৩ নভে, ২০২৬

নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তির শর্ত মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তির শর্ত মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। একই সঙ্গে, বিবাদীরা জমির দখলে থাকলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা করে প্রতিকার পাওয়া যাবে না; দখল পুনরুদ্ধারের আনুষঙ্গিক প্রতিকারও চাইতে হবে। এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে জমি নিয়ে বিরোধের একটি মামলায় দায়ের করা প্রথম আপিল খারিজ করেছেন হাইকোর্ট।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহ ও বিচারপতি মো. লুৎফর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। মিসেস সুফিয়া খাতুন বনাম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ও অন্যান্য মামলায় (এফ.এ. নং ৪০০/২০১৫) আদালত বলেন, ১৯ জানুয়ারি ২০০০ তারিখের নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তিটি ঋণের জামানত হিসেবে সম্পাদিত হয়েছিল—বাদী তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট প্রকাশিত হয় ৩ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের ২৫ নভেম্বর নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ইলিয়াস মোল্লা ও মো. আলী আকবর আলী মোল্লা বিরোধীয় জমি ক্রয় করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের ১৩ মার্চ নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে তাঁরা জমিটি সুফিয়া খাতুনের কাছে বিক্রি করেন।

বাদীর দাবি ছিল, তাঁর স্বামী একটি তফসিলি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে ওই ঋণের জামানত হিসেবে ২০০০ সালের ১৯ জানুয়ারি বিবাদী ১-৩-এর অনুকূলে একটি নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তি সম্পাদন করেন। তবে বাস্তবে জমি বিক্রির কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি। তাঁর স্বামীর ঋণ পরিশোধের পর বন্ধকী সম্পত্তিও অবমুক্ত করা হয়।

বাদীর আরও অভিযোগ ছিল, তাঁকে যথাযথভাবে সমন জারি না করে বিবাদীরা ২০০৩ সালে সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলা দায়ের করেন এবং একতরফা ডিক্রি গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে ওই ডিক্রির ভিত্তিতে জমির দখল নেওয়া হয়। এ অবস্থায় তিনি একতরফা ডিক্রিকে জালিয়াতিপূর্ণ, যোগসাজশমূলক, বেআইনি ও তাঁর ওপর বাধ্যকর নয়—মর্মে ঘোষণার জন্য মামলা করেন।

অন্যদিকে, বিবাদীদের বক্তব্য ছিল, জমির মূল্য ৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করে বাদী তাঁদের অনুকূলে বিক্রয় চুক্তি সম্পাদন করেন। এর মধ্যে ৩ লাখ টাকা সরাসরি এবং অবশিষ্ট ৩ লাখ টাকা পৃথক অর্থপ্রাপ্তির রসিদের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। সম্পূর্ণ মূল্য গ্রহণের পরও বাদী বিক্রয় দলিল সম্পাদন না করায় তাঁরা সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলা করেন। ওই মামলায় একতরফা ডিক্রি পাওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে ১৩ নভেম্বর ২০০৫ তারিখে বিক্রয় দলিল সম্পাদন করা হয়।

বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত ও আপিল

খুলনার যুগ্ম জেলা জজ, তৃতীয় আদালত ১ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে ২০০৭ সালের ৪৪৩ নম্বর স্বত্ব মামলাটি বিবাদী ১-৩-এর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকভাবে খারিজ করেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে বাদী হাইকোর্টে প্রথম আপিল দায়ের করেন।

আপিলকারীর যুক্তি ছিল, ২০০০ সালের বিক্রয় চুক্তির বিপরীতে কোনো মূল্য পরিশোধ করা হয়নি এবং চুক্তিটি মূলত ঋণের জামানত হিসেবে সম্পাদিত হয়েছিল। এ ছাড়া ২০০৩ সালের মামলায় সমন জারির প্রক্রিয়াও আইনসম্মত ছিল না।

অন্যদিকে, বিবাদীদের পক্ষে বলা হয়, বাদী সম্পূর্ণ বিক্রয়মূল্য গ্রহণ করেছিলেন এবং আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলও সম্পাদিত হয়েছে। তাছাড়া বিবাদীরা জমির দখলে থাকায় শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়; দখল পুনরুদ্ধারের প্রতিকারও চাইতে হতো।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখতে পান, বাদী নিজেই বিবাদী ১-৩-এর অনুকূলে ১৯ জানুয়ারি ২০০০ তারিখে নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

আদালত বলেন, প্রদর্শনী ‘খ’ হিসেবে চিহ্নিত ওই নিবন্ধিত দলিলটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিক্রয় চুক্তি (Out-and-out Agreement for Sale), বন্ধকী দলিল নয়। ফলে দলিলটি ঋণের জামানত হিসেবে সম্পাদিত হয়েছিল—বাদীর এমন দাবি প্রমাণিত হয়নি।

এ প্রসঙ্গে আদালত সাক্ষ্য আইনের ৯২ ধারার উল্লেখ করে বলেন, লিখিত চুক্তির শর্তাবলি মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা যায় না। বিশেষ করে নিবন্ধিত দলিলের বিষয়বস্তু মৌখিক সাক্ষ্য দিয়ে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। অতএব, নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তিকে ঋণের জামানত হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য বাদীর মৌখিক বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।

সমন জারির বিষয়ে আদালত উল্লেখ করেন, ২০০৩ সালের ১৫ নম্বর স্বত্ব মামলায় বাদীর মেয়ে শায়লা শারমিনের কাছে সমন জারি করা হয়েছিল বলে মামলার প্রসেস সার্ভার ডি.ডব্লিউ.৩ মো. কামরুজ্জামান সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর সাক্ষ্য অনুযায়ী, বাদীর মেয়ে সমন গ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া বাদীর স্বামী আকবর আলী মোল্লা বিক্রয় চুক্তির একজন সাক্ষী ছিলেন। এসব বিষয় বিবেচনায় বিচারিক আদালত যথাযথভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, বিবাদীরা জালিয়াতির মাধ্যমে একতরফা ডিক্রি গ্রহণ করেছেন—এমন অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বিচারিক আদালত প্রদর্শনী ‘গ’, ‘গ-১’ ও ‘গ-২’ হিসেবে চিহ্নিত অর্থপ্রাপ্তির রসিদ পর্যালোচনা করে বিবাদীদের কাছ থেকে বাদীর ৩ লাখ টাকা গ্রহণের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত পেয়েছেন।

স্বত্ব ঘোষণার পাশাপাশি দখল পুনরুদ্ধারের প্রতিকার চাওয়ার প্রয়োজনীয়তা

মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জমির দখলসংক্রান্ত প্রশ্ন। হাইকোর্টের কাছে স্বীকৃত বিষয় ছিল, বিবাদীরা বিরোধীয় জমির দখলে রয়েছেন।

এ বিষয়ে আদালত বলেন, বিবাদীরা জমির দখলে থাকা অবস্থায় বাদী শুধু স্বত্ব ঘোষণার জন্য মামলা করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে দখল পুনরুদ্ধারের মতো আনুষঙ্গিক প্রতিকার না চাওয়ায় মামলাটি আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু এ কারণেও মামলাটি খারিজযোগ্য।

আপিল খারিজ

সার্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, নিবন্ধিত দলিল এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, বিচারিক আদালতের ১ অক্টোবর ২০১৫ তারিখের রায় ও ডিক্রিতে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনো যুক্তিসংগত কারণ পাওয়া যায়নি। বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথভাবে দেওয়া হয়েছে।

ফলে হাইকোর্ট প্রথম আপিলটি খরচ ছাড়া খারিজ করেন।

আইনি শিক্ষা

এ রায়ের মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নীতি পুনর্ব্যক্ত হয়েছে—

১. নিবন্ধিত লিখিত চুক্তির শর্ত সাক্ষ্য আইনের ৯২ ধারার অধীনে মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

২. নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তিকে ঋণের জামানত হিসেবে দাবি করলে কেবল মৌখিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়; উপযুক্ত আইনগত ও দালিলিক ভিত্তিতে তা প্রমাণ করতে হবে।

৩. একতরফা ডিক্রি জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৪. বিবাদী জমির দখলে থাকলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার প্রতিকার চাওয়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক প্রতিকার হিসেবে দখল পুনরুদ্ধারের দাবিও উত্থাপন করতে হবে।

মামলার বিবরণ: মিসেস সুফিয়া খাতুন বনাম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ও অন্যান্য, এফ.এ. নং ৪০০/২০১৫; রায়ের তারিখ: ২১ এপ্রিল ২০২৬।


শেয়ার করুন

0 coment rios: