১৯ জুন, ২০২৬
১৬ জুন, ২০২৬
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতা: বাংলাদেশের সংবিধানের সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব
বাংলাদেশের সংবিধান বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় সাংবিধানিক দলিল। স্বাধীনতার পর প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বর্তমানে একই সংবিধানে একদিকে ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলিক রাষ্ট্রনীতি হিসেবে স্বীকৃত, অন্যদিকে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবেও সাংবিধানিক মর্যাদা ভোগ করছে। এই দ্বৈত অবস্থান বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল এবং বিতর্কিত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্র কি একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ এবং রাষ্ট্রধর্মবিশিষ্ট হতে পারে? নাকি এটি সংবিধানের অভ্যন্তরে একটি মৌলিক সাংঘর্ষিক অবস্থা?
মুক্তিযুদ্ধ,
১৯৭২ সালের সংবিধান এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতার
আন্দোলন ছিল না; এটি
ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবংবৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য সংগ্রাম। সেই
আদর্শের প্রতিফলন ঘটে ১৯৭২ সালের
সংবিধানে।
সংবিধানের
৮(১) অনুচ্ছেদে চারটি
মৌলিক রাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হয় যথা
জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। ১২ অনুচ্ছেদে
ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। সেখানে বলা
হয়, সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ এবং কোনো
ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা প্রদান না করাই ধর্মনিরপেক্ষতার
মূল লক্ষ্য।
গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হলো, বাংলাদেশের সংবিধানে
ধর্মনিরপেক্ষতা কখনোই ধর্মবিরোধিতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। বরং এর উদ্দেশ্য
ছিল রাষ্ট্রকে ধর্মীয় পক্ষপাত থেকে মুক্ত রাখা
এবং সব ধর্মাবলম্বীর সমান
অধিকার নিশ্চিত করা।
সাংবিধানিক
পরিবর্তনের শুরুঃ ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সাংবিধানিক
দর্শনেও পরিবর্তন আসে। ১৯৭৭ সালে সামরিক শাসনামলে
সংবিধানের প্রস্তাবনায় “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” যুক্ত করা হয় এবং
ধর্মনিরপেক্ষতার স্থলে “আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” সংযোজন
করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের পঞ্চম
সংশোধনী এই পরিবর্তনগুলোকে বৈধতা
প্রদান করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে ১৯৮৮ সালে।
অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ২ক অনুচ্ছেদ সংযোজন করে ঘোষণা করা
হয়: “The state religion of the
Republic is Islam.” তবে
একই অনুচ্ছেদে অন্যান্য ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালনের
অধিকারও নিশ্চিত করা হয়।
পঞ্চদশ
সংশোধনী: দুই বিপরীত ধারণার সহাবস্থানঃ ২০১১ সালে পঞ্চদশ
সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুনরায় সংবিধানের মৌলিক রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়। ফলে
বর্তমান সংবিধানে ৮ অনুচ্ছেদে এ ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলিক
রাষ্ট্রনীতি ব্যাখ্যা করা হয়,
১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা করা হয় কিন্তু ২ক অনুচ্ছেদে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম রাখা হয়। এই অবস্থানই বাংলাদেশের
সাংবিধানিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব: সমালোচকদের অবস্থানঃ সমালোচকদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেবে না। তাদের মতে, ১২ অনুচ্ছেদ এবং ২ক অনুচ্ছেদ এর মধ্যে একটি মৌলিক টানাপোড়েন রয়েছে।
যদি রাষ্ট্র সকল ধর্মের প্রতি সমান আচরণ করে, তাহলে একটি ধর্মকে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যৌক্তিকতা কী? অনেক সাংবিধানিক গবেষক মনে করেন, রাষ্ট্রধর্মের ধারণা প্রতীকী হলেও এটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
রাষ্ট্রধর্মের সমর্থকদের যুক্তিঃ অন্যদিকে রাষ্ট্রধর্মের সমর্থকদের মতে, বাংলাদেশে মুসলমান জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের মতে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। ৪১ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রধর্ম থাকা মানেই অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার হরণ নয়। তারা যুক্তি দেন যে যুক্তরাজ্য, ডেনমার্কসহ অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও রাষ্ট্রধর্ম বা প্রতিষ্ঠিত ধর্ম রয়েছে।
বিচার
বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গিঃ বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১.
Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh (41 DLR (AD) 165 (1989)- এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক
ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এই মামলায় আপিল বিভাগ প্রথমবারের
মতো Basic Structure
Doctrine বা “মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব” স্বীকৃতি দেয়।
আদালত
বলেন, Parliament
can amend the Constitution, but cannot destroy its basic structure. অর্থাৎ সংসদ সংবিধান সংশোধন
করতে পারবে, কিন্তু সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করতে পারবে না।
এই রায় পরবর্তীতে ধর্মনিরপেক্ষতা
নিয়ে বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
২.
Bangladesh Italian Marble Works Ltd v Government of Bangladesh (62 DLR (AD) 298
(2010)- এটি সাধারণত “Fifth Amendment Case” নামে পরিচিত। এই মামলায় সুপ্রিম
কোর্ট পঞ্চম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে ১৯৭২
সালের সংবিধানের মৌলিক আদর্শসমূহ বাংলাদেশের সাংবিধানিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রায়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৩.
State Religion Islam Case- রাষ্ট্রধর্ম
ইসলাম বাতিলের দাবিতে একাধিক রিট আবেদন করা
হয়েছিল। হাইকোর্ট পরবর্তীতে রিট খারিজ করে
এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংক্রান্ত বিধান বহাল রাখে। আদালতের
যুক্তি ছিল, ২ক অনুচ্ছেদ অন্যান্য ধর্মের অধিকার
বাতিল করে না, ৪১ অনুচ্ছেদ ধর্মীয়
স্বাধীনতা নিশ্চিত করছে এবং রাষ্ট্রধর্মের বিধান নিজে থেকেই বৈষম্য
সৃষ্টি করছে এমনটি প্রমাণিত
হয়নি। ফলে বিচার বিভাগ
ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রধর্ম, দুই
ধারণার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান
গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক
প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ কি একা? বাংলাদেশের সাংবিধানিক মডেলকে ভালোভাবে বুঝতে হলে আন্তর্জাতিক তুলনা
গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্স:
কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতাঃ France-এ Laïcité নীতি অনুসরণ করা
হয়। রাষ্ট্র এবং ধর্মের মধ্যে
কঠোর বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা হয়। রাষ্ট্র
কোনো ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেয় না।
ভারত:
সমদূরত্বের ধর্মনিরপেক্ষতাঃ ভারতের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম নেই। ভারতীয় মডেলে রাষ্ট্র সকল ধর্মের প্রতি
সমান সম্মান প্রদর্শনের নীতি অনুসরণ করে।
যুক্তরাজ্য:
রাষ্ট্রধর্ম কিন্তু গণতন্ত্রওঃ United
Kingdom-এ Church of
England রাষ্ট্রের সঙ্গে সাংবিধানিকভাবে যুক্ত। তবুও দেশটি বিশ্বের
অন্যতম শক্তিশালী গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার
উদাহরণ।
মালয়েশিয়া: মধ্যবর্তী মডেলঃ Malaysia-এর সংবিধানে ইসলাম ফেডারেশনের ধর্ম। কিন্তু একই সঙ্গে অন্যান্য ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকারও স্বীকৃত। বাংলাদেশের বর্তমান মডেল অনেকাংশে মালয়েশিয়ার সঙ্গে তুলনীয়।
অনুচ্ছেদ ৭খ এবং ভবিষ্যতের বিতর্কঃ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭বি অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। এই অনুযায়ী সংবিধানের কিছু মৌলিক বিধান সংশোধনযোগ্য নয়। যদি ভবিষ্যতে আদালত ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের অপরিবর্তনীয় মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে ব্যাখ্যা করে, তাহলে ২ক অনুচ্ছেদ এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে। ফলে রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
উপসংহারঃ
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সহাবস্থান
একটি বিরল সাংবিধানিক বাস্তবতা।
এটি শুধু একটি আইনি
বিতর্ক নয়; বরং বাংলাদেশের
জাতীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক বাস্তবতার
প্রতিফলন। বিশ্বের
অধিকাংশ রাষ্ট্র হয় ধর্মনিরপেক্ষ, নয়তো
রাষ্ট্রধর্মভিত্তিক সাংবিধানিক কাঠামো অনুসরণ করে। বাংলাদেশ সেই
দুই ধারার মাঝখানে একটি স্বতন্ত্র পথ
নির্মাণ করেছে।
তবে প্রশ্নটি এখনও রয়ে গেছে, রাষ্ট্র কি সকল ধর্মের ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে, নাকি একটি ধর্মের সঙ্গে সাংবিধানিক সম্পর্ক বজায় রাখবে? সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালত বা সংসদ নয়, বাংলাদেশের জনগণকেই একদিন নির্ধারণ করতে হবে। আর সে কারণেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিতর্ক বাংলাদেশের সাংবিধানিক আলোচনায় আগামী দিনেও কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে থাকবে।
নির্বাচিত
তথ্যসূত্রঃ
1. Constitution of the People’s Republic of Bangladesh 1972,
arts 2A, 8, 12, 41 and 7B.
2. Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh 41 DLR (AD) 165
(1989).
3. Bangladesh Italian Marble Works Ltd v Government of
Bangladesh 62 DLR (AD) 298 (2010).
4. The Constitutional Law of Bangladesh (3rd edn, Mullick
Brothers 2012).
5. Constitutional Law of Bangladesh (3rd edn, Mullick
Brothers 2012).
লিখেছেন,
মোঃ মুসফিক হাসান নিলয়
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, তৃতীয় বর্ষ,
ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি এন্ড সায়েন্সেস (UITS)
১৮ মে, ২০২৬
মানব পাচারের ক্ষেত্রে নতুন আইনেও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
গত ১২ মাসে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এলাকা থেকে ৪৯৫ জন নারী ও শিশুকে উদ্ধার করে। বিজিবির মহেশপুর ব্যাটালিয়ন ও ঝিনাইদহ ব্যাটালিয়ন এই নারী ও শিশুদের সীমান্ত এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে।
পরে আইনি সহায়তা ও প্রকৃত অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দিতে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার নামে একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করে। পাচারের ফলে সীমান্ত পার হলেই এই মানুষগুলো হয়ে যেতেন অনুপ্রবেশকারী। বেআইনি চোরাচালান চক্রের ফাঁদে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ত তাদের জীবন।
মানবপাচার ও চোরাচালান সংক্রান্ত অপরাধের মাত্রা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালনান প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে ভুক্তভোগীদের ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ‘অভিবাসী চোরাচালান’ সংক্রান্ত অপরাধকে আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনেও এককভাবে ও সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই আইন মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধের মামলা ও ভুক্তভোগীদের সঠিকভাবে চিহ্নিতকরণে সহায়তা এবং যৌন শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম, অপরাধমূলক শোষণ ও দাসত্বও অন্যান্য গুরুতর পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য আরো কার্যকারী সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের আইন কাঠামোকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে।
একই সঙ্গে এই আইন মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালনের রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞাকে জাতিসংঘের ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) প্রোটোকল এবং স্মাগলিং ওফ মাইগ্রেন্ট (এসওএম) প্রোটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করবে ।
নতুন এই আইনের মাধ্যমে মানব পাচার অপরাধের প্রকৃতি ও ব্যাপকতা বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত সংস্থাসমূহকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, সম্পত্তি জব্দ এবং আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার করার মতো যুগান্তকারী বিধান এই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া অভিবাসী চোরাচালানের উদ্দেশ্যে পাসপোর্ট বা ভিসা জালিয়াতিকেও কঠোর শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এই আইন সম্পর্কে বলেন, ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশ এই সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত আন্তরিক এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইন প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ২০০০ সালে গৃহীত জাতিসংঘ কনভেনশন এবং এর সম্পূরক প্রোটোকলগুলোর আলোকে বাংলাদেশ সরকার 'মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬' প্রণয়ন করেছে।’
মনজুর মোর্শেদ আরও বলেন, 'নতুন এই আইনে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি ভিকটিমদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন প্রতারণা, স্ক্যামিং এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো আধুনিক অপরাধগুলোকে এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধে কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়, বরং জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যম কর্মীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।'
এই আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাচারকারীকে সম্পত্তি ব্যবহার করতে দিলে বা নথি গোপন করে সহায়তা করলে ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে কাউকে আমদানি বা স্থানান্তর করলে ৩ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। অনলাইনে চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন বা অভিবাসনের নামে প্রতারণা করলে ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত হয়েছে।
এছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন পাচারকারীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও আয়-সম্পদ যাচাইয়ে ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। এমনকি মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল এখন পাচার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অপরাধের (যেমন: আঘাত, মাদক পাচার বা যৌন সহিংসতা) বিচারও একই সঙ্গে করতে পারবে, যা আগে আলাদা আদালতে করতে হতো।
বিদেশে অবস্থিত সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী বা সাক্ষীকে হুমকি দিলে ৩ থেকে ৭ বছর এবং আপস করতে বাধ্য করলে ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাচারের শিকার থাকাকালীন ভুক্তভোগী যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো নির্দিষ্ট অবৈধ কাজ (যেমন: জাল পাসপোর্ট বহন বা অনুপ্রবেশ) করে ফেলে, তবে তাকে আসামি হিসেবে গণ্য না করার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ভুক্তভোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রতি ৬ মাস অন্তর প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।
সোর্সঃ বাসস'এ লিখেছেন “তাপসী রাবেয়া আঁখি”
১৫ ফেব, ২০২৬
ছায়া মন্ত্রিসভা, কি এবং কেন?
কেন এই ঘোষণা? জামায়াত নেতা শিশির মনির জানিয়েছেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তারা এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন। অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, সরকারের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বা ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করাই হবে এই ছায়া মন্ত্রিসভার মূল লক্ষ্য। এটি কোনো সমান্তরাল সরকার নয়, বরং সরকারের ভুলত্রুটি ধরা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব করার একটি মাধ্যম।
ছায়া মন্ত্রিসভা কীভাবে কাজ করে? বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ছায়া মন্ত্রিসভার গুরুত্ব অপরিসীম। এদের প্রধান কাজগুলো হলো–সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সরকারের বাজেটের বিপরীতে জনবান্ধব বিকল্প বাজেট তুলে ধরা। প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বা অসংগতি জনগণের সামনে আনা। আর বিরোধী দলের নেতাদের প্রশাসনিকভাবে দক্ষ করে তোলার কাজটাও এর মাধ্যমে সেরে নেয়া যায়।
বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনে কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে এর সরাসরি কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতাও নেই, তবে এটি নৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। তবে উন্নত বিশ্বের যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলোতে এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত।
ছায়া মন্ত্রীরা কি বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান? যুক্তরাজ্যে ছায়া মন্ত্রিসভার নেতাকে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন দেওয়া হয় এবং তাকে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান মর্যাদা দেয়া হয়। তবে বাংলাদেশে যেহেতু ছায়া মন্ত্রিসভার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই, তাই ছায়া মন্ত্রীরা সরকারি কোষাগার থেকে কোনো আর্থিক বা অন্য কোনো ধরনের সুবিধা পাবেন না।
৭ আগ, ২০২৪
সংবিধান কি 'অন্তবর্তীকালীন সরকার'কে বৈধতা দেয়?
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং গণঅভ্যুত্থানের মুখোমুখি হয়ে সোমবার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন পরের দিন সংসদ ভেঙে দেন।
এছাড়া ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হতে যাচ্ছে। আন্দোলনের সমন্বয়কদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে মঙ্গলবার চূড়ান্ত করা হয়। অন্য সদস্যদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেই সরকার গঠন করা হবে।
এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে এই ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোন বিধান নেই বরং এটি শুধুমাত্র নির্বাচিত সরকারকে বৈধতা দেয়। হঠাৎ করে নির্বাচন ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেখানে অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে বৈধ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উল্লখ্য, বর্তমান সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো বিধান নেই কেননা, সংবিধানের ৫৮ ক, ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ এবং ৫৮ঙ এ উল্লিখিত "তত্ত্বাবধায়ক সরকার" এর বিধান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি রায়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩ তম সংশোধনীর দ্বারা বিলুপ্ত করা হয়। .
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বা পরে নির্বাচিত সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। উক্ত নির্বাচত সরকার তখন বিজয়ী রাজনৈতিক দল বা জোটের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রয়াত বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার উদাহরণ উল্লেখ করেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে এই জাতীয় বিধান একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুশীলন করা যেতে পারে তবে ভবিষ্যতে এর সাংবিধানিক বৈধতা প্রয়োজন।
অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল এ প্রসঙ্গে বলেন, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেশ ও জনগণের স্বার্থে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিধান তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে তবে ভবিষ্যতে এর সাংবিধানিক বৈধতা প্রয়োজন। তিনি ১৯৯১ সালে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের অস্থায়ী সরকারের প্রধান হওয়ার নজিরও উল্লেখ করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সামরিক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের পতনের পর গণঅভ্যুত্থানের ফলে পঞ্চম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিন মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ সব দলের ঐক্যমতের মধ্য দিয়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের অধীনে একটি অন্তর্বর্তী বা অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। পরবর্তীতে, অস্থায়ী সরকারকে ১৯৯১ সালে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পঞ্চম সংসদে ১১তম সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়।
১১ জুল, ২০২৪
বাংলাদেশের হিন্দু আইনে ভরণপোষণের অধিকার ও কর্তব্য
ব্যক্তিগত কর্তব্য: একজন হিন্দু পুরুষের ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে সে তার স্ত্রী সহ নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ভরণপোষণ প্রদান করবে তাই তার কোনো সম্পত্তি, পৈতৃক বা অন্যথায় থাকুক বা না থাকুক। সুতরাং এই দায়িত্ব কোন সম্পত্তির দখলের উপর নির্ভরশীল নয়। এটি নির্দিষ্ট সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। একজন হিন্দু পুরুষ, শাস্ত্রীয় আইনের অধীনে, তার স্ত্রী, বৃদ্ধ পিতামাতা এবং নাবালক সন্তানদের ভরণপোষণ প্রদান করার দায়িত্ব রয়েছে।
আইনের শ্রেণীবিভাগ; Classification of Law in Bangladesh
আইনের শ্রেণীবিভাগ:- আইন বিভিন্ন উপায়ে শ্রেণীবদ্ধ করা যেতে পারে তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণীবিভাগ নিম্নরূপ:
ইসলাম, ইসলামী আইন ও শরিয়া
ইসলামী আইন একটি ঐশী বিধানঅএবং এটা শুধুমাত্র একক ও সত্য রব প্রদত্ত বিধান। ইসলাম এটাই নির্দেশনা দেয় যে, বিশ্বাসীরা একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছা এবং আইন মেনে চলবে। যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন,
আইন কাকে বলে? আইনের বৈশিষ্ট্য কি? এবং বাংলাদেশে আইনের উৎস কি?; Definition, Nature and Sources of Law in Bangladesh
আইন মানুষের জীবনের সাথে জড়িত যা মানুষের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই সমাজে, একটি রাষ্ট্রের সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে আইনের প্রয়োজন হয়।সাধারণত আইন একটি দেশের সরকার দ্বারা প্রণীত হয়, যা সমাজে কিভাবে আচার-আচরণ করতে হয় তা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন আইন পাওয়া যায়। বাংলাদেশে, বিভিন্ন ধরনের আইন রয়েছে যেগুলি আলোচনা করা হবে।