২৪ সেপ, ২০২৬

২৫ বছর পূর্ণের আগে পদত্যাগ করলে পেনশন নয়: আপিল বিভাগের রায়

চাকরি থেকে পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার বিধান অসাংবিধানিক নয়।

সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে শুধু চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন দাবি করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস, পার্ট-১-এর ৩০০(ক) বিধিতে পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার বিধানকে সংবিধানবিরোধী নয় বলে ঘোষণা করেছেন আদালত।

১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ও অন্যান্য বনাম মো. মাহবুব মুর্শেদ ও অন্যান্য (সিভিল আপিল নং ৭৭/২০২২) মামলায় এ রায় দেন আপিল বিভাগের তিন সদস্যের বেঞ্চ। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। সম্প্রতি লিখিত রায় প্রকাছিত হয়। মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগের ১৮ মার্চ ২০২১ তারিখের রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছিল।

মামলার পটভূমি

মো. মাহবুব মুর্শেদ ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে সহকারী জজ হিসেবে যোগ দেন। অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ৩১ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে প্রায় ১৯ বছর চাকরির পর তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তিনি পেনশনের আবেদন করেন। আইন ও বিচার বিভাগ তাঁর পেনশন প্রস্তাব অনুমোদন করলেও ২৫ মার্চ ২০১৫ তারিখে হিসাব ও নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ তা ফেরত দেয়।

এরপর তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে রিট করেন। তাঁর দাবি ছিল, ১৯ বছর চাকরির পর পদত্যাগ করলেও তিনি পেনশনের অধিকারী এবং বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ৩০০(ক) বিধিতে পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার বিধান সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট রিটটি আংশিকভাবে মঞ্জুর করে ৩০০(ক) বিধির যে অংশে পদত্যাগের ক্ষেত্রে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার কথা বলা হয়েছে, তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। এরপর চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ

আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এ সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। আদালত বলেন, পদত্যাগ কোনো শাস্তি নয়; এটি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বরখাস্ত বা অপসারণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যার সঙ্গে অভিযোগ ও তদন্তের বিষয় যুক্ত থাকতে পারে।

তাই পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত হওয়া শাস্তি নয়; এটি পেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি আইনগত অযোগ্যতা।

আদালত আরও বলেন, পদত্যাগ, বরখাস্ত ও অপসারণ একই বিধানে উল্লেখ থাকলেও এগুলোর আইনগত প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ফলে ৩০০(ক) বিধানের এ ব্যবস্থা বৈষম্যমূলক নয় এবং সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থীও নয়।

পেনশনের ক্ষেত্রে ২৫ বছরের চাকরিকাল

আপিল বিভাগ বলেন, প্রযোজ্য আইনি কাঠামোতে অবসর ও স্বেচ্ছা অবসরের ক্ষেত্রে ২৫ বছরের যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল গুরুত্বপূর্ণ। তবে পদত্যাগকে পেনশন পাওয়ার স্বতন্ত্র ভিত্তি হিসেবে সংশ্লিষ্ট আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট পেনশন ব্যবস্থায় ২৫ বছর বা তার বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল সম্পন্ন করার পর পদত্যাগ গ্রহণ করা হলে অবসরকালীন পেনশনের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তবে ১৯ বছর চাকরির পর পদত্যাগ করা বর্তমান মামলার ক্ষেত্রে সেই যোগ্যতা পূরণ হয়নি।

৩০০(ক) বিধান নিয়ে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত

আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে বলেন, পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ৩০০(ক) বিধান সংবিধানবহির্ভূত নয়। আইন যেখানে পদত্যাগের কারণে পেনশনের অধিকার সৃষ্টি করেনি, সেখানে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের পূর্বের অনুমোদন থেকেও এমন কোনো আইনগত অধিকার সৃষ্টি হতে পারে না।

চূড়ান্ত রায়

আপিল বিভাগ সরকারের করা আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্ট বিভাগের ১৮ মার্চ ২০২১ তারিখের রায় ও আদেশ বাতিল করেছেন। একই সঙ্গে মামলায় খরচের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আইনি শিক্ষাঃ

পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করা কোনো শাস্তি নয়; এটি পদত্যাগের আইনগত পরিণতি। নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল পূর্ণ না করে পদত্যাগ করলে শুধু চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন দাবি করা যাবে না।

 

বিডিএলপিবি/মাসুম 

 

 


শেয়ার করুন

0 coment rios: