আরটিক্যাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আরটিক্যাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২১ অক্টো, ২০২৬

মামলার "পরবর্তী তারিখ": যে অন্যায়কে আমরা নিয়তি ভেবে নিয়েছি

মামলার "পরবর্তী তারিখ": যে অন্যায়কে আমরা নিয়তি ভেবে নিয়েছি

আদালত চত্বরের একটা পরিচিত দৃশ্য আছে। ভোর থেকে গ্রামের মানুষ বাস ধরে জেলা শহরে আসেন। হাতে ভাঁজ করা কাগজের বান্ডিল, চোখে অনিশ্চয়তা। সারা দিন গাছতলায় বা বারান্দায় অপেক্ষা করেন। বিকেলে কেউ এসে বলেন, "আজও হয়নি, পরের তারিখ পড়েছে।" মানুষটি কিছু না বলে ফিরে যান। সামনের মাসে আবার আসবেন।

এই দৃশ্য এত পরিচিত যে আমরা এটাকে অন্যায় বলে ভাবি না। বলি, "মামলার তো এমনই হয়।" আমাদের প্রবাদও তা-ই বলে: মামলা মানে তারিখ আর তারিখ মানে হয়রানি। কিন্তু একটা অন্যায় দীর্ঘদিন চললে সেটা নিয়ম হয়ে যায় না। শুধু প্রশ্ন করার অভ্যাসটা মরে যায়।

সংবিধান কী বলে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিচার ঝুলে থাকলে সেটা দয়া বা সুবিধার বিষয় থাকে না, সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আইনের জগতে একটা বহুল প্রচলিত কথা আছে: বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার অস্বীকার করা। আমরা কথাটা মুখস্থ জানি, কিন্তু নিজের দেশের বাস্তবতায় তার অর্থ ভেবে দেখি না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন আদালতে ৪০ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। প্রতিটি মামলার পেছনে অন্তত দুটি পক্ষ, একাধিক পরিবার, কিছু সাক্ষী আর অনেক অপেক্ষার গল্প। সংখ্যাটা কাগজে একটা পরিসংখ্যান, কিন্তু বাস্তবে এটা লাখ লাখ মানুষের জীবন।

তারিখের ভেতরের হিসাব

একটা উদাহরণ ধরা যাক। এক কৃষক তাঁর বাবার রেখে যাওয়া জমি নিয়ে ভাইদের সঙ্গে দেওয়ানি মামলায় জড়ালেন। মামলার সময় তাঁর বয়স চল্লিশ। প্রতি তারিখে যাতায়াত, খাওয়া, উকিলের মুহুরির খরচ আছে, আর সেদিনের কাজ বাদ পড়ে। কখনো বিচারক ছুটিতে, কখনো প্রতিপক্ষের উকিল সময় চেয়েছেন, কখনো সমন ঠিকমতো পৌঁছায়নি, কখনো সাক্ষী আসেননি। প্রতিবারই "পরবর্তী তারিখ"। এভাবে বছর যায়, দশক যায়। শেষ পর্যন্ত রায় আসে ঠিকই, কিন্তু তত দিনে হয়তো মামলার কারণ হওয়া জমির মূল্য মামলার খরচের চেয়ে কম, অথবা মামলাকারী আর বেঁচে নেই। তখন সেই রায় আর ন্যায়বিচার থাকে না, একটা কাগজ হয়ে থাকে।

ফৌজদারি মামলায় ব্যাপারটা আরও নির্মম। অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ হলেও বছরের পর বছর মামলার বোঝা টানেন। চাকরি হারান, সমাজে মুখ দেখাতে পারেন না, পরিবার আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে বাদী বা ভুক্তভোগী, বিশেষ করে নারী বা দরিদ্র মানুষ, ধীরে ধীরে হাল ছেড়ে দেন। অনেক সময় প্রভাবশালী পক্ষের চাপে বা ক্লান্তিতে আপস করেন। দীর্ঘসূত্রতার এই ফাঁকটা তাই সবসময় ক্ষমতাবানদের পক্ষে কাজ করে। যাঁর টাকা আছে, তিনি অপেক্ষা করতে পারেন। যাঁর নেই, তিনি হেরে যান, রায়ের আগেই।

 কেন এমন হয়

কারণগুলো নতুন কিছু নয়, কিন্তু আলোচনা কম।

প্রথমত, বিচারকের সংখ্যা মামলার তুলনায় কম। একজন বিচারককে প্রতিদিন যতগুলো মামলা শুনতে হয়, তাতে প্রতিটির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত, সময় চেয়ে আবেদন করার সংস্কৃতি। দেওয়ানি কার্যবিধির নিয়মে একটি পক্ষ সাধারণত সীমিত সংখ্যকবারই মুলতবি চাইতে পারেন। বাস্তবে "অসুস্থতা", "কাগজ প্রস্তুত নয়" বা "সাক্ষী অনুপস্থিত"-এর মতো কারণ দেখিয়ে মুলতবি চাওয়া এতটাই সাধারণ যে সেটাকে প্রায় অধিকার মনে করা হয়। আদালতও অনেক সময় নমনীয় থাকে।

তৃতীয়ত, সমন জারি ও সাক্ষী হাজির করার দুর্বল ব্যবস্থা। একটা সমন ঠিকানায় পৌঁছাতে কত মাস লাগে, সেটা যাঁরা মামলা করেছেন তাঁরাই জানেন।

চতুর্থত, ফৌজদারি মামলায় তদন্ত ও প্রতিবেদন জমা দিতে বিলম্ব।

পঞ্চমত, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার সীমিত ব্যবহার। আইনে মধ্যস্থতার সুযোগ আছে, গ্রাম আদালতের মতো স্থানীয় ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু অনেকে জানেনই না যে এসব পথ খোলা আছে। অনেক ক্ষেত্রে জানলেও আদালতেই যেতে চান, কারণ "কোর্টের রায়"-এর প্রতি একটা সামাজিক মর্যাদা কাজ করে।

আমরা প্রশ্ন করি না কেন?

এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাটা এত পুরোনো ও এত ব্যাপক যে মানুষ একে প্রাকৃতিক নিয়মের মতো মেনে নিয়েছে। বৃষ্টি হলে ভিজতে হয়, মামলা করলে ঘুরতে হয়।

এর আরেকটা কারণ ভয়। আদালতের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাধারণ মানুষ ভয় পান, কারণ তাঁর মামলাটাই তো ওই আদালতে ঝুলছে। উকিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে পরের তারিখে কী হয়, সে চিন্তাও আছে। ফলে যিনি সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, তিনিই সবচেয়ে বেশি চুপ থাকেন।

তৃতীয় কারণ আইনি সচেতনতার অভাব। অধিকাংশ মানুষ জানেন না, দ্রুত বিচার তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। তিনি জানেন না, অকারণ মুলতবির বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো যায়। তিনি জানেন না, উকিলের কাছে মামলার অগ্রগতির হিসাব চাওয়া তাঁর ন্যায্য দাবি। আইনকে আমরা দেখি "উকিল-মোক্তারের বিষয়" হিসেবে, নিজের জীবনের বিষয় হিসেবে নয়।

কী করা যায়?

সমাধান একটা জাদুকরী সংস্কারে নেই, কিন্তু কিছু পথ স্পষ্ট।

বিচারক নিয়োগ বাড়ানো এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। মামলার ধরন অনুযায়ী সময়সীমা নির্ধারণ এবং অকারণ মুলতবি নিরুৎসাহিত করার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। যেখানে নিয়ম আছে, সেখানে নিয়ম মানাটাই আগে আসে।

প্রযুক্তির ব্যবহারও কাজে আসবে। ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, অনলাইনে মামলার অবস্থা জানার সুযোগ এবং ইলেকট্রনিক সমন জারি অনেক অপচয় কমাতে পারে। এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সারা দেশে ও সব স্তরে কতটা কার্যকর, তা নিয়মিত নজরদারির দাবি রাখে।

মধ্যস্থতা ও সালিশের মতো বিকল্প ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে হবে। পারিবারিক বিরোধ, ছোটখাটো জমি বা লেনদেনের বিষয়ে আদালতের বাইরে দ্রুত সমাধান পেলে মামলার চাপ যেমন কমে, মানুষও অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি থেকে বাঁচেন। তবে এসব ব্যবস্থা যেন প্রভাবশালীদের হাতে অপব্যবহৃত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, নাগরিকের সচেতনতা। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে, গণমাধ্যমে, স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমে নাগরিক অধিকার ও আদালতের প্রাথমিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। মানুষ যখন জানবেন যে দ্রুত বিচার তাঁর অধিকার, তখন প্রশ্নও উঠবে।

 শেষ কথা

"পরবর্তী তারিখ" শব্দ দুটো আমাদের সমাজে এতটাই মিশে গেছে যে এটা নিয়ে ভাবাই বাহুল্য মনে হয়। অথচ এই দুটো শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া সময়, অর্থ ও আস্থা। যে রাষ্ট্র নাগরিককে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রথম শর্ত সময়মতো বিচার।

আমরা যদি এখনো প্রশ্ন না করি, তাহলে আগামী প্রজন্মও গাছতলায় বসে অপেক্ষা করবে, আর শুনবে সেই একই কথা। প্রশ্ন করা অশ্রদ্ধা নয়, নাগরিক দায়িত্ব। আদালতকে আমরা সম্মান করি বলেই তাকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে চাই। ন্যায়বিচার যেন কারও বেঁচে থাকার চেয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার নাম না হয়, এটুকু চাওয়া অন্তত আমরা করতেই পারি।

কলমে,
সুস্মিতা কর্মকার 
শিক্ষার্থী
ইউআইটিএস, আইন বিভাগ 

৪ অক্টো, ২০২৬

অনুচ্ছেদ ২২ সরাসরি বলবৎযোগ্য না হওয়ার সত্তেও মাসদার হোসেন মামলায় বিচার বিভাগ পৃথক করার রায় হলো কীভাবে?

অনুচ্ছেদ ২২ সরাসরি বলবৎযোগ্য না হওয়ার সত্তেও মাসদার হোসেন মামলায় বিচার বিভাগ পৃথক করার রায় হলো কীভাবে?

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার ক্ষেত্রে মাসদার হোসেন মামলা একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে এ মামলাকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে থাকা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ হিসেবে অনুচ্ছেদ ২২ আদালতের মাধ্যমে সরাসরি বলবৎযোগ্য না হলে, এই অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে কীভাবে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের নির্দেশ দেওয়া হলো?

প্রথমেই বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন, মাসদার হোসেন মামলা সরাসরি অনুচ্ছেদ ২২ বলবৎ করার মামলা ছিল না। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮(২) অনুযায়ী, দ্বিতীয় ভাগের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো আদালতের মাধ্যমে সরাসরি বলবৎযোগ্য নয়। ফলে শুধু অনুচ্ছেদ ২২ লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালতের কাছে গিয়ে প্রতিকার চাওয়া যায় না।

তাহলে অনুচ্ছেদ ২২-এর ভূমিকা কী ছিল? আদালত অনুচ্ছেদ ২২-কে সরাসরি মামলার ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার সাংবিধানিক লক্ষ্য ও নীতি হিসেবে বিবেচনা করেছে। এরপর সংবিধানের অন্যান্য বলবৎযোগ্য বিধানের সঙ্গে অনুচ্ছেদ ২২-কে মিলিয়ে বিচার বিভাগের সাংবিধানিক অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অনুচ্ছেদ ১০৯, ১১৫, ১১৬ ও ১১৬ক। অনুচ্ছেদ ১০৯ অধস্তন আদালতের ওপর হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের কথা বলে। অনুচ্ছেদ ১১৫ বিচারিক সার্ভিসে নিয়োগের কাঠামো নির্ধারণ করে। অনুচ্ছেদ ১১৬ পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলার মতো বিষয়ে সাংবিধানিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করে। আর অনুচ্ছেদ ১১৬ক বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিচারিক সার্ভিসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।

এই সাংবিধানিক বিধানগুলো বাস্তবে যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না—সেই প্রশ্নেই অনুচ্ছেদ ১০২-এর অধীনে রিট আবেদন করা হয়। অর্থাৎ অনুচ্ছেদ ১০২ ছিল আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সাংবিধানিক পথ; আর ১০৯, ১১৫, ১১৬ ও ১১৬ক ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণের মূল সাংবিধানিক ভিত্তি। অনুচ্ছেদ ২২ এই বিধানগুলোর উদ্দেশ্য ও অর্থ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মামলায় অনুচ্ছেদ ২৭, ২৯ ও ৩১-এর বিষয়ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আইনের দৃষ্টিতে সমতা, সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ এবং আইনের সুরক্ষার মতো সাংবিধানিক অধিকার বিচারিক কর্মকর্তাদের চাকরির শর্ত ও মর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে মামলাটি শুধু বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের প্রশাসনিক প্রশ্ন ছিল না; এর সঙ্গে সাংবিধানিক অধিকার ও সমতার প্রশ্নও যুক্ত ছিল।

সুতরাং, মাসদার হোসেন মামলার মূল বিষয় ছিল না, “অনুচ্ছেদ ২২ সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা”। বরং আদালত সংবিধানের বিদ্যমান বলবৎযোগ্য বিধানগুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছে যে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার সাংবিধানিক কাঠামো সংবিধানের মধ্যেই রয়েছে। আর অনুচ্ছেদ ১০২-এর রিট এখতিয়ার ব্যবহার করে সেই সাংবিধানিক বিধানগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া সম্ভব।

সহজভাবে বললে, অনুচ্ছেদ ২২ দেখিয়েছে রাষ্ট্রের লক্ষ্য কী; ১০৯, ১১৫, ১১৬ ও ১১৬ক দেখিয়েছে বিচার বিভাগের সাংবিধানিক কাঠামো কী; আর অনুচ্ছেদ ১০২ আদালতকে সেই সাংবিধানিক কাঠামো বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়েছে। এখানেই মাসদার হোসেন মামলার সাংবিধানিক তাৎপর্য।

মাসদার হোসেন মামলার মূল শিক্ষা হলো, সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের কোনো রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য না হলেও, তা সংবিধানের অন্যান্য বলবৎযোগ্য বিধানের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ২২ বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সাংবিধানিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অনুচ্ছেদ ১০৯, ১১৫, ১১৬ ও ১১৬ক সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সাংবিধানিক কাঠামো দিয়েছে এবং অনুচ্ছেদ ১০২ রিটের মাধ্যমে এসব বিধান বাস্তবায়নের পথ তৈরি করেছে।

অতএব, অনুচ্ছেদ ২২ নিজে মামলার সরাসরি ভিত্তি না হলেও, অন্যান্য বলবৎযোগ্য সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে।


বিডিএলপিবি/এমএম


২ অক্টো, ২০২৬

অন্যত্র অবস্থানের দাবি (Plea of Alibi): বাংলাদেশের আইনে ধারণা ও প্রমাণমূল্য

অন্যত্র অবস্থানের দাবি (Plea of Alibi): বাংলাদেশের আইনে ধারণা ও প্রমাণমূল্য

প্রতীকী ছবি
Alibi একটি ল্যাটিন শব্দ, যার অর্থ ‘অন্যত্র’ (elsewhere)। ফৌজদারি মামলায় কোনো আসামি যদি দাবি করেন যে, অপরাধ সংঘটনের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না; বরং অন্য কোনো স্থানে অবস্থান করছিলেন, তাহলে সেটিকে Plea of Alibi বলা হয়।

আইনি ভিত্তি:

বাংলাদেশে Alibi-এর ধারণা মূলত সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ১১ ধারার অধীনে বিবেচিত হয়। এই ধারায় এমন কোনো ঘটনা প্রাসঙ্গিক হিসেবে গণ্য হয়, যা মামলার মূল ঘটনা বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক ঘটনার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ অথবা কোনো ঘটনা সংঘটিত হওয়া অত্যন্ত অসম্ভব বা সম্ভাব্য করে তোলে।

অতএব, আসামি যদি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণ করতে পারেন যে অপরাধ সংঘটনের সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে এমন দূরত্বে ছিলেন, যেখানে তার অপরাধ সংঘটনে অংশ নেওয়া শারীরিকভাবে অসম্ভব বা অত্যন্ত অসম্ভব ছিল, তাহলে তা তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

প্রমাণের দায়:

সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ১০৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো বিশেষ ঘটনা প্রমাণের দায় সাধারণত সেই পক্ষের ওপর থাকে, যে পক্ষ আদালতকে ওই ঘটনার অস্তিত্বে বিশ্বাস করাতে চায়। তাই Alibi-এর নির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করলে তা প্রমাণের দায় আসামিপক্ষের ওপর থাকে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, Alibi প্রমাণে ব্যর্থ হলেই আসামি দোষী সাব্যস্ত হবেন। আসামির অপরাধ প্রমাণের মূল দায় সবসময় প্রসিকিউশনের ওপরই থাকে। প্রসিকিউশনকে স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে আসামির অপরাধ প্রমাণ করতে হবে।

Alibi প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

সময় ও স্থান: অপরাধ সংঘটনের সময় আসামি অন্যত্র ছিলেন—এটি স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ: স্বাধীন সাক্ষী, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি, ডিজিটাল রেকর্ড বা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

দাবির সময়: মামলার শুরুতেই Alibi-এর বিষয়টি উত্থাপন করা হলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়নে তা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

ব্যর্থ Alibi-এর প্রভাব: Alibi প্রমাণে ব্যর্থতা নিজে থেকেই আসামির অপরাধ প্রমাণ করে না। প্রসিকিউশনকে তার বিরুদ্ধে ইতিবাচক ও স্বাধীন প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়।

গুরুত্বপূর্ণ মামলা:

Kazi Mahbubuddin Ahmed alias Mahbub vs. State, 57 DLR 513 মামলায় Alibi-এর পরিধি ও সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ১১ ধারার প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মূল বিষয় হলো—আসামির এমন অবস্থান প্রমাণিত হতে হবে, যাতে অপরাধ সংঘটনের সময় তার ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা অত্যন্ত অসম্ভব প্রতীয়মান হয়।

এছাড়া SQC Trial-সংক্রান্ত বিচারিক কার্যক্রমেও Alibi-এর দাবি প্রমাণের দায় আসামিপক্ষের ওপর থাকার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তবে শুধু Alibi-এর দাবি ব্যর্থ হওয়া দিয়ে আসামির অপরাধ প্রমাণিত হয় না; প্রসিকিউশনকে স্বতন্ত্র ও ইতিবাচক প্রমাণের মাধ্যমে অপরাধ প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

আইনি শিক্ষা:

Alibi একটি স্বতন্ত্র প্রতিরক্ষা-ভিত্তিক দাবি, যার মাধ্যমে আসামি প্রমাণ করতে চান যে অপরাধ সংঘটনের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তবে Alibi প্রমাণের ব্যর্থতা একাই দোষী সাব্যস্ত করার ভিত্তি নয়; প্রসিকিউশনকে নিজস্ব প্রমাণের মাধ্যমে আসামির অপরাধ প্রমাণ করতে হবে।


বিডিএলপিবি/মাসুম


বৈরী সাক্ষী (Hostile Witness): বাংলাদেশের আইনে ধারণা ও প্রমাণমূল্য

বৈরী সাক্ষী (Hostile Witness): বাংলাদেশের আইনে ধারণা ও প্রমাণমূল্য

প্রতীকী ছবি 

১. বৈরী সাক্ষী বলতে কী বোঝায়?

বৈরী সাক্ষী (Hostile Witness) বলতে সাধারণত এমন একজন সাক্ষীকে বোঝায়, যাকে কোনো পক্ষ তার মামলার সমর্থনে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য হাজির করে; কিন্তু সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ওই সাক্ষী তার পূর্ববর্তী বক্তব্য থেকে সরে গিয়ে এমন বক্তব্য দেন, যা সাক্ষীকে আহ্বানকারী পক্ষের স্বার্থের পরিপন্থী অথবা বিপক্ষ পক্ষের পক্ষে যায়।

বাংলাদেশের The Evidence Act, 1872-এ “hostile witness” শব্দবন্ধটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়নি। তবে এ ধরনের সাক্ষীর ক্ষেত্রে সাক্ষীকে আহ্বানকারী পক্ষের নিজের সাক্ষীকেই জেরা করার সুযোগ দেওয়ার বিধান ধারা ১৫৪-এ রয়েছে।

২. প্রাসঙ্গিক আইন: Evidence Act, 1872-এর ধারা ১৫৪

ধারা ১৫৪ অনুযায়ী, আদালত তার বিবেচনামূলক ক্ষমতাবলে কোনো পক্ষকে তার নিজের ডাকা সাক্ষীকে এমন প্রশ্ন করার অনুমতি দিতে পারে, যেসব প্রশ্ন সাধারণত বিপক্ষ পক্ষের জেরার সময় করা যায়।

অর্থাৎ, কোনো পক্ষের সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদানের সময়—

  • ওই পক্ষের প্রত্যাশার বিপরীত বক্তব্য দিলে;
  • পূর্বের বক্তব্য থেকে সরে গেলে;
  • বিপক্ষ পক্ষের পক্ষে বক্তব্য দিলে; অথবা
  • সাক্ষ্য প্রদানে স্পষ্টভাবে অনমনীয় বা বিরূপ অবস্থান গ্রহণ করলে,

আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে জেরা (cross-examination) করা যেতে পারে।

৩. বৈরী সাক্ষী হওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়া

বিষয়টি সাধারণভাবে নিম্নরূপ—

প্রথমত, কোনো পক্ষ তার মামলার সমর্থনে একজন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে।

দ্বিতীয়ত, সাক্ষী Examination-in-Chief-এ এমন বক্তব্য দেন, যা তাকে আহ্বানকারী পক্ষের মামলার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বা বিপরীত।

তৃতীয়ত, সাক্ষীর এমন আচরণ বা বক্তব্যের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষ আদালতের কাছে আবেদন করে তাকে জেরা করার অনুমতি চাইতে পারে।

চতুর্থত, আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুমতি দিলে সাক্ষীকে আহ্বানকারী পক্ষই তাকে জেরা করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে leading question-ও করতে পারে।

৪. বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্য কি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায়?

না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।

কোনো সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করা হয়েছে—এই কারণে তার সম্পূর্ণ সাক্ষ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা অগ্রাহ্য হয়ে যায় না। সাক্ষীর সাক্ষ্যের যে অংশ বিশ্বাসযোগ্য, নির্ভরযোগ্য এবং মামলার অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আদালত পরিস্থিতি অনুযায়ী সেই অংশ গ্রহণ করতে পারে।

অর্থাৎ, hostile witness-এর সাক্ষ্য “all or nothing” নয়।

আদালত সাক্ষ্যের প্রতিটি অংশের বিশ্বাসযোগ্যতা পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। সাক্ষ্যের কোনো অংশ যদি অন্যান্য স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয়, তাহলে সেই অংশের ওপর নির্ভর করা যেতে পারে।

৫. বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্যের প্রমাণমূল্য

বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত বিবেচনা করে—

  • সাক্ষীর কোন বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য;
  • কোন বক্তব্য মামলার অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ;
  • সাক্ষীর পূর্ববর্তী ও বর্তমান বক্তব্যের মধ্যে কী ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে;
  • সাক্ষীর বক্তব্য চিকিৎসা, পারিপার্শ্বিক বা অন্যান্য স্বাধীন প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত কি না; এবং
  • সাক্ষ্যের কোন অংশ গ্রহণ করার মতো নির্ভরযোগ্যতা বহন করে।

সুতরাং, একজন সাক্ষী বৈরী হয়ে গেলেই তার সাক্ষ্যের প্রতিটি অংশকে অগ্রাহ্য করতে হবে—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।

৬. গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্ত

Abu Taher v. The State, 14 BLT (HCD) 68

এ মামলায় বৈরী সাক্ষীর উপস্থিতি সত্ত্বেও অন্যান্য প্রমাণের সমন্বিত মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বৈরী হয়ে গেলেই যে মামলা বা দণ্ডাদেশ অবশ্যই অটোমেটিকভাবে অকার্যকর হয়ে যাবে—তা নয়; মামলায় বিদ্যমান চিকিৎসাগত, পারিপার্শ্বিক বা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতেও আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।

Babul v. The State, 57 DLR 158

এ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ উল্লেখ করেছে যে, কোনো প্রসিকিউশন সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করা হলে তার সাক্ষ্য সম্পূর্ণভাবে মুছে যায় না বা অকার্যকর হয়ে যায় না। সাক্ষ্যের যে অংশ আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রতীয়মান হয়, তা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গ্রহণ করা যেতে পারে।

৭. মূলনীতি

বৈরী সাক্ষী সংক্রান্ত নীতিটি সংক্ষেপে বলা যায়—

“A hostile witness is not necessarily a wholly unreliable witness.”

অর্থাৎ, বৈরী সাক্ষী মানেই সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য সাক্ষী নয়।

আদালত সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করার বিষয়টি বিবেচনা করার পাশাপাশি তার সাক্ষ্যের প্রতিটি অংশের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মামলার অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য পরীক্ষা করবে। বিশ্বাসযোগ্য অংশ গ্রহণ এবং অবিশ্বাস্য অংশ বর্জন—এটি আদালতের প্রমাণ মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সুতরাং, বাংলাদেশের Evidence Act, 1872-এ “hostile witness” শব্দটি সরাসরি সংজ্ঞায়িত না হলেও ধারা ১৫৪-এর মাধ্যমে এ ধরনের সাক্ষীর সাক্ষ্য মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো পক্ষের সাক্ষী বিরূপ বা বৈরী হয়ে গেলেই তার সম্পূর্ণ সাক্ষ্য বাতিল হয়ে যায় না। বরং আদালত সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য অংশ অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করতে পারে।

অতএব, বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্য সম্পূর্ণভাবে বর্জনযোগ্য নয়; বরং তার বিশ্বাসযোগ্য অংশ, যদি তা মামলার অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয় বা নিজস্বভাবে বিশ্বাসযোগ্য প্রতীয়মান হয়, আদালত তা গ্রহণ করতে পারে।


বিডিএলপিবি/মাসুম


১ অক্টো, ২০২৬

প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার  (Natural Justice)  নীতি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ নীতি বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা

প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার (Natural Justice) নীতি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ নীতি বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা

প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার (Natural Justice) হলো এমন একটি মৌলিক আইনগত নীতি, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা, নিরপেক্ষতা ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে। এটি কোনো নির্দিষ্ট সাংবিধানিক বা আইনি বিধান থেকে সরাসরি উদ্ভূত নয়; বরং কমন ল, ন্যায়নীতি ও ন্যায্যতার মৌলিক ধারণার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে।

প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের দুটি প্রধান নীতি:

১. Audi Alteram Partem — ন্যায্য শুনানির অধিকার
কোনো ব্যক্তির অধিকার বা স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার আগে তাকে যথাযথ নোটিশ দিতে হবে এবং নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ, কাউকে না শুনে তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

২. Nemo Judex in Causa Sua — পক্ষপাতমুক্ত সিদ্ধান্ত
কোনো ব্যক্তি নিজের স্বার্থ জড়িত এমন বিষয়ে বিচারক বা সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হতে পারবেন না। সিদ্ধান্তগ্রহণকারীকে অবশ্যই নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতমুক্ত থাকতে হবে।

সাংবিধানিক স্বীকৃতি:

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭-এ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা এবং অনুচ্ছেদ ১০২-এ বিচারিক পর্যালোচনার (Judicial Review) সুযোগ রয়েছে। এসব সাংবিধানিক নীতির মাধ্যমে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ মামলার দৃষ্টান্ত:

  • Abdul Latif Mirza v. Bangladesh (31 DLR (AD) 33): প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারকে সভ্য সমাজের মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং এর লঙ্ঘনকে স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
  • Bangladesh Steamer Agents Association v. Bangladesh (33 DLR (AD) 177): যথাযথ ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ না করে কোনো নাগরিকের অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
  • Mainul Hossain & Anr. v. Bangladesh: সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শুনানির সুযোগ দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। 
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রতিবন্ধকতা:

১. মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও জট: দীর্ঘ সময় ধরে মামলা চললে দ্রুত ও কার্যকর ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়।

২. আইনি সহায়তার অভাব: আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরা অনেক সময় দক্ষ আইনগত সহায়তা নিতে পারেন না।

৩. যথাযথ নোটিশ ও শুনানির অভাব: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত নোটিশ বা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দিলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়।

৪. প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা: যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে।

৫. পক্ষপাতের সম্ভাবনা: সিদ্ধান্তগ্রহণকারীর ব্যক্তিগত বা আর্থিক স্বার্থ থাকলে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

৬. জটিল আইন ও প্রক্রিয়া: জটিল আইনি বিধান সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ কঠিন করে তুলতে পারে।

৭. আইনি সচেতনতার অভাব: অনেক মানুষ তাদের নোটিশ, শুনানি, আইনগত প্রতিনিধিত্ব ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্তভাবে অবগত নন।

৮. প্রশাসনিক দক্ষতা ও ন্যায়বিচারের ভারসাম্য: দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে ন্যায্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার মধ্যে কখনো কখনো ভারসাম্যের সমস্যা দেখা দেয়।

সুতরাং, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার কার্যকর করতে সময়মতো বিচার, যথাযথ নোটিশ, ন্যায্য শুনানি, নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত, সহজলভ্য আইনি সহায়তা এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।


বিডিএলপিবি/মাসুম