![]() |
| বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট |
প্রথমেই বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন, মাসদার হোসেন মামলা সরাসরি অনুচ্ছেদ ২২ বলবৎ করার মামলা ছিল না। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮(২) অনুযায়ী, দ্বিতীয় ভাগের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো আদালতের মাধ্যমে সরাসরি বলবৎযোগ্য নয়। ফলে শুধু অনুচ্ছেদ ২২ লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালতের কাছে গিয়ে প্রতিকার চাওয়া যায় না।
তাহলে অনুচ্ছেদ ২২-এর ভূমিকা কী ছিল? আদালত অনুচ্ছেদ ২২-কে সরাসরি মামলার ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার সাংবিধানিক লক্ষ্য ও নীতি হিসেবে বিবেচনা করেছে। এরপর সংবিধানের অন্যান্য বলবৎযোগ্য বিধানের সঙ্গে অনুচ্ছেদ ২২-কে মিলিয়ে বিচার বিভাগের সাংবিধানিক অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অনুচ্ছেদ ১০৯, ১১৫, ১১৬ ও ১১৬ক। অনুচ্ছেদ ১০৯ অধস্তন আদালতের ওপর হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের কথা বলে। অনুচ্ছেদ ১১৫ বিচারিক সার্ভিসে নিয়োগের কাঠামো নির্ধারণ করে। অনুচ্ছেদ ১১৬ পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলার মতো বিষয়ে সাংবিধানিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করে। আর অনুচ্ছেদ ১১৬ক বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিচারিক সার্ভিসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
এই সাংবিধানিক বিধানগুলো বাস্তবে যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না—সেই প্রশ্নেই অনুচ্ছেদ ১০২-এর অধীনে রিট আবেদন করা হয়। অর্থাৎ অনুচ্ছেদ ১০২ ছিল আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সাংবিধানিক পথ; আর ১০৯, ১১৫, ১১৬ ও ১১৬ক ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণের মূল সাংবিধানিক ভিত্তি। অনুচ্ছেদ ২২ এই বিধানগুলোর উদ্দেশ্য ও অর্থ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মামলায় অনুচ্ছেদ ২৭, ২৯ ও ৩১-এর বিষয়ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আইনের দৃষ্টিতে সমতা, সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ এবং আইনের সুরক্ষার মতো সাংবিধানিক অধিকার বিচারিক কর্মকর্তাদের চাকরির শর্ত ও মর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে মামলাটি শুধু বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের প্রশাসনিক প্রশ্ন ছিল না; এর সঙ্গে সাংবিধানিক অধিকার ও সমতার প্রশ্নও যুক্ত ছিল।
সুতরাং, মাসদার হোসেন মামলার মূল বিষয় ছিল না, “অনুচ্ছেদ ২২ সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা”। বরং আদালত সংবিধানের বিদ্যমান বলবৎযোগ্য বিধানগুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছে যে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার সাংবিধানিক কাঠামো সংবিধানের মধ্যেই রয়েছে। আর অনুচ্ছেদ ১০২-এর রিট এখতিয়ার ব্যবহার করে সেই সাংবিধানিক বিধানগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া সম্ভব।
সহজভাবে বললে, অনুচ্ছেদ ২২ দেখিয়েছে রাষ্ট্রের লক্ষ্য কী; ১০৯, ১১৫, ১১৬ ও ১১৬ক দেখিয়েছে বিচার বিভাগের সাংবিধানিক কাঠামো কী; আর অনুচ্ছেদ ১০২ আদালতকে সেই সাংবিধানিক কাঠামো বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়েছে। এখানেই মাসদার হোসেন মামলার সাংবিধানিক তাৎপর্য।
মাসদার হোসেন মামলার মূল শিক্ষা হলো, সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের কোনো রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য না হলেও, তা সংবিধানের অন্যান্য বলবৎযোগ্য বিধানের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ২২ বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সাংবিধানিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অনুচ্ছেদ ১০৯, ১১৫, ১১৬ ও ১১৬ক সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সাংবিধানিক কাঠামো দিয়েছে এবং অনুচ্ছেদ ১০২ রিটের মাধ্যমে এসব বিধান বাস্তবায়নের পথ তৈরি করেছে।
অতএব, অনুচ্ছেদ ২২ নিজে মামলার সরাসরি ভিত্তি না হলেও, অন্যান্য বলবৎযোগ্য সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে।
বিডিএলপিবি/এমএম

