২৮ অক্টো, ২০২৬

জমি হস্তান্তরের বিষয়ে নোটিশ না থাকলে জ্ঞাত হওয়ার তারিখ থেকে তামাদি গণনা; প্রি-এম্পশনের আবেদন বহাল রাখলেন হাইকোর্ট: পূর্নাঙ্গ রায় প্রকাশিত

প্রাসঙ্গিক আইন: রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৮৯ ও ৯৬ ধারা এবং দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ১১৫(১) ধারা।
জমি হস্তান্তরের বিষয়ে আইনানুগ নোটিশ দেওয়া না হলে প্রি-এম্পশন বা অগ্রক্রয় অধিকারের মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে হস্তান্তরের বিষয়টি জানার তারিখ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। এ ধরনের মামলায় আবেদনকারী নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে কখন হস্তান্তরের বিষয়ে জেনেছেন, তা প্রমাণ করতে পারলে তামাদির প্রশ্ন নির্ধারণে সেই তথ্য বিবেচনা করতে হবে। এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে প্রি-এম্পশন মামলা খারিজ করে দেওয়া নিম্ন আদালতের আপিল বিভাগের রায় বাতিল করেছেন হাইকোর্ট।

সম্প্রতি বিচারপতি আবদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চ সিভিল রিভিশন নং ১৪৬৭/২০২৫, মো. জয়নাল আবেদিন বনাম মো. আমজেদ হোসেন বিশ্বাস ও অন্যান্য মামলায় ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। আদালত যশোরের অতিরিক্ত জেলা জজ, পঞ্চম আদালতের ২৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের রায় বাতিল করে চৌগাছার সহকারী জজ আদালতের ৩১ অক্টোবর ২০২২ তারিখের প্রি-এম্পশন মঞ্জুরের আদেশ বহাল রাখেন। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার আবেদনকারী মো. জয়নাল আবেদিন ও তাঁর ভাইয়েরা সংশ্লিষ্ট জমির সহ-শরিক ছিলেন বলে দাবি করেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি দলিলের মাধ্যমে জমির অংশ অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করা হলেও তাঁকে এ বিষয়ে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি।

আবেদনকারীর দাবি, ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে জমি হস্তান্তরের বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন তিনি। পরে ১১ নভেম্বর দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করেন এবং ২০ নভেম্বর ১৯৯৬ তারিখে প্রি-এম্পশনের মামলা দায়ের করেন।

বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে মামলাটি মঞ্জুর করেন। তবে আপিল আদালত মনে করেন, জমি হস্তান্তরের প্রায় আট বছরেরও বেশি সময় পর মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আবেদনকারী তাঁর জানার তারিখ যথাযথভাবে প্রমাণ করতে পারেননি। এ কারণে আদালত প্রি-এম্পশনের আবেদন তামাদিতে বাধাগ্রস্ত বলে খারিজ করেন। পরে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করা হয়।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট বলেন, আপিল আদালত বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত বাতিল করার সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ স্বাধীনভাবে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেননি। পাশাপাশি, নিম্ন আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচনায় না নেওয়ার বিষয়টিও রায়ে উঠে এসেছে।

আদালত উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৮৯ ধারার অধীনে প্রয়োজনীয় নোটিশ দেওয়া না হলে, ৯৬ ধারার অধীনে প্রি-এম্পশন মামলা দায়েরের তামাদি নির্ধারণে হস্তান্তরের বিষয়ে আবেদনকারীর জ্ঞাত হওয়ার তারিখ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে তাঁর দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।

হাইকোর্ট আরও বলেন, এ মামলায় আবেদনকারী ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে হস্তান্তরের বিষয়ে জানার দাবি করেছেন এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রাথমিক দায়ভার পালন করতে সক্ষম হয়েছেন। দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের মাধ্যমে হস্তান্তর সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টিও আদালত বিবেচনায় নেন।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, প্রি-এম্পশন মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় প্রতিপক্ষের নামে আর.এস. রেকর্ড প্রস্তুত বা প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ওই পক্ষের আইনগত অধিকার চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। মামলার ফলাফল ও প্রাসঙ্গিক আইনগত অবস্থান বিবেচনা করেই বিষয়টি নির্ধারণ করতে হবে।

রিভিশনে হস্তক্ষেপের কারণ

হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন, দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় রিভিশনাল এখতিয়ার প্রয়োগের সময় আদালত সাধারণত আপিল আদালতের মতো নতুন করে সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়ন করেন না। তবে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য উপেক্ষা, প্রমাণের ভুল পাঠ কিংবা আইনগত ভুলের কারণে ন্যায়বিচার ব্যাহত হলে রিভিশনাল আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে।

আলোচ্য মামলায় হাইকোর্ট দেখতে পান, আপিল আদালতের সিদ্ধান্তে প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভুল মূল্যায়ন ও আইনগত ভুল রয়েছে। বিপরীতে, বিচারিক আদালত মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। ফলে আপিল আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপের যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে আদালত মত দেন।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সবশেষে হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে আপিল আদালতের ২৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের রায় ও আদেশ বাতিল করেন। একই সঙ্গে চৌগাছার সহকারী জজ আদালতের ৩১ অক্টোবর ২০২২ তারিখের আদেশ বহাল রাখেন, যার মাধ্যমে প্রি-এম্পশন মামলা মঞ্জুর করা হয়েছিল।

আদালত কোনো খরচের আদেশ দেননি। পাশাপাশি, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রতিকার চাওয়া হলে বিচারিক আদালতকে আগের আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।

সূত্র: হাইকোর্ট বিভাগের ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের রায়।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: