![]() |
| এজাহার দায়েরে প্রায় ৯ ঘণ্টার বিলম্বের ব্যাখ্যা দিতে না পারায় মাদক মামলায় আসামির দণ্ড বাতিল করল হাইকোর্ট |
সম্প্রতি বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চ ক্রিমিনাল আপিল নম্বর ৫৭৯৫/২০২৩ — মো. মিজানুর রহমান সুমান বনাম রাষ্ট্র- এর রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট রায়টি ঘোষণা করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়।
মামলার ঘটনা:
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটের দিকে ঢাকার পল্টন থানাধীন ৫৯ নয়াপল্টনের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে আসামি মো. মিজানুর রহমান সুমনের কাছ থেকে ১০০টি এবং অপর এক আসামির কাছ থেকে ৫০টি ইয়াবা উদ্ধারের কথা বলা হয়। পরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক্স-রে কক্ষ থেকে আরও ৪৬০টি ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করা হয়। সব মিলিয়ে ৬১০টি ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে মামলা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে মামলার বিচার শেষে ঢাকার বিশেষ জজ, ৯ম আদালত ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ মো. মিজানুর রহমান সুমনকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণির ৯(ক) অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামি হাইকোর্টে আপিল করেন।
আপিলকারীর যুক্তি
আপিলকারীর আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, জব্দতালিকার সাক্ষীরা তাঁদের স্বাক্ষর সাদা বা ফাঁকা কাগজে নেওয়া হয়েছিল বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ আসামির দেহ তল্লাশি বা ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেননি। ফলে জব্দতালিকা ও উদ্ধারের বিষয়ে প্রসিকিউশনের বক্তব্য নির্ভরযোগ্য নয়।
এ ছাড়া মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের বক্তব্যে ইয়াবা উদ্ধারের স্থান, ট্যাবলেটের রং এবং এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে অসংগতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, মামলার বাদী ও র্যাব সদস্য মো. মাসুম করিম খান বিভিন্ন পর্যায়ে এজাহার দায়েরের ভিন্ন ভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন। জবানবন্দিতে একবার ঘটনাস্থলে সকাল ৫টা ৫০ মিনিটে এজাহার দায়েরের কথা বলা হয়। পরে একই রাতে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে পল্টন থানায় এজাহার দায়েরের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু জেরার সময় তিনি জানান, প্রকৃতপক্ষে এজাহার দায়ের করা হয়েছিল রাত ২টা ২৫ মিনিটে।
অভিযোগের ঘটনাটি বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে ঘটেছে বলে উল্লেখ থাকায়, এজাহার দায়েরের সময়সংক্রান্ত এই অসংগতি মামলার প্রমাণকে গুরুতরভাবে সন্দেহজনক করে তোলে। আদালত আরও উল্লেখ করেন, এজাহার দায়েরে বিলম্বের কোনো ব্যাখ্যাও প্রসিকিউশন দিতে পারেনি।
আদালতের মতে, সাক্ষীদের বক্তব্যে এ ধরনের গুরুতর অসংগতি থাকা সত্ত্বেও বিচারিক আদালত মামলার যথাযথ মূল্যায়ন না করেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। ফলে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত
সার্বিক তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট আপিলের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। আদালত Criminal Appeal No. 5795 of 2023 মঞ্জুর করে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ ঢাকার বিশেষ জজ, ৯ম আদালত কর্তৃক দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করেন।
মামলার মূল শিক্ষা
ফৌজদারি মামলায় শুধু অভিযোগ আনাই যথেষ্ট নয়; সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এজাহার দায়েরের সময় নিয়ে গুরুতর অসংগতি এবং বিলম্বের ব্যাখ্যার অভাব প্রসিকিউশনের মামলাকে সন্দেহের মুখে ফেলতে পারে।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

0 coment rios: