![]() |
| রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯০৮-এর ২৮ ধারা সম্পর্কিত |
সম্পত্তিসংক্রান্ত এক মামলায় ১৯৮৫ সালের একটি কথিত বিনিময় দলিলকে জাল, প্রতারণামূলক ও বাদীপক্ষের ওপর বাধ্যকর নয় বলে নিম্ন আদালতের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত বিবাদীপক্ষের দায়ের করা সিভিল রিভিশন খারিজ করে দেন।
বিচারপতি আবদুর রহমান ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সিভিল রিভিশন নম্বর ৪২৫৭ অব ২০০১, মো: আব্দুল মজিদ (মৃত), তাঁর উত্তরাধিকারীরা বনাম মোচাম্মাৎ সকিনা খাতুন ও অন্যান্য মামলায় এ রায় দেন। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার বিরোধের সূত্রপাত ভোলার ছোট আলগী মৌজার জমি নিয়ে। বাদীপক্ষের পূর্বসূরি জবোল হক ১৯৮৩ সালের ৪ জানুয়ারি একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বিবাদীপক্ষের কাছে তিন শতক জমি বিক্রি করেন। পরে ওই জমির বিষয়ে অগ্রক্রয় (প্রি-এম্পশন) মামলা দায়ের হলে বিবাদীপক্ষ ১৯৮৫ সালের ৫ মার্চ সম্পাদিত একটি কথিত বিনিময় দলিলের ওপর নির্ভর করে।
দলিলটিতে দেখানো হয়, জবোল হক ছোট আলগী মৌজার ৩৭ শতক জমির বিনিময়ে নতুন চর মৌজায় দুই একর জমি পেয়েছেন। তবে জবোল হকের উত্তরাধিকারীরা দাবি করেন, তাঁদের পূর্বসূরি ওই বিনিময় দলিল সম্পাদন করেননি। তাঁদের অভিযোগ, অগ্রক্রয় মামলা মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে ফাঁকা স্ট্যাম্পে নেওয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে দলিলটি তৈরি করা হয়েছিল। দলিলটি জাল ও প্রতারণামূলক এবং এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কোনো বিনিময়ও সম্পন্ন হয়নি।
এ প্রেক্ষাপটে তাঁরা দলিলটিকে জাল, অবৈধ ও তাঁদের ওপর বাধ্যকর নয় মর্মে ঘোষণার জন্য মামলা করেন। ১৯৯৭ সালের ২৬ মে বিচারিক আদালত তাঁদের পক্ষে ডিক্রি দেন। পরে ভোলার প্রথম আদালতের সাব-জজ ২০০১ সালের ২৫ জানুয়ারি আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে বিবাদীপক্ষ হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট মামলার মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য, উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে দেখতে পান, কথিত বিনিময় দলিলটির যথার্থতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে।
আদালত উল্লেখ করেন, জবোল হক ১৯৮৩ সালের ৪ জানুয়ারির নিবন্ধিত দলিলে টিপসই দিয়েছিলেন। অথচ বিতর্কিত ১৯৮৫ সালের বিনিময় দলিলে তাঁর স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে। এই অসংগতির পক্ষে বিবাদীপক্ষ সন্তোষজনক প্রমাণ দিতে পারেনি। দলিলে থাকা স্বাক্ষর যে জবোল হকের, সেটিও তারা যথাযথভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়।
আদালত আরও দেখতে পান, বিনিময় দলিলের ভিত্তিতে যে জমি হস্তান্তরের দাবি করা হয়েছিল, বাস্তবে সেই বিনিময় কার্যকর হওয়ার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাদীপক্ষের জমিতে তাঁদের দখল বজায় থাকার বিষয়টিও নিম্ন আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। বিবাদীপক্ষের সাক্ষীরাও কথিত বিনিময় সম্পাদনের বিষয়ে প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারেননি।
নিবন্ধনের স্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
মামলায় হাইকোর্ট রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯০৮-এর ২৮ ধারা বিশ্লেষণ করেন। এ ধারায় স্থাবর সম্পত্তিসংক্রান্ত দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি যে সাব-ডিস্ট্রিক্টের মধ্যে অবস্থিত, সেই এলাকার সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে দলিল উপস্থাপনের বিধান রয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিতর্কিত দলিলে বর্ণিত জমি ভোলা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এখতিয়ারভুক্ত হলেও দলিলটি রাধাবল্লভ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়েছিল। ওই অফিসে দলিল নিবন্ধনের বৈধ ভিত্তি হিসেবে জেলা রেজিস্ট্রারের কোনো অনুমোদন বা আদেশও বিবাদীপক্ষ উপস্থাপন করতে পারেনি।
আদালত মনে করেন, এ পরিস্থিতিতে দলিলটি যথাযথ এখতিয়ারসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত হয়েছিল কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাদীপক্ষ প্রাথমিকভাবে দলিল নিবন্ধনের এখতিয়ারসংক্রান্ত ত্রুটি তুলে ধরতে সক্ষম হওয়ায় দলিলের যথাযথ সম্পাদন ও নিবন্ধনের বিষয়টি প্রমাণের দায় বিবাদীপক্ষের ওপর বর্তায়। কিন্তু তারা প্রয়োজনীয় প্রমাণ দিতে পারেনি।
প্রতারণার ক্ষেত্রে তামাদির হিসাব
আদালত জয়নাল আবেদিন বনাম আলী আজম সাইয়াল অ্যান্ড আদার্স, ২১ বিএলটি (এডি) ৩৩৭ মামলার সিদ্ধান্তের প্রতি গুরুত্ব দেন। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, কোনো দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এখতিয়ার না থাকলে এবং প্রতারণার অভিযোগ থাকলে তামাদির সময় গণনার ক্ষেত্রে দলিল সম্পাদনের তারিখের পরিবর্তে প্রতারণা সম্পর্কে জানার তারিখ প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
বর্তমান মামলায় বাদীপক্ষের বক্তব্য ছিল, তাঁরা ১৯৮৯ সালের ১ নভেম্বর বিতর্কিত দলিলটির বিষয়ে জানতে পারেন এবং ১৯৯১ সালের ৫ জানুয়ারি মামলা দায়ের করেন। হাইকোর্টের বিশ্লেষণে দলিলটির নিবন্ধন, সম্পাদন ও প্রতারণার অভিযোগসংক্রান্ত প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
জাল দলিলের ক্ষেত্রে স্বত্ব ঘোষণার প্রশ্ন
হাইকোর্ট আরও পর্যবেক্ষণ করেন, বাদী বা তাঁর পূর্বসূরি যদি কথিত দলিলে অন্তর্ভুক্ত সম্পত্তির স্বীকৃত মালিক হন এবং বিবাদী দলিলের সুবিধাভোগী হিসেবে তার বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে প্রতারণামূলক ও শুরু থেকেই অবৈধ দলিলের ক্ষেত্রে স্বত্ব ঘোষণার প্রয়োজনীয়তা ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে আদালত একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত নীতির পুনরুল্লেখ করেন—কোনো ঘোষণামূলক প্রতিকার পেতে বাদীকে নিজের মামলার শক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে; বিবাদীর দুর্বলতার ওপর নয়। অর্থাৎ, সম্পত্তিতে নিজের স্বত্ব, জমির পরিচিতি এবং দখল নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব বাদীরই।
এ মামলায় আদালত মনে করেন, বাদীপক্ষ তাদের দাবি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, বিবাদীপক্ষ কথিত বিনিময় দলিলের যথার্থতা এবং তার ভিত্তিতে বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
আদালতের সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট দেখতে পান, বিচারিক আদালত ও আপিল আদালত উভয়েই সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাঁদের সিদ্ধান্তে এমন কোনো এখতিয়ারগত ত্রুটি, গুরুত্বপূর্ণ আইনগত অনিয়ম বা প্রমাণের গুরুতর ভুল পাঠ পাওয়া যায়নি, যার কারণে সিভিল রিভিশনের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন।
ফলে হাইকোর্ট বিবাদীপক্ষের দায়ের করা রুল খারিজ করেন এবং ২০০১ সালের ২৫ জানুয়ারি ভোলার প্রথম আদালতের সাব-জজের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন। তবে মামলায় কোনো পক্ষের অনুকূলে খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।
আইনি শিক্ষা
এ রায় থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—
১. দলিলের যথার্থতা প্রমাণ জরুরি: কোনো দলিলে স্বাক্ষর বা টিপসই নিয়ে গুরুতর অসংগতি থাকলে এবং তা ব্যাখ্যা করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকলে দলিলটির বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
২. নিবন্ধনের এখতিয়ার গুরুত্বপূর্ণ: স্থাবর সম্পত্তিসংক্রান্ত দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯০৮-এর ২৮ ধারার বিধান প্রাসঙ্গিক। সংশ্লিষ্ট অফিসের এখতিয়ার ও নিবন্ধনের বৈধ ভিত্তি নিয়ে বিরোধ উঠলে তা প্রমাণের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হয়।
৩. প্রমাণের দায় পরিস্থিতিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে: বাদী প্রাথমিকভাবে নিজের দাবি ও প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রতিষ্ঠা করলে, বিবাদী নিজের বিশেষ দাবি বা দলিলের যথার্থতার পক্ষে প্রমাণ দিতে বাধ্য হতে পারেন।
৪. প্রতারণা তামাদির প্রশ্নে প্রভাব ফেলতে পারে: প্রতারণামূলক দলিলের ক্ষেত্রে প্রতারণা জানার তারিখ তামাদি গণনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; তবে তা সংশ্লিষ্ট আইন ও মামলার তথ্যের আলোকে নির্ধারণ করতে হয়।
৫. রিভিশন দ্বিতীয় আপিল নয়: নিম্ন আদালতের সমসাময়িক সিদ্ধান্তে এখতিয়ারগত ত্রুটি, গুরুত্বপূর্ণ আইনগত অনিয়ম বা প্রমাণ মূল্যায়নে গুরুতর ভুল না থাকলে হাইকোর্ট সাধারণত সিভিল রিভিশনের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করেন না।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

0 coment rios: