছিল না। আদালত আরও লক্ষ করেন, মূল সনদটি বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে শুধু ওই সনদকে কেন্দ্র করে আপিলকারীকে দণ্ডিত করার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বিভাগীয় তদন্তে কোনো কর্মচারীকে দায়ী করা হলেও সেই সিদ্ধান্ত একাই ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফৌজদারি মামলায় অভিযোগের অপরাধমূলক উপাদান যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে। বিভাগীয় কার্যধারা ও ফৌজদারি বিচার পৃথক উদ্দেশ্য ও মানদণ্ডে পরিচালিত হয়।

এ ছাড়া, একই অভিযোগে ফৌজদারি কার্যধারা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২৫ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে আপিলকারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিল। আদালত সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধির ১৬ ধারার আলোকে ওই বরখাস্তের আদেশকে আইনবিরোধী বলে উল্লেখ করেন।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সামগ্রিক ঘটনা, নথিপত্র ও আইনগত বিষয় বিবেচনায় হাইকোর্ট আপিলটি মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের ২৫ মার্চ ২০২৪ তারিখের দণ্ডাদেশ বাতিল করে দেন।

মামলার তথ্য
মামলার নাম: মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বনাম রাষ্ট্র ও অন্য একজন
মামলার নম্বর: ক্রিমিনাল আপিল নং ৮০৫৮/২০২৪
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ
বিচারপতি: বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী
রায়ের তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রাসঙ্গিক আইন: দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪২০ ধারা এবং সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬২, ৬৩ ও ৬৫ ধারা।
রায় প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ (সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে)

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

৪৬৩ কোটি টাকা পাচার: গ্লোবালটেলের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার ১২ বছরের কারাদণ্ড

৪৬৩ কোটি টাকা পাচার: গ্লোবালটেলের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার ১২ বছরের কারাদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত 
আন্তর্জাতিক ইনকামিং কলের মাধ্যমে ৪৬৩ কোটি টাকার বেশি অর্থপাচারের মামলায় অ্যাপল গ্লোবালটেল কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মজুমদার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অভিউর রহমান খানকে ১২ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে অর্থপাচার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে তাঁদের মোট ৯২৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকার বেশি অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে দুই আসামি পলাতক থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক আবদুল্লাহ আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রসিকিউটর মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অর্থপাচারের দায়ে ১২ বছরের কারাদণ্ড

রায়ে অর্থপাচারের দায়ে দুই আসামিকে ১২ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাচার করা অর্থের দ্বিগুণ, ৯২৬ কোটি ৭৪ লাখ ৯২ হাজার ২৯৮ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাঁদের আরও এক বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

এ ছাড়া অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে তাঁদের প্রত্যেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এই জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

তবে আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন, দুই ধারায় দেওয়া কারাদণ্ড একই সঙ্গে কার্যকর হবে। ফলে উভয় আসামিকে মোট ১২ বছর করে কারাভোগ করতে হবে। নির্ধারিত অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে তাঁদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার কথাও রায়ে বলা হয়েছে।

৪৬৩ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ

দুদকের করা মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ইনকামিং কলের মাধ্যমে অ্যাপল গ্লোবালটেল কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৪৬৩ কোটি ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার ১৪৯ টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণের সমপরিমাণ হিসেবে মামলায় ৬ কোটি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫২১ মার্কিন ডলারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দুদকের পরিচালক জালাল উদ্দিন আহাম্মদ মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মহিউদ্দিন মজুমদার ও অভিউর রহমান খানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

পরবর্তী সময়ে গত ৬ আগস্ট আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এর মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে মামলার আটজন সাক্ষীর মধ্যে সাতজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত।

সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর আদালত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম

সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা

১৯ অক্টো, ২০২৬

জাল ও সন্দেহজনক দলিলের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি গ্রহণযোগ্য নয়

জাল ও সন্দেহজনক দলিলের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি গ্রহণযোগ্য নয়

আগের নিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের নির্দেশ হাইকোর্টের
জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধে আগের নিবন্ধিত দলিল, মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য এবং জমির সুনির্দিষ্ট সীমানার প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন, সন্দেহজনক ও জালিয়াতিপূর্ণ বায়নাপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তী দলিলের মাধ্যমে জমির ওপর অগ্রাধিকার দাবি করা যায় না। মামলার সামগ্রিক সাক্ষ্য-প্রমাণে বাদীর স্বত্ব, পূর্ববর্তী দখল ও পরবর্তী সময়ে বেদখল হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে তিনি স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি পেতে পারেন।

বিচারপতি মো. আলী রেজা ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫ এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮ একসঙ্গে নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট এ রায় দেন।

মামলার পটভূমি

মামলার বাদী ১৯৭৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এলাকার দুই শতক জমি ক্রয় করেন বলে দাবি করেন। জমি কেনার পর সেখানে টিনশেড ঘর নির্মাণ করে ওষুধের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বাদীর অভিযোগ, ১৯৭৭ সালের ৭ জানুয়ারি বিবাদীরা তাঁর ঘর ভেঙে তাঁকে জমি থেকে উচ্ছেদ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি জমির দখল ফিরে পেলেও ১৯৭৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আবারও বেদখল হন।

অন্যদিকে, বিবাদীদের দাবি ছিল, তাঁরা ১৯৭৪ সালে জমির মালিকের সঙ্গে বায়নাপত্র সম্পাদন করেন এবং পরবর্তী সময়ে জমির দলিল নিবন্ধন করে দখল নেন। তাঁরা বাদীর দলিলকে জাল ও প্রতারণামূলক দাবি করেন।

এ বিরোধে বাদী ১৯৮৫ সালে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারিক ও আপিল আদালত ঘুরে হাইকোর্ট বিভাগে আসে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, বাদীর সাক্ষীরা জমিতে তাঁর পূর্ববর্তী দখল এবং পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদের বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। জেরায় তাঁদের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য কোনো অসংগতি বের করতে পারেননি বিবাদীরা। বাদীর মূল নিবন্ধিত দলিল, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং জমির সীমানাসংক্রান্ত নথিপত্র তাঁর দাবিকে সমর্থন করেছে।

অন্যদিকে, বিবাদীদের দাখিল করা বায়নাপত্রে একাধিক সন্দেহজনক বিষয় পাওয়া যায়। দলিলের লেখার কালি ও সাক্ষীদের স্বাক্ষরের কালির মধ্যে পার্থক্য ছিল। বায়নাপত্রে ১৯৭১ সালের আদালতের সিল পাওয়া গেলেও সেটি সম্পাদনের তারিখ ছিল ১৯৭৪ সাল। এসব অসংগতি এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত বায়নাপত্রটিকে পরবর্তী সময়ে তৈরি ও জালিয়াতিপূর্ণ বলে মনে করেন।

বিবাদীদের পরবর্তী নিবন্ধিত দলিলেও সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। দলিলে কথিত বায়নাপত্রের উল্লেখ ছিল না এবং স্ট্যাম্প ক্রয় ও নিবন্ধনসংক্রান্ত কিছু অসংগতির সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। আদালতের মতে, এসব দলিল বিবাদীদের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

জমির সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণের গুরুত্ব

বিবাদীরা দাবি করেছিলেন, মামলার জমির সীমানা সুনির্দিষ্ট নয়। তবে হাইকোর্ট বলেন, আরজির তফসিল, বাদীর দলিল, সাক্ষীদের জবানবন্দি, কমিশনারের প্রতিবেদন এবং মামলার নকশা থেকে জমির পরিচয় ও সীমানা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে ইস্যু করা চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত বিএস খতিয়ানেও জমিটি বাদীর নামে রেকর্ড করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে সমর্থিত হলে এ ধরনের চূড়ান্ত রেকর্ডের প্রমাণমূল্য রয়েছে।

আগের নিবন্ধিত দলিলের অগ্রাধিকার

হাইকোর্ট বলেন, কেবল আগের একটি অনিবন্ধিত বায়নাপত্রের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বাদীর আগের নিবন্ধিত দলিলের চেয়ে অগ্রাধিকার দাবি করা যায় না। এ মামলায় বাদীর দলিল আগে নিবন্ধিত হয়েছে এবং তাঁর স্বত্ব, পূর্ববর্তী দখল ও পরবর্তী সময়ে বেদখল হওয়ার বিষয়টি যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বাদীর স্বত্বের দাবিই গ্রহণযোগ্য।

হাইকোর্টের রায়

হাইকোর্ট নিম্ন আদালতগুলোর সংশ্লিষ্ট রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫-এর রুল যথাযথ ঘোষণা করা হয় এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮-এর রুল খারিজ করা হয়।

একই সঙ্গে আদালত বাদীর পক্ষে জমির স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি দেন। বিবাদী ১ ও ২-কে রায় ও আদেশের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে জমির সব বাধা অপসারণ করে বাদীকে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় বাদী আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমির দখল পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।

মামলার বিবরণ

মামলার নাম: ড. আশরাফ হোসেন (মৃত), তাঁর আইনগত উত্তরাধিকারীগণ বনাম হাজী আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ও অন্যান্য

মামলার নম্বর: সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫ এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮

বিচারপতি: বিচারপতি মো. আলী রেজা

রায়ের তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রায় প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬


বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি থাকলেই অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণিত হয় না: হাইকোর্ট

সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি থাকলেই অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণিত হয় না: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
শুধু সরকারি অর্থের ঘাটতি বা ক্ষতি প্রমাণিত হলেই অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; অর্থের ওপর অভিযুক্তের ন্যস্ত দায়িত্ব ও অসৎভাবে আত্মসাতের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে।

সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি পাওয়া গেলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অর্থ আত্মসাতের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, সরকারি অর্থের ঘাটতি বা ক্ষতির প্রমাণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট অর্থ অভিযুক্তের জিম্মায় বা নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে তা আত্মসাৎ করেছেন—এ বিষয়গুলোও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর একক বেঞ্চ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। রায়ে আদালত লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতির ঘটনায় দণ্ডিত ডাক বিভাগের কর্মচারী মো. ওমর ফারুকের আপিল মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে তাঁকে অভিযোগ থেকে খালাস দেন।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরের নিয়মিত পোস্টমাস্টার ছুটিতে থাকাকালে ওমর ফারুক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিয়মিত পোস্টমাস্টার দায়িত্বে ফিরে এলে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি তাঁর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা থাকলেও ওমর ফারুক পরে দায়িত্ব দেবেন বলে জানান এবং একপর্যায়ে অফিস থেকে চলে যান। পরবর্তী সময়ে ডাকঘরে নগদ অর্থ ও অন্যান্য হিসাবের তালিকা প্রস্তুত করে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতি পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫ ধারায় মামলা হয়। ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিশেষ জজ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।

আপিলের শুনানিতে হাইকোর্ট দেখতে পান, ডাকঘরে অর্থের ঘাটতি থাকার বিষয়টি সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে এলেও ওই অর্থ অভিযুক্তের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং তিনি তা অসৎ উদ্দেশ্যে আত্মসাৎ করেছেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি। মামলায় ৯ লাখ টাকা লালমনিরহাট প্রধান ডাকঘর থেকে গ্রহণের কথা বলা হলেও তা আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাবের এন্ট্রি বা প্রেরণের নথি পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তাও স্বীকার করেন, ওই অর্থ প্রকৃতপক্ষে আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, একজন গ্রাহকের তিন লাখ টাকা জমা দেওয়ার লেনদেনের প্রমাণ থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিগতভাবে ওই অর্থ গ্রহণ বা আত্মসাৎ করেছিলেন, তা প্রমাণিত হয়নি। দায়িত্ব হস্তান্তর না করে অফিস ত্যাগ করা কিংবা অর্থের ঘাটতির সময় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা সন্দেহের কারণ হতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট অর্থের সঙ্গে অভিযুক্তের অসৎ আত্মসাতের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা না হলে তা দণ্ডাদেশের জন্য যথেষ্ট নয়। আদালতের মতে, অর্থের ঘাটতি প্রমাণ করা এবং সেই অর্থ অসৎভাবে আত্মসাৎ করা প্রমাণ করা দুটি পৃথক বিষয়।

এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দেন, মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারার অপরাধের অপরিহার্য উপাদান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে আপিল মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল এবং অভিযুক্তকে খালাস দেওয়া হয়।

মামলার বিবরণ: মো. ওমর ফারুক বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য, ফৌজদারি আপিল নং ৭৭১২/২০১৪; রায়ের তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

আইনি তাৎপর্য: এ রায় ফৌজদারি বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে—সরকারি অর্থের ঘাটতি বা হিসাবের অসংগতি থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মসাতের অপরাধে পরিণত হয় না। অভিযুক্তের কাছে অর্থের ন্যস্ততা বা নিয়ন্ত্রণ এবং তাঁর অসৎ আত্মসাতের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।


বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম