১৯ অক্টো, ২০২৬

জাল ও সন্দেহজনক দলিলের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি গ্রহণযোগ্য নয়

আগের নিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের নির্দেশ হাইকোর্টের
জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধে আগের নিবন্ধিত দলিল, মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য এবং জমির সুনির্দিষ্ট সীমানার প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন, সন্দেহজনক ও জালিয়াতিপূর্ণ বায়নাপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তী দলিলের মাধ্যমে জমির ওপর অগ্রাধিকার দাবি করা যায় না। মামলার সামগ্রিক সাক্ষ্য-প্রমাণে বাদীর স্বত্ব, পূর্ববর্তী দখল ও পরবর্তী সময়ে বেদখল হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে তিনি স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি পেতে পারেন।

বিচারপতি মো. আলী রেজা ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫ এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮ একসঙ্গে নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট এ রায় দেন।

মামলার পটভূমি

মামলার বাদী ১৯৭৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এলাকার দুই শতক জমি ক্রয় করেন বলে দাবি করেন। জমি কেনার পর সেখানে টিনশেড ঘর নির্মাণ করে ওষুধের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বাদীর অভিযোগ, ১৯৭৭ সালের ৭ জানুয়ারি বিবাদীরা তাঁর ঘর ভেঙে তাঁকে জমি থেকে উচ্ছেদ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি জমির দখল ফিরে পেলেও ১৯৭৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আবারও বেদখল হন।

অন্যদিকে, বিবাদীদের দাবি ছিল, তাঁরা ১৯৭৪ সালে জমির মালিকের সঙ্গে বায়নাপত্র সম্পাদন করেন এবং পরবর্তী সময়ে জমির দলিল নিবন্ধন করে দখল নেন। তাঁরা বাদীর দলিলকে জাল ও প্রতারণামূলক দাবি করেন।

এ বিরোধে বাদী ১৯৮৫ সালে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারিক ও আপিল আদালত ঘুরে হাইকোর্ট বিভাগে আসে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, বাদীর সাক্ষীরা জমিতে তাঁর পূর্ববর্তী দখল এবং পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদের বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। জেরায় তাঁদের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য কোনো অসংগতি বের করতে পারেননি বিবাদীরা। বাদীর মূল নিবন্ধিত দলিল, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং জমির সীমানাসংক্রান্ত নথিপত্র তাঁর দাবিকে সমর্থন করেছে।

অন্যদিকে, বিবাদীদের দাখিল করা বায়নাপত্রে একাধিক সন্দেহজনক বিষয় পাওয়া যায়। দলিলের লেখার কালি ও সাক্ষীদের স্বাক্ষরের কালির মধ্যে পার্থক্য ছিল। বায়নাপত্রে ১৯৭১ সালের আদালতের সিল পাওয়া গেলেও সেটি সম্পাদনের তারিখ ছিল ১৯৭৪ সাল। এসব অসংগতি এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত বায়নাপত্রটিকে পরবর্তী সময়ে তৈরি ও জালিয়াতিপূর্ণ বলে মনে করেন।

বিবাদীদের পরবর্তী নিবন্ধিত দলিলেও সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। দলিলে কথিত বায়নাপত্রের উল্লেখ ছিল না এবং স্ট্যাম্প ক্রয় ও নিবন্ধনসংক্রান্ত কিছু অসংগতির সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। আদালতের মতে, এসব দলিল বিবাদীদের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

জমির সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণের গুরুত্ব

বিবাদীরা দাবি করেছিলেন, মামলার জমির সীমানা সুনির্দিষ্ট নয়। তবে হাইকোর্ট বলেন, আরজির তফসিল, বাদীর দলিল, সাক্ষীদের জবানবন্দি, কমিশনারের প্রতিবেদন এবং মামলার নকশা থেকে জমির পরিচয় ও সীমানা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে ইস্যু করা চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত বিএস খতিয়ানেও জমিটি বাদীর নামে রেকর্ড করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে সমর্থিত হলে এ ধরনের চূড়ান্ত রেকর্ডের প্রমাণমূল্য রয়েছে।

আগের নিবন্ধিত দলিলের অগ্রাধিকার

হাইকোর্ট বলেন, কেবল আগের একটি অনিবন্ধিত বায়নাপত্রের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বাদীর আগের নিবন্ধিত দলিলের চেয়ে অগ্রাধিকার দাবি করা যায় না। এ মামলায় বাদীর দলিল আগে নিবন্ধিত হয়েছে এবং তাঁর স্বত্ব, পূর্ববর্তী দখল ও পরবর্তী সময়ে বেদখল হওয়ার বিষয়টি যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বাদীর স্বত্বের দাবিই গ্রহণযোগ্য।

হাইকোর্টের রায়

হাইকোর্ট নিম্ন আদালতগুলোর সংশ্লিষ্ট রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫-এর রুল যথাযথ ঘোষণা করা হয় এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮-এর রুল খারিজ করা হয়।

একই সঙ্গে আদালত বাদীর পক্ষে জমির স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি দেন। বিবাদী ১ ও ২-কে রায় ও আদেশের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে জমির সব বাধা অপসারণ করে বাদীকে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় বাদী আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমির দখল পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।

মামলার বিবরণ

মামলার নাম: ড. আশরাফ হোসেন (মৃত), তাঁর আইনগত উত্তরাধিকারীগণ বনাম হাজী আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ও অন্যান্য

মামলার নম্বর: সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫ এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮

বিচারপতি: বিচারপতি মো. আলী রেজা

রায়ের তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রায় প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬


বিডি ল' পোস্ট/মাসুম



শেয়ার করুন

0 coment rios: