৬ অক্টো, ২০২৬

আবরার ফাহাদ হত্যা: দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের প্রত্যাশা অ্যাটর্নি জেনারেলের

আবরার ফাহাদ হত্যা: দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের প্রত্যাশা অ্যাটর্নি জেনারেলের

কোলাজ ছবি 
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে ‘ফ্যাসিবাদ আমলের চরম উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

আগামী ৭ অক্টোবর আবরার ফাহাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক অগ্রগতি তুলে ধরে সাংবাদিকদেরকে তিনি বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা একসময় মনে করতেন, অপরাধ করেও তারা পার পেয়ে যাবেন। তবে আবরার হত্যা মামলার বিচার ও রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে—অপরাধ করলে শেষ পর্যন্ত বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায় হাইকোর্ট বহাল রাখায় রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি। রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান হলো, মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বিলম্ব করা হবে না।

তিনি বলেন, নাগরিকের দ্রুত বিচার পাওয়ার যে সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে, রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করতে চায়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কোনো ধরনের বিলম্ব করা হবে না। এমনকি শুনানি মুলতবির জন্যও রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করবে না।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়া উচিত। মানুষ এই মামলার রায় কার্যকর হতে দেখতে চায়।”

যেভাবে হত্যাকাণ্ড

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা তৎকালীন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিলেন।

বিচারিক আদালতে ২৫ জনের সাজা

আলোচিত এ হত্যা মামলায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২০ আসামি হলেন—মেহেদী হাসান (রাসেল), মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান (রবিন), ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল (জেমি), মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলেন—মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ।

আপিল বিভাগে বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষা

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কয়েকজন আপিল ও লিভ টু আপিল করেছেন। ফলে মামলাটি এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের বিলম্বের চেষ্টা করবে না। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে রায় কার্যকরের পথ সুগম করাই রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা।

বিডিএলপিবি/এমএম
সূত্র: বাসস (০৫.০৯.২০২৬)

প্যানেল চেয়ারম্যান না হয়েও ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক-প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান অবৈধ: হাইকোর্ট

প্যানেল চেয়ারম্যান না হয়েও ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক-প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান অবৈধ: হাইকোর্ট

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দী উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনরত থাকা অবস্থায় আইন ও সরকারি পরিপত্রের বিধান অনুসরণ না করে অন্য একজনকে প্যানেল চেয়ারম্যান দেখিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ.এফ.এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ এ রায় দেন। রিট পিটিশন নং ২৮০৭/২০২৫-এর রায় ২১ জুন ২০২৬ তারিখে ঘোষণা করা হয়। মামলার বাদী আহাম্মদ আলী, ১ নম্বর ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে।

মামলার প্রেক্ষাপট:

আহাম্মদ আলী ২০২১ সালের নির্বাচনে ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১২ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে গেজেট প্রকাশের পর শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পূর্বের প্যানেল চেয়ারম্যান কাজী শহীদুল ইসলামের মৃত্যুর কারণে ১০ নভেম্বর ২০২৪ অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদের সভায় নতুন প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। ওই সভায় মো. কবির হোসেনকে ১ নম্বর এবং মো. নুরু শেখকে ২ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।

তবে ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জারি করা এক স্মারকের মাধ্যমে মোহন রায়হানকে ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে দেখিয়ে তাকে ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচিত চেয়ারম্যান হাইকোর্টে রিট করেন।

আদালতে মূল প্রশ্ন:

রিটে বলা হয়, ১৯ আগস্ট ২০২৪-এর স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী অনুপস্থিত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যানকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। প্যানেল চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকলে বা জটিলতা দেখা দিলে বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের অধীনস্থ কর্মকর্তাকে ওই ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু মোহন রায়হানকে কখনো প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়নি।

অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির কারণে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম সচল রাখার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯-এর ৩৩, ১০১ ও ১০২ ধারার অধীনে সংশ্লিষ্ট আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট দেখতে পান, ১০ নভেম্বর ২০২৪-এর ইউনিয়ন পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুজন সদস্যকে প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়েছিল। কিন্তু মোহন রায়হানকে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচনের কোনো নথি আদালতের সামনে পাওয়া যায়নি।

আদালত বলেন, ১৯ আগস্ট ২০২৪-এর পরিপত্র অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কেবল প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা বিভাগীয় কমিশনার/জেলা প্রশাসকের অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তাকে দেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী গঠিত প্যানেল চেয়ারম্যানদের মধ্য থেকেই একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল।

এ ছাড়া রিটের সঙ্গে দাখিল করা জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, উত্তরাধিকার সনদ ও মাস্টাররোল রেজিস্টার পর্যালোচনা করে আদালত দেখতে পান যে, আবেদনকারী আহাম্মদ আলী ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

আদালতের সিদ্ধান্ত:

হাইকোর্টের অভিমত, ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখের বিতর্কিত আদেশটি ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯-এর ৩৩, ১০১ ও ১০২ ধারার পাশাপাশি ১৯ আগস্ট ২০২৪-এর সরকারি পরিপত্রের বিধান অনুযায়ী জারি করা হয়নি। ফলে আদালত রুল যথাযথ ঘোষণা করে বিতর্কিত স্মারকটি বাতিল করেন।

আদালত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ১৫ জানুয়ারি ২০২৫-এর সংশ্লিষ্ট স্মারকটি ‘without lawful authority and is of no legal effect’—অর্থাৎ আইনগত কর্তৃত্ববিহীন এবং আইনগত কার্যকারিতাহীন। মামলায় খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি এবং রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


বিডিএলপিবি/মাসুম

৫ অক্টো, ২০২৬

মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্টের রায়

মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্টের রায়

ছবি: সংগৃহীত 
রিটের সংক্ষিপ্ত কার্যক্রমে জটিল স্বত্ব-মালিকানা নির্ধারণ করা যাবে না; দেওয়ানি আদালতের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ

অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে কোনো সম্পত্তি অবমুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা ও স্বত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলে তা উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে নিষ্পত্তি করতে হবে বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেছেন, রিটের সংক্ষিপ্ত কার্যক্রমে জটিল স্বত্ব, মালিকানা ও অধিকার নির্ধারণ করা যায় না। এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।

একই সঙ্গে মালিকানা নিয়ে চলমান আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত সম্পত্তি কোনো পক্ষের অনুকূলে অবমুক্ত না করার এবং সম্পত্তির দখল বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

রিটের নিষ্পত্তি, তবে মালিকানা নির্ধারণ দেওয়ানি আদালতে:

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এ. এফ. এম. সাইফুল করিম ও বিচারপতি ফাতেমা নজীব সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ১৯ মে ২০২৬ এই রায় দেন।

রিট আবেদন দুটি হলো—রিট পিটিশন নং ৩৮২০/২০২১ এবং ৩৮২১/২০২১। একই সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করার বিষয়কে কেন্দ্র করে পৃথক কার্যক্রম থেকে দুটি রিটের উদ্ভব হওয়ায় আদালত উভয় রিট একসঙ্গে শুনানি ও নিষ্পত্তি করেন।

কী নিয়ে বিরোধ?

মামলার নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষ পৃথক দলিল ও আদালতের ডিক্রির ভিত্তিতে নিজেদের স্বত্ব দাবি করেন।

রিটকারী শাহাবুদ্দিন আহমেদের দাবি, তিনি ৮ জুলাই ১৯৯৬ তারিখের নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে আলোক কুমার দত্তের কাছ থেকে সম্পত্তিটি ক্রয় করেন। এরপর তিনি সম্পত্তির দখলে থেকে নামজারি করেন এবং ভূমি উন্নয়ন করসহ সরকারি পাওনা পরিশোধ করেন।

অন্যদিকে প্রতিপক্ষের দাবি, আলোক কুমার দত্তের সঙ্গে ২৩ মে ১৯৯৬ তারিখের একটি বায়নাপত্রের ভিত্তিতে তিনি চুক্তির নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলা করেন। ওই মামলায় ডিক্রি পাওয়ার পর ২৬ জানুয়ারি ২০০৩ তারিখে আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধিত বিক্রয় দলিল সম্পাদিত হয়।

ফলে একই সম্পত্তি নিয়ে দুই পক্ষের স্বত্বের দাবি পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে।

নিম্ন আদালতে কী হয়েছিল?

সংশ্লিষ্ট অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালে উভয় পক্ষ পৃথক মামলা করেন। বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল এক মামলায় সম্পত্তি অবমুক্তির পক্ষে এবং অন্য মামলায় তা খারিজ করে রায় ও ডিক্রি দেন।

এর বিরুদ্ধে আপিল হলে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আপিল ট্রাইব্যুনাল ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে উভয় আপিল মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনালের আগের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। এরপর সংশ্লিষ্ট পক্ষ হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট দেখতে পান, উভয় পক্ষই তাদের স্বত্বের দাবি একই মূল মালিকের কাছ থেকে প্রাপ্ত অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠা করছেন। এক পক্ষ ১৯৯৬ সালের বিক্রয় দলিলের ভিত্তিতে এবং অপর পক্ষ ২০০১ সালের চুক্তির নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলার ডিক্রির ভিত্তিতে পরবর্তী দলিলের মাধ্যমে স্বত্ব দাবি করছেন।

আদালত আরও দেখতে পান, ২০০১ সালের মামলার ডিক্রির বৈধতা নিয়ে পরবর্তী দেওয়ানি কার্যক্রম এখনও বিচারাধীন। একই সঙ্গে ১৯৯৬ সালের বিক্রয় দলিলের সত্যতা নিয়েও বিরোধ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন, রিট এখতিয়ারের সংক্ষিপ্ত কার্যক্রমে দলিলের সত্যতা, জটিল স্বত্ব এবং প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এসব প্রশ্ন উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত নির্দেশনা:

আদালত উভয় রিটের রুল নিষ্পত্তি করে নির্দেশ দেন—

প্রথমত, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির স্বত্ব ও মালিকানা উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে নির্ধারিত হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মালিকানা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তি কোনো পক্ষের অনুকূলে অবমুক্ত করা যাবে না।

তৃতীয়ত, চলমান আইনি বিরোধে যে পক্ষের পক্ষে সম্পত্তির স্বত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে, সেই পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তি অবমুক্ত করতে হবে।

চতুর্থত, ততদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পত্তির দখল বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।

রায়ের তাৎপর্য:

এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট মূলত পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, রিট আদালত জটিল মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প দেওয়ানি আদালত নয়। কোনো সম্পত্তির প্রকৃত স্বত্ব নিয়ে গুরুতর বিরোধ থাকলে এবং দলিল ও পূর্ববর্তী ডিক্রির বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে, সংক্ষিপ্ত রিট কার্যক্রমে তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা সমীচীন নয়।

অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তির ক্ষেত্রেও প্রথমে প্রকৃত স্বত্ব নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মালিকানা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষকে সম্পত্তি অবমুক্ত করে দিলে পরবর্তী বিরোধ আরও জটিল হতে পারে—এ কারণেই আদালত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।


বিডিএলপিবি/মাসুম

হাইকোর্টের রায়ের আলোকে রিভিউতে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের এনরোলমেন্ট ভাইভা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বার কাউন্সিলের

হাইকোর্টের রায়ের আলোকে রিভিউতে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের এনরোলমেন্ট ভাইভা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বার কাউন্সিলের

ছবি: সংগৃহীত 
ঢাকা, ৫ অক্টোবর ২০২৬: হাইকোর্টের রায়ের আলোকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটি লিখিত পরীক্ষার রিভিউ-সংক্রান্ত রিটে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির (এনরোলমেন্ট) মৌখিক পরীক্ষা—ভাইভা—গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটির আজকের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক। সভায় কমিটির সদস্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মোহাম্মদ আলী এবং বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল ও বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল) উপস্থিত ছিলেন। সভায় বার কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ কামাল হোসেন শিকদারও উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট রিট পিটিশনগুলোর বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া ১০ জুন ২০২৬ তারিখের রায় পর্যালোচনা করে রিট আবেদন-সংক্রান্ত প্রার্থীদের এনরোলমেন্ট ভাইভা পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট লিখিত পরীক্ষার রিভিউ ফল বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকটি রিট আবেদন করা হয়। গত ১০ জুন হাইকোর্ট বার কাউন্সিলের প্রথম রিভিউয়ের ফল বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং প্রথম রিভিউতে উত্তীর্ণ কিন্তু পরবর্তী রিভিউতে বাদ পড়া প্রার্থীদের ভাইভা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

হাইকোর্টের ওই রায়ের পর বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের ভাইভা গ্রহণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিল।

তবে ভাইভা পরীক্ষার তারিখ ও সময় পরবর্তীতে জানানো হবে বলে ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য MCQ, লিখিত ও মৌখিক—এই তিন ধাপের পরীক্ষা গ্রহণ করে। নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করার পরই একজন প্রার্থী আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির যোগ্যতা অর্জন করেন।


সূত্র: বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের বিজ্ঞপ্তি।
বিডিএলপিবি/মাসুম

বিধি বদলালেও আগের অর্জিত চাকরি-অধিকার উপেক্ষা নয়: হাইকোর্টের রায়

বিধি বদলালেও আগের অর্জিত চাকরি-অধিকার উপেক্ষা নয়: হাইকোর্টের রায়

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
২০০৯ সালের নিয়োগ বিধিতে পদোন্নতির সুযোগ না থাকলেও আগের বিধিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে পূর্বের বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির বিষয় বিবেচনার নির্দেশ।

২০০৯ সালের নিয়োগ বিধিতে পদোন্নতির কোনো সুযোগ না থাকলেও ২০০৯ সালের আগে নিয়োগ পাওয়া ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানদের ক্ষেত্রে তাদের নিয়োগের সময় কার্যকর থাকা ১৯৮৬ সালের নিয়োগ বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির বিষয় বিবেচনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের পদ দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে উন্নীত করার নির্দেশ দিয়ে তা বাস্তবায়নের জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন আদালত।

বিচারপতি এ. এফ. এম. সাইফুল করিম ও বিচারপতি ফাতেমা নাজিব সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ রিট পিটিশন নং ১৬৬৬৬/২০২৫ (মো. মতিউর রহমান ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য) মামলায় গত ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৫ অক্টোবর ২০২৬।

মামলার পটভূমি

মামলার আবেদনকারীরা বিভিন্ন পদে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনায় ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৫ সালের সরকারি গেজেটের মাধ্যমে তৎকালীন নিয়োগ বিধিতে বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী অথবা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমাধারী ব্যক্তিদের ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান পদে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়। পরবর্তীতে আবেদনকারীরা ওই বিধির অধীনে ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

কিন্তু ২০০৯ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন করা হলে ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান পদটি বহাল রাখা হলেও ওই পদ থেকে পরবর্তী উচ্চতর পদে পদোন্নতির কোনো বিধান রাখা হয়নি।

আবেদনকারীদের দাবি ছিল, একই ধরনের দায়িত্ব পালন করলেও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে ডিপ্লোমাধারী ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানদের দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে উন্নীত করা হলেও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী আবেদনকারীরা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

পূর্বের মামলার প্রভাব

আদালত দেখতে পান, একই বিষয়ে রিট পিটিশন নং ৬০৪৮/২০১৩ মামলায় হাইকোর্ট ৩০ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে আবেদনকারীদের ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান পদকে দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে উন্নীত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি এবং রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন সংক্রান্ত কার্যক্রমও আবেদনকারীদের বিপক্ষে যায়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ ১০ আগস্ট ২০২৫ তারিখের স্মারকের মাধ্যমে ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান পদকে দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড পদ হিসেবে উন্নীত করে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট বলেন, বর্তমান মামলার আবেদনকারীরা পূর্বের রিট পিটিশন নং ৬০৪৮/২০১৩ মামলার আবেদনকারীদের সঙ্গে একই অবস্থানে রয়েছেন। ফলে তাদেরও একই ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান আবেদনকারীরা ২০০৯ সালের আগেই ১৯৮৬ সালের নিয়োগ বিধির অধীনে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাই তাদের চাকরির শর্ত এবং পদোন্নতির বিষয়টি তাদের নিয়োগের সময় কার্যকর থাকা ১৯৮৬ সালের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল ব্যুরোর কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী বিবেচনা করতে হবে।

আদালতের মতে, একই অবস্থানে থাকা আবেদনকারীদের বৈধ পদোন্নতির দাবি থেকে বঞ্চিত করা সমীচীন নয়। তাই প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ১৯৮৬ সালের নিয়োগ বিধির অধীনে তাদের পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত নির্দেশ

হাইকোর্ট রুল নিষ্পত্তি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আবেদনকারীদের পদ দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে উন্নীত করার নির্দেশ দেন।

রায়ের অনুলিপি পাওয়ার তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। মামলার খরচের বিষয়ে আদালত কোনো আদেশ দেননি। একই সঙ্গে রায় ও আদেশ অবিলম্বে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


বিডিএলপিবি/মাসুম

চাকরি থেকে বরখাস্তের আগে ন্যাচারাল জাস্টিসের মৌলিক নীতি অনুসরণ করে শোকজ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে: হাইকোর্টের রায়

চাকরি থেকে বরখাস্তের আগে ন্যাচারাল জাস্টিসের মৌলিক নীতি অনুসরণ করে শোকজ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে: হাইকোর্টের রায়

ছবি: সংগৃহীত 
চাকরিতে থাকা অবস্থায় অসদাচরণ, দায়িত্বে অবহেলা বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কোনো কর্মচারীকে বরখাস্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সার্ভিস বিধি অনুসরণ করে শোকজ নোটিশ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে সিভিল রিভিশন নং- ৪৯০৬/২০২৪ মামলায় এ রায় দেন। মামলাটির বাদী ছিলেন মো. আইনাল হক এবং বিবাদী মো. সোহেল রানা ও অন্যান্য। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৪ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

নওগাঁর ১০ নম্বর নুরুল্লাহবাদ ইউনিয়ন পরিষদে বাদী আইনাল হক গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২০ মার্চ ২০০৫ তারিখে কাজে যোগ দেন। তিনি ২০০৮ সালের জুলাই পর্যন্ত নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন।

এরপর ১৮ আগস্ট ২০০৮ তারিখে তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে পোশাক, লাঠি ও টুপি জমা দিতে বলা হয়। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তার নিয়োগকে অবৈধ এবং তার বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়।

বাদী দাবি করেন, তাকে কোনো শোকজ নোটিশ দিয়ে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে নিম্ন আদালত তার মামলা খারিজ করে দেয়। পরবর্তীতে আপিল আদালতও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এরপর তিনি হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট দেখতে পান, বাদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য The Union Council (Village Police Force) Rules, 1968-এর Rule 9(10)-এ শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।

এই বিধান অনুযায়ী, কোনো গ্রাম পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে গুরুতর অবহেলা, দুর্নীতি বা অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে প্রথমে অভিযোগ উল্লেখ করে তাকে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এরপর তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়ার আগে প্রস্তাবিত শাস্তির বিরুদ্ধেও কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে।

আদালত বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের এই সুযোগ দেওয়া প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের (Natural Justice) মৌলিক নীতি। সংশ্লিষ্ট সার্ভিস বিধি অনুসরণ না করে কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।

হাইকোর্ট আরও বলেন, শুধু নিয়োগে কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলেই শোকজ ও শুনানির সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া যায় না। তবে নিয়োগ যদি শুরু থেকেই সম্পূর্ণ অবৈধ হয়—যেমন প্রতারণা, জাল দলিল বা মৌলিক যোগ্যতার অনুপস্থিতি—তাহলে কিছু ব্যতিক্রম হতে পারে।

‘চৌকিদার’ পদে নিয়োগ নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যা

আদালত লক্ষ্য করেন, প্রযোজ্য আইনে পদটির নাম ‘Mahalladar’ হলেও পূর্বে এবং প্রচলিতভাবে এটি ‘Chowkidar’ নামে পরিচিত ছিল। বাদীর নিয়োগপত্রে ‘Chowkidar’ শব্দ ব্যবহৃত হওয়াকে এমন গুরুতর ত্রুটি হিসেবে দেখা যায় না, যার কারণে নিয়োগকে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন বা non est বলা যাবে।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বাদীর বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দায়িত্বে অবহেলার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল। এসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে কলঙ্কজনক প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ তাকে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং প্রযোজ্য সার্ভিস বিধির শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট মনে করেন, বাদীর নিয়োগের তিন বছরেরও বেশি সময় পর হঠাৎ করে তার নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং এতদিন তার বেতন গ্রহণের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। আদালত এ কর্মকাণ্ডে malafide থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।

শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট রুল অ্যাবসলিউট করেন এবং নিম্ন আদালতের উভয় রায় ও ডিক্রি বাতিল করে দেন। বাদীর বিরুদ্ধে জারি করা নোটিশ ও বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ও তার জন্য অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাকে স্বপদে পুনর্বহাল করে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

মূল শিক্ষা

এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট পুনরায় স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে চাকরিচ্যুত করার ক্ষেত্রে ন্যায্য প্রক্রিয়া, শোকজ নোটিশ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযোজ্য সার্ভিস বিধিতে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে নেওয়া বরখাস্তের সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে টেকসই হবে না।


বিডিএলপিবি/মাসুম

আদালতে প্রতারণা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে পাওয়া ডিক্রি বাতিল, মামলা পুনঃশুনানির নির্দেশ হাইকোর্টের

আদালতে প্রতারণা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে পাওয়া ডিক্রি বাতিল, মামলা পুনঃশুনানির নির্দেশ হাইকোর্টের

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে এবং প্রতারণার মাধ্যমে কোনো ডিক্রি অর্জিত হলে তা আইনগতভাবে টেকসই হতে পারে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দিয়ে মামলাটি নতুন করে নিষ্পত্তির জন্য নিম্ন আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান সিভিল রিভিশন নং- ৫৯৫/১৯৯৫ মামলায় ২০ মে ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। মামলায় সৈয়দ আলী ও অন্যান্য ছিলেন বিবাদী-পিটিশনার এবং আবদুল মতিন ওরফে মতিন মিয়ার উত্তরাধিকারীরা ছিলেন বাদী-অপর পক্ষ।

মামলার পটভূমি

কুমিল্লার আদালতে ১৯৮০ সালে দায়ের করা একটি বাটোয়ারা মামলায় বাদী সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে নিজের দাবিকৃত অংশের জন্য পৃথক ‘সাহাম’ চেয়ে মামলা করেন। তার দাবি ছিল, সম্পত্তির বিভিন্ন অংশ উত্তরাধিকার, দান ও ক্রয়সূত্রে তার মালিকানায় এসেছে। অন্যদিকে কয়েকজন বিবাদী দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট জমি অনেক আগেই নিলাম বিক্রি ও পরবর্তী বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাদের দখল ও স্বত্বে এসেছে।

বিবাদীপক্ষের দাবি ছিল, জমির নিলাম বিক্রয়ের পর বন্দোবস্ত, খতিয়ান এবং খাজনা প্রদানের মাধ্যমে তাদের স্বত্ব ও দখলের বিষয়টি প্রমাণিত। তারা আদালতের নিচের দুই স্তরের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।

প্রথম আদালত ৩০ জুন ১৯৯৩ তারিখে মামলাটি আংশিকভাবে ডিক্রি দেন। পরবর্তীতে আপিল আদালত ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখে আপিল খারিজ করে প্রথম আদালতের রায় বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করা হয়।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, মূল মামলায় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের নাম সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি এবং তাদের কাছে যথাযথভাবে সমনও জারি হয়নি।

বিশেষ করে, বিবাদী হিসেবে ‘আবদু মিয়া’ নাম উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত ব্যক্তি ছিলেন ‘আনু মিয়া’। আদালতের নথি অনুযায়ী, আনু মিয়ার কাছে যথাযথভাবে সমন জারি হয়নি এবং তার উত্তরাধিকারীরা দাবি করেন যে তিনি মামলাটি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং আদালতে উপস্থিতও হননি।

এছাড়া আনু মিয়ার মৃত্যুর পর তার নামে সম্পত্তি হস্তান্তরের কয়েকটি দলিল তৈরি করা হয়েছে বলে তার উত্তরাধিকারীরা আদালতে দাবি করেন। এসব দলিলের সত্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। আদালতে দাখিল করা নথিতে এমন দাবিও উঠে আসে যে, আনু মিয়ার মৃত্যুর পর তাকে দাতা দেখিয়ে দলিল তৈরি করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, মামলার আরেক গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ নূরজাহান বেগম মামলার বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেলেও তার উত্তরাধিকারীদের যথাযথভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়নি। পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারীদেরও মামলায় তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না পাওয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।

‘Fraud vitiates everything’

হাইকোর্ট বলেন, এসব ঘটনা ও নথিপত্র বাদী বা তার উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করে ডিক্রি অর্জন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের বিষয়ে গুরুতর সন্দেহ সৃষ্টি করে।

আদালত উল্লেখ করেন, “fraud vitiates everything”—অর্থাৎ প্রতারণা সবকিছুকেই কলুষিত করে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্জিত ডিক্রি ন্যায়বিচারের স্বার্থে বাতিল করা যেতে পারে।

তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেন, যেসব দলিলকে জাল বা ভুয়া বলে দাবি করা হয়েছে, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে জাল কি না—তা প্রমাণ গ্রহণের মাধ্যমে ট্রায়াল কোর্টকেই নির্ধারণ করতে হবে। হাইকোর্ট নিজে এসব দলিলের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করেননি।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট মনে করেন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ পক্ষদের যথাযথভাবে নোটিশ না দেওয়া, তাদের আদালতে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা এবং নথিপত্র নিয়ে ওঠা গুরুতর প্রশ্নের কারণে মামলাটি নতুন করে বিচার করা প্রয়োজন।

এ কারণে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের ৩০ জুন ১৯৯৩ ও ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন এবং মামলাটি নতুন করে বিচারের জন্য ট্রায়াল কোর্টে রিমান্ড করেন।

আদালত নির্দেশ দেন, বিবাদী নং ২, ১৩ ও ৩২-এর উত্তরাধিকারীরা চাইলে নতুন করে লিখিত বক্তব্য দাখিল করতে পারবেন। বাদী ও অন্যান্য বিবাদীরাও প্রয়োজন হলে তাদের pleadings সংশোধনের সুযোগ পাবেন। ট্রায়াল কোর্টকে সব পক্ষকে নোটিশ দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায়ের তাৎপর্য

রায়ের মূল বক্তব্য হলো, আদালতের সঙ্গে প্রতারণা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন এবং কোনো পক্ষকে যথাযথভাবে মামলা পরিচালনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে অর্জিত ডিক্রি আইনের দৃষ্টিতে টেকসই নয়। তবে কোনো দলিল জাল বা প্রতারণামূলক কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রমাণ গ্রহণের পর ট্রায়াল কোর্টকে দিতে হবে।


বিডিএলপি/মাসুম