৪ অক্টো, ২০২৬

যৌতুক মামলায় সাক্ষীদের বক্তব্যে অসঙ্গতি, সন্দেহের সুবিধায় আসামির খালাস: হাইকোর্টের রায়

  বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
যৌতুক দাবির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য থাকায় আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের দায়িত্ব প্রসিকিউশনের। সাক্ষ্য-প্রমাণে যুক্তিসংগত সন্দেহ সৃষ্টি হলে তার সুবিধা আসামিকে দিতে হবে।

হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. বশির উল্লাহ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ক্রিমিনাল রিভিশন নং- ২৬৫৪/২০২৫ মামলার রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। মামলাটি ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থানার সি.আর. মামলা নং ৬৪/২০২২-এ যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারায় দেওয়া সাজা সংক্রান্ত। মামলার রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৪ অক্টোবর, ২০২৬।

মামলার ঘটনা:

মামলার বাদীর সঙ্গে আসামি মো. রাবিউল ইসলামের বিয়ে হয় ২০১০ সালের ৩০ জুন। তাদের দুই সন্তান রয়েছে। বাদীপক্ষের অভিযোগ ছিল, বিয়ের সময় চার লাখ টাকা দেওয়ার পর আসামি আরও তিন লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। পরে দুই লাখ টাকা দেওয়া হলেও ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার তিন লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। দাবি পূরণ না করায় বাদীকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

এ ঘটনায় ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারায় মামলা করা হয়। বিচার শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তৃতীয় আদালত ৩১ মে ২০২৩ আসামিকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দায়রা জজ আদালত ৮ নভেম্বর ২০২৩ আপিলটি খারিজ করে নিম্ন আদালতের সাজা বহাল রাখেন।

হাইকোর্টে আসামির বক্তব্য:

হাইকোর্টে আসামিপক্ষ দাবি করে, বাদীর মামলাটি ছিল পূর্বে দায়ের করা একটি মামলার প্রতিশোধমূলক ও হয়রানিমূলক প্রতিক্রিয়া। আসামি এর আগে বাদী ও তার বাবার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় জামিন পাওয়ার পর বর্তমান যৌতুকের মামলা করা হয় বলে দাবি করা হয়।

আসামিপক্ষ আরও দাবি করে, প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য-প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি রয়েছে এবং অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি।

সাক্ষ্য-প্রমাণে যে অসঙ্গতি পেলেন আদালত:

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের বক্তব্যে আসামির ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা এবং সেখানে কতক্ষণ অবস্থান করেছিলেন—এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

বাদী এক বক্তব্যে জানান, আসামি বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে এসেছিলেন এবং বিকেল ৫টা থেকে ৬টার দিকে চলে যান। অন্যদিকে বাদীর বাবা বলেন, আসামি তাদের বাড়িতে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট ছিলেন। ফলে ঘটনার সময় ও আসামির উপস্থিতির বিষয়ে সাক্ষ্যগুলোর মধ্যে মৌলিক অসঙ্গতি রয়েছে বলে আদালত মনে করেন।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের সাক্ষী ডিডব্লিউ-১ জানান, ঘটনার দিন ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ আসামি তার কর্মস্থলে সারাদিন উপস্থিত ছিলেন এবং অফিসের হাজিরা রেজিস্টারে তার উপস্থিতি লিপিবদ্ধ ছিল। জেরায় এ বক্তব্যকে কার্যকরভাবে খণ্ডন করা যায়নি।

আদালতের আইনগত পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট বলেন, প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য-প্রমাণে এমন অসঙ্গতি রয়েছে, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে যুক্তিসংগত সন্দেহ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যৌতুক দাবির কথিত ঘটনার সময়, আসামির উপস্থিতি এবং সেখানে অবস্থানের সময়কাল নিয়ে সাক্ষীদের বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আদালত আরও বলেন, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—প্রসিকিউশনকে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে যুক্তিসংগত সন্দেহ সৃষ্টি হলে সেই সন্দেহের সুবিধা আসামি পাবেন। এ মামলায় প্রসিকিউশন প্রয়োজনীয় মানদণ্ডে অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

আদালতের মতে, আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সময় তিনি তার কর্মস্থলে ছিলেন—এমন প্রতিরক্ষা সাক্ষ্যও প্রসিকিউশন জেরার মাধ্যমে নড়বড়ে করতে পারেনি। একই সঙ্গে আসামি আগে বাদীপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করায় দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ ও শত্রুতার প্রেক্ষাপটও আদালতের বিবেচনায় আসে।

হাইকোর্টের রায়:

সবশেষে হাইকোর্ট রুলটি যথাযথ ঘোষণা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দায়রা জজ আদালতের ৮ নভেম্বর ২০২৩-এর রায় এবং সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ৩১ মে ২০২৩-এর সাজা বাতিল করেন।

একই সঙ্গে আসামি মো. রাবিউল ইসলামকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয় এবং তার জামিননামা অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ফলাফল: রুল যথাযথ; নিম্ন আদালতের সাজা বাতিল; আসামি খালাস।


বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: