![]() |
| সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৪২ ধারা সম্পর্কিত | সিভিল রিভিশন নং ৫৬১৭/২০২৪ | মতিউর রহমান বনাম শাহানাজ বেগম| রায়: ৬ আগস্ট ২০২৬। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায় প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ |
বিচারপতি মো. শোহরাওয়ার্দী ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট এ রায় দেন। আদালত মতিউর রহমান বনাম শাহানাজ বেগম, সিভিল রিভিশনের রুল অ্যাবসলিউট ঘোষণা করে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জমি বণ্টনের জন্য মামলা দায়েরের সুযোগ দেন।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার বাদী মতিউর রহমান দাবি করেন, তিনি ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ আবদুল গণির কাছ থেকে ১৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। তাঁর অভিযোগ, ২০০৯ সালের ২৭ এপ্রিল বিবাদী শাহানাজ বেগমের স্বামী কামাল আহমেদ তাঁকে ওই জমি থেকে উচ্ছেদ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি স্বত্ব ঘোষণাসহ খাস দখল পুনরুদ্ধারের জন্য ২০১১ সালে ময়মনসিংহের সংশ্লিষ্ট আদালতে অন্য শ্রেণির মামলা নং ৩১৫/২০১১ দায়ের করেন।
অন্যদিকে, বিবাদী শাহানাজ বেগম দাবি করেন, তিনি ১৯৯৭ সালে দুটি দলিলের মাধ্যমে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। ওই জমিতে তিনি বাড়ি নির্মাণ করেন এবং বিদ্যুৎ-সংযোগ গ্রহণসহ জমির খাজনা ও কর পরিশোধ করেন। তাঁর স্বামীর পক্ষেও অতিরিক্ত ৯ শতাংশ জমি ক্রয়ের দাবি করা হয়।
২০১৪ সালে বিচারিক আদালত বাদীর পক্ষে রায় ও ডিক্রি দেন। পরবর্তীতে অতিরিক্ত জেলা জজ, আদালত নং ১, ময়মনসিংহ ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর আপিল খারিজ করে বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এরপর ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করা হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট মামলার নথি ও উপস্থাপিত প্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখতে পান, বিরোধীয় ৭৮ শতাংশ জমির স্বত্বের ধারাবাহিকতা এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমির প্রকৃত বণ্টন স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জমিটি সিএস দাগ নং ২৭৩৬-এর অন্তর্ভুক্ত।
আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, জমির পূর্ববর্তী মালিক বাজিত শেখের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কে কতটুকু জমির মালিক, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যথাযথ বণ্টন ছাড়া অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তির নির্দিষ্ট সীমানাবিশিষ্ট অংশের ওপর একক স্বত্বের দাবি নিষ্পত্তি করতে গেলে অন্য সহশরিকদের অধিকারও বিবেচনায় নিতে হয়।
আদালত আরও লক্ষ্য করেন, এসএ খতিয়ানে জমির পূর্ববর্তী মালিক জামিরুদ্দিন শেখের তিন কন্যা—সুরমান, জারিমন ও কারিমনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ তাঁরা ১৯৬৬ সালে একটি দলিলের মাধ্যমে তাঁদের ১০ শতাংশ জমি ভাই বোহর্দি শেখের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
হাইকোর্টের মতে, খতিয়ানে কারও নাম থাকা বা না-থাকা একাই জমির স্বত্ব সৃষ্টি কিংবা বিলুপ্ত করে না। জমির প্রকৃত স্বত্ব নির্ধারণে দলিল, উত্তরাধিকার, স্বত্বের ধারাবাহিকতা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
দখল প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ নথি
বিবাদী শাহানাজ বেগমের পক্ষে জমি ক্রয়ের দলিল, খতিয়ান, খাজনা পরিশোধের রসিদ, বিদ্যুৎ-সংযোগ এবং বিদ্যুৎ বিলের মতো নথি উপস্থাপিত হয়েছিল। আদালত এসব নথিকে তাঁর দখলের দাবির সমর্থনে প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচনা করেন।
অন্যদিকে, বাদী মতিউর রহমান জমির ওপর তাঁর পূর্ববর্তী দখল এবং পরবর্তীতে তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি বলে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
আদালতের দৃষ্টিতে, কেবল স্বত্বের দাবি উত্থাপন করলেই দখল পুনরুদ্ধারের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। সংশ্লিষ্ট জমির ওপর বাদীর স্বত্বের ভিত্তি, পূর্ববর্তী দখল এবং দখলচ্যুত হওয়ার বিষয়গুলোও যথাযথ প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
আইনি ভিত্তি ও পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৪২ ধারার আলোকে স্বত্ব ঘোষণার দাবির বিষয়টি বিবেচনা করেন। অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতকে সংশ্লিষ্ট সহশরিকদের অধিকার এবং জমির বণ্টনসংক্রান্ত অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হয়।
এ বিষয়ে আদালত পূর্ববর্তী কয়েকটি সিদ্ধান্তের উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- Enjaheruddin Mia alias Md. Enjaheruddin Mia v. Mohammad Hossain, (1998) 18 BLD (AD) 77; 50 DLR (AD) 84।
- Jahangir Alam and others v. Sabdir Ahmed and others, 22 BLC (AD) 75।
উল্লিখিত সিদ্ধান্তগুলোর আলোকে অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশের ওপর অধিকার দাবি করার ক্ষেত্রে যথাযথ বণ্টন এবং প্রয়োজনীয় পক্ষগুলোর উপস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করা হয়।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট মনে করেন, বিরোধীয় ৭৮ শতাংশ জমির স্বত্ব নির্ধারণের আগে বাজিত শেখের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমির অংশ ও বণ্টনসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। জমির স্বত্বের ধারাবাহিকতা এবং সহশরিকদের অধিকার যথাযথভাবে নির্ধারণ না করে নির্দিষ্ট অংশের ওপর স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের দাবি মঞ্জুর করা সমীচীন নয়।
ফলে আদালত সিভিল রিভিশনের রুল অ্যাবসলিউট ঘোষণা করেন এবং নিম্ন আদালতগুলোর রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জমির বণ্টন চেয়ে উপযুক্ত মামলা দায়েরের সুযোগ দেন।
আইনি শিক্ষা
এই রায় থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়—
১. অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে বিরোধ হলে স্বত্বের ধারাবাহিকতা ও উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ জরুরি।
২. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জমির বণ্টন সম্পন্ন না করে নির্দিষ্ট সীমানার অংশের ওপর একক স্বত্ব ঘোষণা চাওয়া আইনগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
৩. খতিয়ান একাই জমির চূড়ান্ত স্বত্বের প্রমাণ নয়; দলিল, উত্তরাধিকার ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণও বিবেচনা করতে হয়।
৪. দখল পুনরুদ্ধারের দাবিতে পূর্ববর্তী দখল ও দখলচ্যুত হওয়ার বিষয়টি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সারকথা: অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে স্বত্ব ও দখলের বিরোধ নিষ্পত্তির আগে সহশরিকদের অধিকার, স্বত্বের ধারাবাহিকতা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জমির বণ্টন নির্ধারণ করতে হবে।
বিডিলপোস্ট/মাসুম

0 coment rios: