১ নভে, ২০২৬

ভুল এসএ রেকর্ডের কারণে মালিকানা হারাবেন না জমির প্রকৃত মালিক: হাইকোর্ট

১৯২৭ সালের নিবন্ধিত কবুলিয়ত ও দখলের প্রমাণ থাকায় ৪০ শতাংশ জমির মালিকানা স্বীকার, সরকারের খাস খতিয়ানে রেকর্ডকে ভুল ঘোষণা 
জমির এসএ খতিয়ানে সরকারের নামে খাস হিসেবে রেকর্ড করা হলেই প্রকৃত মালিকের স্বত্ব বিলুপ্ত হয় না। যথাযথ দলিল, খাজনা পরিশোধের রসিদ এবং দখলের প্রমাণ দিয়ে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা গেলে ভুল রেকর্ডের কারণে কোনো ব্যক্তির স্বত্ব কেড়ে নেওয়া যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সম্প্রতি বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের একক বেঞ্চ আবদুল মান্নান ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য, সিভিল রিভিশন নং ৪০৫৯/২০০৮ মামালয় এ রায় দেন। ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে দেওয়া রায়ে আদালত কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা জজ, প্রথম আদালতের দেওয়া পূর্ববর্তী রায় বাতিল করে নিম্ন আদালতের স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি পুনর্বহাল করেন। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ০১ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার বাদীরা কুমিল্লার লাকসাম এলাকার ৭০৭ নম্বর দাগের ৪০ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি করে ১৯৮৭ সালে স্বত্ব ঘোষণার মামলা দায়ের করেন। তাঁদের দাবি, ১৯২৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নিবন্ধিত দুটি কবুলিয়তের মাধ্যমে তাঁদের পূর্বসূরি রহিমউদ্দিন জমিদারের কাছ থেকে ৪০ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত নেন। এরপর জমিদারকে খাজনা প্রদান এবং জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর সরকারকে খাজনা দিয়ে তাঁরা জমিটি ভোগদখল করে আসছিলেন।

জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ, পুকুর খনন এবং পূর্বসূরিদের কবরস্থানও ছিল। কিন্তু এসএ জরিপে জমির একটি অংশ সরকারের খাস খতিয়ানে রেকর্ড করা হলে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, সরকার দাবি করে, সংশ্লিষ্ট জমির মূল রেকর্ডে সেটি গাবাম ভূমি হিসেবে উল্লেখ ছিল এবং এ ধরনের জমি ব্যক্তিগত বন্দোবস্ত দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে বাদীদের জমির ওপর কোনো স্বত্ব বা দখল নেই।

নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত

১৯৯০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লাকসামের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত বাদীদের পক্ষে স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি দেন। তবে সরকারের আপিলের পর ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা জজ, প্রথম আদালত সেই ডিক্রি বাতিল করে দেন।

এরপর বাদীরা হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট মামলার দলিলপত্র, সাক্ষ্য এবং অ্যাডভোকেট কমিশনারের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখতে পান, ১৯২৭ সালের দুটি নিবন্ধিত কবুলিয়তের মাধ্যমে বাদীদের পূর্বসূরি জমির মালিকানা অর্জন করেছিলেন। সরকার ওই কবুলিয়ত দুটি জাল বা ভুয়া প্রমাণ করতে পারেনি।

আদালত আরও দেখতে পান, জমিদারকে দেওয়া খাজনার রসিদে কবুলিয়তের তফসিল অনুযায়ী জমির সীমানার উল্লেখ রয়েছে। অ্যাডভোকেট কমিশনারের প্রতিবেদনেও বিরোধপূর্ণ জমি কবুলিয়তে বর্ণিত সীমানার অন্তর্ভুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২০ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে আদালত বলেন, ওই ধারায় যেসব শ্রেণির জমি জমিদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের দখলে রাখতে পারবেন না, তার মধ্যে গাবাম ভূমির কোনো উল্লেখ নেই। ফলে শুধু গাবাম ভূমি হিসেবে সিএস খতিয়ানে রেকর্ড থাকার কারণে জমিটি বন্দোবস্তের অযোগ্য ছিল—আপিল আদালতের এমন সিদ্ধান্ত আইনসম্মত নয়।

আদালত আরও লক্ষ করেন, একই দাগের ১.৪৪ একর জমির মধ্যে ৮২ শতাংশ এসএ খতিয়ানে করবান আলীর নামে এবং অবশিষ্ট ৬২ শতাংশ সরকারের খাস খতিয়ানে রেকর্ড করা হয়েছিল। অথচ একই জমিদারের কাছ থেকে একই সময়ে করবান আলী ও বাদীদের পূর্বসূরি পৃথক কবুলিয়তের মাধ্যমে জমি বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন। এ অবস্থায় একই দাগের একাংশকে বন্দোবস্তযোগ্য এবং অন্য অংশকে বন্দোবস্তের অযোগ্য বিবেচনা করা বৈষম্যমূলক।

আদালত বলেন, স্বত্ব ও দখলের প্রাথমিক ধারণা তৈরিতে খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর প্রমাণমূল্য খণ্ডনযোগ্য। যথাযথ মৌখিক ও দালিলিক প্রমাণ দিয়ে ভুল রেকর্ডের বিষয়টি খণ্ডন করা সম্ভব।

বিশেষভাবে আদালত উল্লেখ করেন, বাদীরা দুটি নিবন্ধিত কবুলিয়তের মাধ্যমে মোট ৪০ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি করেছিলেন। এর মধ্যে একটি কবুলিয়ত (দলিল নম্বর ৪৪১১) প্রদর্শনী-১ হিসেবে চিহ্নিত হলেও অন্যটি (দলিল নম্বর ৪৪১০) যথাসময়ে আদালতে দাখিল করা সত্ত্বেও অসাবধানতাবশত প্রদর্শনী হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। শুধু প্রদর্শনী নম্বর না দেওয়ার কারণে বাদীদের দাবি ক্ষতিগ্রস্ত করা ন্যায়সংগত নয়। তাই হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের নথিতে থাকা দ্বিতীয় কবুলিয়তটিও বিবেচনায় নেন।

আদালতের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্টের মতে, বাদীরা তাঁদের স্বত্ব ও দখল যথাযথ দলিল, খাজনার রসিদ এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। বিপরীতে, সরকার বিরোধপূর্ণ জমির ওপর নিজেদের স্বত্ব বা দখলের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি দেখাতে পারেনি।

এ অবস্থায় পরবর্তী এসএ বা অন্য কোনো রেকর্ড ভুল ঘোষণার পৃথক প্রতিকার না চাইলেও বাদীদের স্বত্ব ঘোষণার মামলাটি বর্তমান কাঠামোয় গ্রহণযোগ্য।

হাইকোর্টের আদেশ

হাইকোর্ট রুল অ্যাবসলিউট (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা জজ, প্রথম আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন এবং ১৯৯০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লাকসামের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের দেওয়া স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি পুনর্বহাল করেন। তবে কোনো পক্ষকে মামলার খরচ প্রদান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়নি।

আইনি শিক্ষা

এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, খতিয়ানে ভুল রেকর্ড থাকলেই প্রকৃত মালিকের স্বত্ব বিলুপ্ত হয় না। নিবন্ধিত দলিল, দীর্ঘদিনের দখল, খাজনা পরিশোধের রসিদ এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা গেলে ভুল রেকর্ডের বিরুদ্ধে আদালত প্রতিকার দিতে পারেন। পাশাপাশি, আদালতে যথাসময়ে দাখিল করা কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিল অসাবধানতাবশত প্রদর্শনী হিসেবে চিহ্নিত না হলেও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তা বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: