![]() |
| আদালতের হেফাজতে থাকা মূল দলিল হারিয়ে গেলে তার সত্যায়িত অনুলিপি সাক্ষ্য আইনের অধীনে গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য; ঋণগ্রহীতার দায় স্বীকারও নতুন করে প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা দূর করে |
সম্প্রতি প্রকাশিত এক রায়ে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার এবং বিচারপতি মাহমুদ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রূপালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম মেসার্স পুবালী ট্যানারিজ ও অন্যান্য মামলাটি ফার্স্ট আপিল নং ১১৮/২০১৫ -এ এমন পর্যবেক্ষণ দেন।
মামলার পটভূমি
রূপালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম মেসার্স পুবালী ট্যানারিজ ও অন্যান্য মামলাটি ফার্স্ট আপিল নং ১১৮/২০১৫। মামলাটির সূত্রপাত অর্থঋণ মামলা নং ১৭৭/২০০৬ থেকে। রূপালী ব্যাংক ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান মেসার্স পুবালী ট্যানারিজ, এর স্বত্বাধিকারী, বন্ধকদাতা ও জামিনদারদের বিরুদ্ধে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে ৩৬ কোটি ৯ লাখ ১৩ হাজার ৯০১ টাকা আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে।
মামলা দায়েরের সময় ব্যাংক ঋণ অনুমোদনপত্র, দায় স্বীকারপত্র, ঋণসংক্রান্ত দলিল এবং হিসাব বিবরণীসহ প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র ফিরিস্তির মাধ্যমে আদালতে দাখিল করে। এসব দলিল মামলার নথিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধও ছিল।
মামলা চলাকালে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানটি রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আবেদন করে এবং পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং ২১৩৬/২০১০ দায়ের করে। ওই রিটে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের কাছে তার দায় স্বীকার করে।
পরবর্তী সময়ে অর্থঋণ মামলাটি একতরফা শুনানির জন্য নির্ধারিত হলে বিচারিক আদালত ব্যাংককে মূল দলিলগুলো পুনরায় দাখিল করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, আদালতের হেফাজতে থাকা মূল দলিলগুলো হারিয়ে গেছে। এতে ব্যাংকের কোনো অবহেলা বা দায় ছিল না। এ অবস্থায় ব্যাংক ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে দলিলগুলোর সত্যায়িত ফটোকপি গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে দাখিল করে।
তবে বিচারিক আদালত মূল দলিল উপস্থাপন করতে না পারার কারণ দেখিয়ে মামলাটি খারিজ করেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যাংক হাইকোর্টে আপিল করে।
আইনজীবীদের বক্তব্য ও শুনানি
আপিলকারী রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মো. ইমাম হাসান। তিনি আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, ব্যাংক মামলা দায়েরের সময় ফিরিস্তির মাধ্যমে মূল দলিলগুলো যথাযথভাবে দাখিল করেছিল। পরবর্তী সময়ে আদালতের হেফাজতে থাকাকালে দলিলগুলো হারিয়ে যায়, যার জন্য ব্যাংক দায়ী নয়। এ অবস্থায় দাখিল করা সত্যায়িত অনুলিপিগুলো সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬৩ ও ৬৫ ধারার অধীনে গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
তিনি আরও যুক্তি দেন, ঋণগ্রহীতা হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা রিট পিটিশনে ব্যাংকের কাছে তার দায় স্বীকার করেছে, যা সাক্ষ্য আইনের ৫৮ ধারার অধীনে স্বীকৃতি এবং এর জন্য নতুন করে প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
অন্যদিকে, আপিলে বিবাদী পক্ষের কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, ব্যাংক মামলা দায়েরের সময়ই মূল দলিলগুলো যথাযথভাবে আদালতে দাখিল করেছিল। পরবর্তী সময়ে আদালতের হেফাজতে থাকাকালে সেগুলো হারিয়ে যায় এবং এ ঘটনায় ব্যাংকের কোনো অবহেলা ছিল না।
আদালত বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দাখিল করা সত্যায়িত অনুলিপিগুলো সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬৩ ও ৬৫ ধারার অধীনে গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে স্পষ্টতই গ্রহণযোগ্য। ফলে মূল দলিল আদালতের হেফাজতে হারিয়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংককে তার আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, ঋণগ্রহীতা হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা রিট পিটিশনে ব্যাংকের কাছে তার দায় স্বীকার করেছে। সাক্ষ্য আইনের ৫৮ ধারার অর্থে এটি একটি স্বীকৃতি (Admission), যা সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নতুন করে প্রমাণ করার প্রয়োজনীয়তা দূর করে।
এ ছাড়া অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(৬) ধারার অধীনে বিচারিক আদালত হলফনামা ও দালিলিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন। সুতরাং, গ্রহণযোগ্য গৌণ সাক্ষ্য আদালতের নথিতে থাকা সত্ত্বেও শুধু মূল দলিল অনুপস্থিত থাকার কারণে মামলা খারিজ করা আইনসম্মত নয়।
এ প্রসঙ্গে আদালত Janata Bank Limited বনাম Diniat Begum and others, 2 ALR 160 এবং Osman Gazi Chowdhury বনাম Artha Rin Adalat and another, 21 BLC 322 মামলার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেন। এসব সিদ্ধান্তে মূল দলিল হারিয়ে গেলে গৌণ সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে।
আদালতের আদেশ
হাইকোর্ট আপিলটি মঞ্জুর করে অর্থঋণ আদালতের দেওয়া পূর্ববর্তী রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। একই সঙ্গে মামলাটি পুনরায় নিষ্পত্তির জন্য বিচারিক আদালতে ফেরত পাঠান।
বিচারিক আদালতকে ব্যাংকের দাখিল করা সত্যায়িত অনুলিপিগুলো গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে আইন অনুযায়ী মামলাটি নতুন করে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপিল নিষ্পত্তিতে কোনো খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।
আইনি শিক্ষা
এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, আদালতের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কোনো মামলার মূল দলিল হারিয়ে গেলে তার দায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মূল দলিল হারানোর কারণে গৌণ সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা নাকচ করা যাবে না, যদি সাক্ষ্য আইনের শর্ত পূরণ হয়।
একই সঙ্গে কোনো পক্ষ আদালতের অন্য কার্যক্রমে দায় স্বীকার করলে সাক্ষ্য আইনের ৫৮ ধারার অধীনে সেই স্বীকৃতির প্রমাণমূল্য বিবেচনা করতে হবে। অর্থঋণ মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আদালতকে দাখিল করা গ্রহণযোগ্য দালিলিক সাক্ষ্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
মামলার তথ্যসূত্র
মামলা: রূপালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম মেসার্স পুবালী ট্যানারিজ ও অন্যান্য
ফার্স্ট আপিল নং: ১১৮/২০১৫
মূল মামলা: অর্থঋণ মামলা নং ১৭৭/২০০৬
আদালত: হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বেঞ্চ: বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মাহমুদ হাসান
শুনানির তারিখ: ২ নভেম্বর ২০২৫
রায়ের তারিখ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫
প্রাসঙ্গিক আইন: সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৫৮, ৬৩ ও ৬৫ ধারা; অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(৬) ধারা।
রায়ের কপি: সংযুক্ত ৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়।
সূত্র: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

0 coment rios: