![]() |
| রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯০৮ এর ৬০ ধারা এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন এর ৩৯ ধারা সম্পর্কিত |
বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চ মো. ইব্রাহিম ও অন্যান্য বনাম মো. ফজলুর রহমান মামলায় গত ২৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। মামলাটি সিভিল রিভিশন নম্বর ৮৫৪, ২০২৪ হিসেবে নিষ্পত্তি হয়। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার বাদী মোছা. আয়জান বিবি ছিলেন বিবাদী মো. ফজলুর রহমানের মা। তাঁর দাবি ছিল, ৮৫ বছর বয়সে অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর অজ্ঞাতে বিভিন্ন কাগজে টিপসই নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, ২০১০ সালের ২৫ জুলাই সম্পাদিত ৬৮৯৬ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তাঁর ৭৭ শতাংশ জমি ছেলের নামে হেবা করা হয়েছে।
বাদী দাবি করেন, তিনি স্বেচ্ছায় ওই জমি হেবা করেননি। এ কারণে দলিলটি বাতিলের আবেদন জানিয়ে ২০১১ সালে মামলা করেন।
অন্যদিকে, বিবাদী দাবি করেন, তাঁর মা সুস্থ অবস্থায় স্বেচ্ছায় দলিলটি সম্পাদন ও নিবন্ধন করেছিলেন এবং জমির দখলও তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
২০১১ সালের অন্য শ্রেণির দেওয়ানি মামলাটি ২০২২ সালের ৩১ মে বিচারিক আদালত খারিজ করেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর অতিরিক্ত জেলা জজ, নওগাঁ আপিলেও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করা হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখতে পান, বাদী তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন সময়ে অন্য সন্তান ও তৃতীয় পক্ষের অনুকূলে একাধিক জমির দলিল সম্পাদন করেছিলেন। বিতর্কিত দলিলের পরও তিনি অন্য দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তর করেন। এসব দলিলের সম্পাদন ও নিবন্ধন নিয়ে পক্ষগুলো আপত্তি তোলেনি।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, দলিল লেখক সাক্ষ্যে বলেছেন, তিনি বাদীকে দলিল পড়ে শুনিয়েছিলেন এবং এরপর তিনি টিপসই দেন। দলিল শনাক্তকারী সাক্ষীও নিবন্ধনের সময় বাদীকে শনাক্ত করার কথা জানান।
আদালতের মতে, বাদী বিতর্কিত দলিল বা সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের টিপসই রেজিস্টারে তাঁর টিপসই ছিল না—এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। কেবল দলিল সম্পাদন অস্বীকার করাই দলিল বাতিলের জন্য যথেষ্ট নয়।
নিবন্ধন আইনের ৬০ ধারার গুরুত্ব
হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৬০ ধারা অনুসারে নিবন্ধন সনদ দেওয়া হলে দলিলটি আইনের নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হয়েছে বলে অনুমান করা যায়। তবে এই অনুমান চূড়ান্ত নয়; উপযুক্ত প্রমাণের মাধ্যমে তা খণ্ডন করা সম্ভব।
অর্থাৎ, কোনো পক্ষ নিবন্ধিত দলিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করলে শুধু অস্বীকার করলেই হবে না; দলিলটি যথাযথভাবে সম্পাদন ও নিবন্ধন করা হয়নি—এমন দাবির সমর্থনে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
আদালতের সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট মনে করেন, বিচারিক আদালত ও আপিল আদালত উভয়েই সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ ভুলভাবে পড়া বা বিবেচনা না করার কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
ফলে হাইকোর্ট রিভিশন আবেদনের পক্ষে কোনো যথার্থ কারণ খুঁজে পাননি। আদালত বিধি খারিজ করেন এবং খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি।
আইনি শিক্ষা
এই রায় থেকে স্পষ্ট হয়, নিবন্ধিত দলিল বাতিলের ক্ষেত্রে কেবল অস্বীকার বা অভিযোগ যথেষ্ট নয়। দলিলের সম্পাদন ও নিবন্ধন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা প্রমাণ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দাবিদারের ওপর বর্তায়। একই সঙ্গে নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৬০ ধারার অধীনে নিবন্ধনের নিয়মিততা সম্পর্কে সৃষ্ট অনুমান প্রমাণের মাধ্যমে খণ্ডন করা যায়।
বিডিলপোস্ট/মাসুম

0 coment rios: