২৯ অক্টো, ২০২৬

সিটি জরিপের খতিয়ান দিয়ে মালিকানা দাবি করলেই হবে না, খতিয়ান তৈরির ভিত্তি প্রমাণ করতে হবে: হাইকোর্ট

প্রাসঙ্গিক আইন: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৬, বিধি ১৭ — আরজির সংশোধন
জমির খতিয়ান নিজে মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বরং এটি সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দখল সম্পর্কে একটি অনুমান সৃষ্টি করে। কোনো খতিয়ানের শুদ্ধতা উপযুক্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে, বিশেষ করে পূর্ববর্তী খতিয়ানের সঙ্গে অসংগতির প্রশ্ন উঠলে, সংশ্লিষ্ট খতিয়ান কী ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে বিবাদী নিজের দাবি প্রমাণে ব্যর্থ হলেই বাদীর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না; বাদীকে নিজস্ব দলিল ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে স্বত্ব প্রমাণ করতে হয়।

এ পর্যবেক্ষণ দিয়ে ঢাকার একটি জমির মালিকানা-সংক্রান্ত মামলায় নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল করে পুনর্বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগ। আদালত বলেছেন, মামলার আরজি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে নিযুক্ত আইনজীবীর ভুলের কারণে বাদীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ন্যায়সংগত হবে না। তাই উভয় পক্ষকে আরজি সংশোধন এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিতে হবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ফার্স্ট আপিল নং ১৮/২০১৮, মোহাম্মদ আসিফ বনাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য মামলায় গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে। 

মামলার পটভূমি

মামলার বাদী মোহাম্মদ আসিফ ঢাকার একটি জমির ৬৭৪০ অযুতাংশের স্বত্ব ঘোষণা এবং সিটি জরিপের ১ নম্বর খতিয়ানে সরকারের নামে রেকর্ডকে ভুল ও তাঁর ওপর বাধ্যকর নয়—এ মর্মে প্রতিকার চেয়ে মামলা করেন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট জমি প্রথমে সি.এস. খতিয়ান নং ২৭১৫-এ পূর্ববর্তী মালিকদের নামে রেকর্ডভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমিটি বিভিন্ন ব্যক্তির হাত ঘুরে কাজী সালাহউদ্দিনের মালিকানায় আসে এবং তিনি ১৯৮৯ সালের ৩১ মে নিবন্ধিত কবলা দলিলে জমিটি বাদীর কাছে হস্তান্তর করেন।

বাদীর দাবি অনুযায়ী, তিনি জমিতে কারখানা স্থাপন করে ভোগদখলে ছিলেন। কিন্তু সিটি জরিপের খতিয়ানে জমি সরকারের নামে রেকর্ড হওয়ায় তিনি ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধে বাধার মুখে পড়েন।

অন্যদিকে, সরকারপক্ষের দাবি ছিল, জমিটি সরকারের সম্পত্তি এবং সিটি জরিপের খতিয়ান যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালত ২০১২ সালের টাইটেল স্যুট নং ২৪৫-এ ২০১৭ সালের ১৫ জুন বাদীর মামলা খারিজ করেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে বাদী হাইকোর্টে আপিল করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, সংশ্লিষ্ট জমির পূর্ববর্তী সি.এস. খতিয়ান ও নিবন্ধিত হস্তান্তর দলিলগুলোর বৈধতা সরকারপক্ষ চ্যালেঞ্জ করেনি। কিন্তু আর.এস. খতিয়ান নং ৪০৭৪-এ বাদীর পূর্বসূরি কাজী সালাহউদ্দিনের নামে বিরোধীয় ৬৭৪০ অযুতাংশ জমির মধ্যে মাত্র ৫৮৬৮ অযুতাংশ রেকর্ড করা হয়েছিল। এই অসংগতির ব্যাখ্যা বাদীর আরজি বা সাক্ষ্যপ্রমাণে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।

আদালত বলেন, বাদী যে পরিমাণ জমির মালিকানা দাবি করছেন, পূর্ববর্তী খতিয়ানে তার সম্পূর্ণ অংশ রেকর্ড না থাকায় বাকি জমির স্বত্ব কীভাবে অর্জিত হয়েছিল, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন ছিল। বাদীপক্ষের আইনজীবীও স্বীকার করেন যে, আরজি প্রস্তুতের সময় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

আদালত আরও বলেন, কোনো খতিয়ান স্বত্বের দলিল নয়; এটি মূলত দখল সম্পর্কে অনুমান সৃষ্টি করে। তবে বাদীকে নিজের স্বত্ব স্বাধীনভাবে প্রমাণ করতে হবে। বিবাদীপক্ষ নিজের দাবি প্রমাণ করতে না পারলেই বাদীর মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিক্রি পাওয়ার যোগ্য হয়ে যায় না।

পুনর্বিচারের নির্দেশ

হাইকোর্ট মনে করেন, আরজি প্রস্তুতের সময় আইনজীবীর ভুলের কারণে সৃষ্ট ঘাটতির জন্য বাদীকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হবে। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল করে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য ফেরত পাঠানো প্রয়োজন।

ফলে আদালত আপিল মঞ্জুর করে ২০১৭ সালের ১৫ জুন ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। একই সঙ্গে উভয় পক্ষকে নিজ নিজ আরজি সংশোধন এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিয়ে মামলাটি পুনর্বিচারের নির্দেশ দেন।

হাইকোর্ট নিম্ন আদালতকে আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মামলার খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি।

সূত্র: রায়, হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম



শেয়ার করুন

0 coment rios: