![]() |
| বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ছবি: সংগৃহীত |
একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, কোনো পক্ষের নিজস্ব অবহেলা বা গাফিলতির কারণে তৈরি ঘাটতি পূরণের জন্য সাধারণভাবে মামলা রিমান্ড করা উচিত নয়। তবে আইনজীবীর অনুপস্থিতির কারণে কোনো পক্ষের লিখিত জবাব গ্রহণ না করা হলে এবং এর ফলে সম্পত্তিতে তার স্বতন্ত্র দাবি প্রতিষ্ঠার সুযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাকে মামলাটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
সম্প্রতি মোহাম্মদ আলী ও অন্যান্য বনাম আবদুল জব্বার ও অন্যান্য মামলায় বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। ফার্স্ট আপিল নম্বর ৩৩৯/২০১৮ মামলাটির শুনানি হয় ২০ আগস্ট ২০২৬ এবং রায় দেওয়া হয় ২৫ আগস্ট ২০২৬।
মামলার পটভূমি
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া এলাকার ১৪ দশমিক ৬৪ একর জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। বাদীরা ওই জমির ৫ দশমিক ৮৬ একর নিজেদের বলে দাবি করে স্বত্ব ঘোষণার মামলা করেন। মামলায় কয়েকজন বিবাদী বাদীদের দাবি মেনে নিলেও, অপর কয়েকজন বিবাদী জমির বড় একটি অংশে নিজেদের স্বত্ব দাবি করেন। তারা ১৯৬৪ সাল থেকে বিভিন্ন নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমি কেনার দাবি করেন।
এর আগে একই ১৪ দশমিক ৬৪ একর জমি নিয়ে পার্টিশন স্যুট নম্বর ৫/২০০৪ দায়ের হয়েছিল। ওই মামলায় বর্তমান আপিলকারীদের পক্ষে ৬ দশমিক ২১৫০ একর জমি বরাদ্দ দিয়ে ডিক্রি হয়। পরে ওই ডিক্রির বিরুদ্ধে করা আপিলও খারিজ হয়ে যায়।
তবে পরবর্তী স্বত্ব ঘোষণার মামলায় বিবাদীদের মধ্যে কয়েকজন লিখিত জবাব দেরিতে দাখিল করেন। লিখিত জবাব গ্রহণের আবেদন শুনানির দিন তারা বা তাদের আইনজীবী উপস্থিত হয়ে আবেদনটি উপস্থাপন না করায় আদালত লিখিত জবাব গ্রহণ করেননি। পরে বাদী ও কয়েকজন বিবাদীর মধ্যে আপসের ভিত্তিতে পুরো মামলার নিষ্পত্তি করা হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট বলেন, কোনো পক্ষের নিজস্ব অবহেলা বা গাফিলতির কারণে তৈরি ঘাটতি পূরণের জন্য সাধারণভাবে মামলা রিমান্ড করা উচিত নয়। তবে কোনো পক্ষের ইচ্ছাকৃত বা দোষযোগ্য আচরণের কারণে নয়, এমন পরিস্থিতিতে যদি সে কার্যকরভাবে মামলা পরিচালনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং এতে তার গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলা পুনরায় বিচারের জন্য পাঠানো যেতে পারে।
আদালত আরও বলেন, বর্তমান আপিলকারীরা মামলায় পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। তারা আদালতে হাজির হয়েছিলেন, লিখিত জবাব দাখিলের সময় নিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত লিখিত জবাবের সঙ্গে তা গ্রহণের আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু শুনানির দিন আইনজীবী আবেদনটি উপস্থাপন না করায় লিখিত জবাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়।
হাইকোর্টের মতে, জমির স্বত্ব ঘোষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলায় ওই লিখিত জবাব প্রত্যাখ্যানের ফল ছিল গুরুতর। কারণ সংশ্লিষ্ট বিবাদীরা নিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতে জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশে স্বতন্ত্র স্বত্ব দাবি করেছিলেন এবং আগের পার্টিশন মামলার ডিক্রির ওপরও নির্ভর করেছিলেন।
আপসনামা নিয়ে আদালতের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন, কোনো পক্ষের সঙ্গে করা আপসনামা সেই আপসে সম্মতি না দেওয়া অন্য পক্ষের স্বতন্ত্র অধিকারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। ওই পক্ষের দাবি যথাযথভাবে বিচার করে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
আদালত আরও দেখতে পান, আগের পার্টিশন মামলায় যে জমি নিয়ে ডিক্রি হয়েছিল, সেটিই বর্তমান মামলার জমির সঙ্গে পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট। আগের ডিক্রিতে বর্তমান আপিলকারীদের পক্ষে ৬ দশমিক ২১৫০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী আপস ডিক্রি ওই আগের ডিক্রির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট আপিল মঞ্জুর করে ২০১৫ সালের নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। একই সঙ্গে মামলাটি নতুন করে নিষ্পত্তির জন্য ট্রায়াল কোর্টে ফেরত পাঠানো হয়।
আদালত আরও নির্দেশ দেন, ১১–২২ নম্বর বিবাদীদের দাখিল করা লিখিত জবাব ১০ হাজার টাকা খরচ পরিশোধের শর্তে রেকর্ডে গ্রহণ করতে হবে। আর আপিলে পরবর্তীতে যুক্ত হওয়া ৯–১৮ নম্বর আপিলকারীদের মূল মামলায় বিবাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে লিখিত জবাব দাখিলের সুযোগ দিতে হবে।
নতুন করে বিচারকাজে সব পক্ষকে প্রমাণ উপস্থাপনের যুক্তিসংগত সুযোগ দিতে এবং আগের পার্টিশন মামলার ২০০৭ সালের ডিক্রিসহ পরবর্তী ডিক্রি বিবেচনায় নিতে ট্রায়াল কোর্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলাটি নিম্ন আদালতের নথি ও রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর সম্ভব হলে ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশও দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রায়ের মূল বক্তব্য
আপসনামায় অংশ না নেওয়া কোনো পক্ষের স্বতন্ত্র স্বত্ব ও অধিকারকে আপসের মাধ্যমে খর্ব করা যায় না। বিশেষ করে একই সম্পত্তি নিয়ে পূর্ববর্তী আদালতের ডিক্রি বিদ্যমান থাকলে, তা উপেক্ষা করে আপসের ভিত্তিতে নতুন ডিক্রি দেওয়া আইনগতভাবে টেকসই নয়। ন্যায়বিচারের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে তার দাবি প্রমাণের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে।
বিডিএলপিবি/মাসুম

0 coment rios: