![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে সিভিল রিভিশন নং- ৪৯০৬/২০২৪ মামলায় এ রায় দেন। মামলাটির বাদী ছিলেন মো. আইনাল হক এবং বিবাদী মো. সোহেল রানা ও অন্যান্য। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৪ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার পটভূমি
নওগাঁর ১০ নম্বর নুরুল্লাহবাদ ইউনিয়ন পরিষদে বাদী আইনাল হক গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২০ মার্চ ২০০৫ তারিখে কাজে যোগ দেন। তিনি ২০০৮ সালের জুলাই পর্যন্ত নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন।
এরপর ১৮ আগস্ট ২০০৮ তারিখে তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে পোশাক, লাঠি ও টুপি জমা দিতে বলা হয়। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তার নিয়োগকে অবৈধ এবং তার বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়।
বাদী দাবি করেন, তাকে কোনো শোকজ নোটিশ দিয়ে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে নিম্ন আদালত তার মামলা খারিজ করে দেয়। পরবর্তীতে আপিল আদালতও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এরপর তিনি হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট দেখতে পান, বাদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য The Union Council (Village Police Force) Rules, 1968-এর Rule 9(10)-এ শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।
এই বিধান অনুযায়ী, কোনো গ্রাম পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে গুরুতর অবহেলা, দুর্নীতি বা অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে প্রথমে অভিযোগ উল্লেখ করে তাকে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এরপর তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়ার আগে প্রস্তাবিত শাস্তির বিরুদ্ধেও কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে।
আদালত বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের এই সুযোগ দেওয়া প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের (Natural Justice) মৌলিক নীতি। সংশ্লিষ্ট সার্ভিস বিধি অনুসরণ না করে কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
হাইকোর্ট আরও বলেন, শুধু নিয়োগে কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলেই শোকজ ও শুনানির সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া যায় না। তবে নিয়োগ যদি শুরু থেকেই সম্পূর্ণ অবৈধ হয়—যেমন প্রতারণা, জাল দলিল বা মৌলিক যোগ্যতার অনুপস্থিতি—তাহলে কিছু ব্যতিক্রম হতে পারে।
‘চৌকিদার’ পদে নিয়োগ নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যা
আদালত লক্ষ্য করেন, প্রযোজ্য আইনে পদটির নাম ‘Mahalladar’ হলেও পূর্বে এবং প্রচলিতভাবে এটি ‘Chowkidar’ নামে পরিচিত ছিল। বাদীর নিয়োগপত্রে ‘Chowkidar’ শব্দ ব্যবহৃত হওয়াকে এমন গুরুতর ত্রুটি হিসেবে দেখা যায় না, যার কারণে নিয়োগকে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন বা non est বলা যাবে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, বাদীর বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দায়িত্বে অবহেলার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল। এসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে কলঙ্কজনক প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ তাকে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং প্রযোজ্য সার্ভিস বিধির শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট মনে করেন, বাদীর নিয়োগের তিন বছরেরও বেশি সময় পর হঠাৎ করে তার নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং এতদিন তার বেতন গ্রহণের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। আদালত এ কর্মকাণ্ডে malafide থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট রুল অ্যাবসলিউট করেন এবং নিম্ন আদালতের উভয় রায় ও ডিক্রি বাতিল করে দেন। বাদীর বিরুদ্ধে জারি করা নোটিশ ও বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ও তার জন্য অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাকে স্বপদে পুনর্বহাল করে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মূল শিক্ষা
এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট পুনরায় স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে চাকরিচ্যুত করার ক্ষেত্রে ন্যায্য প্রক্রিয়া, শোকজ নোটিশ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযোজ্য সার্ভিস বিধিতে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে নেওয়া বরখাস্তের সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে টেকসই হবে না।
বিডিএলপিবি/মাসুম

0 coment rios: