২৫ সেপ, ২০২৬

সন্দেহজনক, অপ্রমাণিত বা আইনগতভাবে দুর্বল দলিল দিয়ে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা যায় না: হাইকোর্টের রায়

ছবি: সংগৃহীত 
কোনো দলিল সন্দেহজনক, অপ্রমাণিত বা আইনগতভাবে দুর্বল হলে সেটিকে জমির মালিকানার বৈধ ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, রেকর্ড অব রাইটসে কোনো বিরূপ বা প্রতিকূল এন্ট্রি ভুল হলেও, তার ভিত্তিতে নিজে থেকেই কোনো ব্যক্তির মালিকানা বা দখলের অধিকার সৃষ্টি হয় না। মালিকানার দাবিদারকে প্রথমে নিজের স্বত্বের আইনগত ভিত্তি নির্ভরযোগ্য প্রমাণে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আবদুর রহমান এই সিদ্ধান্ত দেন। আফসার উদ্দিন বেগ ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য (সিভিল রিভিশন নং- ৪৩১৯/১৯৯৭) মামলায় ৪ আগস্ট ২০২৬ দেওয়া রায়ে আদালত নিম্ন আদালতের আপিলের রায় বাতিল করে ট্রায়াল কোর্টের মামলাটি খারিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল করেন। যার পূর্নাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার প্রেক্ষাপট:

মামলার বাদীরা সংশ্লিষ্ট জমিতে নিজেদের স্বত্ব ঘোষণার জন্য ১৯৯১ সালে দেওয়ানি মামলা করেন। তাদের দাবি ছিল, পূর্ববর্তী মালিকদের কাছ থেকে তারা কথিত পট্টার মাধ্যমে জমি পেয়েছেন এবং পরে সেখানে পুকুর, ঘাট ও স্থাপনা নির্মাণসহ দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে জমিটি সরকারের নামে খাস খতিয়ানে রেকর্ড হওয়ায় তারা আদালতের শরণাপন্ন হন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জমিটি মূলত জমিদারির সম্পত্তি ছিল এবং State Acquisition and Tenancy Act, 1950-এর অধীনে জমিদারি বিলুপ্তির পর জমিটি যথাযথভাবে সরকারের খাস জমি হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। বাদীদের জমিতে কোনো বৈধ স্বত্ব নেই বলেও দাবি করা হয়।

ট্রায়াল কোর্ট বাদীদের মামলা খারিজ করলেও আপিল আদালত সেই রায় উল্টে দিয়ে বাদীদের পক্ষে ডিক্রি দেন। এরপর সরকার হাইকোর্টে রিভিশন মামলা করে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট দেখতে পান, বাদীরা তাদের কথিত পট্টা ও দাখিলার মাধ্যমে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেও এসব দলিলের সত্যতা ও প্রস্তুত প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি রয়েছে। বিশেষ করে দাখিলাগুলোর প্রস্তুত ও সম্পাদনের সময় সম্পর্কে সাক্ষীর বক্তব্যের সঙ্গে দলিলের তথ্যের মিল ছিল না।

আদালত আরও বলেন, পরবর্তী এস. এ. রেকর্ডও বাদীদের কথিত পট্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বাদীদের একজন জমির পরিমাণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি এবং ভাড়াও নিয়মিত পরিশোধের প্রমাণ দিতে পারেননি। এসব বিষয় তাদের স্বত্ব ও দখলের দাবিকে দুর্বল করেছে।

হাইকোর্টের মতে, কোনো পক্ষ শুধু পুরোনো দলিল আদালতে উপস্থাপন করলেই তা মালিকানার প্রমাণ হয়ে যায় না। মালিকানার মূল উৎস, পূর্ববর্তী মালিকের স্বত্ব, জমির পরিচয়, পরবর্তী লেনদেন, দখলের ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট খতিয়ান—সবকিছু মিলিয়ে স্বত্বের ধারাবাহিকতা যাচাই করতে হবে।

আদালত স্পষ্ট করে বলেন, খতিয়ান নিজে মালিকানার উৎস নয়। রেকর্ড অব রাইটসের সঙ্গে দলিল, উত্তরাধিকার, দখল, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং স্বত্বের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করতে হবে। পূর্বসূরির বৈধ স্বত্ব প্রমাণিত না হলে পরবর্তী খতিয়ানের এন্ট্রিও সেই ত্রুটি দূর করতে পারে না।

‘Adverse entry’ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য:

আদালত বলেন, কোনো ব্যক্তির স্বত্বের প্রাথমিক ভিত্তিই যদি প্রমাণিত না হয়, তাহলে রেকর্ড অব রাইটসে তার পক্ষে বা বিপক্ষে থাকা কোনো এন্ট্রির ওপর নির্ভর করে স্বত্ব সৃষ্টি করা যাবে না।

রায়ে বলা হয়েছে, “a doubtful, unproved or legally infirm document cannot constitute the juridical foundation of title”—অর্থাৎ সন্দেহজনক, অপ্রমাণিত বা আইনগতভাবে দুর্বল দলিল মালিকানার বিচারিক ভিত্তি হতে পারে না। একইভাবে, মালিকানার প্রাথমিক ভিত্তি না থাকলে রেকর্ড অব রাইটসে বিরূপ এন্ট্রি ভুল হলেও তা নিজে থেকেই বাদীর ঘোষণামূলক বা দখলগত অধিকার সৃষ্টি করে না।

আদালত একই সঙ্গে “Qui sentit commodum, sentire debet et onus” নীতির উল্লেখ করে বলেন, কোনো ব্যক্তি সুবিধা ভোগ করলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়ও বহন করতে হয়—তবে কোনো সম্পত্তির অধিকার সৃষ্টির আইনগত উৎসই যেখানে প্রমাণিত হয়নি, সেখানে এই নীতি প্রয়োগ করে মালিকানা সৃষ্টি করা যায় না।

আপিল আদালতের সিদ্ধান্ত কেন বাতিল:

হাইকোর্ট মনে করেন, আপিল আদালত পট্টা ও দাখিলাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং দলিলগুলোর অসঙ্গতি, জমির পরিচয়, স্বত্বের মূল উৎস, আর.এস. খতিয়ান ও কমিশনারের প্রতিবেদন যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি। একই সঙ্গে ট্রায়াল কোর্টের বিস্তারিত প্রমাণমূল্যায়ন কেন ভুল ছিল, সে বিষয়ে আপিল আদালত যথেষ্ট ও যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে পারেনি।

হাইকোর্ট আরও বলেন, বাদীকে নিজের মামলার ভিত্তি নিজেকেই প্রমাণ করতে হবে; বিবাদীর মামলার দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে বাদী স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে বাদীরা নির্ভরযোগ্য ও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণে তাদের স্বত্বের ধারাবাহিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

রায়

হাইকোর্ট আফসার উদ্দিন বেগ ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য (সিভিল রিভিশন নং- ৪৩১৯/১৯৯৭) -এর রুল এবসোলুট করেন। একই সঙ্গে আপিল আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল করে ট্রায়াল কোর্টের বাদীদের মামলা খারিজের রায় পুনর্বহাল ও বহাল করেন। খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি।

আইনি শিক্ষা:

এই রায়ের মূল শিক্ষা হলো—জমির মালিকানা প্রমাণে শুধু খতিয়ান, পুরোনো দাখিলা বা কোনো একক দলিল যথেষ্ট নয়। দাবিদারকে বৈধ উৎস থেকে স্বত্বের ধারাবাহিকতা, জমির সুনির্দিষ্ট পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দখলের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। সন্দেহজনক বা অপ্রমাণিত দলিল এবং তার ওপর নির্ভরশীল রেকর্ডের এন্ট্রি একা মালিকানার আইনগত ভিত্তি তৈরি করতে পারে না।


বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: