![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, ১০০ টাকার কম মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয়মূল্য হলে তৎকালীন আইনের অধীনে নিবন্ধন ছাড়াও দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে বিক্রয় সম্পন্ন হতে পারে।
-এর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ আবদুল আওয়াল ও বিচারপতি এ কে এম রাবিউল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ফার্স্ট আপিল নং- ৭২১/২০১৮ মামলার রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। রায়টি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঘোষণা করা হয়। মামলাটি ছিল আবদুল রেজ্জাক ভূঁইয়া এবং অন্যান্য বনাম আবদুল হোসাইন খান অ্যান্ড আদার্স। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয় ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার ঘটনা
মামলার বিরোধীয় জমি মুন্সিগঞ্জের একটি মৌজায় সি.এস. খতিয়ান নম্বর ৭৭-এর সি.এস. দাগ নম্বর ১২৪৬-এর ২১ শতাংশ জমি। বাদীদের দাবি ছিল, জমিটির মূল মালিক ছিলেন ইসব খাঁ। তাঁর মৃত্যুর পর দুই ছেলে ও এক মেয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে জমিটি পান এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের উত্তরসূরিরা মালিকানা অর্জন করেন। কিন্তু বিভিন্ন জরিপে তাঁদের কয়েকজনের নাম বাদ পড়ে যাওয়ায় তাঁরা স্বত্ব ঘোষণার জন্য মামলা করেন।
অন্যদিকে বিবাদীদের দাবি, ইসব খাঁ ১৯১৮ সালে ৮৫ টাকা মূল্যে ২১ শতাংশ জমি আমির ভূঁইয়া ওরফে ফেলু ভূঁইয়ার কাছে বিক্রি করেন এবং তাঁকে দখলও বুঝিয়ে দেন। পরবর্তীতে ওই জমি নিয়ে ১৯২০ সালের বন্ধকী দলিল এবং ১৯২৬ সালের কবুলিয়ত দলিল সম্পাদিত হয়। বিবাদীদের পূর্বসূরিদের নামে এসএ ও আরএস খতিয়ানও প্রকাশিত হয়।
বাদীরা ১৯১৮ সালের বিক্রয় দলিলটিকে জাল ও বানোয়াট দাবি করেন। কিন্তু বিবাদীরা দীর্ঘদিনের দখল, পুরোনো দলিল এবং সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে নিজেদের মালিকানা দাবি করেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট দেখতে পান, বিবাদীরা ১৯২৪ সালের একটি নিবন্ধিত হেবা-বিল-এওয়াজ দলিলসহ ১৯১৮, ১৯২০ ও ১৯২৬ সালের একাধিক পুরোনো দলিল আদালতে উপস্থাপন করেছেন। ১৯২৪ সালের দলিল থেকে দেখা যায়, ইসব খাঁর ছেলে আবদুল আজিজ তাঁর পিতার জীবদ্দশাতেই মারা যান। ফলে তৎকালীন প্রযোজ্য মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের অধীনে আবদুল আজিজের ছেলে জুলমত খাঁ সরাসরি দাদার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে অংশ পাওয়ার অধিকারী ছিলেন না।
আদালত আরও বলেন, ১৯১৮ সালের দলিলে জমির মূল্য ৮৫ টাকা দেখানো হয়েছে, যা তৎকালীন ১০০ টাকার নিবন্ধনসীমার নিচে ছিল। দলিলের মাধ্যমে দখল হস্তান্তরও হয়েছিল। তাই তৎকালীন সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ৫৪ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধন ছাড়াও দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে বিক্রয়টি আইনগতভাবে সম্পন্ন হতে পারে।
সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারার প্রয়োগ
রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৯০ ধারা নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যা। হাইকোর্ট বলেন, ৩০ বছরের বেশি পুরোনো কোনো দলিল যথাযথ হেফাজত থেকে আদালতে উপস্থাপন করা হলে দলিলটির সম্পাদন ও সত্যতা সম্পর্কে আদালত আইনগত অনুমান করতে পারেন। ফলে এ ধরনের পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে সম্পাদন প্রমাণের জন্য দলিলের সাক্ষীদের আনুষ্ঠানিকভাবে হাজির করা আবশ্যক নয়।
আদালত অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার (রেভিনিউ) বনাম মো. রিয়াজউদ্দিন পিকে অ্যান্ড আদার্স, ৫ বিএলসি (এডি) ৭৬ মামলার নীতিও উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, যথাযথ হেফাজত থেকে ৩০ বছরের বেশি পুরোনো দলিল উপস্থাপন করা হলে সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারায় তার সত্যতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়।
এ মামলায় ১৯২০ ও ১৯২৬ সালের দলিলগুলো সরকারি রেজিস্ট্রেশন ভলিউম বা বালাম বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। আদালত বলেন, শতবর্ষের কাছাকাছি পুরোনো দলিলে তারিখ বা বাংলা-ইংরেজি তারিখের সামান্য অসঙ্গতি থাকলেই সেটিকে জাল বলা যায় না। এমন সামান্য ত্রুটি সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারার আইনগত অনুমানকে খণ্ডন করে না।
শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা গ্রহণযোগ্য নয়
হাইকোর্ট আরও বলেন, বাদীরা যদি জমির দখলে না থাকেন এবং দখল পুনরুদ্ধারের মতো পরবর্তী প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা করা যায় না। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন , ১৮৭৭-এর ৪২ ধারার প্রোভাইসো অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরবর্তী প্রতিকার না চাওয়া হলে এমন মামলা আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
আদালতের মতে, বাদীরা দীর্ঘ সময় ধরে জমির দখলের বাইরে ছিলেন এবং প্রায় ৯০ বছর পর ২০০৯ সালে ১৯১৮ ও ১৯২০ সালের লেনদেনকে চ্যালেঞ্জ করেন। অথচ দখল পুনরুদ্ধারের কোনো প্রতিকার চাননি। এ কারণে মামলাটি শুধু এ কারণেও আইনগতভাবে টেকসই ছিল না।
রায়
সবশেষে হাইকোর্ট বলেন, বিচারিক আদালত মামলার তথ্য, পরিস্থিতি ও প্রমাণ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং আইনগতভাবে টেকসই নয় এমন ডিক্রি দিয়েছেন। ফলে ফার্স্ট আপিল নং- ৭২১/২০১৮ মঞ্জুর করা হয়।
এর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ, প্রথম আদালতের টাইটেল স্যুট নং- ১৮৭/২০০৯ মামলায় ৮ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করা হয়েছে। আপিলটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিত্তিতে ১–১৪ নম্বর বিবাদীর বিরুদ্ধে এবং অন্যদের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে মঞ্জুর করা হয়।
বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম

0 coment rios: