![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
একই সঙ্গে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, সরকারি মালিকানাধীন বা সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো কোম্পানি কোম্পানি আইনের অধীনে নিবন্ধিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারিক পর্যালোচনার এখতিয়ারের বাইরে চলে যায় না। কোনো প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করলে এবং তার সিদ্ধান্তে জনআইনের উপাদান বিদ্যমান থাকলে সেই সিদ্ধান্ত বিচারিক পর্যালোচনার আওতাভুক্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি উর্মী রহমান ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। মো. মাহবুব কবির বনাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য, রিট পিটিশন নং ১৩৫০১/২০২৫ মামলায় দেওয়া এ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৫ অক্টোবর ২০২৬।
মামলার পটভূমি
রিটকারী মো. মাহবুব কবির প্রথমে চুক্তিভিত্তিকভাবে বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেডে উপমহাব্যবস্থাপক (Deputy General Manager) হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে তিনি প্রধান প্রকৌশলী (Chief Engineer) হন এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্থাপিত জেনারেটরের উৎপত্তির দেশ নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁর বিরুদ্ধে অবহেলা, অদক্ষতা ও অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা করা হয়। তদন্ত শেষে ২৩ জুন ২০২০ তারিখে তাঁকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে তাঁর দায়ের করা আপিলও খারিজ করা হয়।
এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে তিনি চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন করেন। ১৩ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে বিদ্যুৎ বিভাগ (Power Division) কোম্পানিকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেয়। এ উদ্দেশ্যে গঠিত একটি কমিটি ১৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। তবে পরবর্তী প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। পরে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে পুনর্বহাল করা সম্ভব নয় বলে সিদ্ধান্ত নেয়।
এ অবস্থায় চাকরি থেকে অপসারণের আদেশ, আপিল খারিজের সিদ্ধান্ত এবং পুনর্বহালের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিনি হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করেন।
হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
১. সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির বিরুদ্ধেও রিট করা যায়
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেডের অধিকাংশ শেয়ারের মালিকানা সরকারের এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে। প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করে।
তাই কোনো কোম্পানি কোম্পানি আইনের অধীনে নিবন্ধিত হলেও তার কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তে জনআইনের উপাদান থাকলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিচারিক পর্যালোচনা সম্ভব।
বিশেষ করে, মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন, আইনগত কর্তৃত্বের অভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত আদালতের পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
২. সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ না দেওয়া প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন
আদালত দেখতে পান, তদন্ত কমিটি সাক্ষীদের কাছ থেকে লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করলেও রিটকারীকে তাঁদের জেরা করার কোনো সুযোগ দেয়নি। বিশেষ করে, রিটকারী এবং তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সাবুরের বক্তব্যের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা ছিল।
এ অবস্থায় সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ না দেওয়ায় রিটকারীর আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে আদালত মনে করেন।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, রিটকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনকারী তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁর চাকরিচ্যুতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পরিচালনা পর্ষদের সভায়ও অংশগ্রহণ করেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়।
আদালতের মতে, অভিযোগ উত্থাপনকারী ব্যক্তি নিজেই যদি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
ফলে ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের ভিত্তিতে দেওয়া চাকরি থেকে অপসারণের আদেশ আইনগতভাবে বহাল থাকতে পারে না।
৩. আপিল খারিজের সিদ্ধান্তও বেআইনি
বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেড এমপ্লয়িজ সার্ভিস রুলস, ২০১৬-এর বিধি ৭.১০(ই) অনুযায়ী, আপিল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল শাস্তির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত প্রমাণ যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না এবং আরোপিত শাস্তি যথাযথ, অপর্যাপ্ত নাকি অতিরিক্ত—তা পর্যালোচনা করা।
কিন্তু আদালত দেখতে পান, আপিল কর্তৃপক্ষ রিটকারীর উত্থাপিত নির্দিষ্ট অভিযোগ ও যুক্তিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই আপিল খারিজ করে। বরং তদন্তের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে—এমন বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
তাই আপিল খারিজের আদেশকেও বেআইনি ঘোষণা করেন আদালত।
৪. কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ায় রিট মামলা অগ্রহণযোগ্য হয় না
চাকরি থেকে অপসারণের পর উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত হওয়া এবং রিটকারীর কিছু চাকরিসংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।
তবে আদালত বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশে পরবর্তীতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছিল। সেই পুনর্বিবেচনার পর ১০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে নেওয়া সিদ্ধান্ত রিট দায়েরের জন্য নতুন ও তাৎক্ষণিক কারণের (Fresh Cause of Action) সৃষ্টি করে।
তাই কেবল বিলম্বের যুক্তিতে রিট আবেদন অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা যায় না। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনা না করে বিলম্বের বিষয়টি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা সমীচীন নয়।
৫. চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পুনর্বহালের পথে স্বয়ংক্রিয় বাধা নয়
আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, কোম্পানির চাকরি বিধিমালায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান থাকলেও নিয়োগের চুক্তিভিত্তিক প্রকৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহালের সম্ভাবনা নাকচ করে না।
সার্ভিস রুলসের বিধি ৭.৪(বি)-তে চাকরি থেকে অপসারণ (Removal) ও চাকরিচ্যুতি (Dismissal)-এর মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিধি ৭.১১-তে চাকরিতে পুনর্বহালের বিধান রয়েছে।
রিটকারীর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। যেহেতু আদালত অপসারণের আদেশকে বেআইনি বলে ঘোষণা করেছেন, তাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিংবা পরবর্তীতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে পুনর্বহালের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বাধা হিসেবে গ্রহণ করেননি।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
উপরোক্ত পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ রুল অ্যাবসলিউট (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে আদালত নিম্নোক্ত আদেশ ও সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করেন—
১. ২৩ জুন ২০২০ তারিখে জারি করা চাকরি থেকে অপসারণের আদেশ;
২. ৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে রিটকারীর আপিল খারিজের আদেশ; এবং
৩. ১০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহাল না করার সিদ্ধান্ত।
আদালত সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের রিটকারীকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। মামলায় কোনো খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।
রায়ের আইনগত গুরুত্ব
এই রায়ে বিভাগীয় তদন্তে অভিযুক্ত কর্মচারীর আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। বিশেষ করে, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ না দেওয়া প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির লঙ্ঘন।
একই সঙ্গে অভিযোগ উত্থাপনকারী ব্যক্তি যদি অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, তাহলে সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
রায়ে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে, আপিল কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ ও প্রমাণ স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত দিতে হবে। সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির সিদ্ধান্তেও জনআইনের উপাদান থাকলে তা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিচারিক পর্যালোচনার আওতাভুক্ত হতে পারে।
সর্বোপরি, কোনো কর্মচারীর নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক হলেই তাঁর বেআইনি অপসারণের বিরুদ্ধে পুনর্বহালের প্রতিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় না।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

0 coment rios: