১৯ অক্টো, ২০২৬

সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি থাকলেই অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণিত হয় না: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
শুধু সরকারি অর্থের ঘাটতি বা ক্ষতি প্রমাণিত হলেই অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; অর্থের ওপর অভিযুক্তের ন্যস্ত দায়িত্ব ও অসৎভাবে আত্মসাতের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে।

সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি পাওয়া গেলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অর্থ আত্মসাতের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, সরকারি অর্থের ঘাটতি বা ক্ষতির প্রমাণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট অর্থ অভিযুক্তের জিম্মায় বা নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে তা আত্মসাৎ করেছেন—এ বিষয়গুলোও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর একক বেঞ্চ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। রায়ে আদালত লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতির ঘটনায় দণ্ডিত ডাক বিভাগের কর্মচারী মো. ওমর ফারুকের আপিল মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে তাঁকে অভিযোগ থেকে খালাস দেন।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরের নিয়মিত পোস্টমাস্টার ছুটিতে থাকাকালে ওমর ফারুক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিয়মিত পোস্টমাস্টার দায়িত্বে ফিরে এলে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি তাঁর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা থাকলেও ওমর ফারুক পরে দায়িত্ব দেবেন বলে জানান এবং একপর্যায়ে অফিস থেকে চলে যান। পরবর্তী সময়ে ডাকঘরে নগদ অর্থ ও অন্যান্য হিসাবের তালিকা প্রস্তুত করে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতি পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫ ধারায় মামলা হয়। ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিশেষ জজ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।

আপিলের শুনানিতে হাইকোর্ট দেখতে পান, ডাকঘরে অর্থের ঘাটতি থাকার বিষয়টি সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে এলেও ওই অর্থ অভিযুক্তের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং তিনি তা অসৎ উদ্দেশ্যে আত্মসাৎ করেছেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি। মামলায় ৯ লাখ টাকা লালমনিরহাট প্রধান ডাকঘর থেকে গ্রহণের কথা বলা হলেও তা আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাবের এন্ট্রি বা প্রেরণের নথি পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তাও স্বীকার করেন, ওই অর্থ প্রকৃতপক্ষে আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, একজন গ্রাহকের তিন লাখ টাকা জমা দেওয়ার লেনদেনের প্রমাণ থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিগতভাবে ওই অর্থ গ্রহণ বা আত্মসাৎ করেছিলেন, তা প্রমাণিত হয়নি। দায়িত্ব হস্তান্তর না করে অফিস ত্যাগ করা কিংবা অর্থের ঘাটতির সময় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা সন্দেহের কারণ হতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট অর্থের সঙ্গে অভিযুক্তের অসৎ আত্মসাতের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা না হলে তা দণ্ডাদেশের জন্য যথেষ্ট নয়। আদালতের মতে, অর্থের ঘাটতি প্রমাণ করা এবং সেই অর্থ অসৎভাবে আত্মসাৎ করা প্রমাণ করা দুটি পৃথক বিষয়।

এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দেন, মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারার অপরাধের অপরিহার্য উপাদান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে আপিল মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল এবং অভিযুক্তকে খালাস দেওয়া হয়।

মামলার বিবরণ: মো. ওমর ফারুক বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য, ফৌজদারি আপিল নং ৭৭১২/২০১৪; রায়ের তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

আইনি তাৎপর্য: এ রায় ফৌজদারি বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে—সরকারি অর্থের ঘাটতি বা হিসাবের অসংগতি থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মসাতের অপরাধে পরিণত হয় না। অভিযুক্তের কাছে অর্থের ন্যস্ততা বা নিয়ন্ত্রণ এবং তাঁর অসৎ আত্মসাতের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।


বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: