১৯ অক্টো, ২০২৬

সরকারি সংস্থার দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার ফলে আপিল দায়েরে বিলম্ব হলে সন্তোষজনক কারণ (Sufficient Cause) বিবেচনায় মওকুফ করা যায়: হাইকোর্ট

তামাদি আইনের ৫ দ্বারায় বিলম্ব মওকুফ সংক্রান্ত  

সরকারি সংস্থার প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার কারণে আপিল দায়েরে বিলম্ব হলে, যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করা সাপেক্ষে তা মওকুফ করা যেতে পারে বলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি মামলায় আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মওকুফ করে আদালত বলেছেন, মামলার গুণাগুণ বিবেচনার সুযোগ দিতে যথাযথ ক্ষেত্রে কারিগরি ত্রুটির চেয়ে ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সিভিল রিভিশন নাম্বার ৪৬৮৬/২০০৪, বাংলাদেশ রেলওয়ে বনাম শফিকুল ইসলাম, মামলায় এ রায় দেন। আদালত লালমনিরহাটের জেলা জজ আদালতের বিলম্ব মওকুফের আবেদন খারিজের আদেশ বাতিল করে বাংলাদেশ রেলওয়ের আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মওকুফ করেন।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, শফিকুল ইসলাম ২০০২ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও অন্যান্য বিবাদীর বিরুদ্ধে লালমনিরহাটের সহকারী জজ আদালতে আদার স্যুট নাম্বার ৬৮/২০০২ দায়ের করেন। তাঁর আবেদনের মূল বক্তব্য ছিল, আদার স্যুট নাম্বার ১১৭/১৯৯৪ মামলায় ১৯৯৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া রায় ও ডিক্রি (ডিক্রি স্বাক্ষরিত হয় ৫ অক্টোবর ১৯৯৭) তাঁর বিরুদ্ধে যোগসাজশমূলক এবং তাঁর ওপর বাধ্যকর নয়।

বিচার শেষে ২০০৩ সালের ২৪ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট আদালত শফিকুল ইসলামের পক্ষে রায় ও ডিক্রি দেন। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ে লালমনিরহাটের জেলা জজ আদালতে আপিল নাম্বার ২৮/২০০৪ দায়ের করে। তবে আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব হওয়ায় তামাদি আইন, ১৯০৮-এর ৫ ধারায় বিলম্ব মওকুফের আবেদন করা হয়।

জেলা জজ ২০০৪ সালের ১ আগস্ট আবেদনটি খারিজ করেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট আবেদনপত্র, নিম্ন আদালতের নথি এবং বিলম্ব মওকুফের আবেদন পর্যালোচনা করে দেখতে পান, জেলা জজ বিলম্বের কারণ যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই আবেদনটি খারিজ করেছিলেন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে আদালতকে জানায়, রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আইন উপদেষ্টার মতামত নেওয়া, প্রয়োজনীয় ব্যয় বরাদ্দ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং আইনজীবীর মাধ্যমে আপিলের স্মারকলিপি ও বিলম্ব মওকুফের আবেদন প্রস্তুত করতে সময় লেগেছিল। এসব দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার কারণেই ১৬৮ দিনের বিলম্ব ঘটে।

আদালতের মতে, একটি সরকারি সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিলম্বের ব্যাখ্যা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। হাইকোর্টের কাছে বাংলাদেশ রেলওয়ের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক মনে হয়েছে এবং তা তামাদি আইনের ৫ ধারায় বর্ণিত ‘যথেষ্ট কারণ’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে।

পূর্ববর্তী নজিরের আলোকে সিদ্ধান্ত

আদালত বাংলাদেশ বনাম জাহেরউদ্দিন, ১৯৮৬ বিএলডি (এডি) ১৮০ মামলায় আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেন। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, সরকার কোনো বিশেষ সুবিধা ভোগ করে না; তবে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন ধাপের কারণে যথাযথ পরিস্থিতিতে বিলম্ব বিবেচনার সুযোগ থাকতে পারে। সরকার ও সাধারণ মামলাকারীর ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড একই থাকবে।

এ ছাড়া সরকার বনাম আলাউদ্দিন, ৬ বিএলসি (এডি) ১০১ মামলার নীতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের কালেক্টর, ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন, আনান্টনাগ বনাম মিসেস কাটিজি, এআইআর ১৯৮৭ এসসি ১৩৫৩ মামলায় গৃহীত উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের ৫৯ ডিএলআর (এডি) ১ মামলায় অনুমোদিত নীতিগুলোর প্রতিও আদালত গুরুত্ব দেন।

এসব নজিরের আলোকে আদালত বলেন, বিলম্ব মওকুফের ক্ষেত্রে যান্ত্রিক বা অতিরিক্ত কারিগরি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত নয়। বিলম্বের পেছনে যথেষ্ট কারণ থাকলে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন হলে মামলাটি মেরিটস বা প্রকৃত গুণাগুণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া উচিত।

আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট মনে করেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিলম্বের ব্যাখ্যা যথেষ্ট ছিল এবং জেলা জজ আইন ও মামলার পরিস্থিতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই হাইকোর্ট রুল মঞ্জুর করে জেলা জজের ২০০৪ সালের ১ আগস্টের আদেশ বাতিল করেন এবং আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মওকুফ করেন।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আপিল আদালতকে সব পক্ষকে অবহিত করে দ্রুত আইন অনুযায়ী আপিলটি নিষ্পত্তির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, আপিলটি ২০০৪ সালে দায়ের করা হয়েছিল। মামলায় খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি এবং পূর্বে দেওয়া অন্তর্বর্তী আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

আইনি শিক্ষা

এই রায় থেকে প্রতীয়মান হয়, তামাদি আইনের ৫ ধারায় বিলম্ব মওকুফের আবেদন বিবেচনার সময় বিলম্বের কারণ ও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। সরকারি সংস্থার দাপ্তরিক প্রক্রিয়া বিলম্বের ব্যাখ্যার অংশ হতে পারে, তবে কেবল সরকারি সংস্থা হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলম্ব মওকুফের অধিকার সৃষ্টি হয় না।

বিলম্বের যথেষ্ট কারণ প্রতিষ্ঠিত হলে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন হলে আপিলের গুণাগুণ বিবেচনার সুযোগ দেওয়াই আদালতের দায়িত্ব। তবে প্রতিটি মামলায় বিলম্বের ব্যাখ্যা নিজস্ব তথ্য ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।

বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম



শেয়ার করুন

0 coment rios: