৪ নভে, ২০২৬

রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় ১৯ নভেম্বর ঘোষণা করবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত

 ছবি: সংগৃহীত 
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়ার করা ঐতিহাসিক মামলার রায় আগামী ১৯ নভেম্বর ঘোষণা করতে যাচ্ছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। এই রায়ের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত পিস প্যালেসে ১৯ নভেম্বর স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় প্রকাশ্য অধিবেশনে রায় ঘোষণা করা হবে। আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারক ইওয়াসাওয়া ইউজি রায়টি পাঠ করবেন।

মামলার পটভূমি

২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলাটি দায়ের করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। দেশটির অভিযোগ, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর পরিচালিত অভিযান ছিল পরিকল্পিত গণহত্যার অংশ।

ওই অভিযানের সময় হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে। সহিংসতার মুখে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে।

জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক তথ্যানুসন্ধান মিশনও ওই অভিযানে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। তবে মিয়ানমার সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির দাবি, সেনাবাহিনীর অভিযান ছিল সন্ত্রাসবিরোধী বৈধ কার্যক্রম।

গাম্বিয়ার আবেদন ও আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশনা

গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে মিয়ানমারকে ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের অধীন দায়বদ্ধতা লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ঘোষণা করার আবেদন জানিয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর নিশ্চয়তা দেওয়ার নির্দেশনা চেয়েছে দেশটি।

মামলাটির প্রাথমিক পর্যায়ে ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সংরক্ষণ এবং এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপের প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে মিয়ানমার আদালতের এখতিয়ার ও মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি জানায়। তবে ২০২২ সালের ২২ জুলাই আদালত রায়ে জানিয়ে দেন, মামলাটি শুনানির এখতিয়ার তাদের রয়েছে এবং গাম্বিয়ার আবেদন গ্রহণযোগ্য।

পরবর্তীতে উভয় দেশ লিখিত বক্তব্য ও পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করে। কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, স্লোভেনিয়া, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, বেলজিয়াম ও আয়ারল্যান্ডসহ মোট ১১টি দেশ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়েছে।

গণহত্যা প্রমাণে কঠোর আইনি মানদণ্ড

আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণের জন্য শুধু হত্যা, নির্যাতন কিংবা নিপীড়নের ঘটনা প্রতিষ্ঠা করাই যথেষ্ট নয়। বরং প্রমাণ করতে হয়, কোনো জাতীয়, নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট অভিপ্রায় নিয়ে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদে এই বিশেষ অভিপ্রায়কে গণহত্যার অন্যতম অপরিহার্য উপাদান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে মামলাটির রায়ে গণহত্যার অভিযোগের পাশাপাশি মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

রায়ের আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ইতিহাসে গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলায় এটি হবে মাত্র তৃতীয় রায়। এক দশকেরও বেশি সময় পর এ ধরনের মামলায় আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রায় ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে বিচারাধীন অন্যান্য গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধ নিষ্পত্তি করে এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীন রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে। এটি কোনো ব্যক্তির ফৌজদারি বিচার করে না। আদালতের রায় চূড়ান্ত এবং এর বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের জন্যও মামলাটির রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন এখনো নিশ্চিত হয়নি। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারিক মূল্যায়ন এবং মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় দায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স।




শেয়ার করুন

0 coment rios: