![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
মামলা সম্পর্কে তথ্য:
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রথম আপিল নং ৩৮/২০২০ ও ৭৩/২০২০-এর রায় দেন। দুটি মামলাই অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমানে PLC)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং একই ধরনের আইনগত প্রশ্ন থাকায় একসঙ্গে শুনানি করে আদালত। মামলাগুলোতে নিম্ন আদালত ব্যাংকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের ডিক্রি দিয়েছিল। রায়টি প্রকাশিত হয় ২২/০৯/২০২৬ তারিখে।
মামলার প্রেক্ষাপট:
প্রথম মামলায় মেসার্স ইয়ানবার এগ্রো প্রোডাক্টস ইন্ডাস্ট্রিজ জাপান থেকে ব্যাংকের অর্থায়নে এমএস প্লেট আমদানি করে। এসব পণ্যের একটি অংশ দিয়ে এমএস হাউজিং পাইপ তৈরি করা হলেও প্রায় ৬৪ হাজার ৯১২ রানিং ফুট এমএস প্লেট ব্যাংকের ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে অবশিষ্ট ছিল। বাদীপক্ষের দাবি, ব্যাংক দীর্ঘদিন এসব পণ্য বিক্রি বা সমন্বয় না করায় পণ্য নষ্ট হয়ে যায় এবং তাদের আর্থিক ক্ষতি হয়।
দ্বিতীয় মামলায় মেসার্স এ. হাসেম দেওয়ান অ্যান্ড কোং লিমিটেড জাহাজ ভাঙা ব্যবসার জন্য ব্যাংকের অর্থায়ন নেয়। জাহাজ ভাঙার পর উৎপাদিত ৮ হাজার ১৮৩ মেট্রিক টন স্ক্র্যাপের মধ্যে ৪ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ছাড় করা হলেও অবশিষ্ট ৩ হাজার ৯৮৩ মেট্রিক টন পণ্য ব্যাংকের ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে থেকে যায়। বাদীপক্ষের অভিযোগ ছিল, ব্যাংক অবশিষ্ট পণ্য বিক্রি বা ঋণের সঙ্গে সমন্বয় না করায় পণ্যের মূল্য কমে যায়।
নিম্ন আদালতের রায়:
দুটি মামলাতেই নিম্ন আদালত ব্যাংকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের ডিক্রি দেন। প্রথম মামলায় ১৪ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় মামলায় ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৩ হাজার ৫৪৩ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে ব্যাংক হাইকোর্টে আপিল করে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:
হাইকোর্ট বলেন, বন্ধক বা pledge-এর ক্ষেত্রে পণ্যের দখল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত বা গঠনমূলক দখল ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে—এমন প্রমাণ না থাকলে শুধু ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী বা তদারকির ব্যবস্থা থাকলেই ব্যাংককে bailee বা জিম্মাদার বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে পণ্যগুলো বাদীপক্ষের নিজস্ব স্থাপনাতেই ছিল এবং সেগুলোর বাস্তব নিয়ন্ত্রণও বাদীপক্ষের কাছেই ছিল।
আদালত আরও বলেন, Contract Act-এর ১৭৬ ধারায় বন্ধকী পণ্য বিক্রি করাই ঋণ আদায়ের মামলা করার পূর্বশর্ত নয়। পাওনাদার চাইলে ঋণের জন্য মামলা করতে পারে এবং নিরাপত্তা ধরে রাখতে পারে; আবার যুক্তিসংগত নোটিশ দিয়ে বন্ধকী পণ্য বিক্রিও করতে পারে। ফলে পণ্য বিক্রি না করার বিষয়টিকে একাই ব্যাংকের চুক্তিভঙ্গ বা দায় হিসেবে দেখানো যাবে না।
ক্ষতিপূরণের দাবিতে আদালতের ব্যাখ্যা:
হাইকোর্ট বলেন, শুধু পণ্য নষ্ট হয়েছে বা মূল্য কমেছে—এমন দাবি করলেই ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। ব্যাংকের নির্দিষ্ট কোনো আইনগত বা চুক্তিগত দায়িত্ব ছিল কি না, সেই দায়িত্ব ভঙ্গ হয়েছে কি না এবং ওই ভঙ্গের কারণেই সরাসরি ক্ষতি হয়েছে কি না—এসব বিষয় প্রমাণ করতে হবে। মামলাগুলোতে বাদীপক্ষ ব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট কাজ বা অবহেলার কারণে পণ্য নষ্ট হয়েছে এবং দাবিকৃত ক্ষতির পরিমাণ কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, তা সন্তোষজনকভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।
চূড়ান্ত রায়:
আদালত বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পণ্যের ক্ষতি, নষ্ট বা অবনতির ঝুঁকি বাদীপক্ষের ওপর থাকলেও কোনো চুক্তি আইনের বাধ্যতামূলক দায়িত্বকে অকার্যকর করতে পারে না। তবে এখানে ব্যাংকের বিরুদ্ধে এমন কোনো প্রমাণিত দায়িত্বভঙ্গ বা সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়।
ফলে হাইকোর্ট ব্যাংকের আপিল দুটি মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯-এর রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন এবং উভয় মানি স্যুট খারিজ করে দেন। মামলায় কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।
আইনি শিক্ষা:
বন্ধকী বা pledge-এর ক্ষেত্রে শুধু ব্যাংকের কাছে পণ্যের নিরাপত্তাজনিত স্বার্থ থাকলেই ব্যাংককে পণ্যের আইনগত দখলদার বা জিম্মাদার বলা যায় না। ব্যাংকের ওপর পণ্যের ক্ষতি বা অবনতির দায় আরোপ করতে হলে দখল, নির্দিষ্ট আইনগত বা চুক্তিগত দায়িত্ব, দায়িত্বভঙ্গ এবং সেই দায়িত্বভঙ্গের সঙ্গে ক্ষতির সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণ করতে হবে।
একইভাবে, Contract Act, 1872-এর ১৭৬ ধারা অনুযায়ী বন্ধকী পণ্য বিক্রি না করাই ব্যাংকের বিরুদ্ধে দায় সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয়। ক্ষতিপূরণের দাবিতে শুধু পণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনা নয়, ব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট কাজ বা অবহেলার কারণে সেই ক্ষতি হয়েছে এবং দাবিকৃত ক্ষতির পরিমাণ প্রমাণিত হয়েছে—এ বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
বিডিএলপিবি/মাসুম

0 coment rios: