 |
| ছবি: সংগৃহীত |
কোনো ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর সময় থেকে নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন প্রথম তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে প্রকৃতপক্ষে আটক করে, তখন থেকেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার সাংবিধানিক সময়সীমা গণনা করতে হবে বলে রায় দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
আদালত বলেছেন, প্রকৃত আটক ও আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য তৈরি করে পুলিশ কোনোভাবেই ২৪ ঘণ্টার সাংবিধানিক সময়সীমা এড়িয়ে যেতে পারে না। তদন্তের প্রয়োজনে আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের আগে কাউকে আটক রাখার সময়ও এই ২৪ ঘণ্টার হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে।
মামলার পটভূমি
গত ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বিচারপতি উজ্জ্বল ভূইয়ান ও বিচারপতি অতুল এস. চন্দুরকর সমন্বয়ে গঠিত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ এ রায় দেন। সুজিত দাশ বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় এ সিদ্ধান্ত আসে।
মামলাটির সূত্রপাত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের (NDPS Act) অধীনে দায়ের করা একটি মামলাকে কেন্দ্র করে। চারজন অভিযুক্ত ত্রিপুরা হাইকোর্টের জামিন নামঞ্জুরের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বেলা প্রায় ২টার দিকে তল্লাশি ও জব্দ কার্যক্রমের সময় অভিযুক্তদের আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ১১.০৩ কেজি মেথামফেটামিন ট্যাবলেট, যা ইয়াবা নামে পরিচিত, উদ্ধারের অভিযোগ ছিল। কিন্তু তাঁদের আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার দেখানো হয় পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার দিকে। এরপর একই দিন বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে তাঁদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়।
অর্থাৎ, প্রকৃত আটকের সময় থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার বেশি অতিবাহিত হয়েছিল।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
সুপ্রিম কোর্ট বলেন, ভারতের সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ও আটক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের স্থান থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে যাতায়াতের প্রয়োজনীয় সময় বাদে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে।
আদালতের মতে, আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের আগে তল্লাশি, জব্দ, অনুসন্ধান কিংবা তদন্তের নামে কোনো ব্যক্তিকে আটকে রাখার সময় এই ২৪ ঘণ্টার হিসাব থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।
আদালত আরও বলেন, সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদে এমন কোনো সুযোগ রাখা হয়নি, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে তাঁকে হেফাজতে রাখার পরও আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার না দেখিয়ে সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যায়।
বিশেষ করে, আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের আগে ১৮ ঘণ্টা আটকে রাখার বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থা কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। আদালতের মতে, বিচারিক তত্ত্বাবধান ছাড়া এত দীর্ঘ সময় কাউকে হেফাজতে রাখা ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর আশঙ্কা তৈরি করে।
আদালতের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা
সুপ্রিম কোর্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছেন—
১. কোনো ব্যক্তির প্রকৃত আটক বা ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের মুহূর্ত থেকেই ২৪ ঘণ্টার সময় গণনা শুরু হবে; আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের সময় থেকে নয়।
২. গ্রেপ্তারের স্থান থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে পৌঁছানোর জন্য যুক্তিসংগতভাবে প্রয়োজনীয় সময় ছাড়া অন্য কোনো সময় এই ২৪ ঘণ্টার হিসাব থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।
৩. প্রকৃত আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
৪. ম্যাজিস্ট্রেটকে আদালতে হাজির করা ব্যক্তির প্রকৃত আটকের তারিখ ও সময় লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং সাংবিধানিক সময়সীমা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে।
৫. ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাজির করা হলেও আটকের সময়কাল অযৌক্তিক হলে ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন।
মামলার সিদ্ধান্ত
সুপ্রিম কোর্ট দেখতে পান, আসামিদের প্রকৃত আটকের সময় ছিল ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা। সে হিসাবে তাঁদের ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার কথা ছিল। কিন্তু তাঁদের হাজির করা হয় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে।
ফলে সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন হয়েছে বলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন। আদালত ত্রিপুরা হাইকোর্টের ২৯ এপ্রিলের আদেশ বাতিল করে আসামিদের অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেন।
আদালত আরও স্পষ্ট করেন, মাদকদ্রব্য ও মনঃপ্রভাবকারী পদার্থ নিয়ন্ত্রণ আইন (NDPS Act)-এর ৩৭ ধারায় জামিনের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত থাকলেও তা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে খর্ব করতে পারে না।
আইনি শিক্ষা
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছেন, কোনো ব্যক্তিকে কখন আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেটি নয়; বরং কখন থেকে তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা কার্যকরভাবে খর্ব করে আটক রাখা হয়েছে, সেটিই ২৪ ঘণ্টার সময় গণনার নির্ধারক। তদন্তকারী সংস্থা আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার দেখাতে বিলম্ব করে সাংবিধানিক সুরক্ষা এড়িয়ে যেতে পারবে না।
সূত্র: ANI; Bar and Bench, ৫ অক্টোবর, ২০২৬
বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম