 |
| দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারায় দণ্ড দিতে হলে আঘাত গুরুতর জখমের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে; চিকিৎসা সনদের সমর্থনে মৌখিক সাক্ষ্যের ঘাটতি এবং যুক্তিসংগত সন্দেহের সুবিধায় দণ্ড বাতিল। |
গুরুতর জখমের অভিযোগে দণ্ডিত এক ব্যক্তিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারায় দণ্ড দিতে হলে অভিযোগকারীর আঘাত দণ্ডবিধির ৩২০ ধারায় বর্ণিত গুরুতর জখমের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে কি না, সে বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। চিকিৎসা সনদে আঘাতের উল্লেখ থাকলেও চিকিৎসকের আদালতে দেওয়া মৌখিক সাক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বিষয় প্রতিষ্ঠিত না হলে শুধু সনদের ওপর নির্ভর করে দণ্ড বহাল রাখা যায় না।২০২৫ সালের ৯১৫ নম্বর ফৌজদারি রিভিশন মামলা, আনোয়ার বনাম রাষ্ট্র-এ বিচারপতি মো. সালিম ২০২৬ সালের ৫ জুলাই এ রায় দেন। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১২ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে। রায়ে হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দণ্ডাদেশ এবং আপিল আদালতের তা বহাল রাখার আদেশ বাতিল করে আসামি আনোয়ারকে অভিযোগ থেকে খালাস দেন।
মামলার পটভূমি:
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৪ অক্টোবর সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে অভিযোগকারী মেনু মিয়াকে তাঁর বাড়ির পূর্ব পাশের একটি সড়কে কয়েকজন আসামি আক্রমণ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, সিরাজ উদ্দিনের নির্দেশে তৌহিদ ও রাসেল মিয়া মেনু মিয়াকে আটকে রাখেন। এ সময় আনোয়ার লোহার রড দিয়ে তাঁর ডান কাঁধে আঘাত করেন, যার ফলে কাঁধের কাছে হাড় ভেঙে গুরুতর জখম হয় বলে অভিযোগ করা হয়। আরও অভিযোগ ছিল, সিরাজ উদ্দিন লাঠি দিয়ে মেনু মিয়াকে মারধর করেন এবং শামীমা খাতুনের মুখে আঘাত করে তাঁর একটি দাঁত ফেলে দেন। তৌহিদ ও রাসেল মিয়ার বিরুদ্ধে শামীমার চুল ও পোশাক ধরে টানাটানির অভিযোগও আনা হয়।
আহতদের প্রথমে করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট দণ্ডবিধির ১৪৮, ৪৪৭, ৩২৩, ৩২৫, ৩০৭ ও ১১৪ ধারায় আমলে নেন। পরবর্তী সময়ে আনোয়ারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩২৫, ৩০৭ ও ৩২৩ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
বিচারিক আদালতে দণ্ড ও আপিল খারিজ:
বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ আটজন সাক্ষীকে পরীক্ষা করে। আসামিপক্ষ কোনো সাক্ষী উপস্থাপন করেনি।
২০২৩ সালের ২২ মে কিশোরগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আনোয়ারকে দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং তিন হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ রায়ের বিরুদ্ধে করা ফৌজদারি আপিল নম্বর ৩৫৫/২০২৩ কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-৪ ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি খারিজ করে দেন। ফলে বিচারিক আদালতের দণ্ডাদেশ বহাল থাকে।
এরপর দণ্ডাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন আনোয়ার।
চিকিৎসকদের সাক্ষ্যে আঘাতের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন:
হাইকোর্ট মামলার চিকিৎসাসংক্রান্ত সাক্ষ্য পর্যালোচনা করেন। রাষ্ট্রপক্ষের সপ্তম সাক্ষী চিকিৎসক ডা. আসিফ নূর জামান জানান, তিনি মেনু মিয়ার ডান কাঁধ ও মাথায় ফোলা আঘাত পেয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, আঘাতগুলো ভোঁতা অস্ত্রের কারণে সৃষ্ট এবং সাধারণ প্রকৃতির ছিল।
অষ্টম সাক্ষী চিকিৎসক ডা. মো. মাহবুবুল আলম জানান, মেনু মিয়ার মাথার ওপরের অংশ এবং ডান ক্ল্যাভিকল বা কলারবোনের ওপর ফোলা আঘাত ছিল। তিনি মাথার আঘাতকে সাধারণ এবং ডান ক্ল্যাভিকলের আঘাতকে গুরুতর বলে উল্লেখ করেন।
তবে হাইকোর্ট লক্ষ করেন, চিকিৎসকদের আদালতে দেওয়া মৌখিক সাক্ষ্যে অভিযোগকারীর কাঁধের হাড় ভেঙেছিল—এমন বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। চিকিৎসা সনদে আঘাতের বিবরণ থাকলেও আদালতে শপথ নিয়ে দেওয়া সাক্ষ্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক ও সমর্থন বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চিকিৎসা সনদ ও মৌখিক সাক্ষ্যের আইনগত গুরুত্ব:
হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন, আদালতে শপথ নিয়ে দেওয়া সাক্ষ্য হলো মূল বা মৌলিক সাক্ষ্য। অন্যদিকে, চিকিৎসা সনদ মূল সাক্ষ্যকে সমর্থন করতে পারে। আইনগতভাবে মৌলিক সাক্ষ্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কোনো বিধানের মাধ্যমে অব্যাহতি দেওয়া না হলে, কেবল সমর্থনকারী প্রমাণের ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, অভিযোগে লোহার রড দিয়ে আঘাত করে কাঁধের কাছে হাড় ভাঙার কথা বলা হলেও চিকিৎসকদের মৌখিক সাক্ষ্যে সেই ফ্র্যাকচার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে আনোয়ারের আঘাতটি দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারার অধীন গুরুতর জখম হিসেবে গণ্য করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গুরুতর জখম প্রমাণে দণ্ডবিধির ৩২০ ধারার শর্ত পূরণ জরুরি:
হাইকোর্ট বলেন, দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারায় দণ্ডাদেশ দিতে হলে আদালতকে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে যে আসামির কারণে সৃষ্ট আঘাত দণ্ডবিধির ৩২০ ধারায় সংজ্ঞায়িত গুরুতর জখমের মধ্যে পড়ে কি না।
আদালত আরও ব্যাখ্যা করেন, আঘাতের প্রকৃতি, কীভাবে আঘাত করা হয়েছে এবং গুরুতর জখম ঘটানোর উদ্দেশ্য বা সে ধরনের ফল সম্পর্কে আসামির জ্ঞান ছিল কি না—এসব বিষয় প্রাসঙ্গিক। গুরুতর জখমের প্রয়োজনীয় উপাদান প্রমাণিত না হলে শুধু আঘাত হওয়ার কারণে গুরুতর জখমের অপরাধে দণ্ড দেওয়া যায় না।
এ মামলায় হাইকোর্ট মনে করেন, অভিযোগকারীর হাড় ভাঙার বিষয়টি যথাযথভাবে প্রমাণিত হয়নি। একই সঙ্গে দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারায় দণ্ড দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানও সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
যুক্তিসংগত সন্দেহের সুবিধা আসামির প্রাপ্য:
হাইকোর্ট পুনর্ব্যক্ত করেন, ফৌজদারি মামলায় নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য ছাড়া অভিযোগের কোনো আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। রাষ্ট্রপক্ষকে যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে অভিযোগ প্রমাণ করতে হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিচারিক আদালত দণ্ডাদেশ দেওয়ার সময় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হন। আপিল আদালতও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল মূল্যায়নের মাধ্যমে বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
আঘাতের প্রকৃতি এবং গুরুতর জখমের অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে সন্দেহ থাকায় হাইকোর্ট আসামিকে যুক্তিসংগত সন্দেহের সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দণ্ডাদেশ বাতিল, আসামি খালাস:
সব দিক বিবেচনায় হাইকোর্ট রিভিশনের রুল যথার্থ ঘোষণা করেন। কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-৪-এর ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির আদেশ এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ২০২৩ সালের ২২ মে দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করা হয়।
একই সঙ্গে আনোয়ারকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয় এবং তাঁর জামিননামা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
আইনি তাৎপর্য:
এ রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, গুরুতর জখমের অভিযোগে দণ্ড দিতে হলে আঘাতের প্রকৃতি নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। চিকিৎসা সনদে গুরুতর আঘাতের উল্লেখ থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দণ্ডের পর্যাপ্ত ভিত্তি হয়ে যায় না; চিকিৎসকের মৌখিক সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
পাশাপাশি, বিচারিক ও আপিল আদালত উভয়েরই দায়িত্ব হলো সাক্ষ্য-প্রমাণ স্বাধীনভাবে ও সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা। অভিযোগের অপরিহার্য উপাদান যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রমাণিত না হলে আসামি খালাস পাওয়ার অধিকারী।
বিডিলপোস্ট / মাসুম