২৬ সেপ, ২০২৬

যথাযথ শুনানির সুযোগ না দিয়ে শুধু নোটিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া Natural Justice-এর পরিপন্থী: হাইকোর্টের রায়

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
কোনো কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে কোনো ব্যক্তির অধিকার, স্বার্থ বা সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে তাকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের যথাযথ ও কার্যকর সুযোগ দিতে হবে। পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ না দিয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার বা Natural Justice-এর মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে এক রায়ে পর্যবেক্ষণ প্রদান করেছেন হাইকোর্ট।

বিশেষ করে Audi Alteram Partem—অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে শুনতে হবে—এই নীতির গুরুত্ব তুলে ধরে আদালত বলেছেন, শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশ জারি করাই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তার বক্তব্য প্রস্তুত ও উপস্থাপনের জন্য বাস্তব ও যুক্তিসঙ্গত সুযোগও দিতে হবে।

Engineer Md. Mohosin vs. Commissioner of Taxes, Taxes Zone-1, Chattogram and others (Writ Petition No. 2508 of 2026) মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ৫ জুলাই ২০২৬ এ রায় প্রদান করেন যার পূর্ণাঙ্গ লিখিত অনুলিপি প্রকাশ করা হয় ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।মামলাটিতে একজন করদাতার দাখিল করা রিভিশন আবেদনের শুনানির জন্য নোটিশ জারি ও শুনানির মধ্যে সময়ের ব্যবধান এবং নোটিশ যথাযথভাবে পৌঁছেছিল কি না—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি সামনে আসে। হাইকোর্ট দেখতে পান, নোটিশ পাঠানো হলেও শুনানির জন্য কার্যকরভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি এবং নোটিশের যথাযথ সেবা সম্পর্কেও নথিতে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না।

এই প্রেক্ষাপটে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একতরফা আদেশ বাতিল করে বিষয়টি নতুন করে শুনানির জন্য ফেরত পাঠান এবং যথাযথ শুনানির সুযোগ দিয়ে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেন।

মামলার প্রেক্ষাপট:

রিটকারী ইঞ্জিনিয়ার মো. মোহসিন M/S Master & Brothers এবং M/S Janata Syndicate-এর স্বত্বাধিকারী। প্রতিষ্ঠান দুটি আন্তর্জাতিকভাবে পুরোনো জাহাজ আমদানি করে দেশে তা স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে। রিটকারী ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন দাখিল করে নির্ধারিত কর পরিশোধ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর নির্ধারণও সম্পন্ন হয়।

পরবর্তীতে কর কর্তৃপক্ষ আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ৯৩ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট বিধানের অধীনে পুনর্মূল্যায়ন কার্যক্রম শুরু করে এবং পূর্বের তুলনায় বেশি আয় নির্ধারণ করে। এর বিরুদ্ধে রিটকারী আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৮৫ ধারার অধীনে ২০২৫ সালের ২৫ মে পৃথক পাঁচটি রিভিশন আবেদন করেন।

রিভিশন আবেদনের শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ২৬ মে ২০২৫ তারিখে নোটিশ জারি করে এবং ২ জুন সকাল ১১টায় শুনানির দিন নির্ধারণ করে। কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, নোটিশটি ২৭ মে নিবন্ধিত ডাকযোগে পাঠানো হয়েছিল। তবে রিটকারীর বক্তব্য ছিল, তিনি ওই নোটিশ পাননি এবং তাকে কার্যকরভাবে শুনানির সুযোগও দেওয়া হয়নি।

রিটকারীর অনুপস্থিতিতেই ২ জুন শুনানি শেষ করে ১৯ জুন ২০২৫ তারিখে রিভিশন আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করা হয়। পরবর্তীতে পাঁচটি করবর্ষের জন্য মোট ৬ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার ৪২১ টাকা পরিশোধের দাবিতে নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে রিটকারীর ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হলে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন এবং হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

রিটকারীর মূল অভিযোগ ছিল, শুনানির জন্য পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে এবং নোটিশ যথাযথভাবে সেবা হয়েছে কি না নিশ্চিত না করেই একতরফাভাবে রিভিশন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ফলে তিনি তার বক্তব্য, প্রয়োজনীয় দলিল ও প্রমাণ উপস্থাপনের কার্যকর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে মামলাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে—কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যক্তির অধিকার বা স্বার্থের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে যথাযথ ও কার্যকর শুনানির সুযোগ না দিলে সেই সিদ্ধান্ত প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের (Natural Justice) নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

আদালতের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্টের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—শুধু নোটিশ জারি করলেই কি একজন ব্যক্তিকে যথাযথভাবে শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে ধরা যায়?

আদালত বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এমন সময় ও সুযোগ দিতে হবে, যাতে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের সামনে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন, প্রয়োজনীয় প্রমাণ দাখিল এবং তার বিরুদ্ধে থাকা তথ্য বা প্রমাণ মোকাবিলা করতে পারেন। অর্থাৎ শুনানির সুযোগটি শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, কার্যকর ও অর্থবহ হতে হবে।

এ মামলায় আদালত দেখতে পান, ২৬ মে নোটিশ জারি এবং ২৭ মে ডাকযোগে পাঠানোর পর ২ জুন শুনানি নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে কার্যদিবসও ছিল সীমিত। তাছাড়া নোটিশের যথাযথ সার্ভিসের পক্ষে রেকর্ডে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না। রেজিস্টার্ড পোস্টের রসিদে সরকারি ডাক সিল ছিল না এবং Acknowledgement Due (AD) card-ও পাওয়া যায়নি। Order sheet-এও নোটিশ যথাযথভাবে সার্ভ হয়েছে—এমন কোনো endorsement ছিল না।

আদালতের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বাদীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলা যায় না। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় Natural Justice-এর audi alteram partem নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

Audi Alteram Partem নীতির প্রয়োগ-

Audi alteram partem অর্থ—“অন্য পক্ষকেও শুনতে হবে”। এই নীতির মূল বক্তব্য হলো, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে—
-যথাযথ নোটিশ দিতে হবে;
-পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে;
-নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দিতে হবে;
-প্রয়োজনীয় প্রমাণ ও দলিল দাখিলের সুযোগ দিতে হবে;
-এবং তার বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ বা বক্তব্য মোকাবিলার সুযোগ দিতে হবে।

হাইকোর্টের এই মামলায় মূল গুরুত্ব ছিল “effective opportunity of hearing” বা কার্যকর শুনানির সুযোগের ওপর। শুধু একটি নোটিশ পাঠানো হয়েছে—এটিই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যাতে বাস্তবে শুনানিতে অংশ নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারেন, সেই সুযোগ নিশ্চিত করাও ন্যায়বিচারের অংশ।

হাইকোর্টের রায়:

হাইকোর্ট ১৯ জুন ২০২৫ তারিখে কমিশনার অব ট্যাক্সেসের দেওয়া রিভিশন আদেশকে without lawful authority and of no legal effect ঘোষণা করেন।

আদালত মামলাটি পুনরায় শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত পাঠান এবং বাদীকে যথাযথভাবে শুনানি ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ দাখিলের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। পুনঃশুনানি রায়ের কপি পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করতে বলা হয়।

আইনি শিক্ষা:

কোনো কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে কারও অধিকার বা সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, সিদ্ধান্তের আগে তাকে কার্যকরভাবে শুনতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ ছাড়া একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ Natural Justice-এর audi alteram partem নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এই রায়টি বিশেষভাবে দেখায় যে, “শুনানির সুযোগ” কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি মৌলিক প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা।

বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: