![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
২০২৫ সালের ৭ মে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড বনাম মোঃ এ. কে. আজাদ ও অন্যান্য (কার্গো হেলপার), দেওয়ানি আপিল নং ১৭৮/২০১৮ মামলায় দেওয়া রায়ে আপিল বিভাগ বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের স্থায়ী নিয়োগের জন্য তালিকাভুক্ত করা এবং তাঁদের দীর্ঘদিনের সন্তোষজনক চাকরির বিষয়টি আইনগত অধিকার সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনবল কমানোর সিদ্ধান্তের কারণে তাঁদের সেই অধিকার নাকচ করা যায় না।
মামলার পটভূমি
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মীরা প্রায় ১০ থেকে ২৫ বছর ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে অস্থায়ী ভিত্তিতে কার্গো হেলপার ও ট্রাফিক হেলপার হিসেবে কাজ করছিলেন। ২০০০ সালে তাঁদের চাকরি স্থায়ী করার দাবি ওঠার পর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়।
২০০১ সালে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করা এবং সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ড থাকা কর্মীদের স্থায়ী নিয়োগের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয় এবং সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থাও করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
২০০৭ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনবল ৬ হাজার ৮৮৩ থেকে কমিয়ে ৩ হাজার ৪০০ জনে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে কার্গো হেলপার ও ট্রাফিক হেলপার পদ দুটি অনুমোদিত জনবল কাঠামো থেকে বিলুপ্ত করা হয়।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মীরা চাকরি স্থায়ী করার নির্দেশনা চেয়ে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট করেন।
হাইকোর্টের রায় ও আপিল
২০১৬ সালের ২ জুন হাইকোর্ট বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরি স্থায়ী করার বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে বিমান কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। কার্গো হেলপার ও ট্রাফিক হেলপার পদে নিয়োগ সম্ভব না হলে স্থায়ী কাঠামোর অন্য কোনো উপযুক্ত পদে নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করতে বলা হয়।
হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আপিলকারী কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, কর্মীরা অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করতেন এবং সংশ্লিষ্ট পদ বিলুপ্ত হওয়ায় তাঁদের স্থায়ী পদে নিয়োগের সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, কর্মীদের পক্ষে বলা হয়, তাঁরা দীর্ঘদিন সন্তোষজনকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কর্তৃপক্ষ নিজেই তাঁদের স্থায়ী নিয়োগের জন্য তালিকাভুক্ত করেছিল।
আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ
আপিল বিভাগ রায়ে উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নাম স্থায়ী নিয়োগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিমান কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করেনি। তাঁদের দীর্ঘদিনের চাকরি এবং সন্তোষজনক কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে স্থায়ী নিয়োগের জন্য যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছিল।
আদালত ১৯৬৫ সালের Employment of Labour (Standing Orders) Act-এর ৪ ধারা এবং ২০০৬ সালের শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কর্মীদের আইনস্বীকৃত অধিকারকে কেবল জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত বা স্বেচ্ছা অবসর প্রকল্পের অজুহাতে অস্বীকার করা যায় না।
রায়ে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আইনগত অধিকার সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে পদ বিলুপ্তির যুক্তি দেখিয়ে তাঁদের স্থায়ী নিয়োগের অধিকার নাকচ করার অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়।
চাকরি স্থায়ী করার নির্দেশ
আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে কোনো আইনগত ত্রুটি খুঁজে পাননি। আদালত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে নির্দেশ দেন, এখনো অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত এবং সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ডধারী সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরি স্থায়ী করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
রায়ের অনুলিপি পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। একই সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগের ২ জুন ২০১৬ তারিখের রায় থেকে চাকরি স্থায়ী হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরির সুবিধাদির অর্ধেক দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অবসর গ্রহণের বয়স পূর্ণ হলে আইন অনুযায়ী তাঁদের পদ বিলুপ্ত করার স্বাধীনতা বিমান কর্তৃপক্ষের থাকবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
আইনি তাৎপর্য
এ রায়ে আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন, দীর্ঘদিনের সন্তোষজনক চাকরি, স্থায়ী নিয়োগের জন্য যোগ্যতা এবং কর্তৃপক্ষের পূর্ববর্তী পদক্ষেপের ভিত্তিতে কোনো কর্মীর আইনগত অধিকার সৃষ্টি হলে কেবল প্রশাসনিক পুনর্গঠন বা পদ বিলুপ্তির যুক্তিতে তা অস্বীকার করা যায় না। তবে এ সিদ্ধান্ত মামলার নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রযোজ্য আইনের আলোকে বিবেচ্য; এটি সব অস্থায়ী কর্মীর চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী হওয়ার সাধারণ ঘোষণা নয়।
সূত্র: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ, সিভিল আপিল নং ১৭৮/২০১৮, রায়: ৭ মে ২০২৫। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

0 coment rios: