৬ অক্টো, ২০২৬

দেনমোহর স্ত্রীর স্বতন্ত্র অধিকার, আর্থিক অক্ষমতার অজুহাতে দায় এড়ানো যাবে না: হাইকোর্ট

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
দেনমোহর স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র ও আইনগত অধিকার এবং স্বামী আর্থিক অক্ষমতার অজুহাত দেখিয়ে এ দায় থেকে অব্যাহতি নিতে পারেন না—এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, স্ত্রী স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে দেনমোহরের পুরো বা কোনো অংশ মওকুফ না করলে আদালতেরও দেনমোহরের অর্থ কমিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার নেই।

বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ সিভিল রিভিশন নং ৫২১৯/২০২৪ মামলায় এ রায় দেন। ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রায়টি ঘোষণা করা হয়। মামলাটিতে ইকুব আলী ছিলেন আবেদনকারী এবং শানজিদা নাসরিন ছিলেন প্রতিপক্ষ। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি:

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাদী ও বিবাদীর মধ্যে বিয়ে হয়। বিয়েতে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল ২২ লাখ টাকা। তাদের দাম্পত্য জীবনে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়।

পরবর্তীতে দাম্পত্য বিরোধের একপর্যায়ে স্ত্রীকে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং পরে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। স্ত্রী নিজের দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ভরণপোষণ আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করেন।

পারিবারিক আদালত একতরফা ডিক্রি দিয়ে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ ৩০ হাজার টাকা এবং মেয়ের অতীতের ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা, অর্থাৎ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি মেয়ের জন্য প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা ভরণপোষণ এবং বিয়ের আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ওই ডিক্রি কার্যকরের জন্য এক্সিকিউশন মামলা করা হয়। বিবাদী ডিক্রি বাতিলের আবেদন করলেও তা নিষ্পত্তির আগেই তিনি উচ্চতর আদালতে আপিল করেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজের আদালত ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট আপিলটি খারিজ করে পারিবারিক আদালতের ডিক্রি বহাল রাখেন। এরপর তিনি হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।

হাইকোর্টে আবেদনকারীর বক্তব্য:

আবেদনকারীর আইনজীবী যুক্তি দেন, তিনি মামলার সমন যথাযথভাবে পাননি এবং তার অনুপস্থিতিতে একতরফা ডিক্রি দেওয়া হয়েছে। তার দাবি ছিল, তিনি দেনমোহরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছেন এবং আর্থিক সংকটের কারণে বাকি অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

হাইকোর্টে আবেদনকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার ডিক্রির বিপরীতে তিনি ইতোমধ্যে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। বাকি অর্থ মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করা হয়।

অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেন, নিম্ন আদালত দুটি সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনের যথাযথ মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। রিভিশন মামলার মাধ্যমে পুনরায় সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়নের সুযোগ নেই এবং আবেদনকারী কোনো আইনগত ত্রুটি বা এখতিয়ারগত ভুল দেখাতে পারেননি।

দেনমোহর নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

রায়ে হাইকোর্ট পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে দেনমোহরের আইনগত ও ধর্মীয় ভিত্তি বিশ্লেষণ করেন। আদালত উল্লেখ করেন, দেনমোহর কেবল প্রচলিত কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র আর্থিক অধিকার এবং বিবাহের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি বাধ্যবাধকতা।

আদালত আরও বলেন, কোরআনের বিধান অনুযায়ী দেনমোহর স্ত্রীকে প্রদান করতে হবে এবং স্ত্রী নিজের ইচ্ছায় কোনো অংশ ছেড়ে না দিলে স্বামী তা ফেরত নেওয়ার অধিকার রাখেন না।

রায়ে আরও বলা হয়, প্রচলিত মুসলিম আইন ও নিকাহনামার কাঠামো অনুযায়ী তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্বামীর ওপর স্ত্রীর পাওনা ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়। স্ত্রীকে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে—এমন কোনো সাধারণ বিধান নেই।

দেনমোহর মওকুফের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:

হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেন, আদালতের নিজের এখতিয়ার থেকে দেনমোহরের কোনো অংশ মওকুফ করার সুযোগ নেই। তবে স্ত্রী স্বামীর পক্ষে স্বেচ্ছায় দেনমোহরের সম্পূর্ণ বা কোনো অংশ মওকুফ করতে পারেন।

এ ধরনের মওকুফ বৈধ হতে হলে তা হতে হবে সচেতন, দ্ব্যর্থহীন ও স্বাধীন সম্মতির ভিত্তিতে। জবরদস্তি, প্রভাব, প্রতারণা বা স্বাধীন সম্মতির ঘাটতির মাধ্যমে কোনো মওকুফ আদায় করা হলে সেটিকে বৈধ বলে গ্রহণ করা যাবে না।

মেয়ের ভরণপোষণও বহাল:

হাইকোর্ট দেখতে পান, নিম্ন আদালতগুলো ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ভরণপোষণের বিষয়ে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। আদালত বলেন, স্কুলগামী অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের প্রয়োজন, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ও উৎসবসহ সামগ্রিক ব্যয় বিবেচনায় ভরণপোষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, আবেদনকারী মোট ডিক্রিকৃত ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও মেয়ের চলমান ভরণপোষণের আইনগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি।

রিভিশন খারিজ, ডিক্রি বহাল:

সবশেষে হাইকোর্ট আবেদনকারীর রিভিশনে কোনো বেআইনি সিদ্ধান্ত, ত্রুটি বা এখতিয়ারগত ভুল খুঁজে পাননি। ফলে রুলটি খারিজ করে দেন এবং নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন।

তবে আদালত আবেদনকারীকে প্রতিপক্ষ স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের প্রাপ্য বকেয়া দেনমোহর ও ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে প্রকৃত আর্থিক সংকট প্রমাণিত হলে এক্সিকিউটিং আদালত ন্যায়সংগত শর্তে কিস্তিতে ডিক্রির অর্থ পরিশোধের সুযোগ দিতে পারবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়। তবে এমন কিস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ডিক্রিধারীর অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।

বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: