২৩ অক্টো, ২০২৬

গুরুতর অভিযোগ থাকলেই বিচারের পূর্বে অনির্দিষ্টকাল কারাবাস নয়: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, শুধু অভিযোগের গুরুত্বের ভিত্তিতে অনির্দিষ্টকাল বিচার-পূর্ব কারাবাসে রাখা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।
বিচার শেষ হওয়ার আগেই দীর্ঘদিন কারাগারে আটক থাকাকে শাস্তিতে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছেন, আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রেও বিচারাধীন ব্যক্তির ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে।

ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দ্রুত বিচারের অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আদালত এ পর্যবেক্ষণ দেন।

বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি শীল নাগুর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রাজস্থানে ‘জল জীবন মিশন’ প্রকল্পের দরপত্রে শত শত কোটি টাকার অনিয়মসংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত সাবেক কংগ্রেসমন্ত্রী মহেশ চন্দ্র যোশি ও মুকেশ পাঠককে নিয়মিত জামিন দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন।

অভিযোগ গুরুতর হলেও অনির্দিষ্টকাল কারাবাসের ভিত্তি হতে পারে না

আদালত বলেন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশের অভিযোগ গুরুতর এবং সেগুলোর যথাযথ তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জামিনের বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যুক্তিও থাকতে পারে।

তবে অভিযোগের গুরুত্ব যত বেশি হোক না কেন, শুধু সেই কারণে জামিনের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় উপেক্ষা করা যায় না। একইভাবে, বিচার শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাগারে আটক রাখার যৌক্তিকতাও তৈরি হয় না।

আদালত আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বিচার-পূর্ব আটককে বিচার ছাড়াই শাস্তিতে পরিণত হতে দেওয়া হলে তা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দ্রুত বিচারের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হবে।

তদন্ত শেষ, হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন নেই

আদালত উল্লেখ করেন, দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়েছে এবং অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। মামলার অভিযোগের পক্ষে প্রধানত নথিপত্র ও ডিজিটাল প্রমাণের ওপর নির্ভর করছে রাষ্ট্রপক্ষ।

এসব প্রমাণের মধ্যে রয়েছে দরপত্রসংক্রান্ত নথি, সরকারি চিঠিপত্র, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, জব্দ করা মুঠোফোনের ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং আড়ি পেতে ধারণ করা কথোপকথন। এসব আলামত ইতোমধ্যে তদন্তকারী সংস্থার হেফাজতে রয়েছে।

বেঞ্চের মতে, অভিযুক্তদের আর হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ বা নতুন করে কোনো আলামত উদ্ধারের প্রয়োজন নেই। নথিপত্র ও ডিজিটাল প্রমাণ নষ্ট বা পরিবর্তন করার আশঙ্কাও অনেকাংশে দূর হয়েছে।

দীর্ঘ কারাবাস ও বিচার শুরু না হওয়ার বিষয় বিবেচনায়

আদালত দুই অভিযুক্তের কারাবাসের সময়কালও বিবেচনায় নেন। প্রায় ৭২ বছর বয়সী মহেশ চন্দ্র যোশি ২০২৬ সালের ৭ মে থেকে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে ছিলেন। অন্যদিকে, মুকেশ পাঠক ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় আট মাস ধরে কারাগারে আটক ছিলেন।

মামলার বিচার শেষ হতে কত সময় লাগতে পারে, সেটিও জামিন বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে।

আদালত জানান, মামলায় মোট ২২ জন অভিযুক্ত, তিনটি অভিযোগপত্র, রাষ্ট্রপক্ষের ১২৪ জন সাক্ষী এবং প্রায় ২০ হাজার পৃষ্ঠায় বিস্তৃত ১৯২টি নথি রয়েছে। তখনও অভিযোগ গঠন হয়নি এবং বিচার শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া কয়েকজন সহ-অভিযুক্তের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্ত চলছিল এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা কয়েকজন অভিযুক্ত পলাতক ছিলেন। মামলার বিপুল পরিমাণ সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনায় বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আদালত মনে করেন।

সহ-অভিযুক্তদের জামিনও বিবেচনায়

আদালত আরও লক্ষ করেন, একই ঘটনার সূত্রে দায়ের করা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমে দুই অভিযুক্ত জামিন পেয়েছিলেন। বর্তমান মামলার কয়েকজন সহ-অভিযুক্তও জামিন বা অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা পেয়েছিলেন।

সব পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে বেঞ্চ বলেন, অভিযুক্তদের আরও দীর্ঘ সময় বিচার-পূর্ব কারাবাসে রাখার প্রয়োজনীয়তা নেই। রাষ্ট্রপক্ষের যৌক্তিক উদ্বেগগুলো উপযুক্ত জামিনের শর্ত আরোপের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব।

মামলার গুরুত্ব

এই পর্যবেক্ষণে আদালত মূলত স্পষ্ট করেছেন, গুরুতর অভিযোগ থাকলেই বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে অনির্দিষ্টকাল কারাগারে রাখা যায় না। জামিন বিবেচনার ক্ষেত্রে অভিযোগের গুরুত্বের পাশাপাশি তদন্তের অবস্থা, প্রমাণের ধরন, হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা, ইতোমধ্যে ভোগ করা কারাবাস এবং বিচার শেষ হতে সম্ভাব্য সময়ও বিবেচনা করতে হবে।

তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগকে খাটো করে দেখা নয়; বরং বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা।

সূত্র: লাইভ ল' (LiveLaw), ২২ অক্টোবর ২০২৬।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: