২৬ অক্টো, ২০২৬

বাদীপক্ষকে নিজস্ব প্রমাণে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, বিবাদীর দুর্বলতা দিয়ে ডিক্রি পাওয়া যায় না: হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রমাণে জমির স্বত্ব ও দখল প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় মানিকগঞ্জের একটি দেওয়ানি মামলায় নিম্ন আদালতের ডিক্রি বাতিল করেছেন হাইকোর্ট।
জমির মালিকানা ঘোষণার মামলায় বাদীপক্ষকে নিজস্ব মৌখিক ও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু বিবাদীপক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি—এই যুক্তিতে বাদীর পক্ষে ডিক্রি দেওয়া যায় না। জমির দীর্ঘদিনের মালিকানা ও দখলের দাবি প্রমাণের জন্য নির্ভরযোগ্য দলিল, ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনার রসিদ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি গুরুত্বপূর্ণ।

 হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি এ কে এম রাবিউল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আরাধন মণ্ডল ও অন্যান্য বনাম ধনঞ্জয় সরকার ও অন্যান্য, ফার্স্ট আপিল নং ১৭১/২০১৭ নিষ্পত্তি করে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। রায়টির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ২৫ অক্টোবর, ২০২৬  তারিখে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।

মামলার পটভূমি

মামলাটি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানার হরগজ মৌজার জমির মালিকানা ও স্বত্বসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে। বাদীপক্ষের দাবি ছিল, শ্যামাচরণ ও রামচরণ ১৯২৭ সালের ১০ মার্চ ১৮৮৩ নম্বর দানপত্রের মাধ্যমে তাঁদের সৎভাই রাইমোহন নমদাসকে জমি দান করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর উত্তরাধিকারীরা ওই জমির মালিক হন।

বাদীপক্ষের আরও দাবি, পরবর্তী সময়ে প্রস্তুত করা এসএ ও আরএস খতিয়ানে ভুলভাবে বিবাদীপক্ষের পূর্বসূরিদের নাম রেকর্ড করা হয়। এ কারণে তাঁরা স্বত্ব ঘোষণার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খতিয়ান সংশোধনের জন্য মামলা করেন।

অন্যদিকে, বিবাদীপক্ষ দাবি করে, জমির ওপর তাঁদের পূর্বসূরিদের স্বত্ব ও দখল ছিল এবং বাদীপক্ষের উত্থাপিত দানপত্রের ভিত্তিতে মালিকানা প্রতিষ্ঠার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।

২০১২ সালে দায়ের করা টাইটেল স্যুট নং ৪৫৯/২০১২ মামলায় মানিকগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালত ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাদীপক্ষের অনুকূলে ডিক্রি দেন। ওই ডিক্রির বিরুদ্ধে বিবাদীপক্ষ হাইকোর্টে প্রথম আপিল করে।

দানপত্রে দখল হস্তান্তরের স্পষ্ট প্রমাণ ছিল না

আপিল শুনানিতে হাইকোর্ট দেখতে পান, বাদীপক্ষ ১৯২৭ সালের দানপত্রের একটি সার্টিফায়েড কপি দাখিল করলেও দলিলে দান গ্রহণ এবং দখল হস্তান্তরের বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

আদালত আরও লক্ষ করেন, জমির ওপর প্রায় একশ বছরের মালিকানা ও দখলের দাবি করা হলেও বাদীপক্ষ ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের রসিদ, নামজারি-সংক্রান্ত নথি কিংবা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল উপস্থাপন করতে পারেনি।

এ ছাড়া, বাদীপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্যেও জমির পরিমাণ ও দখলসংক্রান্ত বিষয়ে অসংগতি ছিল। মামলার আরজিতে ১৬০ শতাংশ জমির দাবি করা হলেও সাক্ষীদের কেউ কেউ ১৯২ শতাংশ জমির দখলের কথা বলেন।

বাদীপক্ষ জমি বিনিময়ের মাধ্যমেও স্বত্ব অর্জনের দাবি করেছিল। কিন্তু সেই দাবির সমর্থনে কোনো বিনিময় দলিল আদালতে দাখিল করা হয়নি।

বিবাদীপক্ষ সাক্ষী না দিলেই বাদীর দাবি প্রমাণিত হয় না

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন, স্বত্ব ঘোষণার মামলায় বাদীপক্ষের দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট জমির ওপর নিজের স্বত্ব ও অধিকার প্রমাণ করা। বিবাদীপক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে—এটি একাই বাদীর দাবির পক্ষে ডিক্রি দেওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি হতে পারে না।

আদালত আরও বলেন, দীর্ঘদিন বা কয়েক প্রজন্ম ধরে জমির দখলে থাকার দাবি কেবল মৌখিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা যায় না, বিশেষ করে যখন সেই দাবির সমর্থনে প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ অনুপস্থিত থাকে।

মামলার নথি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট মনে করেন, বাদীপক্ষ তাদের দাবিকৃত স্বত্ব যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে বাদীপক্ষের মামলা প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দিয়ে নিম্ন আদালত আইনগত ভুল করেছে।

আপিল মঞ্জুর, নিম্ন আদালতের ডিক্রি বাতিল

সবশেষে হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ বিবাদীপক্ষের আপিল মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে মানিকগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের টাইটেল স্যুট নং ৪৫৯/২০১২ মামলায় ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এবং ৬ মার্চ ২০১৭ তারিখে স্বাক্ষরিত রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন।

আইনি তাৎপর্য 

জমির স্বত্ব ঘোষণার মামলায় বাদীকে নিজের দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। বিবাদীর দুর্বলতা বা সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব বাদীর স্বত্বের বিকল্প প্রমাণ নয়।

বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: