২১ অক্টো, ২০২৬

মামলার "পরবর্তী তারিখ": যে অন্যায়কে আমরা নিয়তি ভেবে নিয়েছি

আদালত চত্বরের একটা পরিচিত দৃশ্য আছে। ভোর থেকে গ্রামের মানুষ বাস ধরে জেলা শহরে আসেন। হাতে ভাঁজ করা কাগজের বান্ডিল, চোখে অনিশ্চয়তা। সারা দিন গাছতলায় বা বারান্দায় অপেক্ষা করেন। বিকেলে কেউ এসে বলেন, "আজও হয়নি, পরের তারিখ পড়েছে।" মানুষটি কিছু না বলে ফিরে যান। সামনের মাসে আবার আসবেন।

এই দৃশ্য এত পরিচিত যে আমরা এটাকে অন্যায় বলে ভাবি না। বলি, "মামলার তো এমনই হয়।" আমাদের প্রবাদও তা-ই বলে: মামলা মানে তারিখ আর তারিখ মানে হয়রানি। কিন্তু একটা অন্যায় দীর্ঘদিন চললে সেটা নিয়ম হয়ে যায় না। শুধু প্রশ্ন করার অভ্যাসটা মরে যায়।

সংবিধান কী বলে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিচার ঝুলে থাকলে সেটা দয়া বা সুবিধার বিষয় থাকে না, সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আইনের জগতে একটা বহুল প্রচলিত কথা আছে: বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার অস্বীকার করা। আমরা কথাটা মুখস্থ জানি, কিন্তু নিজের দেশের বাস্তবতায় তার অর্থ ভেবে দেখি না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন আদালতে ৪০ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। প্রতিটি মামলার পেছনে অন্তত দুটি পক্ষ, একাধিক পরিবার, কিছু সাক্ষী আর অনেক অপেক্ষার গল্প। সংখ্যাটা কাগজে একটা পরিসংখ্যান, কিন্তু বাস্তবে এটা লাখ লাখ মানুষের জীবন।

তারিখের ভেতরের হিসাব

একটা উদাহরণ ধরা যাক। এক কৃষক তাঁর বাবার রেখে যাওয়া জমি নিয়ে ভাইদের সঙ্গে দেওয়ানি মামলায় জড়ালেন। মামলার সময় তাঁর বয়স চল্লিশ। প্রতি তারিখে যাতায়াত, খাওয়া, উকিলের মুহুরির খরচ আছে, আর সেদিনের কাজ বাদ পড়ে। কখনো বিচারক ছুটিতে, কখনো প্রতিপক্ষের উকিল সময় চেয়েছেন, কখনো সমন ঠিকমতো পৌঁছায়নি, কখনো সাক্ষী আসেননি। প্রতিবারই "পরবর্তী তারিখ"। এভাবে বছর যায়, দশক যায়। শেষ পর্যন্ত রায় আসে ঠিকই, কিন্তু তত দিনে হয়তো মামলার কারণ হওয়া জমির মূল্য মামলার খরচের চেয়ে কম, অথবা মামলাকারী আর বেঁচে নেই। তখন সেই রায় আর ন্যায়বিচার থাকে না, একটা কাগজ হয়ে থাকে।

ফৌজদারি মামলায় ব্যাপারটা আরও নির্মম। অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ হলেও বছরের পর বছর মামলার বোঝা টানেন। চাকরি হারান, সমাজে মুখ দেখাতে পারেন না, পরিবার আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে বাদী বা ভুক্তভোগী, বিশেষ করে নারী বা দরিদ্র মানুষ, ধীরে ধীরে হাল ছেড়ে দেন। অনেক সময় প্রভাবশালী পক্ষের চাপে বা ক্লান্তিতে আপস করেন। দীর্ঘসূত্রতার এই ফাঁকটা তাই সবসময় ক্ষমতাবানদের পক্ষে কাজ করে। যাঁর টাকা আছে, তিনি অপেক্ষা করতে পারেন। যাঁর নেই, তিনি হেরে যান, রায়ের আগেই।

 কেন এমন হয়

কারণগুলো নতুন কিছু নয়, কিন্তু আলোচনা কম।

প্রথমত, বিচারকের সংখ্যা মামলার তুলনায় কম। একজন বিচারককে প্রতিদিন যতগুলো মামলা শুনতে হয়, তাতে প্রতিটির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত, সময় চেয়ে আবেদন করার সংস্কৃতি। দেওয়ানি কার্যবিধির নিয়মে একটি পক্ষ সাধারণত সীমিত সংখ্যকবারই মুলতবি চাইতে পারেন। বাস্তবে "অসুস্থতা", "কাগজ প্রস্তুত নয়" বা "সাক্ষী অনুপস্থিত"-এর মতো কারণ দেখিয়ে মুলতবি চাওয়া এতটাই সাধারণ যে সেটাকে প্রায় অধিকার মনে করা হয়। আদালতও অনেক সময় নমনীয় থাকে।

তৃতীয়ত, সমন জারি ও সাক্ষী হাজির করার দুর্বল ব্যবস্থা। একটা সমন ঠিকানায় পৌঁছাতে কত মাস লাগে, সেটা যাঁরা মামলা করেছেন তাঁরাই জানেন।

চতুর্থত, ফৌজদারি মামলায় তদন্ত ও প্রতিবেদন জমা দিতে বিলম্ব।

পঞ্চমত, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার সীমিত ব্যবহার। আইনে মধ্যস্থতার সুযোগ আছে, গ্রাম আদালতের মতো স্থানীয় ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু অনেকে জানেনই না যে এসব পথ খোলা আছে। অনেক ক্ষেত্রে জানলেও আদালতেই যেতে চান, কারণ "কোর্টের রায়"-এর প্রতি একটা সামাজিক মর্যাদা কাজ করে।

আমরা প্রশ্ন করি না কেন?

এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাটা এত পুরোনো ও এত ব্যাপক যে মানুষ একে প্রাকৃতিক নিয়মের মতো মেনে নিয়েছে। বৃষ্টি হলে ভিজতে হয়, মামলা করলে ঘুরতে হয়।

এর আরেকটা কারণ ভয়। আদালতের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাধারণ মানুষ ভয় পান, কারণ তাঁর মামলাটাই তো ওই আদালতে ঝুলছে। উকিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে পরের তারিখে কী হয়, সে চিন্তাও আছে। ফলে যিনি সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, তিনিই সবচেয়ে বেশি চুপ থাকেন।

তৃতীয় কারণ আইনি সচেতনতার অভাব। অধিকাংশ মানুষ জানেন না, দ্রুত বিচার তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। তিনি জানেন না, অকারণ মুলতবির বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো যায়। তিনি জানেন না, উকিলের কাছে মামলার অগ্রগতির হিসাব চাওয়া তাঁর ন্যায্য দাবি। আইনকে আমরা দেখি "উকিল-মোক্তারের বিষয়" হিসেবে, নিজের জীবনের বিষয় হিসেবে নয়।

কী করা যায়?

সমাধান একটা জাদুকরী সংস্কারে নেই, কিন্তু কিছু পথ স্পষ্ট।

বিচারক নিয়োগ বাড়ানো এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। মামলার ধরন অনুযায়ী সময়সীমা নির্ধারণ এবং অকারণ মুলতবি নিরুৎসাহিত করার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। যেখানে নিয়ম আছে, সেখানে নিয়ম মানাটাই আগে আসে।

প্রযুক্তির ব্যবহারও কাজে আসবে। ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, অনলাইনে মামলার অবস্থা জানার সুযোগ এবং ইলেকট্রনিক সমন জারি অনেক অপচয় কমাতে পারে। এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সারা দেশে ও সব স্তরে কতটা কার্যকর, তা নিয়মিত নজরদারির দাবি রাখে।

মধ্যস্থতা ও সালিশের মতো বিকল্প ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে হবে। পারিবারিক বিরোধ, ছোটখাটো জমি বা লেনদেনের বিষয়ে আদালতের বাইরে দ্রুত সমাধান পেলে মামলার চাপ যেমন কমে, মানুষও অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি থেকে বাঁচেন। তবে এসব ব্যবস্থা যেন প্রভাবশালীদের হাতে অপব্যবহৃত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, নাগরিকের সচেতনতা। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে, গণমাধ্যমে, স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমে নাগরিক অধিকার ও আদালতের প্রাথমিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। মানুষ যখন জানবেন যে দ্রুত বিচার তাঁর অধিকার, তখন প্রশ্নও উঠবে।

 শেষ কথা

"পরবর্তী তারিখ" শব্দ দুটো আমাদের সমাজে এতটাই মিশে গেছে যে এটা নিয়ে ভাবাই বাহুল্য মনে হয়। অথচ এই দুটো শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া সময়, অর্থ ও আস্থা। যে রাষ্ট্র নাগরিককে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রথম শর্ত সময়মতো বিচার।

আমরা যদি এখনো প্রশ্ন না করি, তাহলে আগামী প্রজন্মও গাছতলায় বসে অপেক্ষা করবে, আর শুনবে সেই একই কথা। প্রশ্ন করা অশ্রদ্ধা নয়, নাগরিক দায়িত্ব। আদালতকে আমরা সম্মান করি বলেই তাকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে চাই। ন্যায়বিচার যেন কারও বেঁচে থাকার চেয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার নাম না হয়, এটুকু চাওয়া অন্তত আমরা করতেই পারি।

কলমে,
সুস্মিতা কর্মকার 
শিক্ষার্থী
ইউআইটিএস, আইন বিভাগ 


শেয়ার করুন

0 coment rios: