২০ অক্টো, ২০২৬

বিভাগীয় তদন্তে দোষী হলেই ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হয় না, এক্ষেত্রে অভিযোগের অপরাধমূলক উপাদান যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

স্নাতক (পাস) সনদ প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না হওয়ায়, ওই সনদকে কেন্দ্র করে জালিয়াতির অভিযোগে দেওয়া ফৌজদারি দণ্ড বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, সংশ্লিষ্ট চাকরিতে সনদটি বাধ্যতামূলক না হলে এবং মূল সনদ আদালতে উপস্থাপন না করে শুধু ফটোকপির ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া হলে তা যথাযথ প্রমাণের প্রশ্ন তোলে।

বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একক বেঞ্চ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। আদালত ক্রিমিনাল আপিল নং ৮০৫৮/২০২৪ মঞ্জুর করে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের ২৫ মার্চ ২০২৪ তারিখের দণ্ডাদেশ বাতিল করেন।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ গাজীপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিম্ন সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেন। অভিযোগ ছিল, তিনি অন্য এক ব্যক্তির নামে ইস্যু করা স্নাতক (পাস) পরীক্ষার সনদ নিজের বলে জমা দিয়ে চাকরি ও পরবর্তী পদোন্নতির সুবিধা গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি সনদটি যাচাই করে অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদন দেয়। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪২০ ধারায় মামলা হয়।

ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত ২৫ মার্চ ২০২৪ তারিখে তাঁকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন।

হাইকোর্টে আপিলকারীর যুক্তি

আপিলকারীর আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, যে স্নাতক (পাস) সনদটি জাল বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তার মূল কপি বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সনদের ফটোকপির ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি সাক্ষ্য আইনের ৬২, ৬৩ ও ৬৫ ধারার বিধান এবং হাজী ওয়াজিউল্লাহ বনাম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মামলার নজির উল্লেখ করেন।

আইনজীবী আরও বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধি অনুযায়ী নিম্ন সহকারী পদে নিয়োগের জন্য উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) সনদই যথেষ্ট ছিল। একইভাবে, উচ্চ সহকারী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও স্নাতক (পাস) সনদ বাধ্যতামূলক ছিল না। ফলে ওই সনদকে কেন্দ্র করে চাকরি ও পদোন্নতির সুবিধা অবৈধভাবে গ্রহণের অভিযোগের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট মামলার নথি, সাক্ষ্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিবিধি পর্যালোচনা করে দেখতে পান, সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতির জন্য বিতর্কিত স্নাতক (পাস) সনদ দাখিলের বাধ্যবাধকতা ছিল না। আদালত আরও লক্ষ করেন, মূল সনদটি বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে শুধু ওই সনদকে কেন্দ্র করে আপিলকারীকে দণ্ডিত করার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বিভাগীয় তদন্তে কোনো কর্মচারীকে দায়ী করা হলেও সেই সিদ্ধান্ত একাই ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফৌজদারি মামলায় অভিযোগের অপরাধমূলক উপাদান যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে। বিভাগীয় কার্যধারা ও ফৌজদারি বিচার পৃথক উদ্দেশ্য ও মানদণ্ডে পরিচালিত হয়।

এ ছাড়া, একই অভিযোগে ফৌজদারি কার্যধারা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২৫ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে আপিলকারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিল। আদালত সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধির ১৬ ধারার আলোকে ওই বরখাস্তের আদেশকে আইনবিরোধী বলে উল্লেখ করেন।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সামগ্রিক ঘটনা, নথিপত্র ও আইনগত বিষয় বিবেচনায় হাইকোর্ট আপিলটি মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের ২৫ মার্চ ২০২৪ তারিখের দণ্ডাদেশ বাতিল করে দেন।

মামলার তথ্য
মামলার নাম: মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বনাম রাষ্ট্র ও অন্য একজন
মামলার নম্বর: ক্রিমিনাল আপিল নং ৮০৫৮/২০২৪
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ
বিচারপতি: বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী
রায়ের তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রাসঙ্গিক আইন: দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪২০ ধারা এবং সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬২, ৬৩ ও ৬৫ ধারা।
রায় প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ (সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে)

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: