![]() |
| বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট |
মামলার তথ্য:
মামলাটি আবদুল রেজ্জাক ভূঁইয়া ও অন্যান্য বনাম আবদুল হোসেন খান ও অন্যান্য, প্রথম আপিল নং- ৭২১/২০১৮। বিচারপতি শেখ আবদুল আওয়াল ও বিচারপতি এ. কে. এম. রাবিউল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রায় দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয় ৪ অক্টোবর ২০২৬।
বিরোধের সূত্রপাত:
মুন্সিগঞ্জের ২১ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। বাদীদের দাবি ছিল, জমিটির মূল মালিক ইসব খাঁ মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা জমির মালিক হন এবং পরবর্তী জরিপে তাঁদের কয়েকজনের নাম ভুলভাবে বাদ পড়ে। এ কারণে তাঁরা স্বত্ব ঘোষণার জন্য মামলা করেন।
অন্যদিকে বিবাদীদের দাবি ছিল, ইসব খাঁ ১৯১৮ সালে ৮৫ টাকার বিনিময়ে একটি অনিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে শেখ ফেলু ভূঁইয়া ওরফে আমির ভূঁইয়ার কাছে জমিটি বিক্রি করেন এবং দখলও বুঝিয়ে দেন। পরবর্তীতে ১৯২০ সালের নিবন্ধিত বন্ধক দলিল ও ১৯২৬ সালের কবুলিয়ত দলিলের মাধ্যমে লেনদেনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:
হাইকোর্ট দেখতে পান, ১৯১৮ সালের বিক্রয় দলিল, ১৯২০ সালের নিবন্ধিত বন্ধক দলিল এবং ১৯২৬ সালের কবুলিয়ত দলিল—সবগুলোই বহু বছরের পুরোনো এবং যথাযথ হেফাজত থেকে আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে।
আদালত বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ৫৪ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সময়ে ১০০ টাকার কম মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে বিক্রয় সম্পন্ন হতে পারত। এখানে ১৯১৮ সালের লেনদেনের মূল্য ছিল ৮৫ টাকা এবং দখলও হস্তান্তর করা হয়েছিল। ফলে নিবন্ধন না থাকলেও লেনদেনটি আইনগতভাবে সম্পন্ন হয়েছিল বলে আদালত মত দেন।
আদালত আরও বলেন, সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৯০ ধারা অনুযায়ী ৩০ বছরের বেশি পুরোনো দলিল যথাযথ হেফাজত থেকে উপস্থাপিত হলে তার সম্পাদন ও সত্যতা সম্পর্কে আদালত আইনগত অনুমান করতে পারে। সংশ্লিষ্ট দলিলগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি রেজিস্ট্রেশন ভলিউম বা বালাম বইয়ের তথ্যও উপস্থাপিত হয়েছিল।
১৯১৮ সালের দলিলে ইংরেজি ও বাংলা তারিখের মধ্যে সামান্য অসঙ্গতি পাওয়া গেলেও হাইকোর্ট এটিকে কারিগরি বা তুচ্ছ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। আদালতের মতে, শতবর্ষ পুরোনো দলিলে ক্যালেন্ডার রূপান্তরের সামান্য ভুল দলিলকে জাল প্রমাণ করে না।
স্বত্ব ঘোষণার মামলায় দখলের গুরুত্ব:
রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৪২ ধারা। আদালত বলেন, বাদী যদি জমির দখলে না থাকেন এবং দখল পুনরুদ্ধারের মতো অতিরিক্ত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা করেন, তাহলে সেই মামলা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এ মামলায় বাদীরা দীর্ঘ সময় ধরে জমির দখলের বাইরে ছিলেন এবং দখল পুনরুদ্ধারের প্রার্থনা না করে শুধু স্বত্ব ঘোষণার দাবি করেছিলেন। ফলে মামলাটি ৪২ ধারার শর্ত দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে আদালত মত দেন।
উত্তরাধিকার প্রশ্নেও আদালতের পর্যবেক্ষণ:
আদালত আরও দেখতে পান, বাদীদের উত্তরাধিকারের দাবির ভিত্তিতে যে বংশতালিকা উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা ১৯২৪ সালের নিবন্ধিত দান-বিনিময় দলিল-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইসব খাঁর পুত্র আবদুল আজিজ তাঁর পিতার জীবদ্দশায় মারা গেলে, তৎকালীন প্রযোজ্য মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে তাঁর পুত্র জুলমত খাঁ সরাসরি ইসব খাঁর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হতে পারেননি।
আইনি শিক্ষা:
১. ৩০ বছরের পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে আইনগত অনুমান:
যথাযথ হেফাজত থেকে উপস্থাপিত প্রাচীন দলিলের সত্যতা ও সম্পাদন সম্পর্কে সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারায় আইনগত অনুমান সৃষ্টি হয়।
২. সামান্য কেরানিগত ভুলে প্রাচীন দলিল বাতিল নয়:
শতবর্ষ পুরোনো দলিলের তারিখ বা ক্যালেন্ডার রূপান্তরের সামান্য অসঙ্গতি একাই দলিলকে জাল প্রমাণ করে না।
৩. বাদীকে নিজের স্বত্বের ভিত্তিতে মামলা প্রমাণ করতে হবে:
বাদী বিবাদীর দলিলের দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে নিজের স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না।
৪. দখলহীন বাদীর শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা গ্রহণযোগ্য নয়:
দখলের বাইরে থাকা বাদীকে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত প্রতিকার, যেমন দখল পুনরুদ্ধার, চাইতে হবে।
৫. চূড়ান্ত খতিয়ানের আইনগত গুরুত্ব রয়েছে:
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৪ক ধারা অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত খতিয়ানের সঠিকতার পক্ষে আইনগত অনুমান থাকে, যা উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করতে হয়।
রায়ের ফলাফল:
হাইকোর্ট আপিলটি মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে মুন্সিগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ, প্রথম আদালতের ৮ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখের রায় ও ডিক্রি বাতিল করে দেন। আপিলটি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১ থেকে ১৪ নম্বর বিবাদীদের বিরুদ্ধে এবং অন্যদের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে মঞ্জুর করা হয়; তবে কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।
বিডিএলপিবি/মাসুম

0 coment rios: