১১ আগ, ২০২৬

যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত 
দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় সংঘটিত গুরুতর অপরাধের দায়ে সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দামেস্কের ফৌজদারি আদালত কর্তৃক অনুপস্থিত থাকা বাশার আল-আসাদকে পরিকল্পিত হত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে এই সাজা দেওয়া হয়।

একই মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন তাঁর ভাই মাহের আল-আসাদ এবং আত্মীয় আতেফ নাজিব। মাহেরের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে আতেফ নাজিবকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাশার আল-আসাদ ও তাঁর ভাই মাহের আল-আসাদ দুজনই রাশিয়ায় অবস্থান করছেন। ফলে মঙ্গলবারের রায় তাঁদের অনুপস্থিতিতেই ঘোষণা করা হয়েছে।

আদালতের রায়ে আতেফ নাজিবের ভূমিকার বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তিনি সে সময় দেরা প্রদেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, আতেফ নাজিবের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের পাশাপাশি ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। নির্যাতনের কারণে মৃত্যুর ঘটনাতেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথা আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় নাজিব আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে কয়েদির পোশাক পরা অবস্থায় দেখা যায়।

সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিচারকে পুরোনো শাসনামলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০১১ সালের আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামোর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অভিযোগ রয়েছে, তারই একটি অংশ এই বিচারের মাধ্যমে সামনে এসেছে।

বাশার আল-আসাদ প্রায় ২৪ বছর সিরিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর শাসনামলে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও পরে গৃহযুদ্ধ দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে।

সিরিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ২০১১ সালে। ওই বছর দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় দেরা প্রদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। শুরুতে আন্দোলনটি ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্রমে সেই আন্দোলন বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পরে দেশজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তা দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়। এই সংঘাত সিরিয়ার রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনকে ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত করে।

দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। সরকারবিরোধী বাহিনীর অগ্রযাত্রা তীব্র হলে বাশার আল-আসাদ ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে করে দামেস্ক ছেড়ে রাশিয়ায় চলে যান। এর মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে এবং আসাদ সরকারের পতন হয়।

ক্ষমতা হারানোর পর রাশিয়ায় নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। সেই অবস্থাতেই সিরিয়ার আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে চলা বিচার প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হলো।
বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে এই রায় সিরিয়ার রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা কোনো শাসকের পতনের পর তাঁর আমলের কর্মকাণ্ডের বিচার কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে করা যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিডিএলপিবি/এমএম
সূত্র: আল জাজিরা (১১.০৮.২০২৬)


শেয়ার করুন

0 coment rios: