২১ অক্টো, ২০২৬

মাদরাসার সিলেবাসে প্রোগ্রামিং, ব্যবসায় শিক্ষা ও স্পোকেন ভাষা যুক্ত করার দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ

মাদরাসার সিলেবাসে প্রোগ্রামিং, ব্যবসায় শিক্ষা ও স্পোকেন ভাষা যুক্ত করার দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ

ছবি: সংগৃহীত 
দেশের মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে পাঠ্যক্রমে নতুন কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ইসলামিক বিজনেস ও অ্যাকাউন্টিং’, ‘কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ও প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ’ এবং ব্যবহারিক আরবি ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষা।

নোটিশে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এসব বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করার কথা জানানো হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন সোমবার (১৯ অক্টোবর ২০২৬) জনস্বার্থে এ লিগ্যাল নোটিশ পাঠান।

নোটিশের প্রাপক হিসেবে রয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগের সচিব, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান।

ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ের প্রস্তাব

নোটিশে বলা হয়েছে, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাদরাসায় পড়াশোনা করেন। তাদের বিদ্যমান ধর্মীয় শিক্ষা ও পাঠ্যক্রম অপরিবর্তিত রেখে এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা দরকার।

প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর একটি ‘ইসলামিক বিজনেস ও অ্যাকাউন্টিং’। এ বিষয়ে পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা, বিপণন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও হিসাবরক্ষণ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন।

পাশাপাশি ইসলামের নৈতিক ও বাণিজ্যিক মূল্যবোধ অনুসরণ করে ব্যবসা পরিচালনা, সঠিক ওজনে পণ্য বিক্রি, ভেজাল পরিহার এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার বিষয়েও শিক্ষা পাবেন।

নোটিশদাতার মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক ব্যবসায়িক শিক্ষার সমন্বয় ঘটলে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৎ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায়ও তা সহায়ক হতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি ও ভাষা দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ

নোটিশে বলা হয়েছে, বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনায় মাদরাসার শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ও প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ শেখানো প্রয়োজন। এ ধরনের শিক্ষা তাদের সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া আরবি ও ইংরেজি ভাষায় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আরবি ভাষায় শুধু পাঠ গ্রহণ নয়, কথোপকথন ও পেশাগত যোগাযোগে দক্ষতা অর্জন করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক ও করপোরেট খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, ইংরেজিতে যোগাযোগের দক্ষতা আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াবে।

নোটিশদাতার অভিমত, এসব বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।

শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় অনলাইন শিক্ষার প্রস্তাব

মাদরাসাগুলোতে বিশেষায়িত শিক্ষকের অভাব বিবেচনায় প্রস্তাবিত বিষয়গুলো পড়ানোর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনলাইন ক্লাস চালুর কথা বলা হয়েছে নোটিশে।

এ জন্য আইসিটি বিভাগ, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মাধ্যমে মানসম্মত ভিডিও ক্লাস তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব পাঠ সরকারি ওয়েব পোর্টাল অথবা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে।

এ ব্যবস্থায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও অনলাইনে পাঠ গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে মূল্যায়ন ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে।

সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার যুক্তি

মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য যুগোপযোগী ও সর্বজনীন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে নোটিশে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সুযোগের সমতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির প্রসঙ্গে সংবিধানের ১৯, ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের উল্লেখ রয়েছে।

নোটিশদাতার দাবি, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো হলে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে তাদের সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে।

এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে প্রস্তাবিত বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা এবং অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। অন্যথায়, শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।


সূত্র: জাগো নিউজ ২৪

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

২০ অক্টো, ২০২৬

প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে গুরুতর অসংগতি ও সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতার কারণে আসামির দণ্ড বাতিল: হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে গুরুতর অসংগতি ও সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতার কারণে আসামির দণ্ড বাতিল: হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

এজাহার দায়েরে প্রায় ৯ ঘণ্টার বিলম্বের ব্যাখ্যা দিতে না পারায় মাদক মামলায় আসামির দণ্ড বাতিল করল হাইকোর্ট
মাদক মামলায় এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে গুরুতর অসংগতি এবং এজাহার দায়েরে প্রায় নয় ঘণ্টার বিলম্বের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় আসামির দণ্ডাদেশ বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সম্প্রতি বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চ ক্রিমিনাল আপিল নম্বর ৫৭৯৫/২০২৩ — মো. মিজানুর রহমান সুমান বনাম রাষ্ট্র- এর রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট রায়টি ঘোষণা করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়।

মামলার ঘটনা:

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটের দিকে ঢাকার পল্টন থানাধীন ৫৯ নয়াপল্টনের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে আসামি মো. মিজানুর রহমান সুমনের কাছ থেকে ১০০টি এবং অপর এক আসামির কাছ থেকে ৫০টি ইয়াবা উদ্ধারের কথা বলা হয়। পরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক্স-রে কক্ষ থেকে আরও ৪৬০টি ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করা হয়। সব মিলিয়ে ৬১০টি ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে মামলা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে মামলার বিচার শেষে ঢাকার বিশেষ জজ, ৯ম আদালত ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ মো. মিজানুর রহমান সুমনকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণির ৯(ক) অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামি হাইকোর্টে আপিল করেন।

আপিলকারীর যুক্তি

আপিলকারীর আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, জব্দতালিকার সাক্ষীরা তাঁদের স্বাক্ষর সাদা বা ফাঁকা কাগজে নেওয়া হয়েছিল বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ আসামির দেহ তল্লাশি বা ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেননি। ফলে জব্দতালিকা ও উদ্ধারের বিষয়ে প্রসিকিউশনের বক্তব্য নির্ভরযোগ্য নয়।

এ ছাড়া মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের বক্তব্যে ইয়াবা উদ্ধারের স্থান, ট্যাবলেটের রং এবং এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে অসংগতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, মামলার বাদী ও র্যাব সদস্য মো. মাসুম করিম খান বিভিন্ন পর্যায়ে এজাহার দায়েরের ভিন্ন ভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন। জবানবন্দিতে একবার ঘটনাস্থলে সকাল ৫টা ৫০ মিনিটে এজাহার দায়েরের কথা বলা হয়। পরে একই রাতে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে পল্টন থানায় এজাহার দায়েরের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু জেরার সময় তিনি জানান, প্রকৃতপক্ষে এজাহার দায়ের করা হয়েছিল রাত ২টা ২৫ মিনিটে।

অভিযোগের ঘটনাটি বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে ঘটেছে বলে উল্লেখ থাকায়, এজাহার দায়েরের সময়সংক্রান্ত এই অসংগতি মামলার প্রমাণকে গুরুতরভাবে সন্দেহজনক করে তোলে। আদালত আরও উল্লেখ করেন, এজাহার দায়েরে বিলম্বের কোনো ব্যাখ্যাও প্রসিকিউশন দিতে পারেনি।

আদালতের মতে, সাক্ষীদের বক্তব্যে এ ধরনের গুরুতর অসংগতি থাকা সত্ত্বেও বিচারিক আদালত মামলার যথাযথ মূল্যায়ন না করেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। ফলে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

সার্বিক তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট আপিলের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। আদালত Criminal Appeal No. 5795 of 2023 মঞ্জুর করে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ ঢাকার বিশেষ জজ, ৯ম আদালত কর্তৃক দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করেন।

মামলার মূল শিক্ষা

ফৌজদারি মামলায় শুধু অভিযোগ আনাই যথেষ্ট নয়; সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে গুরুতর অসংগতি এবং বিলম্বের ব্যাখ্যার অভাব প্রসিকিউশনের মামলাকে সন্দেহের মুখে ফেলতে পারে।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

তথ্য গোপন করে নেওয়া জামিন বাতিল, ১৬ বছর বয়সী শিশু কারাগারে,আইনজীবীকে সতর্ক করলেন ট্রাইব্যুনাল

তথ্য গোপন করে নেওয়া জামিন বাতিল, ১৬ বছর বয়সী শিশু কারাগারে,আইনজীবীকে সতর্ক করলেন ট্রাইব্যুনাল

প্রতীকী ছবি 
হাইকোর্টে জামিনের আবেদন বিচারাধীন থাকার তথ্য গোপন করে বিচারিক আদালত থেকে জামিন নেওয়ার অভিযোগ; উচ্চ আদালতের মামলার মূল নথি উপস্থাপন করায় আইনজীবীকে সতর্ক

চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানায় দায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় হাইকোর্টে জামিনের আবেদন বিচারাধীন থাকার তথ্য গোপন করে বিচারিক আদালত থেকে জামিন নেওয়ার অভিযোগে ১৬ বছর বয়সী এক শিশুর জামিন বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে পুনরায় গাজীপুরের কিশোর উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলার মূল নথি বিচারিক আদালতে উপস্থাপনের বিষয়েও আসামিপক্ষের আইনজীবীকে সতর্ক করা হয়েছে।

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক এ আদেশ দেন। এর আগে গত ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ আসামিপক্ষের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছিলেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ১ জানুয়ারি নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন খলিলপট্টি এলাকার মারকাযুল কুরআন ওয়াচ্ছুন্নাহ মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে বলাৎকারের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর মা গত ১১ মে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৬ বছর বয়সী আরেক শিশুর বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন। অভিযুক্ত ওই মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে তার বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার একই ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়।

মামলা দায়েরের দিনই পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে আসামিপক্ষ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জামিন আবেদন করে। শুনানির সময় তাদের আইনজীবী আদালতকে জানান, এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগে কোনো মামলা বা জামিনের আবেদন বিচারাধীন নেই। এ বক্তব্যের ভিত্তিতে আদালত আসামির জামিন মঞ্জুর করেন।

তবে পরে বাদীপক্ষ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, আসামির পক্ষে এর আগেই হাইকোর্ট বিভাগে ক্রিমিনাল আপিল মামলা নং ৪৮১৪/২০২৬ দায়ের করা হয়েছিল। মামলাটি হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনের ৮ নম্বর আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর আদালত আদেশ দিয়েছিলেন, অবকাশের পর বিষয়টি শুনানির জন্য আসবে।

হাইকোর্টে জামিনের আবেদন বিচারাধীন থাকার বিষয়টি গোপন করে বিচারিক আদালত থেকে জামিন নেওয়ার অভিযোগ তুলে বাদীপক্ষের আইনজীবী জামিন বাতিলের আবেদন করেন। গত সোমবার উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল তথ্য গোপনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আসামির জামিন বাতিল করেন এবং তাকে পুনরায় কিশোর উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আলমগীর মোহাম্মদ ইউনুছ জানান, হাইকোর্টে জামিনের আবেদন বিচারাধীন থাকার বিষয়টি গোপন করে বিচারিক আদালত থেকে জামিন নেওয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলার মূল নথি কীভাবে বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করা হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে সতর্ক করা হয়েছে।

সূত্র: দৈনিক আজাদী, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বিভাগীয় তদন্তে দোষী হলেই ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হয় না, এক্ষেত্রে অভিযোগের অপরাধমূলক উপাদান যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

বিভাগীয় তদন্তে দোষী হলেই ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হয় না, এক্ষেত্রে অভিযোগের অপরাধমূলক উপাদান যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

স্নাতক (পাস) সনদ প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না হওয়ায়, ওই সনদকে কেন্দ্র করে জালিয়াতির অভিযোগে দেওয়া ফৌজদারি দণ্ড বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, সংশ্লিষ্ট চাকরিতে সনদটি বাধ্যতামূলক না হলে এবং মূল সনদ আদালতে উপস্থাপন না করে শুধু ফটোকপির ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া হলে তা যথাযথ প্রমাণের প্রশ্ন তোলে।

বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একক বেঞ্চ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। আদালত ক্রিমিনাল আপিল নং ৮০৫৮/২০২৪ মঞ্জুর করে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের ২৫ মার্চ ২০২৪ তারিখের দণ্ডাদেশ বাতিল করেন।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ গাজীপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিম্ন সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেন। অভিযোগ ছিল, তিনি অন্য এক ব্যক্তির নামে ইস্যু করা স্নাতক (পাস) পরীক্ষার সনদ নিজের বলে জমা দিয়ে চাকরি ও পরবর্তী পদোন্নতির সুবিধা গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি সনদটি যাচাই করে অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদন দেয়। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪২০ ধারায় মামলা হয়।

ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত ২৫ মার্চ ২০২৪ তারিখে তাঁকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন।

হাইকোর্টে আপিলকারীর যুক্তি

আপিলকারীর আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, যে স্নাতক (পাস) সনদটি জাল বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তার মূল কপি বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সনদের ফটোকপির ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি সাক্ষ্য আইনের ৬২, ৬৩ ও ৬৫ ধারার বিধান এবং হাজী ওয়াজিউল্লাহ বনাম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মামলার নজির উল্লেখ করেন।

আইনজীবী আরও বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধি অনুযায়ী নিম্ন সহকারী পদে নিয়োগের জন্য উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) সনদই যথেষ্ট ছিল। একইভাবে, উচ্চ সহকারী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও স্নাতক (পাস) সনদ বাধ্যতামূলক ছিল না। ফলে ওই সনদকে কেন্দ্র করে চাকরি ও পদোন্নতির সুবিধা অবৈধভাবে গ্রহণের অভিযোগের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট মামলার নথি, সাক্ষ্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিবিধি পর্যালোচনা করে দেখতে পান, সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতির জন্য বিতর্কিত স্নাতক (পাস) সনদ দাখিলের বাধ্যবাধকতা ছিল না। আদালত আরও লক্ষ করেন, মূল সনদটি বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে শুধু ওই সনদকে কেন্দ্র করে আপিলকারীকে দণ্ডিত করার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বিভাগীয় তদন্তে কোনো কর্মচারীকে দায়ী করা হলেও সেই সিদ্ধান্ত একাই ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফৌজদারি মামলায় অভিযোগের অপরাধমূলক উপাদান যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে। বিভাগীয় কার্যধারা ও ফৌজদারি বিচার পৃথক উদ্দেশ্য ও মানদণ্ডে পরিচালিত হয়।

এ ছাড়া, একই অভিযোগে ফৌজদারি কার্যধারা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২৫ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে আপিলকারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিল। আদালত সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধির ১৬ ধারার আলোকে ওই বরখাস্তের আদেশকে আইনবিরোধী বলে উল্লেখ করেন।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সামগ্রিক ঘটনা, নথিপত্র ও আইনগত বিষয় বিবেচনায় হাইকোর্ট আপিলটি মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের ২৫ মার্চ ২০২৪ তারিখের দণ্ডাদেশ বাতিল করে দেন।

মামলার তথ্য
মামলার নাম: মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বনাম রাষ্ট্র ও অন্য একজন
মামলার নম্বর: ক্রিমিনাল আপিল নং ৮০৫৮/২০২৪
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ
বিচারপতি: বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী
রায়ের তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রাসঙ্গিক আইন: দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪২০ ধারা এবং সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬২, ৬৩ ও ৬৫ ধারা।
রায় প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ (সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে)

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

৪৬৩ কোটি টাকা পাচার: গ্লোবালটেলের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার ১২ বছরের কারাদণ্ড

৪৬৩ কোটি টাকা পাচার: গ্লোবালটেলের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার ১২ বছরের কারাদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত 
আন্তর্জাতিক ইনকামিং কলের মাধ্যমে ৪৬৩ কোটি টাকার বেশি অর্থপাচারের মামলায় অ্যাপল গ্লোবালটেল কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মজুমদার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অভিউর রহমান খানকে ১২ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে অর্থপাচার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে তাঁদের মোট ৯২৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকার বেশি অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে দুই আসামি পলাতক থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক আবদুল্লাহ আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রসিকিউটর মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অর্থপাচারের দায়ে ১২ বছরের কারাদণ্ড

রায়ে অর্থপাচারের দায়ে দুই আসামিকে ১২ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাচার করা অর্থের দ্বিগুণ, ৯২৬ কোটি ৭৪ লাখ ৯২ হাজার ২৯৮ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাঁদের আরও এক বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

এ ছাড়া অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে তাঁদের প্রত্যেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এই জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

তবে আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন, দুই ধারায় দেওয়া কারাদণ্ড একই সঙ্গে কার্যকর হবে। ফলে উভয় আসামিকে মোট ১২ বছর করে কারাভোগ করতে হবে। নির্ধারিত অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে তাঁদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার কথাও রায়ে বলা হয়েছে।

৪৬৩ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ

দুদকের করা মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ইনকামিং কলের মাধ্যমে অ্যাপল গ্লোবালটেল কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৪৬৩ কোটি ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার ১৪৯ টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণের সমপরিমাণ হিসেবে মামলায় ৬ কোটি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫২১ মার্কিন ডলারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দুদকের পরিচালক জালাল উদ্দিন আহাম্মদ মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মহিউদ্দিন মজুমদার ও অভিউর রহমান খানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

পরবর্তী সময়ে গত ৬ আগস্ট আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এর মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে মামলার আটজন সাক্ষীর মধ্যে সাতজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত।

সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর আদালত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম

সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা

১৯ অক্টো, ২০২৬

জাল ও সন্দেহজনক দলিলের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি গ্রহণযোগ্য নয়

জাল ও সন্দেহজনক দলিলের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি গ্রহণযোগ্য নয়

আগের নিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের নির্দেশ হাইকোর্টের
জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধে আগের নিবন্ধিত দলিল, মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য এবং জমির সুনির্দিষ্ট সীমানার প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন, সন্দেহজনক ও জালিয়াতিপূর্ণ বায়নাপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তী দলিলের মাধ্যমে জমির ওপর অগ্রাধিকার দাবি করা যায় না। মামলার সামগ্রিক সাক্ষ্য-প্রমাণে বাদীর স্বত্ব, পূর্ববর্তী দখল ও পরবর্তী সময়ে বেদখল হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে তিনি স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি পেতে পারেন।

বিচারপতি মো. আলী রেজা ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫ এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮ একসঙ্গে নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট এ রায় দেন।

মামলার পটভূমি

মামলার বাদী ১৯৭৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এলাকার দুই শতক জমি ক্রয় করেন বলে দাবি করেন। জমি কেনার পর সেখানে টিনশেড ঘর নির্মাণ করে ওষুধের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বাদীর অভিযোগ, ১৯৭৭ সালের ৭ জানুয়ারি বিবাদীরা তাঁর ঘর ভেঙে তাঁকে জমি থেকে উচ্ছেদ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি জমির দখল ফিরে পেলেও ১৯৭৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আবারও বেদখল হন।

অন্যদিকে, বিবাদীদের দাবি ছিল, তাঁরা ১৯৭৪ সালে জমির মালিকের সঙ্গে বায়নাপত্র সম্পাদন করেন এবং পরবর্তী সময়ে জমির দলিল নিবন্ধন করে দখল নেন। তাঁরা বাদীর দলিলকে জাল ও প্রতারণামূলক দাবি করেন।

এ বিরোধে বাদী ১৯৮৫ সালে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারিক ও আপিল আদালত ঘুরে হাইকোর্ট বিভাগে আসে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, বাদীর সাক্ষীরা জমিতে তাঁর পূর্ববর্তী দখল এবং পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদের বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। জেরায় তাঁদের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য কোনো অসংগতি বের করতে পারেননি বিবাদীরা। বাদীর মূল নিবন্ধিত দলিল, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং জমির সীমানাসংক্রান্ত নথিপত্র তাঁর দাবিকে সমর্থন করেছে।

অন্যদিকে, বিবাদীদের দাখিল করা বায়নাপত্রে একাধিক সন্দেহজনক বিষয় পাওয়া যায়। দলিলের লেখার কালি ও সাক্ষীদের স্বাক্ষরের কালির মধ্যে পার্থক্য ছিল। বায়নাপত্রে ১৯৭১ সালের আদালতের সিল পাওয়া গেলেও সেটি সম্পাদনের তারিখ ছিল ১৯৭৪ সাল। এসব অসংগতি এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত বায়নাপত্রটিকে পরবর্তী সময়ে তৈরি ও জালিয়াতিপূর্ণ বলে মনে করেন।

বিবাদীদের পরবর্তী নিবন্ধিত দলিলেও সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। দলিলে কথিত বায়নাপত্রের উল্লেখ ছিল না এবং স্ট্যাম্প ক্রয় ও নিবন্ধনসংক্রান্ত কিছু অসংগতির সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। আদালতের মতে, এসব দলিল বিবাদীদের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

জমির সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণের গুরুত্ব

বিবাদীরা দাবি করেছিলেন, মামলার জমির সীমানা সুনির্দিষ্ট নয়। তবে হাইকোর্ট বলেন, আরজির তফসিল, বাদীর দলিল, সাক্ষীদের জবানবন্দি, কমিশনারের প্রতিবেদন এবং মামলার নকশা থেকে জমির পরিচয় ও সীমানা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে ইস্যু করা চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত বিএস খতিয়ানেও জমিটি বাদীর নামে রেকর্ড করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে সমর্থিত হলে এ ধরনের চূড়ান্ত রেকর্ডের প্রমাণমূল্য রয়েছে।

আগের নিবন্ধিত দলিলের অগ্রাধিকার

হাইকোর্ট বলেন, কেবল আগের একটি অনিবন্ধিত বায়নাপত্রের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বাদীর আগের নিবন্ধিত দলিলের চেয়ে অগ্রাধিকার দাবি করা যায় না। এ মামলায় বাদীর দলিল আগে নিবন্ধিত হয়েছে এবং তাঁর স্বত্ব, পূর্ববর্তী দখল ও পরবর্তী সময়ে বেদখল হওয়ার বিষয়টি যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বাদীর স্বত্বের দাবিই গ্রহণযোগ্য।

হাইকোর্টের রায়

হাইকোর্ট নিম্ন আদালতগুলোর সংশ্লিষ্ট রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫-এর রুল যথাযথ ঘোষণা করা হয় এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮-এর রুল খারিজ করা হয়।

একই সঙ্গে আদালত বাদীর পক্ষে জমির স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি দেন। বিবাদী ১ ও ২-কে রায় ও আদেশের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে জমির সব বাধা অপসারণ করে বাদীকে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় বাদী আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমির দখল পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।

মামলার বিবরণ

মামলার নাম: ড. আশরাফ হোসেন (মৃত), তাঁর আইনগত উত্তরাধিকারীগণ বনাম হাজী আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ও অন্যান্য

মামলার নম্বর: সিভিল রিভিশন নং ৩৯২৭/২০১৫ এবং সিভিল রিভিশন নং ১২৩৮/২০০৮

বিচারপতি: বিচারপতি মো. আলী রেজা

রায়ের তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রায় প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬


বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি থাকলেই অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণিত হয় না: হাইকোর্ট

সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি থাকলেই অর্থ আত্মসাৎ বা বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণিত হয় না: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
শুধু সরকারি অর্থের ঘাটতি বা ক্ষতি প্রমাণিত হলেই অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; অর্থের ওপর অভিযুক্তের ন্যস্ত দায়িত্ব ও অসৎভাবে আত্মসাতের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে।

সরকারি অফিসে অর্থের ঘাটতি পাওয়া গেলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অর্থ আত্মসাতের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, সরকারি অর্থের ঘাটতি বা ক্ষতির প্রমাণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট অর্থ অভিযুক্তের জিম্মায় বা নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে তা আত্মসাৎ করেছেন—এ বিষয়গুলোও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর একক বেঞ্চ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দেওয়া এক রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। রায়ে আদালত লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতির ঘটনায় দণ্ডিত ডাক বিভাগের কর্মচারী মো. ওমর ফারুকের আপিল মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে তাঁকে অভিযোগ থেকে খালাস দেন।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরের নিয়মিত পোস্টমাস্টার ছুটিতে থাকাকালে ওমর ফারুক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিয়মিত পোস্টমাস্টার দায়িত্বে ফিরে এলে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি তাঁর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা থাকলেও ওমর ফারুক পরে দায়িত্ব দেবেন বলে জানান এবং একপর্যায়ে অফিস থেকে চলে যান। পরবর্তী সময়ে ডাকঘরে নগদ অর্থ ও অন্যান্য হিসাবের তালিকা প্রস্তুত করে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতি পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫ ধারায় মামলা হয়। ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিশেষ জজ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।

আপিলের শুনানিতে হাইকোর্ট দেখতে পান, ডাকঘরে অর্থের ঘাটতি থাকার বিষয়টি সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে এলেও ওই অর্থ অভিযুক্তের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং তিনি তা অসৎ উদ্দেশ্যে আত্মসাৎ করেছেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি। মামলায় ৯ লাখ টাকা লালমনিরহাট প্রধান ডাকঘর থেকে গ্রহণের কথা বলা হলেও তা আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাবের এন্ট্রি বা প্রেরণের নথি পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তাও স্বীকার করেন, ওই অর্থ প্রকৃতপক্ষে আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, একজন গ্রাহকের তিন লাখ টাকা জমা দেওয়ার লেনদেনের প্রমাণ থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিগতভাবে ওই অর্থ গ্রহণ বা আত্মসাৎ করেছিলেন, তা প্রমাণিত হয়নি। দায়িত্ব হস্তান্তর না করে অফিস ত্যাগ করা কিংবা অর্থের ঘাটতির সময় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা সন্দেহের কারণ হতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট অর্থের সঙ্গে অভিযুক্তের অসৎ আত্মসাতের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা না হলে তা দণ্ডাদেশের জন্য যথেষ্ট নয়। আদালতের মতে, অর্থের ঘাটতি প্রমাণ করা এবং সেই অর্থ অসৎভাবে আত্মসাৎ করা প্রমাণ করা দুটি পৃথক বিষয়।

এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দেন, মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারার অপরাধের অপরিহার্য উপাদান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে আপিল মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল এবং অভিযুক্তকে খালাস দেওয়া হয়।

মামলার বিবরণ: মো. ওমর ফারুক বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য, ফৌজদারি আপিল নং ৭৭১২/২০১৪; রায়ের তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

আইনি তাৎপর্য: এ রায় ফৌজদারি বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে—সরকারি অর্থের ঘাটতি বা হিসাবের অসংগতি থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মসাতের অপরাধে পরিণত হয় না। অভিযুক্তের কাছে অর্থের ন্যস্ততা বা নিয়ন্ত্রণ এবং তাঁর অসৎ আত্মসাতের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।


বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম