![]() |
| বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট |
হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান সিভিল রিভিশন নং- ৫৯৫/১৯৯৫ মামলায় ২০ মে ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। মামলায় সৈয়দ আলী ও অন্যান্য ছিলেন বিবাদী-পিটিশনার এবং আবদুল মতিন ওরফে মতিন মিয়ার উত্তরাধিকারীরা ছিলেন বাদী-অপর পক্ষ।
মামলার পটভূমি
কুমিল্লার আদালতে ১৯৮০ সালে দায়ের করা একটি বাটোয়ারা মামলায় বাদী সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে নিজের দাবিকৃত অংশের জন্য পৃথক ‘সাহাম’ চেয়ে মামলা করেন। তার দাবি ছিল, সম্পত্তির বিভিন্ন অংশ উত্তরাধিকার, দান ও ক্রয়সূত্রে তার মালিকানায় এসেছে। অন্যদিকে কয়েকজন বিবাদী দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট জমি অনেক আগেই নিলাম বিক্রি ও পরবর্তী বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাদের দখল ও স্বত্বে এসেছে।
বিবাদীপক্ষের দাবি ছিল, জমির নিলাম বিক্রয়ের পর বন্দোবস্ত, খতিয়ান এবং খাজনা প্রদানের মাধ্যমে তাদের স্বত্ব ও দখলের বিষয়টি প্রমাণিত। তারা আদালতের নিচের দুই স্তরের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।
প্রথম আদালত ৩০ জুন ১৯৯৩ তারিখে মামলাটি আংশিকভাবে ডিক্রি দেন। পরবর্তীতে আপিল আদালত ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখে আপিল খারিজ করে প্রথম আদালতের রায় বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করা হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, মূল মামলায় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের নাম সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি এবং তাদের কাছে যথাযথভাবে সমনও জারি হয়নি।
বিশেষ করে, বিবাদী হিসেবে ‘আবদু মিয়া’ নাম উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত ব্যক্তি ছিলেন ‘আনু মিয়া’। আদালতের নথি অনুযায়ী, আনু মিয়ার কাছে যথাযথভাবে সমন জারি হয়নি এবং তার উত্তরাধিকারীরা দাবি করেন যে তিনি মামলাটি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং আদালতে উপস্থিতও হননি।
এছাড়া আনু মিয়ার মৃত্যুর পর তার নামে সম্পত্তি হস্তান্তরের কয়েকটি দলিল তৈরি করা হয়েছে বলে তার উত্তরাধিকারীরা আদালতে দাবি করেন। এসব দলিলের সত্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। আদালতে দাখিল করা নথিতে এমন দাবিও উঠে আসে যে, আনু মিয়ার মৃত্যুর পর তাকে দাতা দেখিয়ে দলিল তৈরি করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, মামলার আরেক গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ নূরজাহান বেগম মামলার বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেলেও তার উত্তরাধিকারীদের যথাযথভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়নি। পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারীদেরও মামলায় তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না পাওয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।
‘Fraud vitiates everything’
হাইকোর্ট বলেন, এসব ঘটনা ও নথিপত্র বাদী বা তার উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করে ডিক্রি অর্জন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের বিষয়ে গুরুতর সন্দেহ সৃষ্টি করে।
আদালত উল্লেখ করেন, “fraud vitiates everything”—অর্থাৎ প্রতারণা সবকিছুকেই কলুষিত করে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্জিত ডিক্রি ন্যায়বিচারের স্বার্থে বাতিল করা যেতে পারে।
তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেন, যেসব দলিলকে জাল বা ভুয়া বলে দাবি করা হয়েছে, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে জাল কি না—তা প্রমাণ গ্রহণের মাধ্যমে ট্রায়াল কোর্টকেই নির্ধারণ করতে হবে। হাইকোর্ট নিজে এসব দলিলের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করেননি।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট মনে করেন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ পক্ষদের যথাযথভাবে নোটিশ না দেওয়া, তাদের আদালতে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা এবং নথিপত্র নিয়ে ওঠা গুরুতর প্রশ্নের কারণে মামলাটি নতুন করে বিচার করা প্রয়োজন।
এ কারণে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের ৩০ জুন ১৯৯৩ ও ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন এবং মামলাটি নতুন করে বিচারের জন্য ট্রায়াল কোর্টে রিমান্ড করেন।
আদালত নির্দেশ দেন, বিবাদী নং ২, ১৩ ও ৩২-এর উত্তরাধিকারীরা চাইলে নতুন করে লিখিত বক্তব্য দাখিল করতে পারবেন। বাদী ও অন্যান্য বিবাদীরাও প্রয়োজন হলে তাদের pleadings সংশোধনের সুযোগ পাবেন। ট্রায়াল কোর্টকে সব পক্ষকে নোটিশ দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ের তাৎপর্য
রায়ের মূল বক্তব্য হলো, আদালতের সঙ্গে প্রতারণা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন এবং কোনো পক্ষকে যথাযথভাবে মামলা পরিচালনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে অর্জিত ডিক্রি আইনের দৃষ্টিতে টেকসই নয়। তবে কোনো দলিল জাল বা প্রতারণামূলক কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রমাণ গ্রহণের পর ট্রায়াল কোর্টকে দিতে হবে।
বিডিএলপি/মাসুম

0 coment rios: