![]() |
| প্রাসঙ্গিক আইন: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ ও ৬ এবং ধারা ১৫১। |
সম্প্রতি বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ রিট পিটিশন নং ২৪৯৮/২০২৬-এর চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ রায় দেন। আদালত অর্থঋণ আদালতের দেওয়া সম্পত্তি ক্রোকের আদেশকে আইনবহির্ভূত ঘোষণা করে তা বাতিল করেন।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, একটি ব্যাংক তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীসহ আটজনের বিরুদ্ধে ১৪৮ কোটি ১৯ লাখ ২ হাজার ৮১০ টাকা ৪২ পয়সা আদায়ের দাবিতে অর্থঋণ মামলা দায়ের করে। মামলাটি প্রথমে অর্থঋণ মামলা নং ৩৩৭/২০২৫ হিসেবে দায়ের করা হলেও পরবর্তী সময়ে অর্থঋণ আদালত-৫, ঢাকায় ৩৪৩/২০২৫ নম্বরে পুনর্নম্বরকরণ করা হয়।
বিবাদীপক্ষ লিখিত জবাব দাখিলের পর ব্যাংক দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ এবং ধারা ১৫১ অনুসারে রায় ঘোষণার আগে বিবাদীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন করে।
পরবর্তী সময়ে অর্থঋণ আদালত যথাযথ কারণ দর্শানোর নোটিশ ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর ক্রোকের আবেদন মঞ্জুর করেন। এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে বিবাদীপক্ষের একজন হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং সংশ্লিষ্ট আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন।
রিটকারীর যুক্তি
রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী তাইসির হক শুনানিতে যুক্তি দেন, দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ অনুযায়ী সম্পত্তি ক্রোকের আগে আদালতের কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে যে, বিবাদী সম্ভাব্য ডিক্রি কার্যকর করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে তার সম্পত্তি হস্তান্তর কিংবা আদালতের এখতিয়ার থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু ব্যাংক এ ধরনের আশঙ্কার পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। তাছাড়া বিবাদীকে জামানত দিতে অথবা কেন জামানত দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়েই ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী মারগুব কবির ও আইনজীবী তাইসির মাহমুদ রিট আবেদন খারিজের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ব্যাংকের আবেদনে সম্পত্তি হস্তান্তরের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধ এড়াতে বিবাদীরা সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন। ফলে অর্থঋণ আদালতের আদেশ যথাযথ ছিল।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত
উভয় পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ ও ৬-এ সম্পত্তি ক্রোকের আগে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথমে আদালতকে বিবাদীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পত্তির মূল্য বা সমপরিমাণ জামানত জমা দিতে নির্দেশ দিতে হবে অথবা কেন জামানত দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে। বিবাদী ওই নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলেই কেবল পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেওয়া যেতে পারে।
আদালত পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট অর্থঋণ আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির বিধানগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা না করেই সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন। আইনে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দেওয়া এমন আদেশ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিশেষে হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে সম্পত্তি ক্রোকের পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল করেন। তবে আদালত স্পষ্ট করেন, আইন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংক চাইলে নতুন করে সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন করতে পারবে।
আইনি শিক্ষা
দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ ও ৬ অনুযায়ী, রায় বা ডিক্রি ঘোষণার আগে বিবাদীর সম্পত্তি ক্রোক কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রতিকার নয়। এ ধরনের আদেশের জন্য বিবাদীর পক্ষ থেকে সম্ভাব্য ডিক্রি কার্যকর করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর কিংবা আদালতের এখতিয়ারের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা থাকতে হবে।
একই সঙ্গে বিবাদীকে জামানত প্রদান অথবা কারণ দর্শানোর যথাযথ সুযোগ দিতে হবে। এসব বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণ না করে দেওয়া সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ আইনগতভাবে টেকসই নয়।
মামলার তথ্য: রিট পিটিশন নং ২৪৯৮/২০২৬।
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ।
বিচারপতি: বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিম।
রিটকারীর আইনজীবী: তাইসির হক।
ব্যাংকের আইনজীবী: মারগুব কবির ও তাইসির মাহমুদ।
সূত্র: কালবেলা

0 coment rios: