![]() |
প্রাসঙ্গিক আইন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকারের আইন, ১৮৭৭-এর ৮ ধারা, পরিত্যক্ত সম্পত্তি আদেশ, ১৯৭২ এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তি-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫। |
সম্পত্তির মালিকানা ও দখল ফিরে পাওয়ার দাবিতে দায়ের করা একটি দেওয়ানি মামলায় নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ এসেছে।
বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদী-এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ফার্স্ট আপিল নং ৫০৪/২০০০, সমীরেন্দ্র গুহ রায় বনাম শাবানা খাতুন ও অন্যান্য মামলায় গত ২৩ আগস্ট ২০২৬ এ রায় দেন। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার পটভূমি
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রাজবাড়ীর ৯.১৮ শতাংশ জমি ও তার ওপর অবস্থিত বাড়ির মালিকানা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। বাদীর দাবি, সম্পত্তিটি আবদুল জব্বারের মালিকানাধীন ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আবদুল জব্বার ও তাঁর স্ত্রী নিহত হলে তাঁদের এক বছর বয়সী কন্যাকে ফরিদপুরে নিয়ে লালন-পালন করা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি শাবানা খাতুন নামে পরিচিত হন।
বাদীর দাবি ছিল, তাঁকে লালন-পালনকারী ব্যক্তি নিজের মেয়ের মতো বড় করে বিয়ে দেন এবং সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির সঙ্গে তাঁর উত্তরাধিকারসূত্রে স্বত্বের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সরকার সম্পত্তিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এবং পরবর্তী সময়ে তা বিবাদীকে বিক্রি করে। ১৯৯৭ সালে বিবাদীরা সম্পত্তির দখল নেন বলে বাদী অভিযোগ করেন।
এ অবস্থায় বাদী স্বত্ব ঘোষণা, দখল পুনরুদ্ধার এবং সম্পত্তি বিক্রির দলিলকে অবৈধ ও তাঁর ওপর বাধ্যকর নয়—এ মর্মে প্রতিকার চেয়ে মামলা করেন। রাজবাড়ীর প্রথম আদালতের তৎকালীন অধস্তন বিচারক ২০০০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বাদীর পক্ষে ডিক্রি দেন। এর বিরুদ্ধে বিবাদী হাইকোর্টে আপিল করেন।
বাদীর উত্তরাধিকার ও পূর্বদখল প্রমাণে ঘাটতি
হাইকোর্ট মামলার নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখতে পান, বাদী নিজেকে আবদুল জব্বারের কন্যা দাবি করলেও সাক্ষীদের কেউই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের ভিত্তিতে তাঁর জৈবিক পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি।
বাদীর পক্ষে দাখিল করা উত্তরাধিকার সনদটি পৌরসভার কমিশনারের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইস্যু করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কমিশনার আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে ওই তদন্ত ও সনদের বিষয়বস্তু সমর্থন করেননি। ফলে সনদটির ভিত্তিতে বাদীর উত্তরাধিকার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আদালত গ্রহণ করেননি।
এ ছাড়া বাদী তাঁর মামলায় দাবি করেছিলেন, অন্য ব্যক্তিরা তাঁর অনুমতিতে বিরোধপূর্ণ বাড়িতে বসবাস করতেন। কিন্তু তাঁদের কারও নাম উল্লেখ করতে পারেননি। সাক্ষ্যেও তাঁর পূর্বদখল কিংবা বিবাদীদের বেআইনিভাবে দখল নেওয়ার বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আদালত বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রতিকারের আইন, ১৮৭৭-এর ৮ ধারায় দখল পুনরুদ্ধারের মামলা সফল করতে হলে বাদীকে পূর্বদখল, পরবর্তী দখলচ্যুতি এবং আইন নির্ধারিত তামাদি মেয়াদের মধ্যে মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রমাণ করতে হয়। আলোচ্য মামলায় বাদী প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছেন।
পরিত্যক্ত সম্পত্তির বিরোধে দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার নেই
হাইকোর্ট আরও পর্যবেক্ষণ করেন, পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্তি এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত দলিলে সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনে বিশেষ প্রতিকারব্যবস্থা রয়েছে।
আদালতের মতে, পরিত্যক্ত সম্পত্তি আদেশ, ১৯৭২ এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তি-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর অধীনে গঠিত সেটেলমেন্ট কোর্টই এ ধরনের সম্পত্তি তালিকা থেকে অবমুক্ত করার দাবিসহ সংশ্লিষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তির উপযুক্ত ফোরাম। এ ক্ষেত্রে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করে প্রতিকার চাওয়া আইনগতভাবে সঠিক পথ নয়।
তবে আদালত উল্লেখ করেন, আবদুল জব্বারের প্রকৃত কোনো উত্তরাধিকারী থাকলে এবং আইনগতভাবে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ অবশিষ্ট থাকলে তিনি সেটেলমেন্ট কোর্টে যেতে পারবেন।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত
সবশেষে হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ আপিলের পক্ষে যথেষ্ট ভিত্তি খুঁজে পান। আদালত রাজবাড়ীর অধস্তন আদালতের ২০০০ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন এবং বিবাদীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি খারিজ করে দেন। আপিলের খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি।
সূত্র: হাইকোর্ট বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

0 coment rios: