৯ অক্টো, ২০২৬

উত্তরাধিকারীদের প্রয়োজনীয় পক্ষ হিসেবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করে দায়ের করা মামলার একতরফা ডিক্রি (Ex-parte Decree) বাতিল হাইকোর্টের রায়ে বহাল

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
জমির মালিকের উত্তরাধিকারীদের প্রয়োজনীয় পক্ষ হিসেবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করে করা মামলায় দেওয়া এক্সপার্টে রায় ও ডিক্রি বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে উত্তরাধিকারীরা তাদের প্রাপ্য অংশ বা সাহাম পাওয়ার অধিকারী বলে আদালত মত দিয়েছেন।

হাইকোর্টের বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ২০২২ সালের একটি মামলায় এ সিদ্ধান্ত দেন। মামলাটি হলো— দেওয়ানি রিভিশন মামলা নং ৬১৭১/২০২২, মো. আহমেদ আলী ও অন্যান্য বনাম মো. আবুল হোসেন ও অন্যান্য।  রায়টি ঘোষণা করা হয় ২০২৬ সালের ৫ জুলাই এবং সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়টি প্রকাশ করা হয় ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি:

মামলার বিরোধীয় জমির সি.এস. খতিয়ান নম্বর ৩০০-তে সিটো বিবি ও জহিরুন নেসার নামে মোট ৫.৩৫ একর জমি রেকর্ড ছিল। এর মধ্যে সিটো বিবির অংশ ছিল ২.৬৭৫ একর। তিনি মারা গেলে তার তিন ছেলে—আনার উদ্দিন, কট্টু শেখ ও শমসের আলী—ওয়ারিশ হিসেবে ওই সম্পত্তিতে অংশ পান। পরবর্তীতে তাদের উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমে বাদীপক্ষের স্বত্বের দাবি ওঠে।

বাদীপক্ষের দাবি ছিল, পূর্ববর্তী একটি মামলায় তাদের প্রয়োজনীয় পক্ষ করা হয়নি। ফলে তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে দেওয়া এক্সপার্টে রায় ও ডিক্রি বাতিল এবং জমিতে তাদের অংশ নির্ধারণের জন্য তারা অন্য শ্রেণির মামলা নম্বর ৫৬/২০১৯ দায়ের করেন।

অন্যদিকে বিবাদীপক্ষ দাবি করে, সিটো বিবি তার জমি বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর করেছিলেন। তবে সেই হস্তান্তরের দলিল তারা আদালতে প্রমাণ করতে পারেনি।

নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত:

বিচার শেষে সহকারী জজ, পাটগ্রাম, লালমনিরহাট ২০২০ সালের ২ মার্চের রায়ে বাদীদের পক্ষে মামলা ডিক্রি করেন। আদালত দেখতে পান, আগের মামলায় সিটো বিবির উত্তরাধিকারীদের প্রয়োজনীয় পক্ষ করা হয়নি এবং তাদের স্বার্থ ওই মামলার রায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে পূর্বের এক্সপার্টে রায় ও ডিক্রি বাতিল করে বাদীদের ১.৬৯০৪ একর জমির সাহাম দেওয়া হয়।

এর বিরুদ্ধে বিবাদীরা টাইটেল আপিল নম্বর ৩৬/২০২০ দায়ের করেন। কিন্তু জয়েন্ট ডিস্ট্রিক্ট জজ, আদালত নম্বর ১, লালমনিরহাট ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।

হাইকোর্টে মূল প্রশ্ন:

হাইকোর্টে বিবাদীপক্ষের প্রধান বক্তব্য ছিল, বাদীরা সিটো বিবির বৈধ উত্তরাধিকারী—এটি যথাযথভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং এস.এ. ও বি.আর.এস. খতিয়ানসহ অন্যান্য প্রমাণ বিবেচনায় না নিয়ে নিম্ন আদালতগুলো সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

অন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, বাদীরা সিটো বিবির উত্তরাধিকারী এবং বিবাদীরা সিটো বিবির কাছ থেকে জমি কেনার কোনো দলিল প্রমাণ করতে পারেনি। উভয় নিম্ন আদালত প্রমাণ মূল্যায়ন করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট দেখতে পান, উভয় নিম্ন আদালতই একযোগে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে বাদীরা সি.এস. রেকর্ডভুক্ত মালিক সিটো বিবির উত্তরাধিকারী এবং তারা তাদের প্রাপ্য সাহাম পাওয়ার অধিকারী। অন্যদিকে বিবাদীরা সিটো বিবির কাছ থেকে জমি হস্তান্তরের দাবি করলেও সেই হস্তান্তরের কোনো দলিল প্রমাণ করতে পারেনি।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বিবাদীপক্ষের সাক্ষী নিজেই স্বীকার করেছেন যে সিটো বিবি সি.এস. খতিয়ানের রেকর্ডভুক্ত মালিক ছিলেন, তার কাছ থেকে জমি হস্তান্তরের কোনো দলিল তারা প্রমাণ করতে পারেনি এবং সিটো বিবির উত্তরাধিকারীদের আগের মামলায় বিবাদী করা হয়নি।

হাইকোর্টের মতে, সিটো বিবি জীবদ্দশায় তার অংশ হস্তান্তর করেছিলেন—এমন প্রমাণ না থাকায় তার উত্তরাধিকারীরা সংশ্লিষ্ট জমিতে তাদের প্রাপ্য অংশ পাওয়ার অধিকারী। যেহেতু তারা আগের মামলার প্রয়োজনীয় পক্ষ ছিলেন কিন্তু তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তাই ওই মামলায় দেওয়া এক্সপার্টে রায় ও ডিক্রি বাতিল করা আইনসঙ্গত হয়েছে।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত:

হাইকোর্ট সিভিল রিভিশনের রুল খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি।

আইনি শিক্ষা:

কোনো সম্পত্তির স্বত্ব দাবি করা উত্তরাধিকারীরা যদি পূর্ববর্তী মামলায় প্রয়োজনীয় পক্ষ হয়েও বাদ পড়ে যান এবং তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে এক্সপার্টে ডিক্রি দেওয়া হয়, তাহলে যথাযথ মামলার মাধ্যমে সেই ডিক্রি বাতিলের সুযোগ রয়েছে—বিশেষত যখন বিপক্ষ তাদের কথিত হস্তান্তরের দলিল প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়।

বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: