![]() |
| বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট |
বিচারপতি আবদুর রহমান কর্তৃক গত ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে প্রদত্ত খন্দকার ইশতিয়াক আহমেদ ও অন্যান্য বনাম আলহাজ মোঃ আব্দুল আজিজ ঢালী ও অন্যান্য, সিভিল রিভিশন নং- ১৩২৫/২০২৬ এর রায়ে আদালত ন্যাটোরের সিনিয়র জেলা জজের দেওয়া আদেশ বহাল রাখেন এবং রুল খারিজ করে দেন। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ০১ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার পটভূমি:
নাটোরের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে অন্য প্রকৃতি (শুফা) মামলা নং- ৩৬/২০১৩ দায়ের করা হয় ইসলামী আইনের অধীনে হক-এ-শুফা বা প্রি-এম্পশনের দাবি নিয়ে।
মামলায় ৩১ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে বিবাদী ১ ও ২-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মামলা ডিক্রি করেন। একই সঙ্গে বাদীকে ৩০ দিনের মধ্যে ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা—বিক্রয়মূল্য ও ক্ষতিপূরণসহ—বিবাদীদের নামে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে টাকা জমা না দিলে মামলা খারিজ হয়ে যাবে বলেও আদালত নির্দেশ দেন।
বাদী ওই সময়ের মধ্যে টাকা জমা না দিয়ে হাইকোর্টে ফার্স্ট আপিল নং- ২৩/২০১৮ দায়ের করেন এবং ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি ওই ডিক্রির কার্যকারিতার ওপর স্থগিতাদেশ পান। পরে আপিলটি ৭ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে নন-প্রসিকিউশনের কারণে খারিজ হয়ে যায় এবং আগের স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল বাদী আবার ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দেওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। ট্রায়াল কোর্ট ২৭ মে ২০২৫ আবেদনটি মঞ্জুর করলে ৭ জুলাই টাকা জমার চালানের কপি আদালতে দাখিল করা হয়।
বিবাদীরা এ আদেশের বিরুদ্ধে সিভিল রিভিশন নং- ২৯/২০২৫ দায়ের করেন। নাটোরের সিনিয়র জেলা জজ ১ এপ্রিল ২০২৬ ট্রায়াল কোর্টের আদেশ বাতিল করেন। এরপর বাদীপক্ষ হাইকোর্টে বর্তমান রিভিশন আবেদন করে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:
হাইকোর্ট বলেন, ২০১৭ সালের ডিক্রিতে স্পষ্টভাবে ৩০ দিনের মধ্যে অর্থ জমা দেওয়ার শর্ত ছিল। ওই সময়ের মধ্যে টাকা জমা দেওয়া হয়নি এবং পরবর্তী সময়ে আপিলও নিষ্পত্তি হয়ে যায়। ফলে ট্রায়াল কোর্ট পরবর্তীতে একই বিষয়ে নতুন করে টাকা জমার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে functus officio হয়ে গিয়েছিল।
আদালত ব্যাখ্যা করেন, functus officio নীতির অর্থ হলো কোনো আদালত কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তার বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর সাধারণত সেই একই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা বা পরিবর্তন করার এখতিয়ার আর রাখে না, যদি না আইন বিশেষভাবে সে ক্ষমতা দেয়।
হক-এ-শুফা প্রসঙ্গ:
রায়ে হাইকোর্ট মুসলিম আইনের হক-এ-শুফা বা pre-emption-এর মৌলিক নীতিগুলোও আলোচনা করেন। আদালতের মতে, এ অধিকার কার্যকর করতে সাধারণত তিনটি talab বা দাবি গুরুত্বপূর্ণ—
১. Talab-i-mowasibat — বিক্রয়ের খবর পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক দাবি;
২. Talab-i-ishhad — আইনসম্মত পদ্ধতিতে সাক্ষীর উপস্থিতিতে দাবি নিশ্চিত করা; এবং
৩. Talab-i-tamlik/talab-i-khusumat — দাবি স্বীকৃত না হলে মামলা করে অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
রায়ে আরও বলা হয়, মূল দলিলে বিক্রয়মূল্য ৫০ লাখ টাকা উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও বাদীপক্ষ সেটি সংশোধন করে ২০ লাখ টাকা করার আবেদন করেছিল। আদালত মনে করেন, এটি নিছক আনুষ্ঠানিক সংশোধন নয়; বরং প্রি-এম্পশন দাবির ভিত্তি হিসেবে থাকা লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টা। তাই আদেশ-৬ এর রুল-১৭, এর অধীনে এমন সংশোধনের পর্যাপ্ত আইনগত ভিত্তি নেই।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
হাইকোর্ট মনে করেন, নাটোরের সিনিয়র জেলা জজ ট্রায়াল কোর্টের ২৭ মে ২০২৫-এর আদেশ বাতিল করে আইনগতভাবে সঠিক কাজ করেছেন। ফলে সিভিল রিভিশন নং- ১৩২৫/২০২৬ এর রুল খারিজ করা হয় এবং ১ এপ্রিল ২০২৬-এর আদেশ বহাল রাখা হয়। কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।
তবে আদালত বাদীপক্ষকে ট্রায়াল কোর্টে জমা দেওয়া ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এ অর্থ যাতে কোনো হয়রানি বা বিলম্ব ছাড়াই পুরোপুরি ফেরত দেওয়া হয়, সে জন্য ট্রায়াল কোর্টকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্বের স্থগিতাদেশ থাকলে তা প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়েছে।
বিডিএলপিবি/মাসুম

0 coment rios: