![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
এক জমি বিক্রির বায়নানামা সংক্রান্ত মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের ডিক্রি বাতিল করে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চ গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মোছা. আম্বিয়া খাতুন বনাম মোছা. হালিমা বেগম ও অন্যান্য (সিভিল রিভিশন নং- ৩৪০৭/২০২৪) এ রায় দেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে।
মামলার পটভূমি
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বিবাদী আম্বিয়া খাতুন ১৯৮১ ও ১৯৮২ সালে দুটি কবলা দলিলের মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ জমি ক্রয় করেন। সেখানে তিনি বসতঘর নির্মাণ করে পরিবারসহ বসবাস করতেন। ১৯৯০ সালে মেয়ের বিয়ের খরচের জন্য অর্থের প্রয়োজন হলে তিনি জমিটি বিক্রির প্রস্তাব দেন বলে দাবি করেন বাদীপক্ষ।
বাদীদের দাবি, জমির মূল্য ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করে ১৯৯০ সালের ১৪ অক্টোবর একটি বায়নানামা সম্পাদিত হয়। এর মধ্যে ২ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়া হয় এবং বাকি ১ লাখ টাকা তিন মাসের মধ্যে পরিশোধের শর্ত ছিল। অবশিষ্ট টাকা গ্রহণের পরও বিবাদী জমির দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধন করে না দেওয়ায় তাঁরা আদালতে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের মামলা করেন।
অন্যদিকে, বিবাদী আম্বিয়া খাতুনের দাবি ছিল, মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি বাদীদের কাছ থেকে মাত্র ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে কয়েকটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর ও জমির মূল দলিল তাঁদের কাছে জমা দেন। কিন্তু বাদীপক্ষ সেই স্ট্যাম্প ব্যবহার করে মিথ্যা বায়নানামা তৈরি করে জমি আত্মসাতের চেষ্টা করে। তিনি আরও দাবি করেন, জমিটি তাঁর পরিবারের বসতভিটা এবং এর বাইরে অন্য কোনো জমি নেই বলে নয়, বরং ওই জমিতেই পরিবার নিয়ে তাঁর বসবাস।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, বায়নানামায় চুক্তি সম্পাদনের জন্য তিন মাস সময় নির্ধারিত ছিল। অথচ ১৯৯০ সালের ১৪ অক্টোবর চুক্তি সম্পাদনের দাবি করা হলেও বাদীপক্ষ ১৯৯১ সালের ৩ ডিসেম্বর আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠায় এবং ১৯৯৩ সালের ১ আগস্ট মামলা দায়ের করে। অর্থাৎ চুক্তিতে নির্ধারিত তিন মাসের মধ্যে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিম্ন আদালত যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।
আদালত আরও বলেন, বাদীপক্ষের বায়নানামায় তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে চুক্তির পক্ষ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের পক্ষে কোনো আইনগত অভিভাবক চুক্তি সম্পাদন করেননি। চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ১১ ধারা অনুযায়ী, চুক্তি সম্পাদনের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাবালক ও আইনগতভাবে চুক্তিতে সক্ষম হতে হবে। ফলে চুক্তিটির বৈধতা ও আইনগত প্রয়োগযোগ্যতা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল।
আদালতের মতে, সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—চুক্তিটি আইনগতভাবে বৈধ ও কার্যকরযোগ্য কি না। কিন্তু বিচারিক আদালত যথাযথভাবে এ বিষয়ে ইস্যু গঠন করেনি। দেওয়ানি মামলায় পক্ষগুলোর আরজি ও লিখিত জবাবের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট ইস্যু গঠন ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার মৌলিক শর্ত। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিরোধীয় বিষয় ইস্যুতে অন্তর্ভুক্ত না হলে তার যথাযথ বিচার ব্যাহত হতে পারে।
আদালত আরও লক্ষ্য করেন, বায়নানামার জমিটি ছিল বিবাদীর বসতভিটা, যেখানে তিনি সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। বাদীপক্ষের সাক্ষীও জেরায় বিষয়টি স্বীকার করেছেন। অথচ বিবাদীর অন্য জমি ও দোকান থাকার বিষয়ে বাদীপক্ষের দাবি থাকলেও তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
এ ছাড়া বায়নানামার খসড়া প্রস্তুত, সাক্ষীদের সাক্ষ্য, দলিল সম্পাদনের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি ছিল। চুক্তির কথিত ছয়জন সাক্ষীর কাউকেই বাদীপক্ষ সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির করেনি। নোটারি পাবলিককেও পরীক্ষা করা হয়নি। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিম্ন আদালত বিবেচনায় নেয়নি।
সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন আদালতের বিবেচনাধীন প্রতিকার
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এর ২২ ধারা উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের ডিক্রি দেওয়া আদালতের বিবেচনাধীন বিষয়। কোনো চুক্তি বৈধভাবে প্রমাণিত হলেও শুধু সে কারণে আদালত সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের প্রতিকার দিতে বাধ্য নয়।
বিশেষ করে চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে বিবাদী এমন কোনো অপ্রত্যাশিত ভোগান্তি বা ক্ষতির সম্মুখীন হলে, যা চুক্তি বাস্তবায়ন না করলে বাদীর ক্ষেত্রে সৃষ্টি হতো না, সে ক্ষেত্রে আদালত সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের ডিক্রি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আদালতকে ন্যায়বিচার, ন্যায়সংগততা এবং পক্ষগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে।
হাইকোর্ট আরও বলেন, নিম্ন আদালতগুলো বাদীপক্ষের সাক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবাদীপক্ষের সাক্ষ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি। আপিল আদালতও নিজস্বভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ না করে বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। ফলে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভুল পাঠ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিবেচনায় না নেওয়া এবং যথাযথ ইস্যু গঠন না করার কারণে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়েছে।
রিভিশনে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বাতিল
হাইকোর্ট বলেন, দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় রিভিশন আদালত সাধারণত আপিল আদালতের মতো নতুন করে সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়ন করে না। তবে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে এখতিয়ারগত ত্রুটি, গুরুত্বপূর্ণ আইনগত অবৈধতা, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভুল পাঠ কিংবা ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার মতো গুরুতর ত্রুটি থাকলে হস্তক্ষেপ করা যায়।
এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট রুল অ্যাবসলিউট ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের ১৯৯৩ সালের ৭৬ নম্বর অপর শ্রেণির মামলায় দেওয়া ডিক্রি এবং অতিরিক্ত জেলা জজ প্রথম আদালতের ২৭২/২০০৫ নম্বর আপিল মামলায় দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। ফলে বাদীদের দায়ের করা মূল সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
তবে বিবাদী আম্বিয়া খাতুন ৫০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করায় আদালত তাঁকে ওই টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। রায়ের অনুলিপি বিচারিক আদালতে পৌঁছানোর ৬০ দিনের মধ্যে ১৯৯০ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে টাকা জমা দেওয়া পর্যন্ত বার্ষিক নয়, বরং মাসিক ৮ শতাংশ সরল সুদসহ ৫০ হাজার টাকা বাদীপক্ষকে পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে আইন অনুযায়ী ডিক্রির মাধ্যমে তা আদায় করা যাবে এবং সে ক্ষেত্রে টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত চক্রবৃদ্ধি সুদ দিতে হবে।
মামলাটিতে উভয় পক্ষের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। রায়ে কোনো খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

0 coment rios: