১ নভে, ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবোঝাই ট্রাক আটকে রাখলে স্টোর রেন্ট নয়, ডিটেনশন চার্জ আদায়ের নির্দেশ হাইকোর্টের: পূর্নাঙ্গ রায় প্রকাশ

ছবি: সংগৃহীত 
চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্কসংক্রান্ত জটিলতার কারণে পণ্যবোঝাই ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান আটকে রাখা হলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের কাছ থেকে স্টোর রেন্টের পরিবর্তে ডিটেনশন চার্জ আদায় করতে হবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রবিধানমালার ১৩৩ নম্বর প্রবিধান অধিকতর প্রযোজ্য। একই সঙ্গে আইনগতভাবে দুটি বিধানের মধ্যে কোনোটি অধিকতর সুবিধাজনক হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই সুবিধাজনক বিধান বেছে নেওয়ার অধিকার রাখেন।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সর্দার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলাম-এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। তাহমিদ এন্টারপ্রাইজ বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য (রিট পিটিশন নং ১৮৮১২/২০২৫) মামলায় আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, তাহমিদ এন্টারপ্রাইজ চীন থেকে লেমিনেটেড উড প্যানেল আমদানি করে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আমদানিকারক শুল্ক ও কর পরিশোধের পর পণ্য খালাসের অনুমতি পায়। পরবর্তী সময়ে পণ্যগুলো ছয়টি ভাড়া করা কাভার্ড ভ্যানে তোলা হলে শুল্ক কর্তৃপক্ষ এইচএস কোডসংক্রান্ত ভুল ঘোষণার অভিযোগে বন্দর গেট থেকে ভ্যানগুলো আটকে দেয়।

পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে পণ্য পুনর্মূল্যায়ন করা হয় এবং অতিরিক্ত শুল্ক, কর ও অন্যান্য চার্জের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি গ্রহণের মাধ্যমে পণ্য ছাড়ের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু পণ্যবোঝাই ছয়টি কাভার্ড ভ্যান বন্দর থেকে বের করার সময় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ স্টোর রেন্ট বাবদ ৬৫ লাখ ২৭ হাজার ৩০৮ টাকা ২৩ পয়সা দাবি করে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের এ দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে আমদানিকারক হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।

পক্ষগুলোর বক্তব্য

রিট আবেদনকারীর পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়, পণ্যগুলো কাভার্ড ভ্যানে তোলার পর শুল্ক কর্তৃপক্ষ সেগুলো আটকে রাখে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রাখা হয়। ফলে এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রবিধানমালা, ২০০১-এর ১৩৩ নম্বর প্রবিধান অনুযায়ী ডিটেনশন চার্জ আদায় করা যেতে পারে। কিন্তু ১৬১ নম্বর প্রবিধান অনুযায়ী স্টোর রেন্ট আদায়ের সুযোগ নেই।

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে বলা হয়, পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও সেগুলো জেটি এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়নি। বরং চার মাসেরও বেশি সময় ধরে ছয়টি কাভার্ড ভ্যান বন্দরের নির্ধারিত স্থান দখল করে রেখেছিল। ফলে ২০০১ সালের প্রবিধানমালার ১৬১ নম্বর প্রবিধান অনুযায়ী স্টোর রেন্ট আদায় আইনসংগত।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট ২০০১ সালের প্রবিধানমালার ১৩৩ ও ১৬১ নম্বর প্রবিধান পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করেন।

প্রবিধান ১৬১ অনুযায়ী, কোনো পণ্য বা কনটেইনারের ডেলিভারি গ্রহণের পরও তা জেটি এলাকা থেকে সরিয়ে না নেওয়া হলে প্রচলিত নিয়মে ভাড়া বা স্টোর রেন্ট প্রযোজ্য হবে।

অন্যদিকে প্রবিধান ১৩৩ অনুযায়ী, আমদানি বা রপ্তানির পণ্যসহ কোনো ট্রাক বা পরিবহন জেটি এলাকায় আটকে থাকলে প্রতিটি পরিবহনের জন্য দৈনিক বা রাতপ্রতি নির্ধারিত হারে ডিটেনশন চার্জ আরোপ করা যাবে।

আদালত বলেন, প্রবিধান ১৩৩-এর প্রথম অংশে পণ্যবোঝাই ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান আটকে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় অংশে মালিক, ভাড়াটিয়া বা চালকের অবহেলার কারণে খালি গাড়ি বন্দরের জেটি এলাকায় ফেলে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। দুটি অংশের প্রয়োগক্ষেত্র পৃথক এবং একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো অপরিহার্য সম্পর্ক নেই।

আদালত আরও বলেন, আলোচ্য মামলায় পণ্যগুলো কাভার্ড ভ্যানে তোলার পর সেগুলো আটকে রাখা হয়েছিল। ফলে এ ক্ষেত্রে প্রবিধান ১৩৩-এর প্রথম অংশ অধিকতর উপযুক্ত ও প্রযোজ্য।

আদালতের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন, কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইনের দুটি পৃথক বিধান কমবেশি প্রযোজ্য হলে তিনি অধিকতর সুবিধাজনক বিধানটি বেছে নেওয়ার অধিকার রাখেন। আলোচ্য মামলায় প্রবিধান ১৩৩ ও ১৬১ উভয়টির প্রয়োগের সুযোগ থাকলেও পণ্যবোঝাই কাভার্ড ভ্যান আটকে রাখার পরিস্থিতিতে প্রবিধান ১৩৩ অধিকতর উপযুক্ত।

এ কারণে আদালত আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ২০০১ সালের প্রবিধানমালার ১৩৩ নম্বর প্রবিধান এবং সংশ্লিষ্ট ট্যারিফ শিডিউল অনুযায়ী চার্জ নির্ধারণের অধিকারী ঘোষণা করেন।

আদালত রিটের রুল যথাযথ ঘোষণা করে (Rule made absolute) মামলাটি নিষ্পত্তি করেন এবং রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আইনি শিক্ষা

এ রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, বন্দরে পণ্যবোঝাই ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান আটকে রাখার ক্ষেত্রে স্টোর রেন্ট ও ডিটেনশন চার্জের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পণ্য খালাসের উদ্দেশ্যে পরিবহনে তোলার পর তা আটকে রাখা হলে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রবিধান ১৩৩ অনুযায়ী ডিটেনশন চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। পাশাপাশি, একই পরিস্থিতিতে একাধিক আইনগত বিধান প্রযোজ্য হলে অধিকতর সুবিধাজনক বিধান বেছে নেওয়ার অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে।

মামলা: তাহমিদ এন্টারপ্রাইজ বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য | রিট পিটিশন নং ১৮৮১২/২০২৫ | রায়ের তারিখ: ২২ জুলাই ২০২৬

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: