ছবিঃ সংগৃহীত
দেনমোহর বা মাহর ইসলামি বিবাহ আইনের একটি মৌলিক ও অপরিহার্য বিধান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, "তোমরা স্ত্রীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো। তবে যদি তারা স্বেচ্ছায় তার কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তাহলে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করো।" এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট যে দেনমোহর কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি স্ত্রীর একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও ধর্মীয় অধিকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিধানটি কতটা মানা হচ্ছে, কোথায় ফাঁকি থাকছে এবং নারীর সুরক্ষায় এটি কতটা ভূমিকা রাখছে - সেটি আলোচনার দাবি রাখে।
দেনমোহরের সংজ্ঞা ও আইনি ভিত্তিঃ মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞ মোল্লার ভাষায়, দেনমোহর হলো সেই অর্থ বা সম্পদ যা স্ত্রী বিবাহের কারণে স্বামীর কাছ থেকে পাওয়ার অধিকার রাখেন। তবে এখানে "বিনিময়" শব্দটি চুক্তি আইনের অর্থে ব্যবহৃত নয়। আব্দুর রহিম স্পষ্টভাবে বলেছেন, দেনমোহর বিবাহচুক্তির প্রতিদান নয়, বরং এটি আইন কর্তৃক স্বামীর উপর আরোপিত একটি বাধ্যবাধকতা - স্ত্রীর প্রতি সম্মানের প্রতীক হিসেবে। এমনকি বিবাহের সময় দেনমোহর নির্ধারণ না হলেও বিবাহ বাতিল হয় না, বরং আইন নিজেই "যথাযথ দেনমোহর" নির্ধারণ করে দেয়। ফতোয়া-ই-কাজি খান বলে, "মাহর বিবাহের জন্য এতটাই অপরিহার্য যে চুক্তিতে উল্লেখ না থাকলেও আইন তা ধরে নেয়।"
দেনমোহরের উদ্দেশ্যঃ দেনমোহরের তিনটি মূল উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, স্ত্রীর প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন। দ্বিতীয়ত, স্বামীর খেয়ালখুশিমতো তালাক দেওয়ার প্রবণতায় লাগাম টানা - কারণ তালাক দিলে সম্পূর্ণ দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হয়, ফলে স্বামী সহজে তালাকের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তৃতীয়ত, বিবাহ বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে তিনি অসহায় না হয়ে পড়েন।
দেনমোহরের প্রকারভেদঃ মুসলিম আইনে দেনমোহর দুই ভাগে বিভক্ত।
নির্ধারিত দেনমোহর (আল-মাহর-আল-মুসাম্মা): বিবাহের সময় যে দেনমোহর নির্দিষ্ট করা হয়, তাকে নির্ধারিত দেনমোহর বলে। এটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত -
তাৎক্ষণিক দেনমোহর (মুয়াজ্জাল): এটি চাওয়া মাত্রই পরিশোধযোগ্য। স্ত্রী তাৎক্ষণিক দেনমোহর না পেলে স্বামীর সাথে বসবাস করতে অস্বীকার করতে পারেন এবং এই অবস্থায় স্বামী তাকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন। বিবাহ সম্পন্ন না হলে স্বামী যদি দাম্পত্য সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের মামলা করেন, তাহলে তাৎক্ষণিক দেনমোহর অপরিশোধিত থাকলে সেটি সম্পূর্ণ আইনি প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। সীমাবদ্ধতার মেয়াদ তিন বছর, যা দাবি করার তারিখ থেকে গণনা শুরু হয়।
বিলম্বিত দেনমোহর (মুওয়াজ্জাল): এটি তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর পরিশোধযোগ্য হয়। বিলম্বিত দেনমোহরে স্ত্রীর অধিকার নিশ্চিত এবং কোনো ঘটনার দ্বারা তা বাতিল হয় না - এমনকি স্ত্রী নিজে মারা গেলেও তার উত্তরাধিকারীরা এই দেনমোহর দাবি করতে পারবেন। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ১০ অনুযায়ী, কাবিননামায় দেনমোহরের ধরন নির্দিষ্ট না থাকলে সম্পূর্ণ দেনমোহরই তাৎক্ষণিক বলে গণ্য হবে।
অনির্ধারিত বা যথাযথ দেনমোহর (মাহর-উল-মিসল): বিবাহের সময় দেনমোহর নির্ধারিত না হলে স্ত্রী "যথাযথ দেনমোহর" পাওয়ার অধিকারী। এই ক্ষেত্রে তার পিতার পরিবারের অন্য নারীদের - যেমন ফুফু বা বোনদের - দেনমোহরের পরিমাণ এবং পরিবারের সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে আদালত দেনমোহর নির্ধারণ করে।
দেনমোহর বনাম যৌতুকঃ দেনমোহর ও যৌতুক দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা, যদিও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়ই এ নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়। দেনমোহর হলো স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে দেওয়া সম্মান ও ভালোবাসার প্রকাশ। পক্ষান্তরে যৌতুক হলো স্ত্রী বা তার পরিবারের কাছ থেকে স্বামী বা তার পরিবারের জোরপূর্বক সম্পদ আদায়ের অপচেষ্টা - যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং বাংলাদেশের আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ অনুযায়ী যৌতুক দেওয়া-নেওয়া বা দাবি করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর ও সর্বনিম্ন এক বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। এর পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ধারা ১১ অনুযায়ী যৌতুকের কারণে স্ত্রীকে সাধারণ জখম করলে এক থেকে তিন বছর, গুরুতর জখম করলে পাঁচ থেকে বারো বছর বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, হত্যাচেষ্টায় যাবজ্জীবন এবং হত্যায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বিধবার সম্পত্তি আটকে রাখার অধিকার (উইডোজ লিয়েন) ঃ মুসলিম আইনে বিধবার একটি বিশেষ সুরক্ষামূলক অধিকার রয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর দেনমোহর অপরিশোধিত থাকলে বিধবা স্বামীর সম্পত্তি নিজের কাছে আটকে রাখতে পারেন এবং সেই সম্পত্তির ফল-ফসল ভোগ করতে পারেন যতক্ষণ না তার দেনমোহর পরিশোধ হয়। তবে তিনি সেই সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা দান করতে পারবেন না। এটি তার মালিকানার অধিকার নয়, বরং দখলে রাখার অধিকার।
বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র ও সমস্যাঃ আইনি বিধান সুস্পষ্ট হলেও বাংলাদেশে দেনমোহরের প্রকৃত প্রয়োগে বেশ কিছু সমস্যা লক্ষ্য করা যায়।
কাগুজে দেনমোহর: অনেক ক্ষেত্রে কাবিননামায় উচ্চ পরিমাণ দেনমোহর লেখা হয় সামাজিক মর্যাদার কারণে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা পরিশোধের কোনো উদ্যোগ থাকে না। এই প্রবণতাকে ইসলামি আইনশাস্ত্রে "আস-সুমআত" বলা হয়। ১৯৬৯ সালের নাসির আহমেদ খান বনাম মিসেস ইসমত জাহান বেগম মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সামাজিক চাপে দাবি না করা: অনেক নারী পারিবারিক ও সামাজিক চাপে তাদের দেনমোহর দাবি করতে সাহস পান না। অনেক সময় স্বামীর মৃত্যুর পর শোকগ্রস্ত অবস্থায় বিধবা দেনমোহর মাফ করে দেন - যা মুক্ত সম্মতিতে হয়নি বলে আদালত ধরে নেন।
সচেতনতার অভাব: গ্রামাঞ্চলের অনেক নারী জানেনই না যে তাৎক্ষণিক দেনমোহর না পেলে তারা স্বামীর সাথে বসবাস করতে অস্বীকার করার আইনি অধিকার রাখেন।
পরিশেষে, দেনমোহর ইসলামি আইনে নারীর সুরক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। বাংলাদেশে পারিবারিক আদালত, কাবিননামার বাধ্যতামূলক নিবন্ধন এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর মাধ্যমে এই বিধানকে আইনি কাঠামোয় সুরক্ষিত করা হয়েছে। কিন্তু কেবল আইন থাকলেই হয় না, তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হয়। নারীর আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক আদালতের কার্যকর ভূমিকা এবং সমাজে দেনমোহরকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলাই হবে এই বিধানকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করার পথ।
--লিখেছেন,তন্নি বাড়ৈ, ঢাকা, বাড্ডা
বিভাগ:
আরটিক্যাল

0 coment rios: