২৩ অক্টো, ২০২৬

আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তি হলেই অব্যাহতভাবে আইন পেশা পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত হয় না: কর্ণাটক হাইকোর্ট

এআইবিই পরীক্ষার ফল যাচাই ও অননুমোদিত আইন পেশা শনাক্তে নিয়মিত তদারকির নির্দেশ বার কাউন্সিলকে
ভারতের কর্ণাটক হাইকোর্ট বলেছেন, আইনজীবী হিসেবে বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত হলেই অব্যাহতভাবে আইন পেশা পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত হয় না। আইন পেশা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত অল ইন্ডিয়া বার এক্সামিনেশন (এআইবিই) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত পূরণ করতে হবে। এ ছাড়া, এআইবিই পরীক্ষার ফল যাচাই এবং অননুমোদিতভাবে আইন পেশা পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করতে নিয়মিত তদারকির জন্য রাজ্য বার কাউন্সিলকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

প্রসন্ন কুমার বনাম কর্ণাটক রাজ্য মামলায় গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক আদেশে কর্ণাটক হাইকোর্টের বিচারপতি এইচ. পি. সন্দেশের একক বেঞ্চ এসব পর্যবেক্ষণ দেন।

মামলায় আদালত বলেন, কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়েরের আগে বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলামূলক প্রতিকার গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়। পেশাগত অসদাচরণের বিষয়টি বার কাউন্সিলের এখতিয়ারভুক্ত হলেও, সংশ্লিষ্ট আচরণে স্বতন্ত্রভাবে ফৌজদারি অপরাধের উপাদান থাকলে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার এখতিয়ারও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

মামলার পটভূমি

মামলাটিতে আবেদনকারীর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০, ১২০-বি ও ৫১১ ধারার পাশাপাশি অ্যাডভোকেটস অ্যাক্ট, ১৯৬১-এর ৪৫ ধারায় অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়, তিনি ২০১১ সালে কর্ণাটক স্টেট বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও এআইবিই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে প্রায় এক দশক আইন পেশা পরিচালনা করেছেন।

অভিযোগটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়েরের পর ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৬(৩) ধারায় পুলিশি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে আবেদনকারী হাইকোর্টে মামলা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, অভিযোগগুলো মূলত পেশাগত অসদাচরণসংক্রান্ত, যা বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলামূলক এখতিয়ারের আওতাভুক্ত। এ ছাড়া, তাঁর তালিকাভুক্তির সনদে তালিকাভুক্তিকে অস্থায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি এবং তিনি পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে এআইবিই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

এআইবিই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে আইন পেশার অধিকার স্থগিত হতে পারে

আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী তালিকাভুক্তির দুই বছরের মধ্যে এআইবিই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইন পেশা পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করা প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে আইন পেশা পরিচালনার অধিকার স্থগিত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার মাধ্যমে পুনরায় আইন পেশা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আদালত আরও বলেন, বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা এবং ফৌজদারি আদালতের এখতিয়ার এক নয়। কোনো আচরণে ফৌজদারি অপরাধের উপাদান রয়েছে কি না, তা তদন্ত ও আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

অননুমোদিত আইন পেশার ক্ষেত্রে ৪৫ ধারা প্রয়োগের প্রশ্ন

আদালত উল্লেখ করেন, আইন পেশা পরিচালনার বৈধ অধিকার না থাকা সত্ত্বেও কেউ পেশা পরিচালনা করলে অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের ৪৫ ধারার প্রয়োগের প্রশ্ন উঠতে পারে। একইভাবে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪২০ ধারাসহ অভিযোগে উল্লিখিত অন্যান্য অপরাধের উপাদান পূরণ হয়েছে কি না, তা তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তের বিষয়।

তবে আদালত আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দেননি। বরং অভিযোগের সত্যতা ও অপরাধের উপাদান রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ রেখেছেন।

বার কাউন্সিলকে ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়মিত যাচাইয়ের নির্দেশ

অননুমোদিতভাবে আইন পেশা পরিচালনা প্রতিরোধে আদালত রাজ্য বার কাউন্সিলকে তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ, নির্ধারিত সময়সীমার মেয়াদ পর্যবেক্ষণ, এআইবিই পরীক্ষার ফল যাচাই এবং নিয়মিতভাবে অননুমোদিত আইন পেশা শনাক্ত করার নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে, কোনো আইনজীবীর তথ্যের মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে বলেও আদালত উল্লেখ করেন।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮২ ধারায় দায়ের করা আবেদনটি খারিজ করে দেন এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশকে আইন অনুযায়ী তদন্ত চালিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিলের সুযোগ দেন। তবে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে একটি প্রক্রিয়াগত ত্রুটিও আদালত চিহ্নিত করেন। আদালতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৬(৩) ধারায় তদন্তের জন্য পাঠানো বিচারিক আমল গ্রহণের আগের ধাপ; আমল গ্রহণের পর ওই পদ্ধতি প্রয়োগের বিষয়টি একইভাবে বিবেচনা করা যায় না।

সূত্র: দ্য বার বুলেটিন, ২১ অক্টোবর ২০২৬।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম 



শেয়ার করুন

0 coment rios: