 |
| ছবি: সংগৃহীত |
অন্য একটি কোম্পানির ঋণ গ্রহণের সময় কোনো ব্যক্তি ওই কোম্পানির পরিচালক না থাকলে, ২০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক না হলে কিংবা ঋণের জামিনদার না হলে তাঁকে ওই কোম্পানির ঋণের দায়ে খেলাপি ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। একইভাবে, কেবল অতীতের ব্যবসায়িক বা পারিবারিক সম্পর্কের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণগ্রহীতা কোম্পানির স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান (Interested Concern) হিসেবে দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা আইনসম্মত নয়।
এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত আবেদনকারীদের নাম সিআইবি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত, রিপোর্ট ও প্রচার করাকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং আইনগত কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঋণের দায়ের বিপরীতে আবেদনকারীদের নাম সিআইবি প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
শওকত আজিজ ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য, রিট পিটিশন নং ২১৬৫/২০২৫- মামলায় এ রায় দেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. মোজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এ রায় ঘোষণা করা হয়। রায়টির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় ৪ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার পটভূমি
মামলার আবেদনকারী শওকত আজিজ অ্যাম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর দাবি, ২০০৬ সালের একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে তাঁর পিতা প্রয়াত এম এ হাসেমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচ ছেলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় তিনি অ্যাম্বার গ্রুপের ব্যবসা পরিচালনা শুরু করেন এবং তাঁর ভাই রুবেল আজিজ পারটেক্স গ্রুপের ব্যবসা পরিচালনা করেন।
পারটেক্স ফাউন্ড্রি লিমিটেড নামের একটি কোম্পানিতে শওকত আজিজ ২০০৯ সালে পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর মালিকানাধীন ৮ হাজার শেয়ার রুবেল আজিজের কাছে হস্তান্তর করেন। এ-সংক্রান্ত বোর্ড রেজল্যুশন, ফরম-১১৭, হলফনামা এবং কোম্পানির সংঘবিধি সংশোধনের নথিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
অন্যদিকে, পারটেক্স ফাউন্ড্রি লিমিটেড পরবর্তী সময়ে যমুনা ব্যাংক পিএলসি ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি থেকে ঋণসুবিধা গ্রহণ করে। ওই ঋণের দায়ে শওকত আজিজ ও তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিআইবি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে তাঁদের ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, ঋণ গ্রহণের সময় তাঁরা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালক, শেয়ারহোল্ডার, জামিনদার কিংবা বন্ধকদাতা ছিলেন না। ফলে অন্য একটি স্বতন্ত্র কোম্পানির ঋণের দায় তাঁদের ওপর চাপিয়ে সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করা আইনসম্মত নয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট প্রথমে রিট আবেদনটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ৪১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ও তার কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সুরক্ষা থাকলেও তা নিঃশর্ত নয় বলে আদালত মত দেন।
আদালত বলেন, কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ তার আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে কোনো পদক্ষেপ নিলে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অজুহাতে সেটিকে বৈধতা দেওয়া যায় না। আবেদনকারীরা ক্ষতিপূরণ দাবি করেননি; বরং তাঁদের নাম আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না, সেটিই আদালতের বিবেচ্য বিষয়। তাই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদনটি গ্রহণযোগ্য।
এরপর আদালত ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৫ ধারার (গগ) উপধারা এবং ২৭কক ধারার বিধান বিশ্লেষণ করেন।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৫ ধারার (গগ) উপধারার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করতে হলে তিনটি শর্তের অন্তত একটি পূরণ করতে হবে। যথা—
১. সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে হবে;
২. ওই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক হতে হবে; অথবা
৩. সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের জামিনদার হতে হবে।
আদালত বলেন, ব্যাখ্যায় উল্লিখিত তিনটি শর্তের কোনোটিই পূরণ না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ওই ব্যক্তির স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা যাবে না। প্রশাসনিক চর্চা, অনুমান কিংবা অন্য কোনো বিবেচনার মাধ্যমে আইনে নির্ধারিত এই সীমা সম্প্রসারণের সুযোগ নেই।
শেয়ার হস্তান্তর ও পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত
ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, ঋণদাতা ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া শেয়ার হস্তান্তর ও পরিচালকের পদত্যাগ কার্যকর হয়নি। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭ক ধারা প্রযোজ্য।
তবে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, ২০০৯ সালের ২২ জুলাই শওকত আজিজ যখন পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ ও শেয়ার হস্তান্তর করেন, তখন সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কোনো ব্যাংকঋণ বা আর্থিক দায় ছিল—এমন কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব স্যাংশন অ্যাডভাইস অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ২০১২ সালে ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
আদালত বলেন, কোনো কোম্পানি ঋণগ্রহীতা হওয়ার আগেই পরিচালকের পদত্যাগ বা শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটি ঋণগ্রহীতা হওয়ার কারণে ২৭ক ধারাকে পূর্ববর্তী সময়ে প্রয়োগ করে সেই পদত্যাগ বা হস্তান্তর অকার্যকর ঘোষণা করা যায় না।
এ ছাড়া কোম্পানিজ অ্যাক্ট, ১৯৯৪-এর ৩৮(৩) ধারা অনুযায়ী, যথাযথভাবে সম্পাদিত শেয়ার হস্তান্তরের দলিলের ভিত্তিতে কোম্পানি শেয়ার হস্তান্তর নিবন্ধন করে। অন্যদিকে, ১১৫(২) ধারা অনুযায়ী পরিচালকদের পরিবর্তনের তথ্য রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানোর দায়িত্ব কোম্পানির। আদালত বলেন, ফরম-১২ মূলত পরিচালকদের বিবরণসংক্রান্ত রিটার্ন; এটি নিজে থেকে শেয়ার হস্তান্তর বা পরিচালকের পদত্যাগ বাতিল করে না।
পারিবারিক সম্পর্কের কারণে দায় আরোপ করা যাবে না
ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরও যুক্তি দেওয়া হয়, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকরা শওকত আজিজের পরিবারের সদস্য এবং তিনি ঋণের সুবিধাও ভোগ করেছেন।
এ যুক্তি গ্রহণ করেননি আদালত। আদালত বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৫ ধারার (গগ) উপধারার ব্যাখ্যায় পারিবারিক সম্পর্ককে স্বার্থসংশ্লিষ্টতার স্বতন্ত্র ভিত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আইনপ্রণেতা যেখানে পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে দায় আরোপ করতে চেয়েছেন, সেখানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং আইনে যেখানে এমন বিধান নেই, সেখানে ব্যাখ্যার মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে দায় আরোপ করা যায় না।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ঋণ গ্রহণের সময় শওকত আজিজ পরিচালক ছিলেন না, তাঁর ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার মালিকানাও ছিল না এবং তিনি ঋণের জামিনদারও ছিলেন না। অন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও আইনে নির্ধারিত তিনটি শর্তের কোনোটি পূরণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আদালতের আদেশ
উপরোক্ত পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে (Rule made absolute) আবেদনকারীদের পক্ষে রায় দেন। আদালতের আদেশে বলা হয়—
* পারটেক্স ফাউন্ড্রি লিমিটেডের যমুনা ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের দায়ে আবেদনকারীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা সিস্টার কনসার্ন হিসেবে সিআইবি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্তি, রিপোর্ট, প্রচার ও প্রকাশ আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং আইনগত কার্যকারিতাহীন।
* বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রায়ের অনুলিপি পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে ওই ঋণের দায়ের বিপরীতে আবেদনকারীদের নাম সিআইবি প্রতিবেদন থেকে বাদ দিতে হবে।
* ভবিষ্যতে আইনের শর্ত পূরণ না করে একই ঋণের দায়ে তাঁদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
* তবে আবেদনকারী ৩ ও ৮-এর নিজস্ব ঋণসহ অন্য কোনো ঋণের দায়ে আইন অনুযায়ী তাঁদের সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এ রায় কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।
* আবেদনকারীদের কেউ ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালক হলে, ২০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক হলে অথবা ঋণের জামিনদার হলে এবং আইনের অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে তাঁদের নাম সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
* ব্যাংকগুলোর ঋণের বকেয়া অর্থ আদায়ের আইনগত অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
আদালত কোনো খরচের আদেশ দেননি।
আইনি শিক্ষা
এ রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, কোনো কোম্পানির ঋণখেলাপির দায় কেবল ব্যবসায়িক, ঐতিহাসিক কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপ করা যায় না। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৫ ধারার (গগ) উপধারার ব্যাখ্যায় নির্ধারিত পরিচালক, ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার মালিকানা অথবা জামিনদার হওয়ার শর্তের অন্তত একটি পূরণ করতে হবে।
একই সঙ্গে, ঋণ গ্রহণের আগে সম্পন্ন হওয়া পরিচালকের পদত্যাগ ও শেয়ার হস্তান্তরকে পরবর্তী ঋণের কারণে পূর্ববর্তী সময়ে অকার্যকর ঘোষণা করা যাবে না। সিআইবিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই আইনে নির্ধারিত সীমা ও শর্ত অনুসরণ করতে হবে।
সূত্র: হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন নং ২১৬৫/২০২৫- এর পূর্ণাঙ্গ রায়।
বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম